দূরের টানে বাহির পানে

হাসান আকবর

বুধবার , ১২ জুন, ২০১৯ at ৫:৩২ পূর্বাহ্ণ
38

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
নীল নদে ক্রুজ করে শুধু মনই ভরলো না, পেটও ভরলো। ভরপেট খাবার খেয়ে আমরা যখন জাহাজ থেকে নেমে আসছিলাম তখন রাত খুব বেশি না হলেও আমাদের শরীর বিছানা খুঁজছিল। চোখ মুখ অন্ধকার করে ঘুম আসার কারণ বেশ বুঝতে পারছিলাম আমি। কায়রোর সাথে চট্টগ্রামের সময়ের ব্যবধান চার ঘণ্টা। এতে করে নীল নদের জাহাজে যখন রাত দশটা তখন চট্টগ্রামে রাত দুইটা। রাত দুইটায় চট্টগ্রামের বেশির ভাগ মানুষই ঘুমে বিভোর থাকেন। আমরাও। ফলে শরীরের খুব বেশি দোষ দিতে পারলাম না। ঘন ঘন হাই তুলছিলেন অনেকেই। কেউ কেউ পাশের জনের গায়ে হেলানও। অসংখ্য জাহাজ ভাসছে নীল নদে। প্রতিটি জাহাজেই চলছে মরিচ বাতির ঝিকিমিকি। জাহাজের ভিতরে চলছে বেলি ড্যান্স, ফোক ড্যান্স। সাথে মদ বিয়ারের মহোৎসব। আধুনিকা স্বল্পবসনা সাকিদের হাত থেকে নেয়া মদের গ্লাসে চুমুকে চুমুকে সময়কে উপভোগ করছেন দেশি বিদেশি শত শত মানুষ। এক একটি জাহাজে তিন চারশ’ জনের মতো নারী পুরুষ ক্রুজে নেমেছেন। এদের সকলেই মদ বিয়ারে গা না ভাসালেও অধিকাংশই ছন্দে ছন্দে গ্লাস উজাড়ে মেতেছেন। সুর এবং অসুরের এমন সমন্বয় জগতে কে যে শুরু করেছিলেন কে জানে!
আমরা আমাদের মতো করে খাওয়া দাওয়া সেরে জাহাজ থেকে নেমে আসলাম। আমাদের পেছনে সিরিয়াল দিয়ে আছে আরো বেশ কয়েকটি জাহাজ। আমাদের আগেও জাহাজ ভিড়েছে ঘাটে। একটি জাহাজ থেকে মানুষ নেমে গেলে অপর জাহাজ লাগানো হচ্ছে। অসংখ্য মানুষ সময়কে উপভোগ করছেন। জাহাজ থেকে নেমে আমরা আবারো বাসে চড়লাম। চমৎকার করে সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা জাহাজ ঘাটেই সারি সারি বাস দাঁড়িয়ে রয়েছে। বিভিন্ন ট্যুরিজম অপারেটরের বাস। অথেনটিক ট্যুরিজমের ইয়াসিন যদি আমাদের বাস চিনিয়ে না দিতেন তাহলে তা খোঁজে পাওয়া কঠিন হতো। অবশ্য অথেনটিক ট্যুরিজমের কায়রোর গাইড আবদুল্লাহর তৎপরতাও ছিল চোখে পড়ার মতো। কোন ঝুটঝামেলা ছাড়া বাস পাওয়ায় আমাদের অনেকেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। বাসে চড়লেও আমাদের মাথায় ঘুরছিল ক্রুজ। শরীর যেন কিছুটা দোলাদুলিও করছিল। ক্রুজ নাইলের নানা বিষয় নিয়ে বিভিন্ন সিট থেকে উচ্ছ্বসিত মন্তব্য আসতে শুরু করলো। আমি বেশ বুঝতে পারলাম যে, ক্রুজ নাইল সকলেরই পছন্দ হয়েছে। কয়েক ঘন্টা নদীতে ভেসে সকলের মেজাজই ফুরফুরে হয়ে উঠেছে।
বাস হোটেলের সামনে এসে থামলো। খাওয়া দাওয়ার ঝামেলা না থাকায় আমরা সরাসরি রুমে চলে গেলাম। কেবিনেট সেক্রেটারি লায়ন জাহেদুল ইসলাম চৌধুরী এবং আমি একই রুমে। জাহেদ ভাই অতি অল্প সময়ে ঘুমিয়ে পড়লেন। অতি নিরীহ ভদ্রলোক জাহেদ ভাইর কিছু একটা হলে যেমন চলে, তেমনি না হলেও কোন আপত্তি করেন না। রুমে চা কফি তৈরির সরঞ্জাম রয়েছে। কিন্তু এসবে জাহেদ ভাইর কোন আগ্রহ নেই। অথচ রুমের এই ছোট্ট আয়োজন আমার বহু ভোগান্তির অবসান করেছে। নাহয় এত রাতে চা কিংবা কফির জন্য আমাকে হেথায় হোথায় ঘুরতে হতো! বিছানার পাশে রাখা সোফায় বসে অতি আয়েশী ভাবে আমি যখন ধুমায়িত কফির কাপে চুমুক দিচ্ছিলাম তখন জাহেদ ভাইর অর্ধেক ঘুম যেন হয়ে গেছে!! নিশীরাতে কফির কাপে চুমুক দেয়ার তৃপ্তিটা যে অন্যরকম তা জাহেদ ভাই বুঝতে পারলেন না। উনাকে যে বুঝিয়ে বলবো সেই সুযোগও দিলেন না।সকালে জাহেদ ভাই আমার ঘুম ভাঙালেন। রাতভর বাঘ ভাল্লুক নিয়ে নানা ভাবনায় ঘুম আসছিল না। কফির প্রভাবও হতে পারে। এতে করে সকালে জাহেদ ভাইর ডাকাডাকিতে ঘুম ভাঙলেও চোখ জ্বালা করছিল আমার। নাস্তার টেবিলে অনেকের সাথে দেখা হয়ে গেল। আমাদের সাথের অনেকেই নাস্তা শেষ করে বাইরে যাওয়ার তোড়জোড় চালাচ্ছেন। আমরা ব্যুফে নাস্তা সারলাম। মন ভরিয়ে দেয়া আয়োজন। কত জনের খাবার যে সাজিয়ে রাখা হয়েছে! বিপুল সংখ্যক মানুষের একই সাথে নাস্তা করার সুযোগ রয়েছে হোটেলটিতে। এতে করে টেবিলে টেবিলে বহু নারী পুরুষ একই সাথে নাস্তা করতে আসলেও কোন ধরনের ঝামেলা হচ্ছিল না। অনায়াসে খাবার নিয়ে টেবিলে বসা যাচ্ছিল। তারকাখচিত হোটেলগুলোতে অতীতে ‘এগ স্টেশনে’ ডিম সরবরাহ দিতে দেখেছি। নানা রেসিপিতে ডিম সরবরাহ দেয়া হয়। তাৎক্ষনিকভাবে তৈরি করে দেয়া হয় ডিম পোজ, ডিমের অমলেট কিংবা মামলেট। কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ কুচি কিংবা মসলার সাথে বিভিন্ন ধরনের মাংস মিশিয়ে ডিম তৈরি করে দেয়া হয়। অথচ এখানে ডিমের পাশাপাশি পেঁয়াজু এবং পুরিও তাৎক্ষণিকভাবে ভেজে দেয়া হচ্ছিল। ছোলাও দেয়া হয়েছে কয়েকভাবে। রয়ে সয়ে আয়েশ করে নাস্তা করে বাইরে যাওয়ার জন্য পুরোপুরি তৈরি হয়ে গেলাম।
আমাদেরকে আজ কায়রো মিউজিয়ামে নিয়ে যাওয়া হবে। যেখানে ফেরাউনের মমি রয়েছে সেটি দেখানো হবে। এতে করে দলের সকলের ভিতরেই কমবেশি উত্তেজনা পরিলক্ষিত হচ্ছে। মিশরে বহু দর্শনীয় স্থান থাকলেও আমাদের এক সপ্তাহের সফরে সবকিছু দেখা সম্ভব হবে না। তবে যতটুকু সম্ভব তার সবটুকু যেন বেশি বেশি দেখা যায় সেই ব্যবস্থা করে দিয়েছেন অথেনটিক ট্যুরিজমের আজিম ভাই। আজিম ভাই লায়ন্সের নেতা। তাই এই ট্যুরটি শুধু উনার ব্যবসাই নয়, পাশাপাশি লায়নিজমের সেবাও। লায়ন্স ক্লাবের সদস্যদের প্রতি উনার বিশেষ দায়িত্ববোধ থেকেও ট্যুরটিকে সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। এর আগে আজিম ভাই শ্রীলংকা এবং মালদ্বীপ সফরের সময়ও ট্যুর সাজানোতে যথেষ্ট দক্ষতা দেখিয়েছিলেন। হোটেল থেকে আমাদেরকে বিশাল বাসে তুলে কায়রো শহরে নিয়ে আসা হলো। শহরের মাঝখানেই কায়রো মিউজিয়াম। অতি বিখ্যাত তাহরীর স্কয়ারের পাশেই বিশাল এলাকা জুড়ে কায়রো মিউজিয়াম। যেই মিউজিয়ামের ভিতরে রয়েছে ফেরাউনের মমি। পৃথিবীর অতি বিখ্যাত কয়েকটি জাদুঘরের একটি কায়রো মিউজিয়াম। এই মিউজিয়ামের সবকিছু বুঝে শুনে পুরোপুরি দেখতে অন্তত এক সপ্তাহ সময় লাগবে। চোখ বুলিয়ে গেলেও সময় লাগবে কমপক্ষে দুইদিন। আমাদের হাতে সময় মাত্র কয়েক ঘণ্টা। তাই আমরা ঝড়ের বেগে দেখে নেয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম।
অথেনটিক ট্যুরিজম আমাদের কাছ থেকে যে প্যাকেজমুল্য নিয়েছে তাতে মিউজিয়ামের টিকেট অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু এখানে এসে দেখা গেল, শুধু একটি টিকেট দিয়ে সবকিছু হবে না। ক্যামেরা বা ভিডিও করতে হলে আলাদা টিকেট কাটতে হবে। মমি রুমে যেতে পৃথক অপর একটি টিকেট নিতে হবে। সেখানে আবার ক্যামেরার টিকেট কোন কাজ করবে না। অর্থাৎ মমি রুমে ছবি তোলা এবং ভিডিও করা পুরোপুরি নিষিদ্ধ। আমরা কিছুটা ভড়কে গেলাম। এত টিকেট কাটাকুটি করে ফতুর হয়ে যাবো নাতো! ত্রাণকর্তা হিসেবে এগিয়ে এলেন ইয়াসিন। অথেনটিক ট্যুরিজমের এই কর্মকর্তা বললেন, আমরা কিছুটা বুদ্ধি করে এগুবো। ক্যামেরার টিকেট সবার জন্য না নিয়ে চারটি নিলে সবার ছবি তোলা হয়ে যাবে। টিকেটের মূল্য দেখে আমার চোখ কপালে উঠার উপক্রম হলো। এত চড়া দাম যে, বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল। অবশ্য মিশরীয়দের জন্য টিকেটের মূল্য একেবারে কম। শুধু বিদেশীদের গলা পুরোপুরি কেটে নেয়ার ব্যবস্থা। এটি অবশ্য শুধু মিশরেই নয়, আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতেও দেখেছি একই অবস্থা। এমনকি কলকাতার ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালেও বিদেশীদের জন্য দাম পাঁচগুণ বেশি। আগ্রার তাজমহলেও!
যাক জাদুঘরের সামনে লিখে রাখা টিকেটের চড়া দাম দেখে আমার মনে হলো, পকেটে যে পরিমাণ মিশরীয় পাউন্ড রয়েছে তা এখানেই ফুরিয়ে যাবে। মিউজিয়ামে প্রবেশে বিদেশিদের জন্য টিকেটের মূল্য ৭৫ মিশরীয় পাউন্ড। (১ মিশরীয় পাউন্ডে বাংলাদেশী ৫ টাকারও কিছু বেশি)। ক্যামেরার জন্য আরও ৫০ মিশরীয় পাউন্ড। আর মিউজিয়ামের শেষদিকে মমি রুমে প্রবেশ করতে আরও ১০০ মিশরীয় পাউন্ড দিয়ে আলাদা টিকেট করতে হবে। মমি পর্যন্ত যেতে আমাদেরকে তিনটি পৃথক টিকেট কিনতে হলো। ইয়াসিন ভাই আমাদের সবার প্রয়োজনীয় সব টিকেটের ব্যবস্থা করলেন। বললেন, অসুবিধা নেই। মমি পর্যন্ত আমরা যাবো। এতদূর এসে ফেরাউনের মমি না দেখে যাওয়ারতো কোন মানে হয়না! সত্যিই তাই, ফেরাউনকে না দেখে যাওয়া ঠিক হবে না। মমি না দেখলে মিউজিয়ামে আসারও দরকার ছিল না। ইয়াসিন ভাই’র কথায় সায় দিলাম আমি। মাথাপিছু ২২৫ পাউন্ডের টিকেট নিয়ে আমরা বিশাল লাইন ঠেলেঠুলে সামনে এগুতে থাকলাম। (চলবে) লেখক : চিফ রিপোর্টার, দৈনিক আজাদী।

x