দুর্নীতি প্রতিরোধে রাজনৈতিক সচেতনতার পাশাপাশি জনগণের সচেতনতা জরুরি

শনিবার , ২৯ জুন, ২০১৯ at ১০:৩৪ পূর্বাহ্ণ
74

সম্প্রতি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশ (টিআইবি) ‘জনপ্রশাসনে শুদ্ধাচার: নীতি ও চর্চা’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তাতে বলা হয়েছে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়লেও দুর্নীতি কমার কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। রাজধানী ঢাকার ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে তাদের কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে জনপ্রশাসনের নিয়োগ, পদোন্নতি, ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা), চুক্তিভিত্তিক নিয়োগসহ বিভিন্ন বিষয়ের তথ্য তুলে ধরা হয়।
টিআইবির কর্মসূচি ব্যবস্থাপক প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে বলেন, রাজনৈতিক ও অন্যান্য প্রভাবের কারণে জাতীয় শুদ্ধাচারের কোনো কোনো কৌশলের চর্চা ফলপ্রসূ হচ্ছে না। প্রশাসনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তিনি বলেন, শুদ্ধাচার কৌশলে জনপ্রশাসন সম্পর্কিত ১১টি কৌশলের মধ্যে পাঁচটি কৌশলের চর্চা সন্তোষজনক। তিনটি কৌশলের চর্চা এখনো শুরুই হয়নি। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় জনপ্রশাসনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের প্রবণতা বেড়েছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে যোগ্যতা নয়, ক্ষমতাসীনদের পছন্দ প্রাধান্য পাচ্ছে। তবে প্রতিবেদনে শুদ্ধাচার কৌশলের কিছু কিছু অগ্রগতির চিত্রও তুলে ধরা হয় গবেষণায়।
অনুষ্ঠানে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, জনপ্রশাসনে শুদ্ধাচারের অবস্থাটি মোটামুটি মিশ্র। কিছু ক্ষেত্রে লক্ষণীয় অগ্রগতি আছে। কিছু কিছু উদ্যোগ নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব আছে। আবার কিছু কিছু উদ্যোগ শুরুই হয়নি।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন বলেছেন, দুর্নীতি এখন জাতীয় ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে যে কারণে সমাজে বৈষম্য তৈরি হওয়া ছাড়াও রাষ্ট্রীয় উন্নয়নকে ব্যাহত করছে।
আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী দিবস উপলক্ষে এক অনুষ্ঠানে প্রধান বিচারপতি বলেছিলেন দুর্নীতিকে না বলে এবং দুর্নীতিবাজদের সামাজিকভাবে বয়কটের মাধ্যমে দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে। দুর্নীতি প্রতিরোধে দেশের তরুণদের এগিয়ে আসার আহ্‌বান জানিয়ে তিনি প্রশ্ন করেন দেশের বিদ্বান ব্যক্তিগণ লোভী হলে, দেশের নেতৃবৃন্দ ঐশ্বর্যের পেছনে ছুটলে, দেশের ব্যবসায়ীগণ অসাধু হলে, দেশের প্রশাসন এবং ন্যায়দণ্ডধারী বিচারকগণ দায়িত্বহীন হলে দেশ এবং দেশের নিপীড়িত জনগণকে কে রক্ষা করবে।
আসলে বর্তমানে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিষবাষ্পের মতো ছড়িয়ে পড়েছে দুর্নীতি। সর্বগ্রাসী দুর্নীতির কবলে আজ বিপন্ন মানবসভ্যতা। সর্বনাশা এই সামাজিক ব্যাধির মরণ ছোবলে বর্তমান সমাজ জর্জরিত। সর্বোচ্চ প্রশাসন থেকে শুরু করে দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, শিক্ষানীতি, সংস্কৃতি, শিল্প-বাণিজ্যসহ সর্বত্রই চলছে দুর্নীতি। তাই বিশেষজ্ঞরা দুর্নীতিকে জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম প্রধান অন্তরায় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
কলাম লেখক খায়রুন নাহার লিপি দুর্নীতি প্রতিরোধে করণীয় শীর্ষক এক লেখায় বলেছেন, বাংলাদেশের সমাজজীবনে অনৈক্য, হিংসা, দলাদলি, কোন্দল, স্বার্থপরতা, অবিশ্বাস এবং চরম দুর্নীতি বিরাজ করছে। দুর্নীতি আজ রাজনীতি, প্রশাসন, অর্থনীতি, সামাজিক, ধর্মীয় ও ব্যক্তি জীবনের সব ক্ষেত্রে বিরাজ করছে। এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও তা থেকে বাদ যায়নি। দুর্নীতিমুক্ত সমাজ সবার কাম্য। দুর্নীতি উন্নয়ন পরিকল্পনাকে ব্যর্থতায় পর্যবসিত করে এবং জনগণের সম্পদকে ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করার প্রবণতা জাগায়। দুর্নীতি ও বিভিন্ন অপরাধের ক্ষেত্রে যারা প্রভাব বিস্তার করে তারা সেই প্রভাব স্বীকার করে না। এই দুর্নীতিপরায়ণ অবস্থা কোনো নীতিকথা ও তথাকথিত সামাজিক বয়কটে পরিবর্তন হবে না। বর্তমান যুগে অপরাধের ধারা বদলে গেছে। গত কয়েক বছর ধরে ভিওআইপির সাহায্যে কতিপয় কোম্পানি যে অনাচার করে এসেছে, প্রশাসন তাদের কেশ পর্যন্ত স্পর্শ করতে পারেনি। এসব দুর্নীতি ও অপরাধ কর্মের সঙ্গে সমাজের উচ্চ মহলের শিক্ষিত, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মদদ রয়েছে। তাদের সহায়তায় অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে বহাল তবিয়তে থাকে। তাই দুর্নীতি প্রতিরোধে রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি জনগণের সচেতনতা জরুরি বলে অনেকে মনে করেন। তাঁরা বলেন, ‘রাজনীতিবিদরা সত্যিকারে যদি চান তাহলে -তাঁরা যদি আজ বলেন যে এ মুহূর্ত থেকে বাংলাদেশে আর কোনো দুর্নীতি চলবে না তাহলে তাঁরা পারেন।’ তাঁরা সর্বগ্রাসী দুর্নীতিকে প্রশ্রয় না দিলে তার বিস্তার এতোটা ভয়াবহ হতো না। ফলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ঐক্য গড়ে তুলতে কঠিন আইন প্রণয়ন এবং আইন প্রয়োগের ওপর জোর দিতে হবে।

x