দেখি বাংলার মুখ : পায়ের নিচে সর্ষে

আলী হাসান

শুক্রবার , ৮ জুন, ২০১৮ at ৫:৪৩ পূর্বাহ্ণ
32

যাহা বলিতে বসিয়াছি তাহাই বলি। কিন্তু বলিলেই ত বলা হয় না। ভ্রমণ করা এক, তাহা প্রকাশ করা আর। যাহার পাদুটা আছে, সেই ভ্রমণ করিতে পারে; কিন্তু হাতদুটা থাকিলেই ত আর লেখা যায় না! সে ভারি শক্ত।’ণ্ড কথাগুলো শরৎবাবুর। তিনি যদি এ যুগের লেখক হতেন বোধকরি বলতেনণ্ড ভ্রমণের জন্য শুধু পা দু’টিই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন পড়ে অর্থের। আর ভ্রমণ শেষে সেবৃত্তান্ত লিখে প্রকাশ করা, সেতো যুদ্ধজয়ের সমান। কেন, কেন এমন শক্ত কথা? কারণ আছে। যে মস্তিষ্কে ফসলের চেয়ে আগাছার চাষ বেশি, যে দর্শনে সুদর্শনের পরিস্ফুটন নেই, যে দৃষ্টি ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসে, সেখানে আর যাই হোক সাহিত্যকর্মের চাষ সম্ভব নয়।

শফিক হাসান ‘দেখি বাংলার মুখ’ বইটিতে গ্রন্থিত ভ্রমণবৃত্তান্তগুলোর চমৎকার চমৎকার শিরোনাম দিয়েছেনণ্ড লালন ও রবীন্দ্র সান্নিধ্যে, কেওক্রাডং চূড়ায়, ব্রাত্যজনের ব্রাসেলস (বরিশাল!) যাত্রা, গীতিকার দেশে, শেকড়ের সন্ধানে মুজিবনগরে, কক্সবাজারে সমুদ্রভোজনে, স্মৃতিবিস্মৃতির চট্টগ্রামে, মাদারীপুরের স্বর্ণরেণু, তূর্ণা নিশিথায় নিশিযাপন এবং হাতিরঝিল ভেসে যায় জলজোছনায়। বরিশালকে লেখক ব্রাত্যজনের ব্রাসেলস বলে বিশেষিত করেছেন। বিষয়টি ভাবনার অবকাশ রাখে।

সাহিত্যিক মানেই সৌন্দর্যের পূজারি। তবে শফিক হাসান যেন এদিকটায় একটু এগিয়ে। সৌন্দর্যের নানা পরশ তাকে নানাভাবে আলিঙ্গন করে যায়। কষ্টসহিষ্ণু ভ্রমণপথে চলতে চলতে প্রকৃতিকে তিনি খুব কাছ থেকে দেখেন। পথের ক্লান্তি, ক্ষুধাবাধা তাকে প্রকৃতিপ্রেম থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারে না। সেপ্রেমের বন্যায় ভাসতে ভাসতে তিনি বলে ওঠেনণ্ড ‘মাইলখানেক পথ হেঁটে উঠলাম পাকা রোডে। মুক্তি এবং অ্যাডভেঞ্চারণ্ড যুগপৎ আনন্দে উদ্বেলিত আমি পথ চলি। মনে হয় হাজার বছর পথ হাঁটিতেছি বরিশালের পথে।’ এর পরপরই আবার বলতে শুনিণ্ড ‘আহ, কতদিন পর গ্রাম দেখছি, দ্বীপের মতো জেগে থাকা বাড়িঘর, গ্রাম্য সরুসর্পিল পথ, থগতির যানবাহন, গ্রামের মানুষ, স্কুলফেরত কিশোরকিশোরী। দেখি, কেবলই দেখে যাই। দৃশ্যাবলি দেখতে দেখতে চোখমুখে মুগ্ধতার অদৃশ্য কায়া একের পর এক বাসা বাঁধে।’

মানবকৃত নানা অপকর্মে প্রকৃতির রূপসত্তায় যে বিনাস সাধনের চিত্র ধরা পড়ে তা দেখে হৃদয়টা ব্যথায় ভরে ওঠে শফিক হাসানের। নির্দয় কষ্ট, একটা যন্ত্রণাবোধ তাকে ক্ষতবিক্ষত করে যায়। সেবেদনাকে ক্ষোভঅনুতাপের সুরে তিনি ব্যক্ত করেনণ্ড ‘রুমের পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে মাথাভাঙ্গা নদী। অবশ্য এটাকে নদী না বলে শীর্ণকায় খাল বললেও খুব একটা ভুল হবে না। নদীতে যদি স্রোতই না থাকে, তবে নদী কীসের! সেহিসেবে মাথাভাঙ্গার কোমর ভেঙ্গে গেছে অনেক আগেই।’

ধ্বংসের ছোঁয়া কোথায় নেই? বন উজাড়, বিলবাঁওড় ভরাট, পাহাড় কাটা যেন একটা গোষ্ঠীর দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে। নির্দ্বধচিত্তে তারা এসব করে যাচ্ছে। তবুও মনের ক্ষোভ চেপে রেখে পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথে চলতে চলতে লেখক উদ্বেল হয়ে ওঠেন। তাকে বলতে শোনা যায়ণ্ড ‘রাস্তার দুপাশে ছোট ছোট পাহাড়। গাছপালা, ঝোপজঙ্গল, লতাগুল্মের সাম্রাজ্য। সবুজের সমারোহ। যেদিকে তাকাই চোখ জুড়িয়ে যায়। মন ভরে ওঠে অনাবিল আনন্দে। এত রূপবতী আমাদের দেশ! আমাদের দেশমাতা এত সুন্দরী আগে ভালোভাবে খেয়াল করে দেখা হয়নি। কেন যে হয়নি!’

মাদারীপুরে স্বর্ণরেণু খুঁজতে গিয়ে লেখককে বলতে শুনিণ্ড ‘পুরুষ দোকানির পাশাপাশি রয়েছে নারী দোকানিও। আমরা মধ্যাহ্নভোজ সারতে ঢুকলাম একটা হোটেলে। এটা বাসা কাম হোটেল। খাবার পরিবেশন করছে ১০/১২ বছরের একটা মেয়ে। কী জন্য যেন ভেতর থেকে তার মা নাম ধরে ডাক দিলেন। নাম জেনে আমিও হাঁক দিলামণ্ড সুবর্ণা, পানি দিয়ে যা।’ ঠিক যেন রবীন্দ্রনাথের পোস্টমাস্টারের রতনের মতো। ‘যখন অন্ধকার দাওয়ায় একলা বসিয়া গাছের কম্পন দেখিলে কবিহৃদয়েও ঈষৎ হৃদকম্প উপস্থিত হইত তখন ঘরের কোণে একটি ীণশিখা প্রদীপ জ্বালিয়া পোস্টমাস্টার ডাকিতেন ‘রতন’। রতন দ্বারে বসিয়া এই ডাকের জন্য অপেক্ষা করিয়া থাকিত কিন্তু এক ডাকেই ঘরে আসিত নাণ্ড বলিত, কী গা বাবু কেন ডাকছ।’

সাগরের বিশালতা মানুষকে উদার করে, সংসারজ্বালাযন্ত্রণা ভুলিয়ে দেয়। সাগর সৈকতে বেড়াতে এসে মানুষ আদিম সত্তার খুব কাছে চলে যায়। সাগরের তরঙ্গের সাথে তরঙ্গায়িত হয়ে দেহমন কেবলই সুখানুভূতি খোঁজে, কী পুরুষ, কী নারী। নারীদেহে পরিধেয় সংক্ষিপ্ত পোশাক লেপ্টে যে অরূপ সৌন্দর্যের অবতারণা হয় তা আর কারো দৃষ্টি না কাড়লেও সাহিত্যিকের দৃষ্টি ফাঁকি দেওয়ার উপায় পায় না। তেমনি একটি চমৎকার দৃশ্য শফিক হাসানের মন কেড়ে নেয় বালুকাবেলায়ণ্ড ‘কোনো কোনো প্রেমিক জুটি জলকেলি করছে,… কেউবা জড়িয়ে ধরে আছে পরস্পরকে। ..স্নানপর্ব সেরে যেসব নারী উপরে উঠে এসেছেণ্ড স্পষ্ট হয়ে উঠেছে তাদের দেহের বিপজ্জনক বাঁকগুলো।’

একজন স্বাভাবিক মানুষকে যেমন দুর্নীতিঅবক্ষয় শান্তিতে থাকতে দেয় না, কবিসাহিত্যিকদেরকেও না। স্বাধীনতা অর্জনের সুদীর্ঘকাল পরেও যখন আমরা ভাবতে পারি না যে, আমরা স্বাধীন হয়েছি এবং ভালো আছি, তখন দুঃখবেদনায় হৃদয় কুঁকড়িয়ে ওঠে। পথেপ্রান্তরে ঘুরতে ঘুরতে দুর্নীতিঅবক্ষয়ের দৃশ্যাবলি শফিক হাসানের শান্তি কেড়ে নেয়। অন্তরের কষ্টবোধকে চেষ্টা করেও চেপে রাখতে পারেন না কখনো কখনো। তিনি বেদনায় নীল হয়ে ওঠেন, কিন্তু তা অকারণে অন্যের মাঝে সংক্রমিত করতে চান না, আবার নিজের ভেতর চেপে রেখে স্বস্তিও পান না। তাই খুব সাদামাটাভাবে সেসবের ছিটেফোঁটা বর্ণনা তুলে ধরেন। ট্রেনভ্রমণে যাত্রীকে যেদুর্নীতির কবলে পড়তে হয় তার বর্ণনা এসেছে এভাবেণ্ড ‘তার (টিকিট মাস্টারের) নির্লিপ্ততার পরও মানুষ হাল ছাড়ছে না। ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে ধৈর্যের পরিচয় দিচ্ছে। মাঝখানে থাকায় আমি পিছনের লোকদের ঠেলা খাচ্ছি, গুঁতা খাচ্ছি, ক্ষেত্রবিশেষে ধমকও। যেন আমার জন্যই তারা টিকিট কিনতে পারছে না, আমার জায়গায় তারা হলে এতক্ষণে ঠিকই কিনে ফেলত।’ অল্প কথায় একজন টিকিট সংগ্রহকারীর দুর্দশার চিত্র কী চমৎকারভাবে উঠে এসেছে! পড়ে মনে হয় আমি বর্ণনাকারীর খুব নিকটে আছি এবং সবই প্রত্যক্ষ করছি। চরম কষ্টের পর যখন যাত্রী টিকিট না পাওয়ার কারণ উদ্ধার করে তা আরো বিস্ময়কর, আরো পীড়াদায়কণ্ড ‘এ সময়ে টিকিট মাস্টারের পিছনে এসে দাঁড়ালেন লাল টাই, সাদা শার্ট পরা মধ্যবয়স্ক এক লোক। পাশের এক যাত্রী তাকে চোখের ইশারায় ডাকল। যাত্রী লাল টাইকে ফিসফিসিয়ে বলল, দুইটা টিকিটের ব্যবস্থা করে দিন না! টিকিট দুইটা আছে, তবে বিশটাকা বাড়িয়ে দিতে হবে। মোট তিনশ বিশ টাকা দেবেন। এতক্ষণে বুঝে গেছি লাল টাই ট্রেনের টিটি। ছেঁকে ধরলাম লাল টাইকে। আমাদেরও টিকিটের ব্যবস্থা করে দিতে হবে। তিনি বললেন, টিকিট নাই, টিকিট ছাড়াই যাবেন আমার সাথে? …লাল টাই কিছুক্ষণ পরপর যাত্রী এনে বসিয়ে দিচ্ছেন। সবাই টিকিট ছাড়া ‘চুক্তি মোতাবেক’।’ এই চুক্তিটা যে কী তা আর আমাদের বুঝতে বাকি থাকে না। তাই লেখক পরক্ষণেই দুঃখ করেনণ্ড ‘হায় দুর্ভাগা দেশ, এর রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি আর অশুভের আস্ফালন।’ এখানেই শেষ নয়, দেশের যুবসমাজ আজ যে মাদকের গ্রাসে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে সেটিও যে সমাজের কর্তাব্যক্তিদের যোগসাজসেই ঘটে সেবিষয়টিও ভ্রমণ করতে যেয়ে শফিক হাসানর দৃষ্টি এড়াতে পারেনিণ্ড ‘ফেন্সিডিলের বড় একটা চালান উঠল। যে লোকটা এর দেখভাল করে, মাদকসম্রাটের মতো মনে হলো তাকে। গলায় লোহার চেইন, হাতে মোটা মেটাল ব্রেসলেট।’

সত্যিই ‘দেখি বাংলার মুখ’ শফিক হাসানকে তার নানামাত্রিক মুখ না দেখিয়ে ছাড়েনি। বর্ণনার দক্ষতায় ভ্রমণবৃত্তান্ত ভীষণ প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে। মনে হয় না পড়ছি, মনে হয় ভ্রমণকারীর সাথে সাথে ঘুরছি। এত সুন্দর এবং প্রাঞ্জল ভাষায় লেখা এরকম সংকলন খুব বেশি আছে বলে আমার জানা নেই। চমৎকার একটি বই। পাঠ করে যে কেউই প্রত্যাশায় থাকবে পরবর্তী সংকলনটির জন্যণ্ড কথাটা একটু জোর দিয়েই বলা যায়।

দেখি বাংলার মুখ, শফিক হাসান ॥ প্রকাশক : পারিজাত প্রকাশনী, প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারি ২০১৬, প্রচ্ছদ : জাবেদ ইমন, দাম : ১৫০ টাকা

x