দূরের টানে বাহির পানে

হাসান আকবর

বুধবার , ১০ অক্টোবর, ২০১৮ at ৬:৫৭ পূর্বাহ্ণ
34

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে ছিলাম আমরা। প্রকৃতির এক অপরূপ রূপ আমাদের মুগ্ধ করছিল। সাগরের উপকূল জুড়ে গাছ গাছালী। গাছ গাছালীর ফাঁক দিয়ে বাড়িঘরও দেখা যাচ্ছিল। উঁচু কোন বহুতল ভবন নেই। সবই দুই তিন তলা উচ্চতার বাড়িঘর। বাংলো টাইপের বাড়ি ঘরও রয়েছে। আমি এবং আমার এডিটর স্যার (দৈনিক আজাদী সম্পাদক এম এ মালেক) ডেনমার্কের প্রকৃতি দেখছিলাম। আসলে ডেনমার্ক আর নরওয়ে বলে কোন ব্যবধান নেই। পুরো ইউরোপের প্রকৃতিই অনেকটা একই রকম। দেশগুলোর স্বাভাবিক অবস্থাও অনেকটা একই। মানুষের জীবনযাত্রার মানও কাছাকাছি। তবে ইউরোপের কয়েকটি শহরে প্রচুর মানুষ। আর কোন কোন শহরে মানুষের সংখ্যা খুবই কম। গ্রামেগঞ্জে মানুষের আনাগোনা নেই বললেই চলে। এই যে, আমরা জাহাজের এগারতলা থেকে পাড়ের দিকে তাকিয়ে আছি। এত দীর্ঘ সময়ে একজন মানুষও দেখিনি। কোথাও যেন কেউ নেই। কিছু নেই। শুধু গাছ গাছালী এবং বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে থাকা কয়েকটি বাড়ি। গাছ-গাছালীগুলোতেও পাতা ঝরতে শুরু করেছে। ন্যাডা ন্যাডা গাছ। মায়া লাগছিল। পুরো প্রকৃতিই যেন কেমন মায়াবতী!
কোপেনহেগেনের দিকে ছুটছে আমাদের জাহাজ। সাগরের উপকুল ধরে ছুটে চলা। আমি এবং এডিটর স্যার বসে আছি। প্রকৃতির নানা আয়োজন দেখছিলাম। সূর্য উঠেছে। পূব আকাশে সূর্য উঠার আগ দিয়ে প্রকৃতি যে কতভাবে রূপ পাল্টায় তা এর আগে কোনদিন খেয়াল করেছি বলে মনে করতে পারলাম না। কক্সবাজারসহ বিশ্বের বহু সী বিচে সূর্য ডুবে যেতে দেখেছি। মুগ্ধ হয়েছি। কিন্তু সাগরের বুক জুড়ে আলো ছড়িয়ে লাল টকটকে সূর্যের উদয় হওয়াও যে মন রাঙানোর মতো একটি জিনিস তা এর আগে কোনদিন খেয়াল করিনি। আমার মনে হলো, চাঁদের হাসিই কেবল আলো ছড়ায় না, সূর্যের হাসিও বুঝি সাগর ভাসায়!
আরো কিছুক্ষণ বসে থাকলাম আমরা। অতঃপর ধীরে সুস্থে নিচে নেমে আসলাম। নাস্তা করতে হবে। ক্ষুধা নিজের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে। এডিটর স্যারকে রুমে বসিয়ে আমি আমার বন্ধুদের খুঁজতে গেলাম। রুমে নক করে টের পেলাম যে তারা এখনো ঘুমুচ্ছে। আমি ক্রমাগত কল বেল বাজিয়ে তিনজনেরই ঘুম ভাঙলাম। আনোয়ার ভাই দরজা খুললেন। তিনি চোখ খুলতে পারছিলেন না। বুঝতে পারলাম যে, রাতে আড্ডা জমজমাট ছিল। রাতভর গল্প করে হয়তো সকালের দিকে ঘুমুতে গেছেন। মনজু ভাই এবং টিপু ভাইর অবস্থাও শোচনীয়। অবশ্য কিছু করার নেই। কিছুক্ষণের মধ্যে আমাদের সতের ঘণ্টার সাগরজীবনের অবসান ঘটবে। জাহাজ ছেড়ে চলে যেতে হবে।
আমরা নাস্তা শেষ করার আগেই জাহাজের মাইকে ঘোষণা দেয়া হলো যে গন্তব্য খুবই কাছাকাছিতে। আমাদের নামতে হবে। দ্রুত তল্পিতল্পা গুছিয়ে নিলাম আমরা। ডেনমার্ক সফরের জন্য মোটামুটি তৈরি হয়ে নামার প্রস্তুতি নিলাম। ডেনমার্কে আমাদের লোকাল গার্ডিয়ান হবেন মনির ভাই। পুরো নাম মনিরুল ইসলাম। ডেনমার্কের বেশ বড় ব্যবসায়ী। রাজনীতিও করেন। সমাজসেবাও। আমাদের সাথে মনির ভাইর কোন পরিচয় নেই। নেই যোগাযোগও। তবে আমার বন্ধু নরওয়ের আনোয়ার ভাইর সাথে মনির ভাইর সম্পর্কে আত্মীক। পারিবারিক। আনোয়ার ভাই আমাদেরকে ডেনমার্ক দেখাতে মনির ভাইর সহায়তা চেয়েছেন। মনির ভাই বলেছেন, কোন অসুবিধা নেই। সবই করা হবে। মনির ভাই বিশাল এক গাড়ি নিয়ে জাহাজ ঘাটায় উপস্থিত থাকবেন বলেও আশ্বস্ত করেছেন।
আমাদের জাহাজ ঘাটে ভিড়লো। জেটিতে বার্থিং নেয়ার মতো। কিন্তু জাহাজ ঘাটা যেন বিমানবন্দর। পুরোদস্তুর নানা আয়োজন। আমাদের লাগেজ স্কেনিং করা হলো। কাস্টমস কড়া নজরদারীও চললো। তকতকে ঝকঝকে চারদিকে। আমরা বিশাল লন পার হয়ে বাইরে বেরিয়ে আসলাম। রাস্তায় নামতেই তীব্র শীতে জুবুথুবু অবস্থা। আমরা পেছনে আবারো ছুটে রুমের ভিতরে ঢুকে গেলাম।
আনোয়ার ভাই নিজের উপস্থিতি জানান দিতে মনির ভাইকে ফোন করলেন। এক মিনিটের মধ্যে আসছেন বলে জানালেন তিনি। অতঃপর অল্পক্ষণের মধ্যেই মনির ভাই বিশাল এক গাড়ি নিয়ে হাজির হলেন। জীপ গাড়ি। বহু টাকা পয়সা থাকলে এমন বড় গাড়ি চালানো যায়। মনির ভাই নিজেই ড্রাইভ করছিলেন।
এডিটর স্যারকে সামনে নিজের পাশে বসিয়ে আমাদের সকলকে গাড়িতে নেয়া হলো। বোঝাই করা হলো আমাদের লাগেজ। অতঃপর গাড়ি ছুটতে লাগলো। কিন্তু কিছুদূর গিয়েই মনির ভাই হায় হায় করে উঠলেন এবং গাড়ি ইউ টার্ণ নিলেন। আমি মনে করলাম, ঘাটে কিছু ফেলে এসেছেন। কিন্তু মনির ভাই বললেন, লিটল মারমেইডতো এখানেই। শুরুতে এটা দেখে যাই। পরে অন্য কিছু দেখা যাবে। লিটল মারমেইডের কথা শুনে আমার এডিটর স্যার নড়ে চড়ে বসলেন। খুশী হলেন। বললেন, ভালোই হলো। আগে লিটল মারমেইড দেখে যাই। পরে যা হয় একটা কিছু হবে। লিটল মারমেইড কি বুঝতে পারছিলাম না। কোনদিন নাম শুনেছি বলেও মনে পড়লো না। কক্সবাজারে এই নামের একটি রেস্টুরেন্ট চালু করা হয়েছে বলে মনে পড়লো। কিন্তু পুরো বিশ্ব চষে বেড়ানো এবং নানা বিষয়ে অগাধ জ্ঞান রাখা আমার এডিটর স্যার ঠিকই লিটল মারমেইড চিনে ফেললেন। তিনি এই লিটল মারমেইড সম্পর্কে ছোটোখাটো একটি বর্ণনাও দিয়ে দিলেন। স্যারের কথায় পুরোপুরি সায় দিলেন মনির ভাই। আমি দ্রুত মোবাইল হাতে নেটে তৎপর হলাম। লিটল মারমেইড নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে যা জানলাম তা মোটামুটি বিস্ময়কর।
দ্যা লিটল মারমেইড আসলেই একটি মূর্তি। এই মূর্তিটির নানা নাম আছে। মৎস্য কন্যা হচ্ছে সবচেয়ে বেশি প্রচলিত নাম। এছাড়া জলকন্যা, জলপরী, জলকুমারী প্রভৃতি নামও রয়েছে। একশ’ বছরের পুরানো একটি মূর্তি। সাগরের বুকে পাথরের বেদি বানিয়ে মূর্তিটি স্থাপন করা হয়েছে। অল্পক্ষণের মধ্যে আমরা সাগরপাড়ে এসে হাজির হলাম। আমাদের চোখের সামনেই দ্য লিটল মারমেইড। সাগরের বুকে অনেকগুলো পাথর দিয়ে একটি বেদীর মতো তৈরি করা হয়েছে। ওই বেদীর উপর স্থাপন করা হয়েছে মূর্তিটি। কিছুটা নারী, কিছুটা মৎস্য মিলিয়ে মূর্তিটির তৈরি করা হয়েছে। রূপকথার এক গল্প থেকে এই মূর্তির সূচনা।
দুনিয়াতে যত রূপকথা প্রচলিত রয়েছে তার একটি বড় অংশ দখল করে রয়েছে মৎস্য কন্যা বা জলপরী। বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্নভাবে আলোচিত হলেও জলকন্যার সরব উপস্থিতি প্রায় সব জায়গাতেই। বিশেষ করে রূপকথা আছে অথচ জলকন্যা বা জলপরী নেই এমন পাওয়া যাবে না। এই জলকন্যার ধারণাটি এসেছে গ্রিক পুরাণের দেবী এফ্রোদাইতি ( ভালোবাসার দেবী) থেকে।
জলকুমারীর অতি পরিচিত সব রূপকথার মধ্যে ‘লিটল মারমেইড ‘ বা ‘ ছোট্ট জলকন্যা‘ নিয়ে প্রচলিত রূপকথাটি নাকি পৃথিবীব্যাপী অতি পরিচিত একটি রূপকথা। যতটুকু শুনলাম গল্পটা নাকি এরকম যে, বহু বছর আগে সাগরে একটি রাজকীয় জাহাজডুবির ঘটনা ঘটে। ওই জাহাজে ছিল এক রাজপুত্র। সাগরের ওই অঞ্চলে ছিল এক স্বাধীনচেতা, চঞ্চল জলকন্যা। ছয় বোনের সবচেয়ে কনিষ্ঠ। সেই কনিষ্ঠ জলপরীকেই নিয়েই লিটল মারমেইড রূপকথা।
রূপকথাটিতে বলা হয় যে, সমুদ্রের অতলে মায়াবী এক জগত ছিল। সেই জগতের বাসিন্দাদের অর্ধেক মানুষ। অর্ধেক মৎস্য। সে মায়াবী রাজ্যের রাজার স্ত্রী মারা গিয়েছিল ছয় কন্যা রেখে। বিপত্নীক রাজা তার আদরের ছয় কন্যাকে আদরে সোহাগে আগলে রেখেছিলেন। অবশ্য তাদের দেখভাল করতেন রাজমাতা। রাজমাতা যেমন ছিলেন এক জ্ঞানী জলপরী। নিজের জ্ঞান, গরিমা, মর্যাদায় তিনি লেজে বারোটি ঝিনুক ধারণ করতেন। গল্পে ছয় রাজকন্যার মধ্যে কনিষ্ঠ জন ছিল সবচেয়ে সুন্দরী। তেজি এবং চঞ্চলা। স্বভাবেও সে অন্যদের মতো ছিলনা। সাগরের অতলে থাকা অন্য রাজকন্যারা যখন জাহাজডুবিতে পাওয়া জিনিসপত্র নিয়ে বাস্ত হয়ে যেতো তখন ছোট জলপরী মগ্ন থাকতো সাগরের তলদেশের নানা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নিয়ে। প্রাসাদের সামনে বাগানে খেলা করতো রাজকন্যা। ছোট রাজকন্যা বাগানে নিজের নির্দিষ্ট জায়গায় কুড়িয়ে পাওয়া একটি মার্বেলের মূর্তি। ছয় রাজকন্যার মধ্যে পাঁচ জন সাগরের উপরিভাগে যাওয়ার অধিকার থাকলেও ছোট রাজকন্যার অধিকার ছিল না। কারণ ওই রাজ্যে নিয়ম ছিল যে, পণের বছর বয়স না হলে কেউ সাগরের উপরিভাগে যেতে পারবে না। এতে করে ছোট কন্যা সাগরের তলদেশেই থাকে আর বড়দের কাছ থেকে উপরের গল্প শুনে। যেদিন তার বয়স পনের বছর পূর্ণ হলো সেদিন সে সাগরের উপরে আসার অনুমতি পেল। সাগরের উপরে এসে নানা কিছু দেখে আর বিস্ময়ে মুগ্ধ হয় জলপরী। সে একটি জাহাজ দেখলো। জাহাজের নাবিকদের দেখলো। আজব ধরনের কিছু কাণ্ডকারখানাও দেখলো। জাহাজের জানালা দিয়ে সে এক রাজপুত্রকে দেখলো। এই রাজপুত্র ঠিক যেন তার বাগানে রাখা মার্বেলের মূর্তির মতো। জলকন্যা রাজপুত্রের প্রেমে পড়ে গেল। সে সাগরের ঢেউর বুকে ভাসতে ভাসতে জাহাজের পাশে পাশে চলতে লাগলো। সাত রাজ্যের বিস্ময় এবং মুগ্ধতা নিয়ে সে তাকিয়ে ছিল রাজপুত্রের দিকে। কিন্তু একেবারে আচমকা সাগরে ঝড় উঠলো। জাহাজটি লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল। নাবিকদের কেউ কেউ জাহাজের কাঠ ধরে ভাসতে লাগলো। কেউবা ডুবে গেল। কিন্তু রাজপুত্র ডুবে যাচ্ছিল। ছোট জলকন্যা সাগরের নিমজ্জিত হওয়া থেকে রাজপুত্রকে উদ্ধার করে। জীবন বাঁচায়। পরবর্তীতে আরো নানা ঘটনা আছে। নানা অঘটন আছে। রাজপুত্র পাশের দেশের রাজকন্যাকে বিয়ে করে। রাজপুত্রের সাথে বিয়ে না হওয়ায় ছোট রাজকন্যার জীবন হুমকির মুখে পড়ে। সূর্য উঠার সাথে সাথে তার মৃত্যু এবং সাগরের জলে তার বিলীন হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু বায়ু রাজকন্যাদের কারণে ছোট মৎস্যকন্যার জীবন রক্ষা পায়। সে বেঁচে থাকে। তিনশ’ বছর মানুষকে সহায়তা করলে সেই নতুন এক জীবন লাভ করবে বলেও বায়ু রাজকন্যারা তাকে আশ্বস্ত করে। আরো বহু বহু কথা রয়েছে রূপকথাটির পরতে পরতে।
জনপ্রিয় এ গল্পটির উৎস ডেনিশ লেখক হান্স ক্রিশ্চিয়ান এনডারসনের ‘ ডে লিল হাফ্রু’। ডেনিশ ভাষায় রচিত এই শিরোনামের অর্থ দাঁড়ায় লিটল মারমেইড। এনডারসন এ গল্পটি লেখেন ১৮৩৬ সালে এবং প্রকাশ করেন ১৮৩৭ সালে। ‘ফেইরি টেল টোল্ড ফর চিল্ড্রেন নামের গ্রন্থে গল্পটি ঠাঁই পায়। পরবর্তীতে এই গল্পটি আরো বেশ কয়েকজন প্রকাশক প্রকাশ করেন। আর মৎস্য কন্যার বেদনা বিধূর জীবন কাহিনীই দিনে দিনে অতি জনপ্রিয় এক রূপকথায় পরিণত হয়।
১৮৩৬ সালে লেখা এই মৎস্যকন্যার কাহিনী যুগের পর যুগ চলে সমান জনপ্রিয়তায় মানুষের মুখে মুখে। রূপকথার এই জলকন্যাকে একটি ধাতব মূর্তির আদল দেন ভাস্কর এডওয়ার্ড এরিকসেন। ১৯১৩ সালের ২৩ আগস্ট কোপেনহেগেন পোতাশ্রয়ের কাছেই লিটল মারমেইড উন্মোচিত হলো। তবে এই মূর্তির তৈরির পেছনেও রয়েছে চমৎকার একটি ইতিহাস। সেটির সূচনা হয়েছিল ১৯০৯ সালে। ওই বছর বিখ্যাত কালসবার্গ কোম্পানির ধনকুবের মালিকের পুত্র কার্ল জ্যাপবসেন কোপেনহেগেন রয়্যাল থিয়েটারে মৎস্যকন্যার রূপকথাভিত্তিক ব্যালে নাচ দেখতে আসেন। নাচ দেখে মুগ্ধ হন তিনি। অনুষ্ঠান শেষে তিনি নৃত্যদলের প্রধান এলেন প্রাইসকে ডেকে নেন। তিনি বলেন, আমি মৎস্য কন্যার একটি মূর্তি গড়াতে চাই। আপনি যদি তার মডেল হন তাহলে আমি খুশী হবো। তিনি ওই সময়কার বিখ্যাত ভাস্কর এডওয়ার্ড এরিকসেনকে মূর্তি গড়ার দায়িত্ব দেন। ভাস্কর এরিকসেন ব্রোঞ্জ ব্যবহার করে মূর্তিটি তৈরি করেন। মূর্তির মুখমণ্ডল এলেন প্রাইসের মতো করে তৈরি করা হলেও নিচের অংশ নিয়ে কিছুটা বিপত্তি তৈরি হয়। এলেন প্রাইজ শরীর উদোম বা কাপড় খুলে ফেলতে রাজি না হওয়ায় ভাস্কর এরিকসেন নিজের স্ত্রী এলাইন এরিকসেনকে মডেল হিসেবে ব্যবহার করেন। এতে করে মূর্তিটির মুখমণ্ডল এক নারীর আদলে হলেও শরীরের অপরাংশ তৈরি হয় অন্য নারীর আদলে। দুই নারীর মিলিত রূপের সাথে শিল্পীর কল্পনা মিলে মিশে একাকার হয়েছে লিটল মারমেইডে। লিটল মারমেইডের উচ্চতা ৪ ফুট ১ ইঞ্চি। এটির ওজন ১৬৫ কেজি। সাগরের বুকে একটি বেদির উপর স্থাপিত ব্রোঞ্জের এই মূর্তিটি শিল্পরসিকদের কাছে বেশ আদরের হলেও কিছু মানুষের নির্মমতাও একে তাড়া করেছে। ৬০-এর দশকে বহুবার আক্রান্ত হয়েছে লিটল মারমেইড। নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে মূর্তিটিকে। বিভিন্ন অংশ ভেঙে দেয়া হয়েছে। বিকৃত করা হয়েছে চেহারা। অবশ্য প্রতিবারই আধুনিক শিল্পীরা লিটল মারমেইডকে আসল আদল দিয়ে পুনরায় তৈরি করে দিয়েছেন। ১৯৬৪ সালের ২৪ এপ্রিল মৎস্যকন্যার মাথাটাই কেটে নিয়েছে দুর্বৃত্তরা। এটা আর উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। নতুন করে মাথা নির্মাণ করতে হয়েছে। ১৯৮৪ সালের ২২ জুলাই ভেঙে নিয়ে গিয়েছিল ডান বাহু। ১৯৯০ সালে আবারও মাথা কাটার চেষ্টা করা হয়। তবে দুবৃত্তরা সফল হয়নি। ঘাড়ে সাত ইঞ্চির মতো ক্ষত করে চলে যায় দুর্বৃত্তরা। ১৯৯৮ সালের ৬ জানুয়ারি আবার মাথা কেটে নিয়ে যায়। ২০০৩ সালের ১০ সেপ্টেম্বর একটি বিস্ফোরণ ঘটানো হলে মৎস্যকন্যা মুখ থুবড়ে পড়ে, এর কনুই ও হাঁটুতে ক্ষত সৃষ্টি হয়। ২০০৪ সালে তুরস্কের ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানের প্রতিবাদে মৎস্যকন্যাকে বোরকায় ঢেকে ফেলা হয়। ১৯৬৩, ২০০৬ ও ২০০৭ সালে মূর্তিটির গায়ে রং ঢেলে বিকৃত করা হয়। রূপকথার মৎস্য কন্যাকে জীবনে অনেক বেদনার মুখোমুখি হতে হয়েছে। বিরহি জলপরীর জীবনটিই বেদনাবিধূর। বাস্তবের মৎস্য কন্যাকেও কম ভোগান্তির শিকার হতে হয়নি। তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে হলো পৃথিবীব্যাপী কোটি কোটি মানুষের অপার এক ভালোবাসা লিটল মারমেইড পেয়েছে। রূপকথার সেই মৎস্যকন্যা বা লিটল মারমেইডের ভালোবাসা ও বেদনামাখা জীবনকাহিনী নিয়ে নির্মিত মূর্তিটি কালের পরিক্রমায় ‘সিম্বল অফ কোপেনহেগেনে’ পরিণত হয়েছে। আমরা অনেকক্ষণ ধরে ছোট্ট মূর্তির আশেপাশে ঘুরঘুর করলাম। ছবি তুললাম। আমি মুগ্ধ হয়ে অনুভব করার চেষ্টা করলাম যে, শত বর্ষ আগে এই ধরনের একটি মূর্তি নির্মাণ কী পরিমাণ কঠিন কাজ ছিল! (চলবে)
লেখক : চিফ রিপোর্টার, দৈনিক আজাদী।

x