দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে হবে

বৃহস্পতিবার , ৩১ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৬:০৫ পূর্বাহ্ণ
45

বাংলাদেশে দুর্নীতি বেড়েছে। খবরটা বরাবরের মতো দুঃখজনক। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা যায়, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই)-এর ‘দুর্নীতির ধারণাসূচকে’ বাংলাদেশের অবস্থান ছয় ধাপ নেমে গেছে। বিশ্বের ১৮০টি দেশ ও অঞ্চলের ২০১৮ সালের দুর্নীতির পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে জার্মানির বার্লিনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান টিআই মঙ্গলবার এই সূচক প্রকাশ করেছে। সূচকের ঊর্ধ্বক্রম অনুযায়ী (ভালো থেকে খারাপ) বাংলাদেশের অবস্থান এবার ১৪৯ নম্বরে। গতবার ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৪৩ নম্বরে। আবার অধঃক্রম অনুযায়ী (খারাপ থেকে ভালো) বিবেচনা করলে বাংলাদেশ আগের ১৭তম অবস্থান থেকে নেমে গেছে ১৩তম অবস্থানে। ১০০ ভিত্তিতে এই সূচকে বাংলাদেশের স্কোর এবার ২ পয়েন্ট কমে ২৬ হয়েছে। এই স্কেলে শূন্য স্কোরকে দুর্নীতির ব্যাপকতার ধারণায় সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত এবং ১০০ স্কোরকে সবচেয়ে কম দুর্নীতিগ্রস্ত বা সর্বোচ্চ সুশাসনের দেশ হিসাবে বিবেচনা করা হয়। এই সূচকে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের চেয়ে বাজে অবস্থা শুধু আফগানিস্তানের। অধঃক্রম অনুযায়ী (খারাপ থেকে ভালো) আফগানিস্তানের অবস্থান এবার নবম।
দুর্নীতির এমন চিত্রে যে কেউ বিব্রত হবেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই। প্রধানমন্ত্রী গত ১৫ই জানুয়ারি জাতির উদ্দেশে ভাষণে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। বলেছেন, ‘আমি জানি, দুর্নীতি নিয়ে সমাজের সর্বস্তরে অস্বস্তি রয়েছে। দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের নিজেদের শোধরানোর আহ্বান জানাচ্ছি। আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে দুর্নীতি উচ্ছেদ করা হবে।’ যে কোন দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করার ভয়ানক এক সামাজিক ব্যাধির নাম হচ্ছে দুর্নীতি। দুর্নীতি মানে হচ্ছে অসৎ উপায়ে অন্যের সম্পত্তি নিজের বলে আত্মসাৎ করা, অযোগ্য কাউকে অর্থের বিনিময়ে কাজ পাইয়ে দেয়া, পরীক্ষায় বেশি নম্বর দিয়ে ভালো শিক্ষার্থীদের সম্ভাবনা নষ্ট করে দেয়া সহ অনেক অবৈধ উপায়। ‘সুশাসনের অবর্তমানে জবাবদিহিতাবিহীন পরিবেশে, আয়-ব্যয় ব্যবস্থাপনায় অস্বচ্ছতার অবয়বের অন্যতম প্রতিফল হলো দুর্নীতি’। দুর্নীতি শুধু ব্যক্তিবিশেষ অর্থাৎ যে দুর্নীতি করে তাকে ন্যায়নীতিহীনতার জন্য ক্ষতিগ্রস্ত করে তা নয়, তার দ্বারা সমাজকে নেতৃত্বদান বা যে কোনো ক্ষেত্রে দৃঢ়চিত্তে অবস্থান গ্রহণে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালনকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে দেয়।
অর্থনীতিবিদ ড. মইনুল ইসলাম আজাদীতে লিখেছেন, সামপ্রতিক নির্বাচনটা প্রশ্নবিদ্ধ হলেও আগামী পাঁচ বছর শেখ হাসিনাই আবারো দেশকে নেতৃত্ব প্রদান করবেন। সুযোগটাকে কাজে লাগিয়ে দুর্নীতি দমনে সর্বশক্তি প্রয়োগ করে দেশের অর্থনীতিতে অপ্রতিরোধ্য গতিসঞ্চার করাই তাঁর প্রথম অগ্রাধিকার হবে, এটাই আমাদের পরম কামনা। …বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের অনেক অনেক সুকৃতি জনগণের সুবিবেচনা পাবে, যদি দুর্নীতির বিরুদ্ধে শেখ হাসিনা সত্যিকারের কঠোর অভিযান বিশ্বাসযোগ্যভাবে পরিচালনা করেন। …দুদককে সকল সাহায্য-সহায়তা দিয়ে স্বাধীন ও কার্যকরভাবে দুর্নীতি দমনের অভিযানকে গতিশীল করে তুলতে পারলে ভবিষ্যতে অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে বারবার বিজয় অর্জন আওয়ামী লীগের পক্ষে খুবই সম্ভব মনে করি।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বাংলাদেশের দুর্নীতির পরিস্থিতি তুলে ধরতে গিয়ে বাংলাদেশের অবনমনকে ‘বিব্রতকর’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, ‘উচ্চ পর্যায়ের দুর্নীতিবাজদের বাদ দিয়ে নিম্ন ও মধ্যম সারিতে ব্যবস্থা নেয়ায়’ বাংলাদেশ আশানুরূপ উন্নতি করতে পারছে না। আমাদের দুর্নীতিবিরোধী অভিযান নিম্ন ও মধ্যম পর্যায়ে সীমাবদ্ধ। উচ্চ পর্যায়ের দুর্নীতিবাজদের দিকে আমাদের নজর দিতে হবে এখন। দল ও পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।’
দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের ক্ষেত্রে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ পদক্ষেপের বাস্তবায়ন চায় সাধারণ মানুষ। অদম্য আগ্রহ, সৃজনশীলতা এবং সুন্দর বাংলাদেশ গঠনের স্বপ্ন নিয়ে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে তাদের সর্বাত্মক অংশগ্রহণ আজ সময়ের দাবি। দুর্নীতি যে বাস্তবেই শাস্তিযোগ্য অপরাধ, সব প্রকার ভয় বা করুণার ঊর্ধ্বে গিয়ে তার দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। এ জন্য চাই দুদকের পাশাপাশি অন্যান্য জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থায় পেশাদারি ও দলীয় রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে নিরপেক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের পরিবেশ। সর্বোপরি দুর্নীতির বিরুদ্ধে সাধারণ জনগণ, গণমাধ্যম ও বেসরকারি সংগঠনের সোচ্চার ভূমিকা অপরিহার্য, যার পরিবেশ নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের। জনগণ যত বেশি সোচ্চার ও তাদের চাহিদা যত বেশি সরকার তথা ক্ষমতাবানদের প্রভাবিত করতে পারবে, তত বেশি সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতি প্রতিরোধে অগ্রগতি হবে; দুর্নীতির সূচকে বাংলাদেশের উন্নতিও হবে ততটুকুই।

x