দুর্নীতির বিরুদ্ধে নাগরিক সমাজকে ভূমিকা রাখতে হবে

সোমবার , ৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ৩:৩৬ পূর্বাহ্ণ
37

এডওয়ার্ড গিবন বলেছেন, দুর্নীতি হলো সাংবিধানিক স্বাধীনতার সবচেয়ে অভ্রান্ত লক্ষণ। অন্যদিকে, রবার্ট সি ব্রুকস বলেছেন,‘সরকারি কোষাগারের টাকা চুরি করে, সরকারি কাজ খারাপভাবে করে রাজনীতিক, ঠিকাদার, যোগানদার আর দালালদের পকেট ফুলে ফেঁপে ওঠা খুব খারাপ; তবে এর চেয়েও বেশি খারাপ রাষ্ট্রীয় কার্যাদি যথাযথ সম্পাদন ও নতুন নতুন ক্ষেত্র সম্প্রসারণের জন্য রাষ্ট্রের হাতে প্রয়োজনীয় তহবিল না থাকা’।
গত শনিবার ৭ সেপ্টেম্বর ঢাকায় আয়োজিত চতুর্থ দক্ষিণ এশিয়া অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক সম্মেলনের প্রথম দিনে বক্তারা দুর্নীতি রোধের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। সানেম ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে তাঁরা বলেন, জনগণের দোরগোড়ায় নাগরিকসেবা পৌঁছে দিতে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। স্থানীয় সরকারকে আরো কার্যকর করতে স্থানীয় মানুষজনকে যুক্ত করা দরকার। আর দুর্নীতি কমাতে জনগণকে সোচ্চার ভূমিকা পালন করতে হবে।
আসলে দুর্নীতি এক মহামারীর নাম। বিশ্বব্যাপী দুর্নীতিকে একটা দুষ্টক্ষত হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। গণতন্ত্র ও উন্নয়নের পথে দুর্নীতি যেমন সবচেয়ে ক্ষতিকর, তেমনি সমাজ কল্যাণ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পথে দুর্নীতি হলো এককভাবে সবচেয়ে বিপজ্জনক বাধা। সমাজের অনেক জটিলতার মতো দুর্নীতির সংজ্ঞা নির্ধারণও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিষেজ্ঞদের মতে ইচ্ছাকৃতভাবে কাজ ঠিকমতো না করা বা কোনো স্বীকৃত কর্তব্য পালনে অবহেলা কিংবা কমবেশি সরাসরি ব্যক্তিগতভাবে (নগদে বা সামগ্রীতে) সুবিধা হাসিলের মতলবে ক্ষমতার অনভিপ্রেত অনুশীলনকে ‘দুর্নীতি বোঝায়। তবে আধুনিক বিশ্বে দুর্নীতির সংজ্ঞায় সুনির্দিষ্টভাবে আরো কয়েকটি বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যেমন: বিশ্বাসভঙ্গ, সরকারি পর্যায়ে প্রতারণা, পরিকল্পিত বা ইচ্ছাকৃতভাবে জনস্বার্থের ওপরে ব্যক্তির স্বার্থকে ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া, আইনের মারপ্যাঁচ খাটিয়ে বা আইনের যৌক্তিকতা দিয়ে দুর্নীতিমূলক কাজকে আড়াল করার চেষ্টা, উচ্চ পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তিবর্গের স্বজনপ্রীতি ও তোষণ, অবৈধ সুবিধা বা লাভের জন্য যোগসাজশ, পরিকল্পিতভাবে প্রভাব খাটিয়ে জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করা ইত্যাদি।
সানেম ও বিশ্বব্যাংকের সম্মেলনে বক্তারা বলেছেন, শুধু আর্থিক ব্যবস্থা বিকেন্দ্রীকরণ করলেই যে দুর্নীতি কমে যাবে তা নয়। আর্থিক খাতের বিকেন্দ্রীকরণের পাশাপাশি প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। এছাড়া নাগরিক সমাজকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে আরো জোরালো ভূমিকা পালন করতে হবে। অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেছেন, এদেশে সব ক্ষমতা কেন্দ্রের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে। এতে নাগরিকরা শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো জরুরি সেবা থেকে বঞ্চিত হয়। স্থানীয় পর্যায়ে এসবে জবাবদিহি থাকে না। এ ছাড়া প্রকল্প নির্বাচনের ক্ষেত্রেও স্থানীয় পর্যায়ের অংশগ্রহণ থাকে না। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষক তাঁর নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন সম্মেলনে। তিনি বলেন, যেখানে স্থানীয় জনগণ দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার নয়, সেখানে দুর্নীতি বেশি হয়। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, বিহার, তেলেঙ্গানা ও কর্নাটকে দুর্নীতির মাত্রা বেশি। আবার দিল্লির মতো অঞ্চলে দুর্নীতির মাত্রা কম। ভারতে ব্যাংক খাতে দুর্নীতি কম, আবার পরিবহন খাতে দুর্নীতির মাত্রা বেশি। তবে ব্যাংক খাতে ঘুষের পরিমাণ গড়ে ২ হাজার রুপি, আর পরিবহন খাতে গড়ে ৩৫০ রুপি ঘুষ দিতে হয়।
দুর্নীতি বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আমাদের রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর রন্ধ্রে রন্ধ্রে এমনভাবে সংক্রমিত দুরারোগ্য ক্যানসারের মতো বিস্তার লাভ করছে, যা থেকে বিপজ্জনক অস্ত্রোপচারের পর আরোগ্য লাভ কষ্টসাধ্য। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সর্বত্র এই সমাজব্যাধি শক্ত শেকড় গেড়ে বসেছে। কিন্তু বিস্ময়কর সত্য হলো, এ বিষয়ে জনগণ সোচ্চার নয়। গোটা সমাজ অসম্ভব রকমের দুর্নীতিতে ছেয়ে গেলেও এর বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে উঠছে না। আমরা কেমন যেন মারাত্মক সামাজিক ব্যর্াধিতে ভুগছি। মাদকের বিরুদ্ধে বর্তমান সরকার যেভাবে ‘জিরো টলারেন্স’ প্রদর্শন করে এর মাত্রা কমানোর প্রচেষ্টা চালিয়েছে, তেমনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চালাতে হবে। প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঘাপটে মেরে বসে থাকা কতিপয় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে শাস্তির ব্যবস্থা করা গেলে এর মাত্রা কমবে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। দেশ যেভাবে উন্নতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে দুর্নীতি রোধ করা গেলে তার এগিয়ে যাওয়ার গতি আরো ত্বরান্বিত হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

x