দূরের দুরবিনে

অজয় দাশগুপ্ত

শুক্রবার , ৯ নভেম্বর, ২০১৮ at ৮:৩৯ পূর্বাহ্ণ
33

শোক ও সম্ভাবনার শহরে আলোর রেখা
আমার বসবাস যেখানেই হোক মন পড়ে থাকে জন্মভূমি চট্টগ্রামে। জন্ম থেকে বড় হবার শহর আমার আত্মায়। আমি তার কাছে ফিরে যাই বারবার। তাই আজ এমন দুজন মানুষের কথা লিখবো যাঁদের চলে যাওয়া শুধু চট্টগ্রামের না সারা দেশের রাজনীতি ও সংস্কৃতির জন্য দুঃসংবাদ। আমাদের দেশের আয়তন ছোট আমরা ঘন বসতিপূর্ণ দেশের মানুষ। তাই মায়া বেশী। পাড়ায় পাড়ায় মহল্লায় যে প্রীতি বা সম্পর্ক কোন বড় শ্রোতা দেখবেননা। কারণ মানুষ যত আধুনিকতার নামে যান্ত্রিক হবে তত ই তাদের ভেতর দূরত্ব বাড়বে। একসময় তারা পাশাপাশি থাকলেও কেউ আর কাউকে চিনবেনা। চিনলেও সে সম্পর্ক হবে মমতাহীন। ঢাকায় তা বাস্তব হলেও চট্টগ্রাম এখনো সে পথে পা বাড়ায়নি। আর আমরা যখন বড় হচ্ছিলাম তখন চট্টগ্রাম কিছুটা গ্রাম ই ছিলো। সে গ্রামের আলোকিত মানুষগুলোর তেজ ও দীপ্তি আমাদের পথ দেখালেও সারাদেশ তাঁদের তেমন করে চিনতে পারেনি। যার মূল কারণ আমাদের দেশে সবকিছু এককেন্দ্রিক। রাজনীতি থেকে সংস্কৃতি সব বেলাতেই আমরা এমন। শরীরের সব রক্ত মুখে উঠলে তাকে সুষম বলা যায়না । ঠিক তেমন অসম এক বিন্যাস আমাদের। ঢাকায় না গেলে কেউ জাতীয় হয়না। হতে পারেনা। যত বড় প্রতিভাই হোক না কেন তিনি তাঁদের মফস্বলের হয়েই জীবন কাটাতে হয়।
সমপ্রতি বিগত শেখর দস্তিদার আর রণজিৎ রক্ষিত দু জনই কৃতী মানুষ। একজন রাজনীতিতে সারাজীবন সাম্যের জন্য লড়েছেন। সরকারি কলেজ বলতে গেলে উপমহাদেশের সুপ্রসিদ্ধ কলেজ চট্টগ্রাম কলেজের প্রিন্সিপালও হয়েছিলেন তিনি। তারপর ও সে আদর্শ ভোলেননি। রিটায়ার করার পর সামাজিক মিডিয়ায় তাঁর পদচারণা দেখলেই বোঝা যেতো কতটা সচল আর ভাবুক ছিলেন। কবিতা থেকে আন্দোলন সব বিষয়ে এমন মনোযোগী মানুষ আজকাল দেখতে পাওয়া যায়না। তাঁকে আমি তাঁর যৌবনে দেখেছি কাপড় চোপড় কিংবা খাবার কিছু ই কিছু না। দেশ সমাজ আর মানুষের জীবন পরিবর্তনের জন্য সে এক লড়াই বটে। আদর্শবাদী মানুষের যা হয় ছাত্র ইউনিয়ন করা মানুষতো আর চাইলেই পোশাকের মত দল বদল করতে পারেননা। তাই এক দলেই কাটিয়ে গেলেন নিজের জীবন। সরকারি বেসরকারি কোন দলের মোসাহেবি করতেন না বলে মৃত্যুর পর ও তেমন আহাজারী দেখিনি তাদের। দলদাসের দেশে এটাই রীতি। আমি এসব নিয়ে বলতে চাইনা। বলার কথা এই, এমন মানুষের আদর্শ থেকে কতটা সরে এসেছি আমরা? আজকের বাংলাদেশ ও তারুণ্য কি আসলেই এঁদের কথা জানে? না বুঝতে পারে? যে তারুণ্য এখন ইন্টারনেট মোবাইল বা যন্ত্র নির্ভর তারা জানেই না এরা না থাকলে এদেশ স্বাধীন হতোনা। আর এরা মাঠে নেমে জিয়া এরশাদ সহ যাবতীয় সেনা ও সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে না দাঁড়ালে কোনদিনো আজকের বাংলাদেশ পাওয়া সম্ভব হতোনা। বলাবাহুল্য শেখর দস্তিদার ছিলেন সেই সূর্য সন্তান মুক্তিযোদ্ধা। শুধু চট্টগ্রাম নয় সারাদেশ যেন তাঁকে মনে রাখে।
রণজিৎ স্যার ছিলেন আমাদের স্কুলের টিচার। সৌম্য দর্শন ভদ্রলোক। যৌবনের শুরুতে দেখতাম মিলন চৌধুরীর দলে নাটক করতেন। রাশভারী মানুষ আর চেহারায় আভিজাত্য থাকার কারণে তাঁকে দেয়া হতো রাজা জমিদার এমন সব চরিত্র। তখন থেকেই পরিচয়। একসময় তিনি হয়ে উঠলেন আবৃত্তিকার। দেশ বরেণ্য আবৃত্তিশিল্পী। এই যে দেশ বরেণ্য বলছি তাঁর মৃত্যুর পর কি পুরো দেশে আসলে কোন সাড়া পড়েছে? যদি না পড়ে থাকে সে জন্যে তিনি থোড়াই দায়ী। মূলত এ আমাদের অপারগতা। সমাজ যখন এমন সব মানুষদের হিরো বানায় যারা মারামারি লাঠালাঠি করে তাদের নেতা বলে তখন এঁরা জনপ্রিয়তার শীর্ষে যেতে পারবেননা এটাই তো স্বাভাবিক। রণজিৎ বাবু অমায়িক ভদ্রলোক ছিলেন। টিচার মানুষ সাথে শিল্পচর্চা তাঁকে নিয়ে গেছিল পরিচয় ও খ্যাতির ভিন্ন এক জগতে। তারপরও তিনি আমাকে বলেছিলেন: মাঝে মাঝে তাঁর মনে হয় এদেশ এদেশের মানুষদের তিনি ঠিক চিনতে পারেননা। দেশাত্ববোধে জাগ্রত মানুষটি সমাজের অন্ধকার আর কালো দিক নিয়ে বড় চিন্তিত ছিলেন। বলা উচিৎ সামপ্রদায়িকতার মত কালো দানবের থাবাকে ভয় পেতেন তিনি। সে কি ভয় আসলে কেটেছে? না এখনো পর্দার আড়ালে ঘাপটি মেরে আছে দানবের মুখ? দুর্ভাগ্য জাতির এই মানুষটিকে আমরা আর কোনদিন ও দেখতে পাবোনা, যিনি তাঁর কবিতা আবৃত্তি বা কথা নিয়ে এগিয়ে আসবেন দানবের মোকাবেলায়।
তারপরও হতাশার কারণ দেখিনা। তাই শেষ করবো তেমনি একটা আশাপ্রদ ঘটনা দিয়ে। তাও ঘটেছে চট্টগ্রামে। সমপ্রীতি বাংলাদেশ নামের নবজাতক সংগঠনটি তাদের চট্টগ্রাম সফর শেষ করেছে । সংগঠনটি জন্মলগ্ন থেকেই মানুষের দৃষ্টি কেড়েছে। আমরা দূরদেশে থাকলেও বিশ্বায়নের কারণে দেশের সাথে যুক্ত। এবং তা অবিরল ও অবিচ্ছেদ্য। সংগঠনটির অন্যতম প্রধান নাট্য অভিনেতা লেখক পীযূষ বন্দোপাধ্যায়। দাদার সাথে আমার সম্পর্ক সবসময় মধুর। তাঁর অভিনয় কন্ঠ এবং দেশপ্রেম এর সবগুলোই আমার প্রিয়। খবরের কাগজে লেখালেখির কারণে একধরণের সখ্যতা ও আছে আমাদের। কোন কোন কাগজে একসাথে লিখি।
একসাথে সামপ্রদায়িক কারণে নামের জন্য বাদ ও দেয়া হয়েছে আমাদের। সব মিলিয়ে তাঁর সাথে সম্পর্ক আর ভালোলাগায় যে নীরব ঐক্য তাতে আমি জানি তিনি বুঝেশুনেই মাঠে নেমেছেন। সংগঠনটি হবার পরপর সিডনির একরাতে দীর্ঘ কথাও হয়েছিল আমাদের। সে কথা আর সংগঠনের আদর্শ উদ্দেশ্য জেনে প্রচারপত্র পাঠ করে নিজেও কয়েকটা লেখা লিখেছি ঢাকার কাগজে। যেখানে ছিলো একটাই আশাবাদ। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আর বিশ্বাসে গড়ে উঠুক সেই বাংলাদেশ যেখানে কোন বৈষম্য বা অন্ধকার থাকবেনা।
বলা যত সহজ করা ততটাই কঠিন। খেয়াল করবেন একদা মাঠে থাকা সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো এখন হয় নির্জীব নয়তো মৃত। ছোটরা খেলাঘর কচিকাঁচা মুকুলের মাহফিল বা অন্য সংগঠনগুলো তাদের বড় করে তুলতো। তারপর তারা যুক্ত হতো আদর্শবাদী ছাত্র সংগঠনে। অথবা তাদের দলে টানতো আদর্শবাদী সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো। তারা সবাই এখন নীরব। দেশ সমাজ বা জনগণের কাছ থেকে ক্রমাগত দূরে যাওয়া সংগঠনগুলো কেন জানি আর পারছেনা। এমন অচলায়তন ভাঙতে সমপ্রীতি বাংলাদেশের ভূমিকা সত্যি প্রশংসানীয়।
চট্টগ্রামের সংস্কৃতি জগত আর সুধিজনদের যে সাড়া আর সমর্থন তাতে এটা নিশ্চিত বাংলাদেশের মানুষ আর যাই চাক কোনভাবে অন্ধকারে ফিরতে চায় না।
তাই আমরা আশাবাদী থাকতে চাই। আমাদের ভরসার জায়গা বড় কম। কমে আসছে আলোর জগত। সেখানে যন্ত্রনির্ভর তারুণ্য ও নবীনপ্রজন্মকে পথ দেখাতে এমন সংগঠনের বিকল্প নাই। রাজনীতি ও নেতাদের ওপর কমবেশী বীতশ্রদ্ধ মানুষের মনে আশা জাগাতে সমপ্রীতি বাংলাদেশের ভূমিকা হোক সবল । যাতে মানুষ জানতে পারে কেউনা কেউ আছে কোথাও না কোথাও দূর্গ আছে তাদের। যেখানে আশ্রয় নিয়ে দানবের মোকাবেলা সম্ভব। চট্টগ্রামে সমপ্রীতি বাংলাদেশের সভা যেন সে কথাই জানিয়ে গেলো আমাদের।

x