দৃষ্টি আজ আত্মসমর্পণে

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কক্সবাজারে, সেফহোমে শতাধিক ইয়াবা কারবারি

আহমদ গিয়াস ও জাবেদ ইকবাল চৌধুরী

শনিবার , ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ at ৭:৫১ পূর্বাহ্ণ
204

 

 

 

জলদস্যু কিংবা পার্বত্য অঞ্চলের অস্ত্রধারীদের মতো এবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হাতে আত্মসমর্পণ করতে যাচ্ছেন শতাধিক ইয়াবা কারবারি। এদের মধ্যে ২০ থেকে ৩০ জন শীর্ষ ইয়াবা কারবারিসহ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত ৫৫ থেকে ৬০ জন গডফাদারও রয়েছেন। তাদের মধ্যে বহুল আলোচিত সরকার দলীয় সাবেক সাংসদ আবদুর রহমান বদির ভাইসহ অন্তত ১০ জন নিকটাত্মীয় রয়েছেন।

প্রায় মাসখানেক ধরে এসব ইয়াবা কারবারি পুলিশি হেফাজতে থাকার পর আজ শনিবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণ করার কথা রয়েছে। এ নিয়ে সীমান্ত উপজেলা টেকনাফের সাধারণ মানুষের মাঝে কৌতূহলের শেষ নেই। এসব আত্মসমর্পণকারী চিহ্নিত ইয়াবা কারবারির ভাগ্যে কী ঘটছে? এরা কি আইনের গ্যাঁড়াকলে আটকে যাচ্ছে নাকি পার পেয়ে যাচ্ছে?

এদিকে, আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান সফল করতে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে কক্সবাজার জেলা পুলিশ। গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠানস্থল টেকনাফ পাইলট হাই স্কুল মাঠে তৈরি করা হয়েছে বিশাল মঞ্চ। এ কাজ তদারকি করতে গত কয়েকদিন ধরে কক্সবাজার অবস্থান করছেন পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুক। তিনি বৃহস্পতিবার মঞ্চ ও প্যান্ডেল নির্মাণ কাজ পরিদর্শন করেন।

জেলা পুলিশের তত্ত্বাবধানে কক্সবাজার জেলা পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদের সভাপতিত্বে সকাল ১০টায় মাদক কারবারিদের আত্মসমর্পণ ও অপরাধ দমন সভা শুরু হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান খান কামাল প্রধান অতিথি, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) . মো. জাবেদ পাটোয়ারী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সচিব মোস্তফা কামাল উদ্দিন বিশেষ অতিথি থাকবেন। গতকাল সকালে তারা কক্সবাজারে এসে পৌঁছেছেন। স্থানীয় এমপি শাহীন আক্তারসহ কক্সবাজার জেলার চার এমপি এবং জেলার শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকবেন।

কক্সবাজার জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. ইকবাল হোসেন বলেন, আমরা ধরে নিচ্ছি শনিবার শতাধিক ইয়াবা কারবারি আত্মসমর্পণ করবে। তবে এ সংখ্যা একটু কমবেশি হতে পারে। এদের মধ্যে চিহ্নিত এবং তালিকাভুক্ত ইয়াবা কারবারি আছে অর্ধশতাধিক।

তিনি বলেন, ইতোমধ্যে আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান সফল করতে সব ধরনের প্রস্তুতি আমরা সম্পন্ন করেছি। প্রস্তুতি কাজ তদারকির জন্য গত কয়েকদিন ধরে স্বয়ং ডিআইজি স্যার কঙবাজার অবস্থান করছেন। আশা করছি, পুলিশের এ উদ্যোগ মাদক নির্মূলে টেকনাফ তথা পুরো কঙবাজারে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

পুলিশের বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, আত্মসমর্পণের জন্য প্রায় এক মাস আগে থেকে পুলিশি হেফাজতে রয়েছেন এসব মাদক কারবারি। এদের মধ্যে সাবেক এমপি আবদুর রহমান বদির ভাই আবদু শুক্কুর, আবদুল আমিন, মো. শফিক, মো. ফয়সাল, বেয়াই শাহেদ কামাল, চাচাতো ভাই মো. আলম, ফুফাতো ভাই কামরুল ইসলাম, ভাগ্নে সাহেদুর রহমান নিপু, খালাতো ভাই মং মং সিংসহ অন্তত দশজন নিকটাত্মীয় রয়েছেন।

এছাড়া রয়েছেন টেকনাফ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জাফর আহমদের ছেলে দিদার মিয়া, ভাইপো মো. সিরাজ, হ্নীলার ইউপি সদস্য জামাল হোসেন, নুরুল হুদা মেম্বার, তার ভাই নুরুল কবির, টেকনাফ পৌরসভার কাউন্সিলর নুরুল বশর নুরশাদ, নারী কাউন্সিলর কহিনুর বেগমের স্বামী শাহ আলম, টেকনাফ সদর ইউপি সদস্য এনামুল হক, ছৈয়দ হোসেন মেম্বার, ছৈয়দ আহমদ ছৈতু, শফিকুল ইসলাম, মো. ইউনুছ, একরাম হোসেন, রেজাউল করিম মেম্বার, মোজাম্মেল হক, জোবাইর হোসেন, মারুফ বিন খলিল ওরফে বাবু, মো. ইউনুছ, উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. আবদুল্লাহর দুই ভাই জিয়াউর রহমান ও আবদুর রহমানসহ শতাধিক ইয়াবা কারবারি। এদের বিরুদ্ধে ২ থেকে ১৫টি পর্যন্ত মামলা রয়েছে বলে পুলিশের একটি সূত্র জানায়।

অন্যদিকে টেকনাফের বহুল আলোচিত ইয়াবা গডফাদার হাজি সাইফুল করিমকে নিয়ে চলছে নানা গুঞ্জন। অনেকে বলছেন, সাইফুল করিমও আজ আত্নসমর্পণ করতে যাচ্ছেন। তবে পুলিশের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে, সাইফুল পুলিশি হেফাজতে নেই। এমপি বদির আরেক ভাই পৌর কাউন্সিলর মৌলভি মুজিবুর রহমানও আত্মসমর্পণ করতে পারেন বলে এলাকায় গুঞ্জন থাকলেও তিনি প্রকাশ্যেই রয়েছেন বলে জানা যায়।

কঙবাজার জেলা গোয়েন্দা পুলিশের সর্বশেষ ইয়াবা ব্যবসায়ীর তালিকায় ১ হাজার ১৫১ জনের নাম রয়েছে। এর মধ্যে ৭৩ জন প্রভাবশালী ইয়াবা কারবারি (গডফাদার)। তাদের ৬৬ জনই টেকনাফের বাসিন্দা।

গত বছরের ৪ মে থেকে দেশজুড়ে মাদকবিরোধী অভিযান শুরু হয়। এরপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সন্ত্রাসীদের মধ্যে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ শুধু কঙবাজার জেলায় ৫৪ মাদক ব্যবসায়ীর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে টেকনাফে মারা গেছে ৫০ জন।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সবক’টি তালিকায় ‘পৃষ্ঠপোষক’ হিসেবে আবদুর রহমান বদি ও ইয়াবা গডফাদার হিসেবে তার পাঁচ ভাই, এক বোনসহ ২৬ জন নিকটাত্মীয়ের নাম রয়েছে। পুলিশ, বিজিবি, কোস্টগার্ড, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও গোয়েন্দা সংস্থার তালিকা অনুযায়ী সারা দেশে তিন হাজারেরও বেশি চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী রয়েছে। এদের মধ্যে কঙবাজার জেলায় আছে ১ হাজার ১৫১ জন। তার মধ্যে ৭৩ জন প্রভাবশালী ইয়াবা কারবারিকে চিহ্নিত করা হয়েছে; যারা বেশিরভাগই টেকনাফের। এছাড়া তালিকায় সাবেক সাংসদ আব্দুর রহমান বদিসহ ৩৪ জন সাবেক ও বর্তমান জনপ্রতিনিধি এবং বদির ৫ ভাই আবদুস শুক্কুর, আবদুল আমিন, মৌলভী মুজিবুর রহমান, মো. সফিক ও মো. ফয়সাল ও ১ বোনসহ ২৬ জন নিকটাত্মীয়ের নাম রয়েছে।

কঙবাজার জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. ইকবাল হোসেন জানান, গত বছর ৪ মে থেকে সারা দেশে মাদকবিরোধী অভিযান জোরদার করা হয়। এরপর থেকে এ অভিযানে এবং মাদক কারবারিদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে শুধু কঙবাজারেই বন্দুকযুদ্ধে অর্ধশতাধিক মাদক ব্যবসায়ী নিহত হয়েছেন। এদের মধ্যে ৯০ ভাগই টেকনাফের।

অন্যদিকে, মাদকবিরোধী অভিযান অব্যাহত থাকলেও, এমনকি প্রায় প্রতিদিন বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটলেও বন্ধ হয়নি ইয়াবা পাচার। এরকম পরিস্থিতিতে প্রতিদিন আইনশৃংখলা বাহিনীর হাতে ইয়াবা ধরা পড়ছে। গত দুই মাসে পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি, কোস্টগার্ড ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের হাতে ধরা পড়েছে প্রায় ১৬ লাখ ইয়াবা। এমনকি আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানের আগের দিনও ধরা পড়েছে সাড়ে ৫ লাখ পিস ইয়াবা।

সবকিছু মিলে এই ব্যবসা নির্মূল করা যাবে কি না তা নিয়ে স্থানীয়দের সংশয় কাটছে না। তাদের দাবি, ইয়াবা কারবারিদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি সম্পদও যেন বাজেয়াপ্ত করা হয়।

কঙবাজার(উখিয়াটেকনাফ) আসনের সাবেক সাংসদ অধ্যাপক মো. আলী বলেন, মাদক তথা ইয়াবার কারণে আমাদের বিশেষ করে টেকনাফের মানুষের মাথা নত হয়ে যাওয়ার অবস্থা। এমন পরিস্থিতিতে মাদক কারবারিদের আত্মসমর্পণের বিষয়টি অবশ্যই প্রশংসনীয় উদ্যোগ। তবে, এটিকে কীভাবে অধিকতর ফলপ্রসূ করা যায়, এর দায়িত্ব সরকারের, পুলিশ বিভাগের। এরা যাতে আত্মসমর্পণের নামে পার পেয়ে না যায় সে বিষয়টি তাদের দেখতে হবে। না হলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হতে পারে।

তবে, কঙবাজার পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন বলেন, আত্মসমর্পণকারী ইয়াবা কারবারিদের বিরুদ্ধে যে মামলাগুলো আছে, সেই মামলাগুলো আইনের গতিতে চলবে। তাদের অবৈধ সম্পদের বিষয়টি এনবিআর, দুদক দেখবে। পার পেয়ে যাওয়ার মতো কোনো সুযোগ থাকবে না বলে জানান তিনি।

তিনি বলেন, মাদক, বিশেষ করে ইয়াবা পাচারের কারণে সারা দেশে কঙবাজারের যে দুর্নাম ছড়িয়েছে, সেই দুর্নাম ঘুচানোর জন্যই আমাদের এ উদ্যোগ। আশা করছি আমরা সফল হব।

আত্মসমর্পণ করছেন না টপ টেনের কেউ!

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তালিকা অনুযায়ী, শীর্ষ ৭৩ ইয়াবা কারবারির মধ্যে ‘টপ টেন’ অর্থাৎ প্রথম ১০ জনের কেউই আজ শনিবারের আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে আত্নসমর্পণ করছেন না। আত্মসমর্পণের জন্য বেশ কিছুদিন আগে থেকে পুলিশের হেফাজতে থাকা শতাধিক ইয়াবা গডফাদার ও কারবারির মধ্যে টপ টেনের কারো নাম নেই। বিষয়টি বিভিন্ন মহলে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তালিকা অনুযায়ী শীর্ষ ৭৩ ইয়াবা কারবারির মধ্যে ‘টপ টেন’ অর্থাৎ প্রথম ১০ জনের এক নম্বরে রয়েছেন টেকনাফের সাবেক সাংসদ আবদুর রহমান বদির নাম। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন টেকনাফের শীলবনিয়ার হানিফ ডাক্তারের ছেলে সাইফুল করিম ওরফে হাজী সাইফুলের নাম। ততীয় অবস্থানে রয়েছেন সাবেক বিএনপি নেতা ও বর্তমানে আওয়ামী লীগ নেতা ও বদির ঘনিষ্ঠজন হিসাবে পরিচিত টেকনাফের বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান জাফর আলম, চতুর্থ স্থানে সাবেক এমপি আবদুর রহমান বদির ভাই আবদুস শুক্কুর, পাঁচ নম্বরে নাম রয়েছে বদির আরেক ভাই টেকনাফ পৌরসভার বর্তমান প্যানেল মেয়র মৌলভী মুজিবুর রহমান, ষষ্ঠ নম্বরে টেকনাফ উপজেলা চেয়ারম্যান জাফর আহমদের ছেলে টেকনাফ সদর ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান শাহজাহান মিয়া, সপ্তমে নাম থাকা মোস্তাক মারা গেছেন। তালিকার আট নম্বরে রয়েছেন টেকনাফ উপজেলা পরিষদের বর্তমান ভাইস চেয়ারম্যান মৌলভী রফিক উদ্দীন ও নবমে তার ভাই বাহারছড়া ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান মৌলভী আজিজ উদ্দীনের নাম এবং টপ টেনের সর্বশেষ নামটি টেকনাফ পৌরসভার জালিয়াপাড়ার ইয়াবার লগ্নিকারক ও হুন্ডি সম্রাট হিসেবে খ্যাত জাফর আহমদ ওরফে টিটি জাফর।

এদের মধ্যে হাজী সাইফুল করিম আত্মসমর্পণ করতে পারেনএমন শোনা গেলেও তিনিসহ টপ টেনের কেউ পুলিশি হেফাজতে নেই বলে পুলিশ সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে। আবার এদের হাজী সাইফুলসহ বাকিরা এখন প্রকাশ্যে ঘোরাঘুরি করছেন বলে জানান কঙবাজার জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি ইশতিয়াক আহমদ জয়।

তিনি বলেন, গডফাদাররা সকলেই কঙবাজার শহর কিংবা টেকনাফে প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা করে বেড়াচ্ছেন। তালিকায় নাম থাকা সত্ত্বেও কোনো এক অদৃশ্য কারণে আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়ার বাইরে রয়েছেন টেকনাফ সীমান্তের অনেক বড় বড় ইয়াবা কারবারি বা গডফাদাররা। ঠিক কোন কারণে, কেন তারা আত্নসমর্পণ করছেন না, এই প্রশ্নের উত্তর জানেন না কেউ।

প্রস্তুত বিশেষ মঞ্চ

ইয়াবা কারবারিদের আত্মসমর্পণের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে বিশেষ মঞ্চ। টেকনাফ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে বিশাল প্যান্ডেল তৈরি করা হয়েছে। এখানে প্রায় পাঁচ হাজার আসন বিন্যাস করা হয়েছ্যে। মাঠের দক্ষিণে তৈরি করা হয়েছে অতিথিদের জন্য প্রধান মঞ্চ।

প্রধান মঞ্চের পূর্বে তৈরি করা হয়েছে আত্মসমর্পণকারী ইয়াবা কারবারিদের অবস্থানের জন্য বিশেষ স্থান। অনুষ্ঠান ঘিরে তিনদিনব্যাপী মাইকিং হয়েছে। স্কুলমাদরাসার শিক্ষার্থীদেরও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

পুলিশের একটি সূত্রে জানা যায়, আত্মসমর্পণকারী শতাধিক ইয়াবা কারবারির বিরুদ্ধে টেকনাফ মডেল থানায় একটি মামলা হবে। পুলিশ বাদী হয়ে এই মামলায় তাদের আটক দেখিয়ে আদালতে সোপর্দ করা হবে। এরপর আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবে। এতে প্রশাসন স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা ইয়াবা কারবারিদের পুনর্বাসনসহ অন্যান্য সহযোগিতা দেবে। এদের বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলো যথানিয়মে চলবে।

এদিকে সেফহোমে যাওয়া কয়েকটি পরিবারের সাথে কথা হলে জানা যায়, তারা উদ্বিগ্নউৎকণ্ঠায় রয়েছে। অনেক পরিবার ইয়াবায় অর্জিত সম্পদ বাজেয়াপ্ত ও দীর্ঘমেয়াদে কারাদণ্ড হওয়ার সংশয়ে রয়েছে। অনেকে আশা করছে, সরকার তাদেরকে ক্ষমা করে দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সুযোগ দেবে।

অবৈধ অস্ত্রের কী হবে

ইয়াবা ব্যবসায়ীদের হাতে থাকা অবৈধ অস্ত্রের কী হবে? তা নিয়ে চলছে টেকনাফের সাধারণ মানুষের মাঝে আলোচনা। ইতিমধ্যে শতাধিক ইয়াবা ব্যবসায়ী পুলিশ হেফাজতে রয়েছেন। আবার এদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের মধ্যে রয়েছে মাদক ও অস্ত্রের মামলা। অনেকের টেকনাফের বিভিন্ন স্থানে প্রকাশে অস্ত্রের মহড়া দিয়ে নিজেদের আধিপত্য জাহির করারও অভিযোগ রয়েছে।

এর মধ্যে টেকনাফ সদরের ৮ নং ওয়ার্ডের সদস্য এনামুল হকের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা পুলিশ ও র‌্যাব সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনায় মামলাও রয়েছে বেশ কয়েকটি। হ্নীলা ইউপির ৮ নং ওয়ার্ডের সদস্য নুরুল হুদা ও ৭ নং ওয়ার্ডের সদস্য জামাল হোছনের বিরুদ্ধে রয়েছে একাধিক অস্ত্র ও মাদক মামলা। বিভিন্ন সময়ে আইনশৃংখলা বাহিনীর সাথে মাদক কারবারিদের বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনার সাথে জড়িত ইয়াবা কারবারিদের হাতেও রয়েছে অবৈধ অস্ত্র। এছাড়া উপজেলা আইনশৃংখলা কমিটির সভায় দায়িত্বশীল অনেকে চিহ্নিত ইয়াবা ব্যবসায়ীদের হাতে অবৈধ অস্ত্র থাকার কথা উল্লেখ করেছিলেন।

টেকনাফ মডেল থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাস বলেন, আইন নিজের গতিতে চলবে। ইয়াবা কারবারি অস্ত্রধারীদের ছাড় দেওয়া হবে না। ইয়াবা উদ্ধারের পাশাপাশি অস্ত্র উদ্ধার ও পুলিশি অভিযান জোরদার হবে।

হুন্ডি নেটওয়ার্ক

প্রায় এক মাস ধরে পুলিশ হেফাজতে থাকা ইয়াবা কারবারিদের কেউ কেউ ইয়াবা বিস্তারের নেপথ্যে হুন্ডি নেটওয়ার্কের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তথ্য দেন সংশ্লিষ্টদের। এসব তথ্যে উঠে এসেছে ৩০ গডফাদারের নাম, যারা অবস্থান করছে দুবাই ও সিঙ্গাপুরে। এই চক্রের সদস্যদের কারো নাম প্রশাসন বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কোনো তালিকায় আসেনি। এরা নেপথ্যে থেকে ইয়াবা ব্যবসা পরিচালনার জন্য সহযোগিতা করে থাকে।

ইয়াবা কারবারিরা জানান, মিয়ানমার থেকে ইয়াবার চালান পাঠানো হয় টেকনাফের নির্ধারিত ব্যক্তির কাছে। সেখান থেকে বিভিন্ন ভাগে চালান নিরাপদে ব্যক্তি বিশেষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। তবে এসব ইয়াবার লেনদেন দেশের মধ্যে পরিশোধ করতে হয়। দেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থানরত নির্ধারিত এজেন্ট এ টাকা সংগ্রহ করে। বড় চালানের জন্য মিয়ানমারে সরাসরি কোনো টাকা বা অর্থ পাঠাতে হয় না।

আত্মসমর্পণে আসা ব্যক্তিদের স্বীকারোক্তিতে এমন ৩০ জন এজেন্টের নাম পেয়েছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এই এজেন্টরা ইয়াবার টাকা সংগ্রহ করে পাচার করে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। এ টাকা বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে পাচার করা হয় দুবাই ও সিঙ্গাপুরে অবস্থানরত ইয়াবার মূল মালিকদের কাছে। আর দুবাইসিঙ্গাপুর ঘুরে এ অর্থ পৌঁছায় মিয়ানমারে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা মনে করেন, ইয়াবা গডফাদারদের নেপথ্যে রয়েছে টাকা সংগ্রহকারী হুন্ডি ব্যবসায়ীরা। আর এসব হুন্ডি ব্যবসায়ীর নেপথ্যের ব্যক্তিরা রয়েছে দুবাই ও সিঙ্গাপুর। ইতোমধ্যে দুবাই, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া থেকেও কিছু ব্যক্তি আত্মসমর্পণ করতে দেশে ফিরেছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ইয়াবা গডফাদারদের নেপথ্যের হুন্ডি ব্যবসায়ী ৩০ জনকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। টেকনাফ, কঙবাজার শহর, চট্টগ্রাম এবং ঢাকা কেন্দ্রিক এসব ব্যবসায়ী বৈধ ব্যবসার আড়ালে ইয়াবার অর্থ সংগ্রহ করে দুবাইসিঙ্গাপুর পাচার করে থাকে। এসব সিন্ডিকেটের সদস্যরা টেকনাফে অবস্থান করে নানাভাবে ইয়াবার অর্থ সংগ্রহ করে থাকে। এসব সদস্যের নাম এসেছে ইয়াবা কারবারিদের স্বীকারোক্তিতে।

টেকনাফ মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) এবিএমএস দোহা জানান, ইয়াবা কারবারিদের টাকা লেনদেনের হুন্ডি চক্রের বিষয়ে তদন্ত চলছে। যথাসময়ে এসব চক্রের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

x