দূরের টানে বাহির পানে

হাসান আকবর

বুধবার , ৯ অক্টোবর, ২০১৯ at ৬:৫৪ পূর্বাহ্ণ
34

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
দুবাই বলে কথা! সবকিছুই চোখ ধাঁধানো। বহু দিন আগে একবার এসেছিলাম। তখনকার রাস্তাঘাটের সাথে বর্তমানের রাস্তাঘাটের কোন মিল নিশ্চয় থাকবে না। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে রাস্তাঘাট নিয়ে আমাদের মাথা ঘামাতে হবে না। বড় বড় বাস ভাড়া করে রেখেছে আমাদের ট্যুর অপারেটর অথেনটিক ট্যুরিজমের লায়ন আনোয়ারুল আজিম। সাথে রয়েছেন ট্যুর অপারেটরের ম্যানেজার মোহাম্মদ ইয়াসিন। এতে করে বড়সড় দলটি বেশ স্বাচ্ছন্দ্যে এদিক ওদিক ঘুরতে পারবে। আমাদেরকে ইতোমধ্যে ট্যুর প্ল্যান দিয়ে দেয়া হয়েছে। সেই প্ল্যান অনুযায়ী সবকিছুই হয়ে যাবে। অথেনটিকের সাথে ইতোপূর্বেও শ্রীলংকা এবং মালদ্বীপে গিয়েছিলাম। খুবই গোছানো তাদের আয়োজন। টেনশনের কোন কারণ থাকে না। আপাতত টেনশন নাস্তা নিয়ে। বিশাল হোটেল। রেস্টুরেন্টে ভিড় লেগে থাকে। অবশ্য বেশ কয়েকটি ফুড কর্ণার থাকে। যেখান থেকে ইচ্ছে খাবার নিলে খুব একটা অসুবিধা হয়না। তবে এগ স্টেশনেই গোলমাল হয়ে যায়। সেখানেই লাইন অবধারিত।
হোটেল নভোটেলের রেস্টুরেন্ট বিশাল। বেশ খোলা মেলা। মরুর বুকে গড়ে উঠা দুবাই শহরে ভূমির দাম অনেক হলেও এসব হোটেলগুলো এত জায়গার উপর কি করে হাত পা ছড়িয়ে বসেছে কে জানে! বিরাট লবি, বিরাট রেস্তোরাঁ, অগুণতি রুম। উচ্চতাও আকাশছোঁয়া। ৩৫ তলা। লিফটের সংখ্যাও অনেক। আরাম আয়েশের কমতি নেই। বার নাইট ক্লাব হেলথ ক্লাব থেকে শুরু করে বিনোদনের সব আয়োজন পরতে পরতে রয়েছে হোটেলটিতে। তবে আমাদের মতো নিরস মানুষদের এত আয়োজনে কিছু যায় আসে না। খাওয়া এবং ঘুমানোর বাইরে আর কোন সুবিধা নিয়ে আমাদের মাথা ব্যথা নেই।
লায়ন জাহেদুল ইসলাম চৌধুরী এবং আমি মুখোমুখি টেবিলে বসলাম। এগ স্টেশনে কড়া ঝাল দিয়ে একটি ডিম ভেজে দেয়ার কথা বলে জুসসহ নানা খাবার নিয়ে টেবিলে বসেছিলাম। লায়ন জাহেদুল ইসলাম চৌধুরী ভাইও ডিমের অর্ডার করে এসে বসলেন। আমাদের নিকটে অপর একটি টেবিলে আমার স্যার, দৈনিক আজাদী সম্পাদক এম এ মালেক এবং ম্যাডাম লায়ন কামরুন মালেক বসেছেন। স্যার এবং ম্যাডাম আমাদের আগেই রেস্টুরেন্টে এসেছেন। আড়চোখে দেখলাম যে, উনারা দুজনই দুধের মধ্যে ‘কর্নপ্লেক্স’ সাঁতার কাটাচ্ছেন। আমি কিছু এনে দেবো কিনা জানতে চাইলাম। স্যার এবং ম্যাডাম দুজনই মাথা নাড়লেন। বললেন, আর কিছু লাগবে না। তোমরা খেয়ে নাও।
বন বাটার দিয়ে জম্পেশ খাওয়া দাওয়া করা যায়। তবে এই ধরনের তারকাখচিত হোটেলগুলোতে ব্যুফের নামে এত রকমারি খাবার থাকে যে, কোনটি রেখে কোনটি নেবো তা নিয়ে ঘুরপাক খেতে হয়। নানা ধরনের খাবার। স্যুপ থেকে শুরু করে ভাত পর্যন্ত। তরিতরকারিতেও থাকে বৈচিত্র্য। নানা দেশের নানা খাবার সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা হয়। তবে দুবাই মুসলিম দেশ হওয়ায় এখানে খাবারের খুব একটি বাছ-বিচারের প্রয়োজন পড়লো না। পাউরুটির মতো নিরীহ খাবারেও শুকরের মাংস মিশিয়ে দেয়া হয় বহুদেশে। বিশেষ করে ইউরোপ আমেরিকার মতো দেশগুলোতে চোখ কান পুরোটাই খোলা রাখতে হয় একজন ইমানদার মুসলিমকে। পাউরুটির এই বেহাল অবস্থা প্রথম চোখে পড়েছিল মেক্সিকোতে। আমি এবং আমার এডিটর স্যার এম এ মালেক এই ঘটনা জানতে পেরে আকাশ থেকে পড়েছিলাম! অবশ্য পরবর্তীতে ইউরোপের বহু দেশেও একই ধরনের পাউরুটি পেয়েছি। চিফস এবং চকলেট পেয়েছি। আরো হরেক রকমের খাবারে এই ধরনের মিশ্রনের ঘটনা দেখেছি। যেগুলোতে শুকরের মাংস থাকার কথা আমরা স্বপ্নেও হয়তো কোনদিন ভাবিনি।
বেশ পেট ভরা আয়োজনে নাস্তা সারলাম।
আজ আমাদের তেমন কোন কাজ নেই। শুধু ঘোরাঘুরি। ট্যুর অপারেটরের পক্ষ থেকে বড় বাস ভাড়া করা হয়েছে। ট্যুরিস্ট বাস। হোটেলের সামনে থেকে আমাদেরকে বাসে চড়ানো হবে। ঘুরিয়ে টুরিয়ে আবারো হোটেলের সামনে নামিয়ে দিয়ে যাবে। এর বাইরে কারো কোন ব্যক্তিগত আয়োজন থাকলে সেটি ভিন্ন কথা। অনেকেই আত্মীয় স্বজন এবং বন্ধুবান্ধবদের সাথে ঘুরবেন। অনেকেই ইতোমধ্যে চলেও গেছেন। আমার বন্ধু বান্ধবদের অনেকেই দুবাইসহ সংযুক্ত আরব আমীরাতে থাকেন। তবে আপাতত আমি কাউকে কিছু জানাইনি। সবার সাথে দল বেঁধে ঘুরার তৃপ্তিটা আসলে আলাদা।
আমাদেরকে আজ আধুনিক বিশ্বের বড় বিস্ময় বুর্জ খলিফা দর্শনে নিয়ে যাওয়ার কথা রয়েছে। আরব বিশ্বের এই অহংকার নিয়ে কৌতুহলের কমতি নেই। দুনিয়ার সব দেশের ভ্রমণ পিপাসু মানুষের নিকট বুর্জ খলিফা অন্যতম একটি দর্শনীয় স্থান। তাই অথেনটিক ট্যুরিজম আমাদের দুবাই শহরে ঘোরানো শুরু করতে চায় বুর্জ খলিফা দিয়ে।
নাস্তা শেষ করে আমরা বাসে চড়ে বসলাম। যথারীতি আমি এবং জাহেদুল ইসলাম চৌধুরী দুই সিটে। পেছনের দিকে বসেছি আমরা। ইতোমধ্যে আমাদের একটি বড় গ্রুপ তৈরি হয়ে গেছে। সিনিয়রদের চোখ এড়িয়ে আমরা আমাদের মতো করে হৈ হল্লা করতে করতে ঘুরতে শুরু করলাম।
মরুভূমির দেশ দুবাই। খাঁ খাঁ করছে রোদ। তবে বাসের ভিতরে রোদের কোন প্রভাব নেই। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাসের ভিতরে আমরা আয়েশ করে বসে জানালার পর্দা সরিয়ে চারপাশে চোখ বুলাচ্ছিলাম। টিন্টেড গ্লাসে বাইরে থেকে আমাদের দেখা যাচ্ছিল না। আমরাই সবকিছু চোখ ভরে দেখছিলাম। দুবাই শহর আইস্যা আমার পরাণ জুড়াইছে টাইপের তৃপ্তি আমাদের অনেকের চোখে মুখে। মাত্র কবছর আগে দুবাই এসেছিলাম। ঘুরেছিলাম রাতে দিনে। কিন্তু ওই সবের কোন চিহ্ন কোথাও আছে বলে মনে হলো না। চারদিকে উন্নয়ন। চারদিকে পরিবর্তন। চারদিকেই যেন পেট্রোডলারের জয় জয়কার।
আমাদেরকে বুর্জ খলিফার সামনে বাস থেকে নামিয়ে দেয়া হলো। পার্কিং খালি পাওয়া যাচ্ছিল না। ড্রাইভার বলে দিলেন যে, সামনে থাকবেন। ঘোরাঘুরি শেষ হলে ফোন করলে তিনি এসে তুলে নেবেন।
বুর্জ খলিফার সামনে দাঁড়িয়ে উপরের দিকে তাকালাম। আহা, কী অপরূপ সৃষ্টি। মাথা থেকে টুপি পড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু ভবন। শুধু উঁচু ভবনই নয়, একই সাথে দৃষ্টিনন্দনও। অতি আকর্ষণীয় এই ভবনটি বর্তমান বিশ্বের সর্বোচ্চ স্কাইস্ক্রাপার বা গগনচুম্বী হিসেবে স্বীকৃত। আমরা ধীরলয়ে ভবনটির নিচতলায় প্রবেশ করলাম। দুনিয়ার সেরা সব ব্রান্ডের দোকান। থরে থরে সাজানো নানা পণ্য। বুর্জ খলিফার কয়েক ফ্লোর মিলে রয়েছে শপিং মল। শপিং মলগুলোতে নেই হেন কোন পণ্য দুনিয়াতে নেই। পৃথিবীর সব সেরা ব্রান্ডের দোকানগুলো হুড়োহুড়ি করে নিজেদের জন্য জায়গা নিয়েছে বুর্জ খলিফায়। পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু ভবন বুর্জ খলিফায় শুধু শপিং মলই নয়, একই সাথে ফ্ল্যাট বাড়ি, সেভেন স্টার হোটেল এবং অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বিশ্বের বহু শীর্ষ ধনীর অফিস এবং ফ্ল্যাট রয়েছে এখানে। দুনিয়ার অন্যতম সেরা এই ভবনে বসবাস করেন বহু রথি মহারথি, বহু তারকা। ভবনটির উচ্চতা ৮২৯.৮ মিটার বা ২ হাজার ৭শ’ ২২ ফুট। যা প্রায় আধা মাইল লম্বা। সর্বোচ্চ উচ্চতা থেকে প্রায় ৬০ মাইল বা ৯৫ কিলোমিটার দূর পর্যন্ত স্পষ্টভাবে দেখা যায়। ১৬০ তলাবিশিষ্ট ভবনটি দেখতে রকেটের মতো। মজার আরেকটি বিষয় হলো ভবনটির নিচতলা থেকে সর্বোচ্চ তলার মধ্যে ১০ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রার পার্থক্য রয়েছে। ভূমি থেকে ভবনটি এতো উঁচু যে ভবনের উপরতলার লোকজন সূর্যাস্তের পরও দুই মিনিট সূর্যটাকে দেখতে পায়। তাই ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা রমজান মাসে নিচতলায় যখন ইফতার করেন তার ২মিনিট পরে উপরতলার মানুষেরা ইফতার করেন।
এতকিছু লেখেও ভবনটির বিশালতা ঠিকভাবে বুঝাতে পারলাম বলে মনে হলো না।
এমার প্রপার্টিজ নামের একটি আধা সরকারি রিয়েল এস্টেট কোম্পানি ভবনটির মালিক। এতে কারো ব্যক্তিগত মালিকানা নেই। বুর্জ খলিফার স্থপতি হলেন যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতিমান আর্কিটেকচার অড্রিয়ান স্মিথ।
২০০৪ সালে শুরু করা হয় বুর্জ খলিফার নির্মাণ কাজ। ২০০৯ সালে ভবনটি নির্মাণের কাজ শেষ হয়। সুবিশাল এই ভবনটি তৈরিতে ইট, বালি, রড, সিমেন্ট ছাড়াও গ্লাস ও স্টিল ব্যবহার করা হয়েছে। আকাশ ছোঁয়া এই ভবনটিতে যে পরিমাণ কাঁচ ব্যবহার করা হয়েছে তা কোথাও জড়ো করে রাখতে হলে ১৭টি স্টেডিয়াম লাগবে। আর পুরো ভবনে যে পরিমাণ ইট-বালি-সিমেন্ট ব্যবহৃত হয়েছে তা দিয়ে প্রায় ১২৮৩ মাইল লম্বা দেওয়াল বানানো সম্ভব হতো বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
আমরা ঘুরছিলাম। একই সাথে সাত রাজ্যের বিস্ময়ও আমাদের গ্রাস করছিল। কি করে সম্ভব। কত টাকা বিনিয়োগ করলে এমন একটি ভবন গড়ে তোলা হয়। কী অপরূপ। আমরা ভবনটির সামনের দিকে গেলাম। চমৎকার ফোয়ারা। সেখানে ঝর্ণা তৈরি করা হয়েছে। ঝর্ণার খেলা চলছে। রাতের বেলা সুরের তালে তালে এই ঝর্ণা নৃত্য করে। মালয়েশিয়ার টুইন টাওয়ারের পেছনেও এমন ফোয়ারা দেখেছিলাম। পরবর্তীতে বিস্মিত হয়েছিলাম আমেরিকার লাস-ভেগাসে ঝর্ণার নৃত্য দেখে। দুবাইর ঝর্ণাও বেশ শানদার। রাতের বেলায় নাকি এই ঝর্ণা অপরূপ হয়ে দ্যুাতি ছড়ায় চারদিকে।
বাইরে তীব্র গরম। আমরা আবারো ভিতরে চলে আসলাম। ঘুরতে ঘুরতে কাহিল হয়ে উঠার অবস্থা। ভবনের নিচতলায় ইনফরমেশন ডেক্স রয়েছে। আমি রয়ে সয়ে ওখানে গেলাম। কিছু তথ্য উপাত্ত দেয়ার অনুরোধ করলে এক তরুণী আমাকে বেশ কয়েকটি পুস্তিকা টাইপের ছাপানো কাগজ দিলেন। কাগজে চোখ বুলাতে বুলাতে আমার মাথা কেবলই ঘুরতে লাগলো। বুর্জ খলিফা ২০০৮ সাল থেকে পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু ভবনের তকমা দখল করে আছে। যদিও ভবনটি ২০১০ সালের ৪ জানুয়ারি উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধন করেছিলেন তৎকালীন দুবাই এর শাসক শেখ মোহাম্মদ বিন রাশেদ আল মাক্তুম। শুরুতে ভবনটির নাম ছিল বুর্জ দুবাই। পরবর্তীতে সংযুক্ত আরব আমীরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ খলিফা বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সম্মানে ভবনটির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় বুর্জ খলিফা। বুর্জ খলিফা একটি আরবি শব্দ। বাংলা করলে এটির অর্থ দাঁড়ায় খলিফার টাওয়ার। খলিফার টাওয়ার ঠিক যেন টাওয়ারের খলিফা হয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। (চলবে)

লেখক : চিফ রিপোর্টার, দৈনিক আজাদী

x