দুয়ারে দাঁড়ায়ে বলে নাহ

লুসিফার লায়লা

মঙ্গলবার , ৯ অক্টোবর, ২০১৮ at ১০:৩২ পূর্বাহ্ণ
20

পুরনো গল্প, পুরনো দিন, হারানো নাকচাবির শোক অথবা ঝাঁকড়া সবুজ পাতার টুপি পড়া কামিনী গাছ, ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখ এবং হল্লাহাটির ঝগড়াঝাটির বিরামহীন ছায়াছবি। সেই আমাদের পুরোনো বাড়ি। ঢোকার মুখে একটা বুড়ো ছাতিম মাথা দুলিয়ে ডাকে, এসো। কত কত দিন যোগ হতে হতে বছর ফুরিয়েছে তবু সে-একই ছাতিম এই পুরনো বাড়িটার একমাত্র সহচর। দুঃখ- সুখের সাথী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে দিবারাত্রি। আমি সেই ছাতিম গাছের উষ্ণতা টের পাই কেননা প্রথম প্রেম ভেঙ্গে যাবার পর ছোট্ট জানালাটার কাছে দাঁড়িয়ে জেনেছিলাম তার বুনোগন্ধী ফুল ব্যথার পথ্যি হয়েছিল। পুরনো বাড়ির সেই ছোট্ট জানালার জায়গায় এখন আস্ত একখানা দরজা তবু কোনো কোনো ভাতঘুমের দুপুরবেলায় সেই সদ্য কিশোরী হয়ে ওঠা বালিকার মুখ যেন জেগে থাকে সেই পুরনো জানালায়।
এক, দুই ,তিন করে পাঁচ পাঁচটা সিঁড়ি ভেঙ্গে উঠে দাঁড়ালেই বসার ঘর। নীলের চাটাইয়ে মোড়ানো বাঁশের বেড়ায় তৈরি সেই বসার ঘরটার ভেতর ঢুকে পড়লেই পুরনো দিনের কোলাহল হাজারো কাঁচের শিশির ভাঙ্গা টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। নানারকমের লোকজনের আনাগোনা এই বসার ঘরে। সে-সব নানান মুখের ভেতর কেবল উজ্জ্বল মুখগুলোর উপস্থিতি স্মৃতির ভেতর নড়েচড়ে বসে। এই বসার ঘরেই মাঝে মাঝে আসতেন সাহিত্যিক ওয়াহিদুল আলম, সম্পর্কে আমাদের বড় আব্বা। এলে প্রায় আমাদের সদ্য কেনা হারমোনিয়াম বাজিয়ে গাইতেন ‘ও যে মানে না মানা’, তারপর সে-গানবাজনার সকাল ফুরোলে তিনি যখন ফিরে যেতেন তখন এই বালিকা সদর দুয়ারে দাঁড়িয়ে বলে না, নাহ, না। তারপর সারাদিন পুরনো বাড়ির পেছনের মস্ত খোলা বারান্দায় বিধুর বিকল হয়ে হাওয়া খেলে যেত। আর বালিকা ছাদখোলা কলঘরে দাঁড়িয়ে মাথা উঁচু করে দেখত তার প্রথম প্রেমিকের মুখ। দুর্দান্ত সবুজ মুখের প্রেমিক হাওয়ায় তার বাবড়ি দোলান চুল উড়িয়ে ডাকতো আয়! সে ডাকে বিভোর হয়ে স্কুলে যাবার তাড়াগুলোকে মনের সুখে এড়িয়ে যাওয়া যেত। বর্ষার দিনে কোনো বর্ষাতি ছাড়াই সেই কলঘরে দাঁড়িয়ে মেয়েটা তার সবুজ মুখের প্রেমিকের মাথার ধবধবে সাদা টুপিটা নাড়িয়ে দিয়ে বলত ‘ভালোবাসি’। আর উত্তরে প্রেমিকটি তার সাদা টুপি থেকে ঝরিয়ে দিত সহস্র পালক।
প্রচণ্ড ঝড়ে যে-বার বাড়িটার টিনের চালা খড়কুটোর মতো ভেসে গেছিল সেইববারের ঝড়েই ভেঙ্গে পড়ে ছিল সেই ঘন সবুজ মুখের দুর্দান্ত প্রেমিক। সকলের চোখ এড়িয়ে ভোরভোর মেয়েটা সেই মস্ত বারান্দা ডিঙিয়ে ছুটে এসেছিল সেই কামিনী গাছটার কাছে। ফিরবে না জেনেও অজস্রবার তাকে ডেকে ডেকে ক্লান্ত হয়ে যেখানে সে ফিরে এসেছিল সেটা তার দাদির শোবার ঘর এবং তার বেদনা ভোলার আশ্রয়। এই শোবার ঘরটাই তাদের আকাশ চেনার পাঠশালা। লোহার পাতের ছোট ছোট খোপ কাটা সেই জানালার ভেতর দিয়ে সন্তানহীন মা শেখায় কেমন করে কালপুরুষ চিনতে হবে, কোথায় অনি নক্ষত্রের বাস। শুকতারাটাই যে সন্ধ্যাতারা হয়ে ফিরে আসে সেকথায় কেমন ঘোর লেগে যেত সেই ঘরে। আজো সেই ঘর আছে কেবল পাঠশালাটা বন্ধ হয়ে গেছে। আজও আছে সেই ছোট-ছোট খোপকাটা জানালা। কেবল জানালার ওপারের মুখটা বদলে গেছে, বদলে গেছে অপেক্ষার কারণ।
ছেলেবেলার ছুটির দিনের দুপুরগুলোতে মেয়েটা জানালার গা ঘেঁষে অপেক্ষায় থাকত সেই জাদুকরের। যে কিনা ক্ষণে ক্ষণে গড়ে দিত চিনির পাখি, আংটি, ঘড়ি, সোনার চেইন অথবা হরিণ শাবক। বহুকাল পরে যে-মেয়েটা চারুশিল্পী হবার স্বপ্ন দেখত তার স্বপ্নের বীজ বুনে দেয়া সে চিনির চকলেট বিক্রেতা আর আসে না। অবাক বিস্ময়ে কেউ ভাবে না দুটো হাতের ভেতর যাদু মন্ত্র বলে তৈরি হতে পারে কারো আগামী দিন। কেবল সেই জানালা যা-কিনা সময়ের প্রয়োজনে দরজায় রূপ পেয়েছে সে জানালার ধারের কাছে জমা রইল সেইসব স্বপ্ন বোনার দিন।
বাড়িটা কতকাল হয় ছেড়ে এসেছি কিন্তু বাড়িটা পিছু ছাড়েনি। বাড়িটার ছোটবড় ঘরগুলোতে কত শত সময় যাপনের ভেতর বেড়ে ওঠার পাঠ নিতে হয়েছে। সেই সব পাঠ একাডেমির চাইতেও মজবুত করে গড়ে দিয়েছে জীবনের ভীত। সেখানে বাবা মায়ের ঘরটায় ছিল আমাদের রঙিন হয়ে উঠবার শৈশব। আমার বাবার মাথার ভেতর রাখা থাকত রাজ্যের রূপকথা। সেই সব রূপকথার ভেতর কান্না হাসির দোলদোলানো শৈশব হেসে খলখল, গেয়ে কলকল তালেতালে দিত তালি। আর আমার বাবার চেষ্টা থাকত সেই সব গল্পের ভেতর জীবনের একটা গুঢ় অর্থের সাথে আমাদের ভাবনা জুড়ে দেয়া। সপ্তাহের একদুবারের বেশি সে গল্পের আসর বসত না। যখনই বসত তখন জগত সংসারের সবকিছু থেকে ছুটি নিয়ে আমাদের বাবা হয়ে যেত ঠাকুমার ঝুলি, হান্স ক্রিশ্চিয়ান এন্ডারসন, ইশপ কিংবা সুকুমার রায়। আর আমাদের মা সেই ঘরে বসে নানা সম্পর্কের সন্তানদের ভেতর সাম্য চর্চা করত। ঘরটা অনেকটাই আগের মতোই আছে কেবল নিবাসী বদলে গেছে।
আর সেই মস্ত বারন্দাটা যেটা কিনা আমাদের মুক্তাঙ্গন। আমাদের জীবনের মূল পাঠশালা। একবার আমার দুভাই চুরি গেছিল। সেই দিনটায় কি অদ্ভুত অন্ধকার ছিল সে বারান্দাটা। চার দিকে এত কোলাহল তবু কেমন মুখ থুবড়ে পড়েছিল সময় সেই বারান্দায়। আমার মা নিঃশব্দে কাঁদছিল আমার বাবা চুপচাপ সন্তান ফিরে পাবার পথ খুঁজে যাচ্ছিল। অনেক রাতে এক ভদ্রলোক আমার ভাইদের বাড়ি ফিরিয়ে দিয়ে গেছিল। চারপাশের মানুষ সে মানুষটাকেই ছেলেধরা ভেবে মারতে গেলে আমার দুভাই তাদের ছোট ছোট হাত তুলে বাধা দিতে গেছিল। সেদিনের সেই রাত শেষে কারা যেন ছেলেধরাকে ধরে এনে আমাদের পেছনের উঠোনের বড় আম গাছটার সাথে বেঁধে মারতে শুরু করেছিল। শোবার ঘর থেকে ছুটে এসে সেই বারান্দায় দাঁড়িয়ে আমার বাবা কঠিন গলায় বলেছেন- থাম। সেই ‘থাম’ শব্দটার ভেতর কী যে ছিল জানি না, সবাই চুপচাপ সরে দাঁড়িয়েছিল। সেদিন সেই দুপুরে এক থালা ভাত চামচ কেটে ছেলেটাকে যে খাইয়ে দিয়েছিল সে আমাদের বাবা। বারান্দায় দাঁড়িয়ে সে অদ্ভুত দৃশ্য দেখতে দেখতে যে মানবিকতার পাঠ আমরা নিয়েছি তার সাক্ষ্য বহন করে সেই খোলা বারান্দাটা। এইখানেই আমার প্রথম রবি ঠাকুরের গানের সাথে পরিচয়। পাশের বাসার ক্যাসেট প্লেয়ারে রোজ সকালে আকাশ ভরা সূর্য-তারা শুনতে শুনতে আমাদের দিনের শুরু হতো। সারাদিন সেই সুরের আবেশ জড়িয়ে হাওয়া খেলে যেত আমাদের পেছনের বারান্দায়।
অনেক অনেক বছর পেরিয়ে এসে পুরনো বাড়ির গল্প বলতে আজ যে আমি পাঠকের দরজায় দস্তখৎ দিচ্ছি তার গল্প লিখবার ইচ্ছের বুনিয়াদ সেই একই বারান্দায়। যেখানে বহুকাল আগে অন্ধ মতলুব জ্যাঠা লাঠি ঠুকে ঠুকে এসে বসতেন এক কাপ চা খাবেন বলে। এক কাপ চা তার আসবার কারণ বলে আজ আর মনে হয় না। মতলুব জ্যাঠা আসলে আসতেন গল্প বলতে। অন্ধ চোখ দুটো শূন্যে মেলে দিয়ে উনি মুখে মুখে গল্প তৈরি করতেন। শুনুক বা না শুনুক কেউ তবু তিনি ঘন্টা খানেক সেই গল্পের ঝাঁপি খুলে বসে থাকতেন। গল্প বলা শেষ করে চায়ের কাপটা সরিয়ে নিতে বলে আস্তে আস্তে আবার ফিরে যেতেন। মুখে মুখে গল্প ফেরি করা মানুষগুলো আর নেই কোথাও। কিন্তু এই এই সব মুখে-মুখে ফেরা গল্পের পুটুলি হাতে ঠাকুর বাড়িতে সংসার করতে গেছিলেন রবি ঠাকুরের স্ত্রী। তার মুখ থেকে শোনা সেই গল্পের ঝাঁপি নিয়েই অবন ঠাকুরের ক্ষীরের পুতুল। গল্প লিখিয়ে হয়ে উঠব কিনা সে জানা নেই কিন্তু জানি এই যে লিখবার জন্যে প্রাণ ব্যাকুল হয়ে থাকে, নিজের ভেতরের জমা হতে থাকা নানান স্মৃতির ঝাঁপি গল্পের ছলে লিখতে ইচ্ছে করবার মন মতলুব জ্যাঠার কাছে থেকে সেই পুরোনো বারান্দায় বসে একটু একটু করে চুরি করা।
৮৮ হোল্ডিং নাম্বারের সেই বাসাটা চমক-ধমক বিশেষ ছিল না কিন্তু ভারি একটা সুশ্রী ছাঁদ ছিল চৌচালা বাড়িটার। এখনও তেমনি আছে কেবল আগের চাইতে মলিন হয়েছে তার শ্রী। পেছনের উঠোনটা আর নেই, ওখানে এখন দু অংশীদারের নড়বড়ে সীমানা পাঁচিল। নীলের চাটাই মোড়ান বসার ঘরে এখন আর কোলাহল নেই। দুপাশের শোবার ঘরগুলোতে এখন নানান হিসেব নিকেশে বাধা সংসারী মানুষে দিন শেষের ঘুম জড়ানো চোখ আগামীকালের অংক কষে। খোপকাটা ছোট জানালাগুলোতে আকশের বদলে বাহারি দালানকোঠার সারিবদ্ধ অবস্থান। আর সেই পুরনো ছাতিম গাছ এখনও সে আছে। হেমন্তের সন্ধ্যায় তার বুনোগন্ধের ভেতর এখনও সে ব্যাথা ভোলায় ব্যথা জাগায়। কামিনী গাছের বিরহ ভোলাতে এই ছাতিম গাছটাই একদিন বুক পেতে দিয়েছিল।
প্রবাসী হয়ে উঠবার বেশ কিছুদিন পরেও আমাদের বাড়িমুখি মন আমায় অস্থির করে দিত। কখনো টেঙিতে চড়বার দরকার হলে টেঙি চালককে আমি গোটা বাংলায় বলতাম আলকরণ যাব। চালক অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে ফিরে যেত।সারাক্ষন বুকের তলায় মন কেমন করা হাওয়া নিয়ে ঘুড়ে বেড়ানো আমাকে সান্তনা দিত মার্গারেট। আমার ৯৬ বছর বয়সি বন্ধু। জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে সে আমার বাড়ি ফিরবার ব্যাথার ওপর মলম লাগাত। বলত ইটকাঠে তৈরি ঘরটাই নাকি বাড়ি নয়। বাড়ি হয় মনের ভেতর, যেখানে সে তার সকল প্রিয়র সাথে বাস করে। ওর এই সব কথায় কত কত দিন স্বস্তি কুড়িয়েছি। কিন্তু তারপরেও সেইমনে মনে ফিরেছি সেই ইটকাঠের বাড়ির দরজায়। কেননা আমার এই মধ্যবিত্ত মন মনন এবং আমার বেড়ে উঠবার যাবতীয় রসদের ভাঁড়ার ঘর আমাদের সেই পুরনো বাড়ি। আজও যখন সেখানে ফিরি সেখানকার হাওয়ায় আমার ছেলেবেলার সুর বাজে। ছায়াছবি চলতে থাকে সেইসব দিনের যেখানে আমার মন বাধা আছে এই জন্মের মতো। পুরনো বাড়ির সামনে দিয়ে এখনও যখন নতুন বাড়িতে ফিরি তখন পুরনো বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে আমারই শৈশব গায় ‘পুরানো জানিয়া চেওনা চেওনা আমারে আধেকো আঁখির কোণে।’

x