দুর্নীতিমুক্ত ও লাভজনক করতে হবে

বিআরটিসি লোকসানি সংস্থা হলে দেশের ক্ষতি

বৃহস্পতিবার , ৪ জুলাই, ২০১৯ at ৫:২৭ পূর্বাহ্ণ
36

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্পোরেশনের (বিআরটিসি) বহরে বাস রয়েছে এক হাজার ৩৮৯টি। এর মধ্যে ৫২৫টিই অচল হয়ে বিভিন্ন ডিপোয় পড়ে আছে। অর্থাৎ বিআরটিসির বহরে থাকা বাসগুলোর ৩৮ শতাংশ অচল অবস্থায় আছে। এ অচল বাসগুলো গত ১০ বছরে কেনা। এর বাইরে ভারত থেকে কেনা হচ্ছে ৬০০ বাস, যার মধ্যে গত মে পর্যন্ত বিআরটিসির বহরে যুক্ত হয়েছে ২৫৩টি। সবক’টি নতুন বাস এলে সংস্থাটির বহরে সচল বাসের সংখ্যা দাঁড়াবে ১ হাজার ০৬৪। তখনও ২৬ শতাংশ বাস অচল অবস্থায় থাকবে। গত এক দশকে নতুন বাস-ট্রাক ক্রয়ে বিআরটিসিকে বিনিয়োগ করতে হয়েছে ১ হাজার ৬১২ কোটি টাকা। বিপুল এ বিনিয়োগের পরও লোকসান থেকে বেরোতে পারেনি রাষ্ট্রায়ত্ত পরিবহন সংস্থাটি। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বিআরটিসি লোকসান গুণেছে ২ কোটি ৯২ লাখ টাকা। পিছিয়ে রয়েছে যাত্রীসেবায়ও। লোকসানের দায় সর্বশেষ পে-স্কেলে বেতন বৃদ্ধির ওপর চাপাচ্ছেন বিআরটিসির কর্তারা। পাশাপাশি চীন ও কোরিয়া থেকে কেনা ৫৩০টি বাসের কথাও বলছেন তারা। যেগুলো বারবার নষ্ট হয়ে সংস্থাটির বোঝায় পরিণত হয়েছে। তবে ধারাবাহিক লোকসান কাটিয়ে চলতি অর্থবছর (২০১৮-১৯) মুনাফার প্রত্যাশা করছে সংস্থাটি। ২০১০ সালে চীন থেকে ২৭৫টি বাস কেনে বিআরটিসি। ওই সময় বাসগুলো কিনতে ব্যয় হয় ১১৩ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। চীনের পর ২০১১-১২ অর্থবছরে দক্ষিণ-কোরিয়া থেকে কেনা হয় আরো ২৫৫টি বাস। এগুলো সংগ্রহ করতে বিআরটিসি ব্যয় করে ২৮১ কোটি ৫১ লাখ টাকা। পত্রিকান্তরে সম্প্রতি এ খবরটি প্রকাশিত হয়। খবরে আরও বলা হয়, বিআরটিসির বহরে আর্টিকুলে টেড বাস যুক্ত হয় ২০১২ সালে। ৫৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে ৫০টি আর্টিকুলেটেড বাস কেনা হয় সে বছর। একই বছর ভারত থেকে কেনা হয় ২৯০টি ডাবল ডেকার বাস। ডাবল ডেকার বাসগুলো কিনতে ৩০৩ কোটি টাকা খরচ করে বিআরটিসি। পরের বছর (২০১৩) ভারত থেকে প্রায় ৬০ কোটি টাকায় আরো ৮৮টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাস কেনা হয়। সর্বশেষ ২০১৬ সালে ভারত থেকে ৬০০ বাস ও ৫০০ ট্রাক কেনার উদ্যোগ নেয় বিআরটিসি। এরই মধ্যে এসব বাস-ট্রাক সংস্থাটির বহরে যুক্ত হতে শুরু করেছে। ভারতের এসব বাস-ট্রাক কিনতে ৭৯৮ কোটি টাকা খরচ হচ্ছে। সব মিলিয়ে গত ১০ বছরে ২ হাজার ৫৮টি বাস ট্রাক কিনতে ১ হাজার ৬১২ কোটি টাকা ব্যয় করছে সংস্থাটি।
সিঙ্গেল ডেকার, ডাবল ডেকার, আর্টিকুলেটেড, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যানবাহন ছাড়াও বিআরটিসির পণ্য দেশের নানাস্থানে আনা-নেওয়ার জন্য ট্রাকের বহরও রয়েছে। স্বভাবত রাজধানীসহ পণ্য আনা-নেওয়া ও যাতায়াতের জন্য সারাদেশের মানুষ মনে করে যে এতে তাদের সুবিধা হয়েছে। কারণ ট্রেনের চেয়ে বাস-ট্রাকে যাতায়াত ও পণ্য পরিবহণে সময় কম লাগে এবং ভাড়াও অপেক্ষাকৃত বেশি নয়। কিন্তু এর বদলে রাষ্ট্রায়ত্ত এ সংস্থাটি বছরের পর বছর লোকসান দিয়ে যাচ্ছে এবং সেবারমানও আশানুরূপ নয় সেটা বোঝা যায়, যখন বাসে যাতায়াত ও পণ্য পরিবহন করতে হয় ট্রাকে। উল্লিখিত প্রতিবেদন মতে বিআরটিসি বহরে ১ হাজার ৩৮৯ টি বাস। তার মধ্যে ৫২৫টিই অচল হয়ে পড়ে আছে বিভিন্ন ডিপোয়। সংস্থার কর্মকর্তারা বলছেন অচল বাস সচল করার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ তাদের নেই। তারা আশা করে বসে আছেন। সরকার ত্রাতা হিসেবে আবার এগিয়ে আসবে। নতুন বাস আমদানি করবে বা ডিপোতে পড়ে থাকা অচল বাস মেরামত করে দেবে। কিন্তু আমাদের প্রশ্ন, এমন স্থায়ী লোকসানি প্রতিষ্ঠানের বোঝা আর কতদিন টানবে সরকার?
যেসব বাস রাজধানীর বিভিন্ন রুটে চলাচল করে সেগুলো চলে প্রধানত চুক্তিভিত্তিতে মর্জিমাফিক। অনেক ক্ষেত্রে পারস্পরিক যোগাযোগ ও সমঝোতার মাধ্যমে বিআরটিসির রুট বন্ধ করে দেওয়ার খবরও আছে। বিশেষ করে দূরপাল্লার অত্যন্ত লাভজনক রুটগুলোয় সাধারণ মানুষ বিআরটিসি’র বাস সেবা পায় না বললেই চলে। সবকিছু মিলিয়ে বলা যায়, রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাটি দুরারোগ্য ব্যাধিতে ভুগছে। আর এই ব্যাধিটি হচ্ছে দুর্নীতি ও অনিয়ম নামক ক্যান্সার। অযোগ্য ও অদক্ষ লোকের হাতে পড়ে মাথাভারী প্রশাসন ও অদক্ষ ড্রাইভার-হেলপারদের মাধ্যমে বছরের পর বছর ধরে ক্রমাগত লোকসান দিয়ে যাচ্ছে সংস্থাটি। বেসরকারি খাতে পরিবহন কোম্পানিগুলো যেখানে চুটিয়ে ব্যবসা করছে, সেখানে প্রচুর সংখ্যক বাস থাকা সত্ত্বেও বেড়েছে প্রতিষ্ঠানটির লোকসান। বেসরকারি খাতের যানবাহনগুলো যেখানে অনায়াসে ১০-১৫ বছর চলে, সেখানে বিআরটিসি’র বাসগুলো রাস্তায় নামানোর দু’তিন বছরের মধ্যেই জরাজীর্ণ, অকেজো বা অচল হয়ে পড়ে। প্রধানত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে। অথচ সংস্থাটির ডিপোগুলোতে যানবাহন মেরামতের ব্যবস্থা আছে। জনবলও রয়েছে। যোগ্য প্রশাসক ও দক্ষ জনবল দিয়ে পরিচালিত হলে বিআরটিসির লোকসান দেওয়ার কোনো কারণ থাকতে পারে না। বিআরটিসি নানাভাবে কর ছাড় সুবিধা পায়। রুট পারমিটও লাগে না। এমনকি রুট পারমিটের জন্য কারো সঙ্গে প্রতিযোগিতাও করতে হয় না। জনপ্রিয় রুটগুলোয় সেবা দেওয়ার একচেটিয়া সুযোগ আছে। যানবাহন রাখার জন্য কোন ভাড়া দিতে হয় না। চালানো থেকে শুরু করে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার জন্যও লোক আছে। এত কিছু থাকার পরও সংস্থাটি দিনের পর দিন লোকসান দিয়ে যাবে। তা বোঝা দুষ্কর। সংস্থাটির সুযোগসন্ধানী কর্মকর্তারাই যে এর জন্য দায়ী তাতে কোন সন্দেহ নেই। অবশ্য প্রতিষ্ঠানটির সাংগঠনিক কাঠামোতে অনেক দুর্বলতা আছে। যার বিআরটিসি সম্পর্কে কোন অভিজ্ঞতা নেই তাকেই দেওয়া হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এসব পদে এসে কর্তা ব্যক্তিরা সংস্কার উন্নয়নের বদলে নিজেদের লাভের দিকটাতেই বেশি নজর দিচ্ছেন। এমন প্রবণতা বন্ধ করতে হলে বিআরটিসিতে ব্যাপক সংস্কার করতে হবে। দুর্নীতিবাজদের শাস্তি নিশ্চিত করাও অত্যাবশ্যক। তাছাড়া ভারতের আদলে সংস্থাটিকে সাজাতে হবে। দরকার হলে পুরনোদের ছাঁটাই ও নতুন জনবল’ নিয়োগ দিতে হবে। মোট কথা বিআরটিসিকে দেশের মানুষ একটি দুর্নীতিমুক্ত লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখতে চান। সরকারকে এ বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে।

x