দূরের দুরবিনে

অজয় দাশগুপ্ত

শুক্রবার , ১২ অক্টোবর, ২০১৮ at ৭:৩৮ পূর্বাহ্ণ
21

রাজনীতির ঝোলানো মুলা কে গিলবে?
নির্বাচন একদিকে যেমন সরকার পরিবর্তনের সুযোগ দেয় আরেকদিকে নির্বাচন মানে মানুষের মতামত জানার সেরা উপায়। তারা যে সরকার পরিবর্তন করতে চান এমনটা নাও হতে পারে। তাদের চাওয়াকে মূল্য দিলে কত আশ্চর্যজনক আর অদ্ভুত কিছু হতে পারে। এইতো কিছুদিন আগে নব্বই বছরেরো বেশি বয়সের মাহথির মুহাম্মদকে আবারো ফিরিয়ে এনেছেন জনগণ। এটা নিয়ে কারো কিছু বলার নাই। কারণ এ ছিলো পিপিলস চয়েস। অন্যদিকে আমেরিকার জনগণ বা ভোটারেরা তাদের দেশ পরিচালনায় এনেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের মত একজনকে। যিনি মানসিকভাবে একধরনের উৎকেন্দ্রিক নেতা। তাঁর আমলে আমেরিকার রাজনীতি ও অর্থনীতি নিজেদের বেলায় ভালো হলেও বিদেশে তিনি নিন্দিত। ভারতের জনগণ নরেন্দ্র মোদীকে নিয়ে এসেছেন গণতান্ত্রিক ভারতের সিংহাসনে। যে ভারত অসামপ্রদায়িকতা আর গণতন্ত্রের জন্য দুনিয়া খ্যাত তার রাজমুকুট উঠেছে মোদীর মত ধর্মভিত্তিক রাজনীতির নেতার মাথায়। সব ই জনগণের ইচ্ছা। আমাদের দেশে কখনো কখনো এমন হলেও প্রায়ই তা হয়না। কে দায়ী বা কোন দল দায়ী সে কথা তুললেই চলবে বিতর্ক। সরকারি দল আওয়ামী লীগের যেমন ভোটভীতি আছে তেমনি বিএনপির আছে অকারণ আসহায়ত্ব। অকারণ এই কারণে আসলে জনগণ কি চায় সেটা বিএনপি বোঝেনা। তারা মনে করেন নেগেটিভ ভোট মানে তাদের অধিকার। তারা এটাও মানেন না ভারত বিরোধিতা সামপ্রদায়িকতা আর সরকারের ওপর অসন্তোষ এই তিনের ওপর ভিত্তি করে আর যাই হোক দীর্ঘকাল রাজনীতি করা যায়না। ভুলভ্রান্তি যে কত বিপজ্জনক হতে পারে নীচের খবরটাই তার বড় উদাহরণ।
একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিরোধী জোটের জন্য ৩০০ আসন বণ্টনের রূপরেখা দিয়েছেন বিকল্পধারা বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ও যুক্তফ্রন্ট চেয়ারম্যান একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। এর মধ্যে বিএনপিকে ১৫০ এবং যুক্তফ্রন্ট ও অন্যান্য দলকে ১২০ আসন দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন তিনি। এ ছাড়া সুশীল সমাজকে ১০ আসন এবং জামায়াত ছাড়া বিএনপি জোটের অন্যান্য শরিকদের ২০ আসন দিতে চান সাবেক এই রাষ্ট্রপতি।
সমপ্রতি বি. চৌধুরীর এই আসন বণ্টনের লিখিত প্রস্তাব বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের হাতে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।
কতটা খারাপ হাল হলে বিএনপিকে এমন একটা প্রস্তাব দেয়া যেতে পারে? কে না জানে এই দলটির ওপর এখন শনির দশা চলছে। কিন্তু কেন? একসময় তো তাদের ভূমিকা আর হাবভাব দেখে মনে হতো তাদের বিকল্প নাই। তাদের নেতারা জামাতকে সাথে নিয়ে এমন সব কথা বলতেন বা এমন কাজ করতেন যাতে মনে হতো বাংলাদেশ আসলে মুক্তিযুদ্ধ করে স্বাধীন হয়নি। কোন এক সেনা অফিসারের বাঁশীর ফূঁ ই ছিলো সবকিছু। ইতিহাসকে যারা অতীতের কর্মকান্ড মনে করেন তাদের চোখ খুলে দেয়া বর্তমান কেন যে তাদের বিবেকের জানালা খুলতে পারেনা কে জানে? পারলে এমন অপমান বিএনপির কপালে জুটতোনা। যুবকের ঔদ্ধত্য যুবশক্তির অপমান আর বঙ্গবন্ধুও বাংলাদেশকে অপমানের শাস্তি পাওয়া দলটিকে এখন বুড়ো আঙ্গুল দেখাচ্ছে তাদের কল্যাণে রাষ্ট্রপতি হতে পারা মানুষ। যিনি কি কারণে সে দল ছেড়ে বিকল্প দল করেছেন তা সবাই জানেন। সবচেয়ে বেশী জানে বিএনপি নিজে। এই অপমান করার পেছনে যে নিষ্ক্রিয়তা আর হতাশা সেটা আমাদের সমাজকে আরো একবার দেখিয়ে দিয়েছে নেতা হতে হলে মুখে আপোসহীন হতে হয়না। হতে হয় শেখ হাসিনার মতো আপন তেজে চলা কেউ। তাঁর আমলে আওয়ামী লীগের নেতাদের ভূমিকা নানাস্তরে প্রশ্নবিদ্ধ হবার পরও দল ও সরকার চলছে সমান তালে।
জামাতকে সাথে নিয়ে দেশের শাসনভারে থাকা বিএনপি মানেনি এদেশের মানুষ আর যা মানুক আর না মানুক স্বাধীনতা বিরোধীদের মাথায় রাজমুকুট মানেনি। তারা সহ্য করেছে। একসময় যখন সময় হয়েছে জবাব দিতে ভুল করেনি। বলছিলাম ইতিহাস আর অতীতকে কেউ অবজ্ঞা করলে সময় তাদের ছেড়ে কথা বলেনা। রাজনীতি বিমুখ মানুষ এগুলো নিয়ে যখন তখন মাথা ঘামায় না বটে তবে সুযোগ পেলে তাদের ভূমিকা রাখতে ভুল করেননা। শাহবাগকে বিস্মরণে রাখা মানে আমাদের দেশের অস্তিত্ব কে এড়িয়ে যাওয়া। আমাদের দেশে উন্নয়ন বা অগ্রযাত্রা যেমন প্রয়োজন তেমনি দরকার শান্তি। বিএনপি যে বিষয়টা পরিষ্কার করতে পারেনা সেটা হচ্ছে কিভাবে তারা শান্তি ও প্রগতি নিশ্চিত করবে? আজকের বাংলাদেশ তারেক রহমানের মত কাউকে চায় কি না সেটাও তারা বোঝেনা। খেয়াল করেছি তাদের বয়সী নেতাদের চোখেমুখে মূলত অবিশ্বাস আর অভিমানের ছাপ। রাজনীতিতে অভিমানের মূল্য শূন্য। দলটি আমাদের যে সব অপকর্ম আর অপরাজনীতি উপহার দিয়েছিল তা নিয়ে কিছুই বলেনা তারা। যখন তারা সামনে এসে দাঁড়ান আমরা দেখি অন্য দলছুট কিছু মানুষের মুখ। কেউ ভাসানী ন্যাপ, কেউ মুসলিম লীগ, কেউবা স্বাধীনতা বিরোধী। সেনানায়ক এরশাদের দালালও আছে দলে। তারা আসলে কি চায় নিজেরাও জানেননা। এমন নেতাদের অধীনে কারা যাবে আন্দোলনে? মানুষ কি এতটা বেকুব? না তাদের খেয়ে দেয়ে আর কোন কাজ নাই?
রাজনীতিকে আমলে না নিয়ে সরকার গঠনের জন্য মরিয়া কোন দলকে মানুষ কিভাবে বিশ্বাস করবে? সবচেয়ে বড় কথা আজকে তাদের নিয়ে হাসি তামাশার মত কাজ করছে তাদের শরীকেরা। খুব কি দরকার ছিলো জোটের নেতাদের উস্কে দেয়ার? এই নেতাগুলোকে নিয়ে আর লিখতে ইচ্ছে করেনা। ড: কামাল হোসেন আওয়ামী লীগের পিঠে ছুরি মারার জন্য নেমেছেন। যা তাঁর ব্যক্তি হিংসা আর প্রতিশোধের পরিচায়ক। সাথে থাকা মান্না আর রব জনগণে অবিশ্বস্ত এবং স্বার্থপর। রব এরশাদ আমলে যে সত্তরটি দলের নেতা বলে নিজেকে পরিচয় দিতেন তার ঊনসত্তরটি এখন মৃত। হারাধনের এক ছেলে আ স ম রবের হা হা রব এখন আর কারো কানে পৌঁছায় না। বাকী যে বি চৌধুরী তিনি মুখে যাই বলুন তার ঘরেই আছে সরকারের সাথে আঁতাত করা বদনামের ভাগী পুত্র মাহী বি চৌধুরী। যিনি এই সেদিনও বললেন বিএনপিকে গদীতে বসানোর জন্য কোন জোট হয়নি। কে না জানে মাহি বনাম তারেকের লড়াইর কারণেই যত ফ্যাসাদ। মাহী নিশ্চয় ই গুণগতভাবে তারেকের চাইতে অগ্রগামী। কিন্তু রক্তের উত্তরাধিকারের রাজনীতি তা মানেনি। মানবেও না। সেখানে কে কার পুত্র কন্যা সেটাই বড় কথা। সে অসম লড়াইয়ে মাহী পেরে উঠবেননা আবার তারেকের নেতৃত্বও মানবেন না। ফলে এই লড়াই মিটবেনা। পিতা বি চৌধুরী এখন বয়সী মানুষ। আপাতত তিনি এসব কথা বললেও সময়ে ঠিকই পুত্রের পাশে এসে দাঁড়াবেন বা দাঁড়াতে বাধ্য হবেন। তখন কোথায় যাবে মির্জা ফখরুলদের স্বপ্ন বা খোয়াব? কিভাবে বাস্তবায়িত হবে তাদের এজেন্ডা?
মূলত শেখ হাসিনার সরকার তাঁর উন্নয়ন কার্যক্রম এবং বিশ্বরাজনীতি বিএনপির মত দলকে যে জায়গায় নিয়ে এসেছে সেখান থেকে উত্তরণের পথ একটাই। অতীতের ভুল থেকে পাঠ গ্রহণ করে দেশ জনগণের কাছে ফিরে আসা। মানুষের কাছে মাফ চেয়ে দেশের অতীত ও শুদ্ধ ধারার প্রতি অনুগত থাকা। যেটা করা তাদের জন্য অসম্ভব। কারণ তা করতে গেলে তাদের মূল পরিচয় আর অতীত ই হয়ে যাবে ফ্যাকাসে । শূন্যগর্ভ রাজনীতির দায় মেটাতে গিয়ে দেউলিয়া বিএনপি মুখে যতই বলুক জনগণের রায় তাদের দিকে সেটা সত্য হলেও গুণগত রাজনীতিতে তারা এখন অসহায়। যে কারণে রেললাইন ধরে দৌড়ে পালিয়ে বাঁচা এককালের বিএনপি রাষ্ট্রপতি নেতাও তাদের সামনে মুলো ঝুলিয়ে বলতে পারে আসলে আসো নাহলে নাই। বিএনপি কি এই অপমান থেকে আসলে কোন শিক্ষা নেবে? না এমন প্রস্তাব গিলে আরো একবার তলিয়ে যাবার রাস্তা খুঁজবে?
লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

x