দুর্দিনের মাঝেও চামড়া সংগ্রহের প্রস্তুতি

এবার লক্ষ্য সাড়ে ৫ লাখ পিস

আজাদী প্রতিবেদন

রবিবার , ১১ আগস্ট, ২০১৯ at ৭:৩৪ পূর্বাহ্ণ
67

চট্টগ্রামে এবার কোরবানিতে সাড়ে পাঁচ লাখ পিস চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এখানে চামড়া শিল্পে দুর্দিন চলছে। তাই দর নিয়ে সংকটের আশঙ্কা করা হচ্ছে। এদিকে, চট্টগ্রামে দুটি ট্যানারি সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ চামড়া কিনতে পারবে। এতে করে বাকি ৮৫ শতাংশ চামড়া নিয়ে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের নির্ভর করতে হবে ঢাকার ট্যানারি মালিকদের ওপর।
এ সংকটকে পুঁজি করে ঢাকার ট্যানারি মালিকরা গত দুই বছরে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের প্রায় ৩০ কোটি টাকা আটকে রেখেছেন। বেহাল এ অবস্থার মাঝে বৃহত্তর চট্টগ্রামে আগামীকাল ঈদুল আজহায় চট্টগ্রামের আড়তদাররা চামড়া সংগ্রহের প্রস্তুতি চূড়ান্ত করেছেন।
এবার ৪ লাখ গরু, ১ লাখ ২০ হাজার ছাগল, ১৫ হাজারের মতো মহিষ এবং ১৫ হাজারের মতো ভেড়া কোরবানি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এত চামড়া কেনার মতো ট্যানারি চট্টগ্রামে নেই। চট্টগ্রামে একসময় ২২টি ট্যানারি ছিল। এখন আছে মদিনা ট্যানারি ও রিফ লেদার। এর মধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্দেশিত ইটিপি না থাকায় মদিনার কার্যক্রম বন্ধ। তবে মদিনায় ইটিপি বসানোর কাজ শেষ পর্যায়ে। এ ট্যানারি এবার চামড়া কেনার প্রস্তুতি নিয়েছে।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, চট্টগ্রামে ট্যানারি শিল্পের বেহাল দশা এবং চামড়া সংরক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় ঢাকায় গড়ে উঠেছে সিন্ডিকেট। জিনিসপত্রের দাম প্রতি বছর বাড়লেও চামড়ার দাম কেবল কমছে। ২০১৩ সালের তুলনায় চলতি বছরে চামড়ার দাম অর্ধেকের নিচে নেমে গেছে। এবার ঢাকায় লবণযুক্ত চামড়া ৪৫ থেকে ৫০ টাকা এবং ঢাকার বাইরে লবণযুক্ত চামড়া ৩৫ থেকে ৪০ টাকা দর নির্ধারণ করা হয়েছে। একটি চামড়ায় লবণ দেওয়া, শ্রমিক খরচ এবং ঢাকার ট্যানারিতে নেওয়ার সময় ‘বাদ দেওয়া’ অংশ মিলে প্রতি ফুট চামড়ায় ১৫ টাকার মতো খরচ হয় বলে জানান একাধিক আড়তদার।
ব্যবসায়ীরা জানান, প্রতি বর্গফুটে ২/৩ টাকা ব্যবসা করতে হলে একজন আড়তদারকে ১৭/১৮ টাকায় প্রতি বর্গফুট কাঁচা চামড়া কিনতে হবে। ছোট আকৃতির গরুতে ২০/২১ ফুট এবং বড় আকৃতির গরুতে ৩৫/৪০ ফুট চামড়া পাওয়া যায়। মহিষে ৩৫/৪০ ফুট এবং ছাগলে
৪ ফুটের মতো চামড়া হয়। কোরবানির সময় ছোট-বড় ও মাঝারি আকৃতির গরু কোরবানি হয়, তাই একটি পশুতে গড়ে ২৫ ফুট চামড়া হিসেব করে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। এ হিসাবে মাঝারি একটি গরুর চামড়া এবার সর্বোচ্চ ৪শ টাকা পর্যন্ত দরে আড়তদাররা কিনবেন। হিসাবটি মাথায় রেখে চামড়া কেনার জন্য মৌসুমী ব্যবসায়ীদের আহ্বান জানিয়েছেন আড়তদাররা।
চট্টগ্রামের চামড়া শিল্পের প্রায় পুরোটাই ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়ায় সংকট প্রকট হয়েছে বলে উল্লেখ করে ব্যবসায়ী ও আড়তদাররা জানান, চট্টগ্রামে পর্যাপ্ত ট্যানারি থাকলে পরিস্থিতি এমন হতো না। এখন ঢাকার ট্যানারি মালিকরা মর্জিমাফিক দর নির্ধারণ করে দেন। একইসঙ্গে চামড়ার টাকা পরিশোধের ক্ষেত্রেও নজিরবিহীন সংকট চলে। দুই বছর আগে কোরবানির সময় চামড়া বিক্রি করে এখনো টাকা পাননি অনেক আড়তদার। গত দুই বছরে চট্টগ্রামের কয়েকজন আড়তদারের অন্তত ত্রিশ কোটি টাকা ঢাকার ট্যানারি মালিকদের কাছে আটকা পড়েছে। এবার কোরবানি উপলক্ষে দুদিন আগে ঢাকার ট্যানারি মালিকরা চট্টগ্রামের আড়তদারদের টাকা পরিশোধ করেছেন। যে আড়তদার পঞ্চাশ লাখ টাকা পাবেন তাকে দেওয়া হয়েছে ১-২ লাখ টাকা। এক কোটি টাকা পাবেন এমন আড়তদারকে দেওয়া হয়েছে ৩-৪ লাখ টাকা। চট্টগ্রামের সব আড়তদারকে মিলে এক কোটি টাকা দেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। কিন্তু এরপরও চামড়া কিনে তাতে লবণ দিয়ে তা আবার ঢাকার ট্যানারি মালিকদের দিতে হবে।
গতকাল একাধিক ব্যবসায়ী বলেছেন, চট্টগ্রামে কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির ১১২ জন সদস্যের পাশাপাশি আরো প্রায় ৭৫ জন ব্যবসায়ী রয়েছেন। দুইশজনের মতো ব্যবসায়ী মূলত চট্টগ্রামের পাঁচ লাখেরও বেশি চামড়া সংগ্রহ করে লবণ দিয়ে ঢাকার ট্যানারি মালিকদের সরবরাহ করবেন।
ব্যবসায়ীরা জানান, ২০১৩ সালে দেশে গরুর চামড়া বিক্রি হয়েছিল ৯০ টাকা। অথচ ছয় বছর পর ২০১৯ সালে এসে সেই চামড়ার দর নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি বর্গফুট ৪৫-৫০ টাকায়। ২০১৩ সালে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী লবণযুক্ত প্রতি বর্গফুট খাসির চামড়ার দর নির্ধারণ করা হয়েছিল সর্বনিম্ন ৫০ আর সর্বোচ্চ ৫৫ টাকা। ছয় বছরের ব্যবধানে ২০১৯ সালে তা সর্বোচ্চ ৫০ আর সর্বনিম্ন ৪৫ টাকা। ঢাকার বাইরে এই দর চল্লিশ টাকা। বিষয়টি দুঃখজনক বলে তারা মন্তব্য করেছেন।
চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া আড়তদার সমিতির সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ মোসলেম উদ্দিন গতকাল দৈনিক আজাদীকে বলেন, গত বছরের চেয়ে চামড়া-প্রতি একশ থেকে দুইশ টাকা কমে কিনতে হবে। এর থেকে বেশি দিয়ে কিনলে লোকসান গুণতে হবে। মৌসুমী ব্যবসায়ীদের সতর্ক করে তিনি বলেন, চামড়া নিয়ে বহুমুখী সমস্যা চলছে। ইচ্ছেমতো চামড়া কিনলে পরে তা গলার ফাঁস হয়ে দেখা দেবে।

x