দূরের টানে বাহির পানে

হাসান আকবর

বুধবার , ১৭ জুলাই, ২০১৯ at ৬:২০ পূর্বাহ্ণ
47

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
কায়রো শহর বহু পেছনে ফেলে এসেছি। ক্রমে এগিয়ে আসছে আলেঙান্দ্রিয়া। আমাদের বাস ছুটছে দারুণ গতিতে। আশে পাশে আরো বহু গাড়িও। সবগুলো গাড়ি ছুটছে তীব্র গতিতে। এমন রাস্তায় বুঝি এর থেকে কম গতি মানায় না। চমৎকার রাস্তা। আট লেনের। ডেজার্ট রোড। মরুর বুক ছিড়ে বয়ে যাওয়া রাস্তাটি ওয়ান ওয়ে। এক পাশের চার লেনে আলেঙান্দ্রিয়ামুখী গাড়ি। অন্যপাশের চার লেনে ছুটছে কায়রোমুখী। সুশৃংখল চলাচল। কোথাও ব্রেক কষার দরকার পড়ছে না। কোন জট নেই। রিঙা টেঙির মতো বাহন নেই। নেই মানুষের পারাপার। সবই দ্রুত গতির গাড়ি। সবই ছুটছে পাল্লা দিয়ে। বিশাল বাসটির জানালায় চোখ রেখে মরুভূমি দেখছিলাম আমি। চমৎকার সব ফলের বাগান মরুর বুকে! আমরা সকলেই তাজ্জব হয়ে লক্ষ্য করলাম যে, শত শত বাগান। গাছ ভর্তি কমলা ও মাল্টা। পাকা কমলা ও মাল্টায় গাছের সবুজ রঙই পাল্টে গেছে। কী অপরূপ যে লাগছিল! একেবারে রাস্তার পাশ ঘেঁষে বাগান। ঘেরা দেয়া। শ্রমিকেরা কাজ করছেন। কেউবা গাছের গোড়ায় মাটি দিচ্ছেন। কেউবা পানি। আবার কেউ কেউ ফল তুলছিলেন। সবই দেখা যাচ্ছিল। বাস থামিয়ে দু’চারটি ফল কী তুলে নেয়া যায় ? কি জানি! হয়তো যায়। এত এত্ত ফল থেকে দু’চারটি দিলে বা নিলে কি আর এমন ক্ষতি হবে! কিন্তু আমাদের দাঁড়ানোর সুযোগ ছিল না। হাইওয়েতে এভাবে বাস দাঁড়াতেও পারে না। বাস ছুটছিল। একটির পর একটি করে অগুনতি বাগান পেছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছিলাম আমরা।
ফল এবং ফসল ফলানো বেশ কঠিন একটি কাজ। এক একটি ধান উৎপাদনে এক-একজন কৃষকের যে পরিমান শ্রম ও ঘাম জড়িত তার মূল্য দেয়া আসলেই কঠিন। মরুর বুকে বাগান করা আরো একটু বেশী কঠিন। মরুভূমির বালির উপর মাটির আস্তর দিতে হয়েছে। দূর থেকে আনতে হয়েছে মাটি। পানির সংস্থান করতে হয়েছে। ৪৮ ডিগ্রি তাপে তপ্ত মরুতে এসব করা যে কত কঠিন তা আমাদের মতো সুজলা সফলা সুশীতল দেশে বসে অনুধাবন করা সত্যি সত্যি কঠিন। আমি মনে মনে মরুর বুকের ঘাম ঝরানো কৃষকদের ধন্যবাদ দিলাম। তারা এত কষ্ট করে ফলন ফলান বলেই হয়তো আমাদের দেশে একশ’ টাকা কেজিতে মাল্টা জোটে! অন্যথায় নিজের শরীরের রক্ত পানি করেও আমরা অসুস্থ মায়ের মুখে কিংবা প্রিয় সন্তানের মুখে এক ফোটা মাল্টার রস যোগাতে পারতাম না। আমার বেশ মনে পড়ছিল বছর কয়েক আগের কথা। যখন অসুস্থ মানুষকে এক ছটাক আধা ছটাক আঙ্গুর কিনে নিয়ে টিপে টিপে রস খাওয়ানো হতো। আঙ্গুর, আপেল কিংবা সফেদার মতো ফলগুলো ছিল অসুস্থ মানুষের শেষ খাবার। বিশেষ করে গ্রামেগঞ্জের বহু মৃত্যু পথযাত্রী মানুষ একটি আঙ্গুর খেতে পেতেন না। জীবনে একটি আস্ত কমলা খেতে পারেননি এমন বহু স্বজন, পরিজন পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। অথচ আজ প্রত্যন্ত গ্রামীণ বাজারেও দু’চারটি ফলের দোকান রয়েছে। যেখানে থোকায় থোকায় ঝুলে আঙ্গুর। থরে থরে সাজানো থাকে আপেল, কমলা, মাল্টা। পৃথিবীব্যাপী কৃষি বিপ্লবের সুফল আমাদের প্রত্যন্ত গ্রামেও পৌঁছছে। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা পৃথিবীকে হাতের মুঠোয় নিয়ে এসেছে।
বাহ্‌, চোখ ভরে গেল। রাস্তার পাশেই খালের মতো জলাশয়। মরুর বুক থেকে হঠাৎই যেন বাংলাদেশের কোন গ্রামীন জনপদে এসে পড়লাম। জলাশয় ভর্তি নানা ধরনের গাছ-গাছালী। পাট গাছের মতো নানা গাছ। এসব আগাছা নাকি কোন কিছুর চাষ করা হয়েছে তা বুঝতে পারছিলাম না। আলেক্সান্দ্রিয়া দেখা যাচ্ছিল। সুউচ্চ সব ভবন মাথা উচু করে দাঁড়িয়ে আছে। এক একটি উজ্জ্বল ভবন যেন আমাদের স্বাগত জানাচ্ছিল।
আলেক্সান্দ্রিয়া ভমূধ্যসাগরের উপকুলীয় একটি শহর। সাগরের দক্ষিণ উপকূলে অবস্থিত শহরটি পৃথিবীর অন্যতম সেরা একটি পর্যটন নগরী। দেশ বিদেশের হাজার হাজার মানুষ প্রতিদিন এই নগরী ঘুরতে আসেন। এখানের সমুদ্রের পাড়ে হাওয়া খেয়ে বেড়ান। সমুদ্রস্নান করেন। বেলাভূমিতে শরীর উদোম করে সূর্যস্নানে মাতেন। বহু আগে শোনা এসব কাহিনী আমাকে রোমাঞ্ছিত করতো। সে রোমাঞ্ছ গায়ে মাখতে ছুটছি আমি। আমরা।
বাহ্‌, কী অপরূপ শহর! একেবারে সাগরের বুকে গড়ে তোলা সভ্যতা। চমৎকার রাস্তা। আমরা পূর্ব দিকে ছুটছি। রাস্তার ডান পাশে সুউচ্চ সব ভবন। বাম পাশেই সাগর। ভূমধ্যসাগরের স্বচ্ছ নীল জলরাশি থৈ থৈ করছে। আর বিপরীত পাশেই আলীশান সব ভবনে দুনিয়ার সব নামি দামি ব্র্যান্ড। মেরিন ড্রাইভ। শহরের মাঝামাঝিতে একটি স্থানে সাগর কিছুটা বাঁক নিয়ে বিশ পঞ্চাশ গজের মতো ভিতরের দিকে ঢুকে গেছে। আর এই ছোট্ট বাঁকা অংশটির সৌন্দর্যও নষ্ট করা হয়নি। ইচ্ছে করলে সাগরের খালের মতো হয়ে যাওয়া ছোট্ট অংশটি অনায়াসে ভরাট করা যেতো। কিন্তু তা না করে ওভাবেই বাঁকটি রেখে রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে। রাস্তা সোজা করতে গিয়ে একটি লম্বা ব্রিজ তৈরি করতে হয়েছে। এতে করে ব্রিজের তলা দিয়ে সাগরের পানি দোকানপাটের সামনে আছড়ে পড়ছে। অপূর্ব এক নান্দনিকতা। অপূর্ব এক সৌন্দর্য। মুগ্ধ না হয়ে উপায় থাকে না।
আলেঙান্দ্রিয়া শহরের বুকের ঠিক বাম পাশ দিয়ে চলে যাওয়া রাস্তাটি ধরে এগুচ্ছি আমরা। বাসের ভিতরে বসে আছি। ধীর লয়ে এগুচ্ছে বাস। হোটেল শেরাটনের সামনে আমাদের যখন নামানো হলো তখন মনটি ভরে গেল। আলেঙান্দ্রিয়া ধরা দিল অন্যভাবে। সত্যিই, মুগ্ধ হওয়ার মতো একটি পরিবেশ। আবহ। হু হু করে সাগরের বুক ছুঁয়ে আসছিল বাতাস। তীব্র গরমের মাঝে অন্যরকমের ভালোলাগায় আচ্ছন্ন হচ্ছিলাম আমরা। এত চমৎকার একটি হোটেল পছন্দ করায় অথেনটিক ট্যুরিজমের স্বত্বাধিকারী লায়ন আনোয়ারুল আজীম ভাইকে মনে মনে ধন্যবাদ দিলাম। শেরাটনের মতো পাঁচ তারকা হোটেলই শুধু নয়, সাগর পাড়ের অতি নান্দনিক জায়গাটিও আমার সন্তুষ্টির মাত্রাকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেল। রাত কাটানোর এমন আয়োজন কালে ভদ্রে জোটে! আমাদের দলে থাকা লায়ন সদস্যদের অন্তর বুঝি ভরে গেল। সকলের চেহারায়ও সন্তুষ্টির চাপ খেলা করছিল। অথেনটিক ট্যুরিজমের কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইয়াসিনকে কথাটি বলে ধন্যবাদ দিলাম।
হোটেল শেরাটনের পনের তলায় আমাদের রুম দেয়া হয়েছে। আমি আর কেবিনেট সেক্রেটারি লায়ন জাহেদুল ইসলাম চৌধুরী একই রুমে। ইলেক্ট্রনিঙ কী দিয়ে দরোজা খুলে মনটি ভরে গেল। চমৎকার রুম। দুইটি বিছানা। বেশ গোছানো। ওয়াল কেবিনেট, লকার, সোফা, চেয়ার টেবিল, টিভি, ফ্রিজ সবই রয়েছে রুমে। জানালার ভারী পর্দা সরাতে মনটি নেচে উঠলো। চোখের সামনে খেলা করছে ভূমধ্যসাগর! নিজেকে সাগরের মাঝখানে বলে মনে হচ্ছিল। সাগরের স্বচ্ছ নীল জলরাশি যেন হাতছানী দিচ্ছিল। একটির পর একটি ঢেউ ছুটে আসছিল সাগরের বুক ছিঁড়ে। এই সাগরের অপর পাড়েই ইউরোপ। আহারে ভূমধ্যসাগর! এই সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে কত লোকের সলিল সমাধি হচ্ছে! স্বপ্নের ঘোরে সাগর পাড়ি দিচ্ছে অসংখ্য মানুষ। আমাদের দেশের বহু মানুষও এই সাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্নে বেঘোরে প্রাণ হারিয়েছে। হারাচ্ছে। এই উত্তাল সাগর পাড়ি দেয়া সহজ নয়। কেউ কেউ হয়তো সফল হয়েছে। কিন্তু বেশির ভাগই নৌকা ডুবিতে প্রাণ দিয়েছে। কেউ কেউ প্রাণে বাঁচলেও বাকি জীবন সাগর দেখলেই আঁৎকে উঠবে। দালালদের খপ্পরে পড়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপের গ্রিস বা ইতালী যাওয়ার এই অপচেষ্টায় নিজেদের লাভতো হচ্ছেই না, উল্টো দেশের ইমেজ নিয়ে টানাটানি চলছে। শুধুমাত্র এই ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেয়া মানুষগুলোর জন্যই গ্রিস এবং ইতালী গত কিছুদিন ধরে বাংলাদেশকে বাঁকা চোখে দেখতে শুরু করেছে। আমি সাগরের দিকে চোখ রাখলাম। সোজা উত্তর দিকে পার হয়ে গেলে তুরস্ক। কিছুটা বামে গেলে গ্রিস। এর থেকে আর একটু বামে সরলে ইতালী। অবশ্য এই সাগর পাড়ি দিয়ে ফ্রান্স এবং স্পেন গিয়েও নৌকা ভিড়ানোর সুযোগ রয়েছে। তবে দালালেরা গ্রিস এবং ইতালীতে লোক পাচার করে। এদের কেউ কেউ শেষপর্যন্ত ইউরোপে পৌঁছতে পারলেও অধিকাংশই মারা পড়ছে পথে ঘাটে। বেঁচে থাকলেও ধরা পড়ে অর্ধমৃত হয়ে। ভূমধ্যসাগরের এই পুরো পথটিই উত্তাল, ভয়ংকর। জীবন হাতে নেয়ার বিষয়টি আক্ষরিক অর্থে যে কত কঠিন তাই সাগরের এই কূলে বসে কল্পনা করা কঠিন। তবে নৌকা নিয়ে ধারণ ক্ষমতার অনেক বেশি মানুষ গাদাগাদি করে সাগরটি পাড়ি দিতে গেলেই কেবল টের পাওয়া যায় যে মৃত্যু কত কাছাকাছিতে ঘুরঘুর করে! হোটেলের কাছেই অতি নান্দনিকভাবে সাজিয়ে রাখা একটি বিচ। তাতে অনেক নারী পুরুষ সাগরমন্থনে ব্যস্ত। কেউ শুয়ে আছেন বালিতে। কেউবা জলকেলিতে মেতেছেন ভূমধ্যসাগরে। জানালা থেকে চোখ সরাতে পারছিলাম না। জাহেদ ভাইকে ডেকে দেখালাম। আমরা দুজনেই স্বীকার করলাম যে, সাগরের কূলটিকে অনেক সুন্দর করে সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা হয়েছে। জায়গাটি আসলেই অনেক সুন্দর!
রুমেই কফি বানানোর সরঞ্জাম রয়েছে। ইচ্ছে করলে চা। কফি বানালাম। সোফায় হেলান দিয়ে সাগরের উদোম নৃত্যে মাতোয়ারা হয়ে কফির কাপে চুমুক দিতে গিয়ে বার বার রোমাঞ্ছিত হচ্ছিলাম। (চলবে)
লেখক : চিফ রিপোর্টার, দৈনিক আজাদী

x