দুর্ঘটনা রোধে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা সময়োপযোগী ও প্রশংসাযোগ্য

বুধবার , ২৭ জুন, ২০১৮ at ৪:৩২ পূর্বাহ্ণ
65

সড়ক দুর্ঘটনা রোধে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জরুরি কিছু নির্দেশনা প্রদান করেছেন। দেরিতে হলেও তাঁর এ নির্দেশনা দেশে দুর্ঘটনা কমাতে সাহায্য করবে বলে আমরা মনে করি। সাথে সাথে আমরা তাঁকে অভিনন্দন জানাতে চাই এবং তাঁর এ নির্দেশনা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্টদের তৎপর হওয়ার জন্য আহ্বান জানাই। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনাগুলোর মধ্যে রয়েছে: গাড়ির চালক ও তার সহকারীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা; লং ড্রাইভের সময় বিকল্প চালক রাখা, যাতে পাঁচ ঘণ্টার বেশি কোনো চালককে একটানা দূরপাল্লায় গাড়ি চালাতে না হয়; নির্দিষ্ট দূরত্ব পর পর সড়কের পাশে সার্ভিস সেন্টার বা বিশ্রামাগার তৈরি; সড়কে যাতে সবাই সিগন্যাল মেনে চলেতা নিশ্চিত করা; পথচারী পারাপারে জেব্রা ক্রসিং ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং চালক ও যাত্রীদের সিটবেল্ট বাধার বিষয়টি নিশ্চিত করা। গত সোমবার সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী এ নির্দেশনা দেন।

সড়ক দুর্ঘটনা কমানোর লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর এ নির্দেশনা শুধু সময়োপযোগী নয়, প্রয়োজনীয় ও প্রশংসাযোগ্য। দূরপাল্লার গাড়িতে একটানা ৫ ঘণ্টার বেশি গাড়ি চালানোর ক্ষেত্রে যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলো, সেটাসহ অন্যান্য নির্দেশনা বাস্তবায়নে দায়িত্বপ্রাপ্ত তিন মন্ত্রীসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা পালন করতে হবে। আমরা দেখতে পাই, একমাত্র গাড়ি চালকের অদক্ষতা ও অসচেতনতার কারণে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটছে। সড়কে প্রতিদিনই নামছে মৃত্যুর মিছিল।

দেশের জাতীয়, আঞ্চলিক ও অনলাইন সংবাদপত্র সমূহে প্রকাশিত সড়ক দুর্ঘটনার সংবাদ মনিটরিং করে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি সম্প্রতি এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে দেখা গেছে, ২০১৭ সালের ১লা জানুয়ারি থেকে ৩১শে ডিসেম্বর পর্যন্ত ১২ মাসে ছোটবড় ৪,৯৭৯টি সড়ক দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। এতে সর্বমোট ২৩,৫৯০ জন যাত্রী, চালক ও পরিবহন শ্রমিক সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহত হয়েছেন। এসব দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে সর্বমোট ৭,৩৯৭ জন, আহত হয়েছে ১৬,১৯৩ জন। এর মধ্যে হাত, পা বা অন্য কোনো অঙ্গ হারিয়ে চিরতরে পঙ্গু হয়েছে ১,৭২২ জন। এইসব দুর্ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে জিডিপি’র প্রায় দেড় থেকে দুই শতাংশ। এসময় ১২৪৯টি বাস, ১৬৩৫টি ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান, ২৭৬ টি হিউম্যান হলার, ২৬২টি কার, জীপ, মাইক্রোবাস, ১০৭৪টি অটোরিক্সা, ১৪৭৫টি মোটরসাইকেল, ৩২২টি ব্যাটারী চালিত রিক্সা, ৮২৪টি নছিমন করিমন দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। সংঘটিত দুর্ঘটনার ৪২.৫ শতাংশ পথচারীকে চাপা, ২৫.৭ শতাংশ মুখোমুখি সংঘর্ষ, ১১.৯ শতাংশ খাদে পড়ে, .৮ শতাংশ চাকায় ওড়না পেছিয়ে সংঘটিত হয়।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সাম্প্রতিক গবেষণাতেও সড়ক দুর্ঘটনার সবচেয়ে বড় শিকার হিসেবে পথচারীদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পথচারীদের একটা বড় অংশই আবার স্কুলগামী শিক্ষার্থী। সড়ক দুর্ঘটনার কারণ ও নিহত ব্যক্তিদের পরিচয় পর্যালোচনা করে দেখা যায়, মূলত ফিটনেসবিহীন যানবাহন ও বেপরোয়া গতির কারণে দুর্ঘটনা বেশি ঘটছে। এর ফলে পথচারী এবং যাত্রীরা সবচেয়ে ঝুঁকির মধ্যে পড়ছেন। আসলে বিশেষজ্ঞদের মতে সড়ক দুর্ঘটনার কারণসমূহ হলো: বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালনা, বিপজ্জনক অভারটেকিং, রাস্তাঘাটের নির্মাণ ত্রুটি, ফিটনেস বিহীন যানবাহন, যাত্রী ও পথচারীদের অসতর্কতা, চলন্ত অবস্থায় মোবাইল বা হেড ফোন ব্যবহার, মাদক সেবন করে যানবাহন চালানো, মহাসড়ক ও রেলক্রসিংয়ে ফিডার রোডের যানবাহন উঠে পড়া, রাস্তায় ফুটপাত না থাকা বা ফুটপাত বেদখলে থাকায় রাস্তার মাঝ পথে পথচারীদের যাতায়াত।

মোটরযান আইন অনুসারে, একজন পেশাদার চালক টানা পাঁচ ঘণ্টার বেশি যানবাহন চালাতে পারবেন না। এর বেশি চালাতে হলে অবশ্যই আধা ঘণ্টার বিরতি দিতে হবে। তবে কোনোভাবেই দিনে আট ঘণ্টার বেশি যানবাহন চালাতে পারবেন না। কিন্তু চালকদের অনেকে টানা ১২১৬ ঘণ্টাও যানবাহন চালাচ্ছেন।

এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় সড়কে আসতে পারে শৃঙ্খলা। সড়ক ব্যবস্থাপনায় আসতে পারে নতুন আশাবাদী চিত্র। আমাদের মানতেই হবে যে, কেবল চালকদের কারণেই প্রতিদিন লাশের মিছিল দেখতে হয়। তাদের লাগাম ধরার কেউ ছিল না। বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোর কারণে তারা অনেক সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। আবার অনেক সময় চোখে ঘুম নিয়ে গাড়ি চালিয়ে দুর্ঘটনায় পতিত হয়। এজন্য এরকম কঠোর একটা নির্দেশনা প্রদান করা জরুরি ছিল। সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আন্তরিক হলে এ নিদের্শনার বাস্তবায়ন কঠিন হবে না।

x