বৈলগাঁও চা-বাগান

দেশের অর্থনীতিতে রাখছে বিশাল অবদান

কল্যাণ বড়ুয়া মুক্তা, বাঁশখালী

সোমবার , ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ at ৬:১৮ পূর্বাহ্ণ
261

সবুজের সমারোহে ছেয়ে গেছে বাঁশখালীর বৈলগাঁও চা বাগান। বর্তমানে চা বাগানে কচি পাতা গজিয়ে উঠছে। ক্লোন চা উৎপাদন করায় এই বাগানটি বর্তমানে দেশের অন্যতম শীর্ষ স্থানে রয়েছে। বাঁশখালীতে অবস্থিত ৩ হাজার ৪ শত ৭২.৫৩ একর জায়গা জুড়ে অবস্থিত এই চাবাগানটির রয়েছে বিশাল এক ইতিহাস। যা পর্যালোচনা করে দেখা যায় বাগানটির প্রতিষ্ঠার সঠিক তথ্য কারো জানা নেই, তবে রেকর্ড পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে, চট্টগ্রাম জেলাধীন বাঁশখালী উপজেলার লট হল ও লট চানপুর মৌজায় অবস্থিত চাঁদপুর বেলগাঁও চাবাগানটি ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর থেকে মালিকানার অনুপস্থিতিতে অব্যবস্থাপনার সম্মুখীন হয়। ক্রমান্বয়ে বাগানের অধিকাংশ জমি স্থানীয় অধিবাসীদের অবৈধ দখলে চলে যায়। পরবর্তীতে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত রায় বাহাদুর জমিদারের মালিকানায় ছিল। জমিদার রায় বাহাদুরের জন্ম ছিল কুন্ড পরিবারে। তাই এই বাগান পূর্বে কুন্ড চাবাগান নামে খ্যাত ছিল। ১৯৬৫ সালের একটি গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে বাগানটি অর্পিত চাবাগান সমূহের চীফ কাষ্টুডিয়ান চাবোর্ডের উপর ন্যস্ত করা হয়। পরবর্তীতে এনিমি প্রপার্টি ম্যানেজম্যান্ট বোর্ড (ইপিএমবি) গঠিত হলে বাগানটির ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ইপিএমবি এর উপর ন্যস্ত করা হয়। ১৯৭২ সালে স্বাধীনতার পর মিনিষ্ট্রি অফ ইন্ডাস্ট্রিজ এন্ড ন্যাচারাল রিসোর্স কর্তৃক ০৯.০৩.১৯৭২ইং তারিখের একটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তৎকালীন ইপিএমবি এর ব্যবস্থাপনাধীন আরও কতিপয় চাবাগান সহ চাঁদপুর বেলগাঁও চাবাগানটির ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পরিত্যক্ত চাবাগানগুলো পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ চাবোর্ডের আওতায় গঠিত বাংলাদেশ টি ইন্ডাস্ট্রিজ ম্যানেজম্যান্ট কমিটির (বিটিআইএমসি) উপর ন্যস্ত করা হয়। কিন্তু ইপিএমবি ও বিটিআইএমসি কোনো প্রতিষ্ঠানই চায়ের অস্তিত্ব বিহীন এ বাগানটির বেদখলীয় জমির দখল উদ্ধার করে চাচাষাবাদ করতে পারেনি। ১৯৬৫ সাল থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ২০ বছর বাগানটি পরিত্যক্ত ছিল। ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ চাবোর্ড ক্ষুদ্রায়তন চাচাষ প্রকল্প চালু করার উদ্দেশ্যে বাগানটির বাস্তব দখল চাবোর্ডের নিকট হস্তান্তরের জন্য ভূমি মন্ত্রনালয়ের নিকট আবেদন জানায়। এই পরিপ্রেক্ষিতে ভূমি মন্ত্রণালয় ০৭.০৪.১৯৮৫ইং তারিখের ৮৪২০/৮৪ নং পত্রে বাগানটির দখল চাবোর্ডের নিকট বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্বকে) নির্দেশ প্রদান করেন। তখন চাবোর্ড প্রায় ৮ (আট) একর জমির উপর চাচাষ শুরু করে। অতপর মাত্র ৮ (আট) একর চাবাগানটি বাংলাদেশ চাবোর্ড ০৫.০৫.১৯৯২ইং তারিখে স্বা রিত চুক্তিপত্র অনুযায়ী চাঁদপুর বেলগাঁও চাবাগানটি ব্যবস্থাপনার জন্য রাগীব আলীর স্বত্তাধিকারী বাঁশখালী টি কেম্পানীর নিকট হস্তান্তর করেন। অতপর ২০০৩ সালে বাঁশখালী টি কেম্পানীর সমূদয় শেয়ার ব্র্যাক ক্রয় করে এবং কোম্পানী আইন ১৯৯৪ এর বিধান অনুযায়ী এ কোম্পানীকে ব্র্যাক বাঁশখালী টি কোম্পানী লিঃ নামকরণ করেন। ব্র্যাক চাবাগানটির মালিকানাস্বত্ত্ব গ্রহন করার পর ২০০৪ সালে চাকারখানা চালু করে। অতপর চাঁদপুর বেলগাঁও চাবাগানের মালিকানা ব্র্যাক, বাঁশখালী টি কোম্পানী লিঃ এর নিকট থেকে গত ২০১৫ সালের ৫ নভেম্বর থেকে সিটি গ্রুপ পরিচালিত ফজলুর রহমান গং এর ভ্যান ও মেরান ট্যাংক টার্মিনাল (বাংলাদেশ) লিঃ এবং ইন্টারন্যাশনাল ওয়েল মিলস্‌ লিঃ ক্রয় করেন।

প্রতিদিন ৭ শতাধিক শ্রমিক এই চা বাগানে তাদের শ্রমের মাধ্যমে নতুন পাতা উৎপাদন ট্রেসিং থেকে শুরু করে চাবাগানের সামগ্রিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। বাঁশখালীর চা সারাদেশে মানের দিক দিয়ে ২য় স্থানে অবস্থান করলেও চট্টগ্রামে প্রথম স্থানে রয়েছে বলে জানান চা বাগান কর্তৃপক্ষ। চলতি বছরে ৩ লক্ষ ৩০ হাজার কেজি চা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে চা বাগান কর্তৃপক্ষ তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। প্রতি বছর জানুয়ারীফেব্রুয়ারি মাসে চাপাতা তোলা না হলেও অপরাপর সময়ে চাশ্রমিকরা তাদের কর্মঘন্টা অনুসারে ২৫ কেজি চাপাতা তুলে থাকেন। বর্তমানে তা ১০ কেজির নিচে প্রতি শ্রমিক প্রতিদিন চাপাতা বাগান থেকে তুলে থাকেন। চা বাগানের অভ্যন্তরে ৭ শতাধিক কর্মচারী নাগরিক সুযোগসুবিধা, স্বাস্থ্য সেবা, শিক্ষাসহ অন্যান্য সার্বিক সুযোগ সুবিধা রয়েছে বলে জানান চাবাগানের ম্যানেজার আবুল বাশার। দেশের ১ম স্থান অধিকারী সিলেটের মধুপুর চাবাগান। এর পরপরই বাঁশখালীর এই বাগানের অবস্থান। এদিকে চাবাগান কর্তৃপক্ষ নিজস্ব উদ্যোগে প্রতিদিন বাগানের সর্বত্র আধুনিক উপায়ে পানি নিস্কাশনের ব্যবস্থা করায় প্রতিদিনই নতুন নতুন কচি পাতা গজিয়ে উঠছে। বর্তমান শীত মৌসুম আসতে না আসতেই এই চাবাগানে পর্যটকরা ভিড় জমাচ্ছেন বাগানের নতুন কচি পাতা গজিয়ে উঠার দৃশ্য দেখার জন্য।

গতকাল বাঁশখালীর বৈলগাঁও পুকুরিয়া সরকার চা বাগান পরিদর্শনকালে বাগানের ম্যানেজার আবুল বাশারের সাথে কথা হলে তিনি জানান, বাঁশখালীর এই বিশাল চা বাগানের চা পাতা সারা দেশে সুখ্যাতি রয়েছে। যার ফলে দেশের যত সব চা বাগান রয়েছে বাঁশখালীর চা বাগানের পাতা মানের দিক দিয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে এবং চট্টগ্রামে প্রথম স্থানে রয়েছে। এই মানের জন্য চা বাগানে কর্মরতরা প্রতিদিন অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছে। তিনি বলেন, আমাদের উৎপাদন যত বৃদ্ধি পায় সরকার রাজস্ব তত বেশি পায়। বর্তমানে চা পাতার বিক্রিত অর্থ থেকে সরকার ১৫% হারে ভ্যাট পান। তবে তিনি বাগানের কিছু সমস্যার কথা উল্লেখ করে বলেন, চা বাগানের চার পাশে ঘেরা বেড়া না থাকায় প্রতিদিন হাতির পাল চা বাগানে ছুটে আসে। ফলে শ্রমিককর্মচারীরা প্রায় সময় শংকিত অবস্থায় থাকে। তিনি সরকারী এই রাজস্ব আয়ের অন্যতম চাবাগানকে আরো বেশি পৃষ্টপোষকতার জন্য উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

- Advertistment -