দুর্গম পাহাড়ে সবুজের আলো ছড়াচ্ছে ‘তরুপল্লব’

সুনীল বড়ুয়া : রামু

সোমবার , ৪ মার্চ, ২০১৯ at ১০:৪৭ পূর্বাহ্ণ
73

বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার সোনাইছড়ির দুর্গম উপজাতীয় গ্রাম বৈদ্যপাড়া। এলাকাটি বান্দরবানের হলেও পার্শ্ববর্তী কক্সবাজারের রামু উপজেলা থেকে দুরত্ব মাত্র ৫-৭ কিলোমিটার। রামু থেকে পূর্বরাজারকুল-মনিরঝিল সড়ক দিয়ে সোনাইছড়ি যেতে যতদূর চোখ যায় দুইপাশে চোখে পড়ে শুধু তামাক আর তামাক। সেই তামাকের রাজ্যেই এখন হাতছানি দিচ্ছে অসাধারণ সবুজের সমারোহ। দুর্গম এই পাহাড়ি জনপদে সবুজের আলো ছড়াচ্ছে‘তরুপল্লব’ নামের সমন্বিত একটি খামার।
যে খামারে আছে, বিশ্বের সেরা অন্তত ১৩ জাতের আম গাছ, চার জাতের লেবু, দুই জাতের ড্রাগনছাড়াও পেয়ারা, সফেদা, আমড়া, কমলা, মালটা, লিচুসহ প্রায় ১২জাতের সুস্বাদু পুষ্টিকর ফলের গাছ। আছে মাছের পুকুর,এছাড়াও খামারে পরীক্ষামূলকভাবে শুরু করা হয়েছে দেশী মুরগীর চাষ।
উদ্যোক্তারা জানালেন, খামারের ফলদ গাছের বেশিরভাগই সংগ্রহ করা হয়েছে ময়মনসিং কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকা ও কক্সবাজার ব্র্যাক নার্সারী থেকে। যেখানে রাসায়নিক সারের পরিবর্তে জৈবসার ব্যবহার করে সম্পূর্ণ অর্গানিক উপায়ে উৎপাদন করা হচ্ছে নানা রকম সুস্বাদু ফল।
সমপ্রতি খামারটি পরিদর্শনে গিয়ে দেখা গেল, অন্য রকম একটি দৃশ্য। বাগানের প্রায় ৫০ থেকে ৬০টি উন্নত জাতের থাই পেয়ারা গাছে ঝুঁলছে বড় বড় পাকা পেয়ারা। এক একটির ওজনও ৩০০-৪০০ গ্রাম। নানা রকম পাখি গাছের ডালে বসে মনের সুখে পেঁয়ারা খাচ্ছে। এমনকি প্রতিটি গাছেই খাওয়ার উপযোগী পাকা পেঁয়ারা থাকলেও তা সংগ্রহ করা হচ্ছে না।
খামারের উদ্যোক্তা পুলক বড়ুয়া জানালেন, প্রায় ১৫ রকম ফল গাছের সাখে এই খামারে উন্নত বাউ-৫ জাতের ৫৫-৬০টি পেয়ারা গাছ আছে। যে গাছগুলো লাগানো হয়েছে মূলত পাখিদের জন্য। পাখিরা খাওয়ার পর,বাকি থাকলে পাশের উপজাতীয় গ্রামগুলোতে গর্ভবতী মা ও শিশুদের বিনামূল্যে দেওয়া হয়। এর পরেও থাকলে সেগুলো বিক্রি করা হয়’।
পুলক বলেন, প্রকৃতি প্রেমী আমাদের এক বন্ধূ ঢাকা ‘মধুপোক’ প্রকাশনীর স্বত্ত্বাধিকারী,সর্বজন পত্রিকার সম্পাদক আবুল খায়ের মোহাম্মদ আতিকুজ্জামানের অনুপ্রেরণা এবং সহযোগিতায় এই খামারে পাখির অভয়ারণ্য গড়ে তোলার পাশাপাশি দুর্গম এই জনপদে গর্ভবতী মা ও শিশুদের পুষ্টি চাহিদা পূরণের লক্ষে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এমনকি বছর তিনেকের মধ্যে এই খামারে এখন নানা রকম পাখি আসা শুরু করেছে। বিশেষ করে সকালে ঘুঘু, বুলবুলি, বাঁবুই,শালিক, টিয়া, পানকৌড়ির গুঞ্জনে খামারে অনন্য রকম আবহের সৃষ্টি হয়।
খামারটির আম বাগানে গিয়ে দেখা গেল, প্রতিটি গাছ মুকুলে ছেয়ে গেছে।সবুজের মাঝে উঞ্চতা ছড়াচ্ছে হলদে মুকুল।
উদ্যোক্তারা জানান,বর্তমানে এই খামারে বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত জাতের আম আলফনসো, নাম ডকমাই,বাউ-১৪ (বেনানা ম্যাংগো), মল্লিকা, হিম সাগর, আম্রপালি, হেইডেনসহ অন্তত ১৩ জাতের গাছ আছে। এছাড়াও আছে কলম্বো, জারা, বীজশূন্যসহ চার জাতের ১হাজার ১০০ লেবু গাছ, বারি ও বাউ প্রজাতীর ১৫০টি ড্রাগন, ১০০টি কমলা ও মালটা এবং ১৬টি সফেদাসহ ১৫ রকমের ফলের গাছ। মাছের পুকুর। ৯টি দেশি মুরগী ও ১টি মোরগ নিয়ে পরীক্ষামূলকভাবে শুরু করা হয়েছে দেশি মুরগীর চাষ।
খামারের উদ্যোক্তা কারিগরী সমন্বয়ক পুলক বড়ুয়া লোকালয়কে জানান, বর্তমানে এই খামারে ২ থেকে ৫ বছর বয়সী ১২০টি আমগাছ থেকে ১ মেট্রিক টন ফল পাওয়া যায়। তিন বছর পরে গাছগুলো পরিণত হলে অন্তত ১০ মেট্রিকটন আম সংগ্রহ করা যাবে। আর ১১শ লেবু গাছ এখন প্রায় দুই লাখ লেবু পাওয়া গেলেও তিন বছর পরে এ সংখ্যা হবে দ্বিগুণ। আশা করছি আগামী তিন বছরে এ খামার থেকে বছরে ১২ থেকে ১৫লাখ টাকা আয় করা সম্ভব হবে।
‘খেত-খামারে রাসায়নিক সার ব্যবহারের ফলে জমি দিন দিন পুষ্টিগুণ কমে যাচ্ছে। ফলের গুণগতমান হ্রাস পাচ্ছে, প্রাকৃতিক বিশুদ্ধতা হারাচ্ছে। এমনকি দীর্ঘদিন রাসায়নিক সার ব্যবহারের কারণে ক্ষেত-খামারের আশে পাশের পুকুরগুলোতে ছোট মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্র নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এইসব বিষয় মাথায় রেখে এই খামারে রাসায়নিক সারের পরিবর্তে ৯৫ ভাগ জৈব সার- গোবর, সরিষার খৈল, ধানের খড় ব্যবহার করা হচ্ছে। উদ্দেশ্য একটাই অর্গানিক পদ্ধতিতে বিশুদ্ধ পুষ্টিকর ফল উৎপাদন। যোগ করেন খামারটির উদ্যোক্তা ও টেকনিক্যাল সমন্বয়কারী পুলক বড়ুয়া।
যেভাবে শুরু : ২০১৪ সালে তিন বন্ধু পুলক বড়ুয়া,অগ্রণী ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার কাজল বড়ুয়া ও ব্যবসায়ী তাপস বড়ুয়া মিলে প্রথমে দুই একরের একটি জমি বর্গা নেন। প্রথম বছর ৬০টি স্থানীয় জাতের পেঁপে, ১ হাজার লেবুর চারা এবং অর্গানিক উপায়ে শীতকালীন সব্জির খেত দিয়ে খামারের যাত্রা শুরু করেন তারা। খামারে ঘেরা-বেড়া, অবকাঠামো নির্মাণসহ সবমিলে খরচ হয় প্রায় ১০লাখ টাকা। শুরুতেই পেঁপের অভাবনীয় ফলন হয়েছে। একটি পেঁপের ওজনও হয়েছে সবোর্চ্চ ৫ কেজি ২৫০গ্রাম। পেঁপে চাষে সাফল্যের জন্য প্রথম বছরই বান্দরবান জেলা কৃষি বিভাগ পুরুস্কৃত করে তাদের। কিন্তু পর পর দুই বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগের রোষানলে পড়ে প্রায় ধ্বংস হয়ে যায় পেঁপে বাগান। প্রায় ১ মেট্রিকটন পেঁপে নষ্ট হয়ে যায়।
পুলক বড়ুয়া জানান,শুরুতেই বড় হোঁচট খেলেও আমরা হাল ছাড়িনি। পরবর্তীতে পৈতিৃক সম্পত্তি বন্ধক দিয়ে এবং বন্ধু বান্ধবের কাছ থেকে ধার নিয়ে আরো দশলাথ টাকা সেই খামারে বিনিয়োগ করি। সেই থেকে প্রায় পাঁচ বছর কঠোর পরিশ্রমের এবং পরিচর্যার পর খামারের আজ এই অবস্থা। তিনি বলেন, মূলত তিনবন্ধু মিলে এই খামার শুরু করলেও শুরু থেকেই আজ পর্যন্ত আর্থিক সহায়তাসহ আমাদের নানাভাবে সহযোগিতা দিয়ে আসছে ঢাকার বন্ধু আবুল খায়ের মোহাম্মদ আতিকুজ্জামান।
প্রকৃতি প্রেমী ও ঢাকা মধুপোক প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী আবুল খায়ের মোহাম্মদ আতিকুজ্জান রাসেল মুঠোফোনে লোকালয়কে বলেন, খামারে প্রতিটি গাছ এখন কথা বলে। খামারের ফলবান গাছের সঙ্গে কথা বলতে আর নানা রকম পাখির কলরব শুনতে সুযোগ পেলেই ঢাকা শহরের এই যান্ত্রিকতা ছেড়ে সেখানে চলে যাই। ওখানে গেলে প্রকৃতির স্বর্গে আছি বলে মনে হয়।
তিনি বলেন, খামারের উদ্যোক্তা পুলক বড়ুয়া শুধু প্রকৃতির জন্য নয়,মানুষের জন্য যে মানবিকতা দেখিয়ে চলেছেন,তা এই সময়ে বিরল দৃষ্টান্ত । আমি জেনে অবাক হয়েছি অন্তত একহাজারের বেশি গরিব,অসহায়,দুস্থ রোগীকে রক্ত দিয়ে জীবন বাঁচিয়েছেন। দীর্ঘ দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি এ মানবিক কাজটি করছেন। তাঁর কাছে জাতি-গোত্র কোন বিষয় নয়, যে কোন অসহায়,গরীব মানুষের অসুস্থতার খবর শুনলেই নিজের পকেটে না থাকলে অন্যজনের কাছ থেকে টাকা ধার করে তিনি ছুটে যান। এ ধরনের মানবিকতার দৃষ্টান্ত এই সময়ে সত্যিই বিরল।
স্থানীয় সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা যা বললেন : স্থানীয় বানিয়া ঝিরি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক উছিংমং জানান, এক সময় ওই জমিটি ঝোঁপ ঝাড়ে ঘেরা ছিল। ভূতের ভয়ে কেউ ওইদিকে যেতে চাইতো না। এখন জায়গাটি মানুষের দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে। যে খামারটি দেখার জন্য দূর দূরান্ত থেকে মানুষ আসছে।
নাইক্ষ্যংছড়ি সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান তসলিম ইকবাল চৌধুরী বলেন, আমি বেশ কয়েকবার ওই খামারে গিয়েছি। সোনাইছড়ির মতো দুর্গম জনপদে,তামাকের রাজ্যে এই খামারটি এখন সবুজের আলো ছড়াচ্ছে। রাসায়নিক সার ব্যবহার না করেও প্রতিটি ফলের গাছ এতটা সুন্দরভাবে বেড়ে উঠছে তা না দেখলে বোঝা যাবেনা।
তিনি বলেন, সোনাইছড়িকে ঘিরে সরকার অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে। এটি হয়ে গেলে এই খামারকে ঘিরে এই সোনাইছড়িতেই পর্যটনের অপার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
রামু সরকারি কলেজের দর্শন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ইজ্জত উল্লাহ বলেন, মাত্র কদিন আগেই আমি এই খামারটি ঘুরে এসেছি। রামু থেকে যাওয়ার পথে যতদূর দেখেছি শুধু তামাক আর তামাক খেত। তামাকের রাজ্যে এই যে সুন্দরের হাতছানি মুগ্ধ হবার মত । সবচেয়ে বেশি প্রাণিত হয়েছি তাদের পাখি প্রেম আর মানুষের প্রতি মানবিকতা এবং মমত্ববোধ দেখে। বর্তমান সময়ে এ ধরনের মানবিক দৃষ্টান্ত সত্যিই বিরল’।
নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা কৃষি বিভাগের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা সুলাল বড়ুয়া বলেন, কৃষি সেক্টরে পুলক এখন পুরো উপজেলার মডেল ব্যক্তি। তার দেখাদেখিতে ওই এলাকার অনেক তামাক চাষী তামাক ছেড়ে ফলজ বাগান করছেন। আরো শত শত মানুষ উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন ফলজ বাগানের দিকে। কঠোর পরিশ্রমের কারণে এটি সম্ভব হয়েছে। তাদের এই চেষ্টা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে এটি বাংলাদেশের একটি মডেল সমন্বিত খামারে পরিণত হবে। পাশাপাশি এই খামার থেকে আয় হবে লাখ লাখ টাকা।
তিনি বলেন, উচ্চ পদস্থ সেনা কর্মকর্তা, কৃষি বিভাগের উপ-পরিচালক, সহকারী পরিচালক,উপজেলা কৃষি অফিসারসহ যারা এ খামারটি পরিদর্শন করেছেন সবাই মুগ্ধ হয়েছেন। এছাড়াও কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে নিয়মিত পরামর্শ এবং সহযোগিতা অব্যাহত রেখেছেন বলেও তিনি জানান।

x