দুদকের নজরদারিতে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাসান আকবর

শুক্রবার , ১১ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৪:১৫ পূর্বাহ্ণ
320

দেশের আমদানি রপ্তানি বাণিজ্যের প্রবেশদ্বার এবং রাজস্ব আয়ের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র চট্টগ্রাম কাস্টমস দুদকের নজরদারিতে। আন্তর্জাতিক শিপিং বাণিজ্যসহ দেশের সার্বিক ব্যবসা বাণিজ্য ও উন্নয়ন কর্মকান্ডকে গতিশীল রাখতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কাস্টমসকে দুর্নীতিমুক্ত করার মিশনে নেমেছে। চট্টগ্রাম কাস্টমসের অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে দুদকে অভিযোগের পাহাড় গড়ে উঠেছে বলে জানা গেছে। গতকাল প্রথম দফায় অভিযানে এক কর্মকর্তাকে ছয় লাখ নগদ টাকাসহ গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ভবিষ্যতে আরো ঝটিকা অভিযানের প্রস্তুতি রয়েছে । পুরো কার্যক্রম দুর্নীতি দমন কমিশনের ঢাকাস্থ সদর দফতর থেকে মনিটরিং করারও সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। চট্টগ্রাম বন্দর ও কাস্টমসের মাধ্যমে আমদানি-রপ্তানির নব্বই শতাংশ কার্যক্রম পরিচালিত হয়। একইসাথে দেশের আন্তর্জাতিক শিপিং বাণিজ্যের সিংহভাগ পরিচালিত হয় চট্টগ্রাম থেকে। দেশে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকার পণ্য আমদানি হয়। আর প্রতিটি চালানের সাথে জড়িত শুল্ক। দেশে সর্বমোট ২ লাখ কোটি টাকার মতো রাজস্ব আয় হয়। এর মধ্যে গত বছর চট্টগ্রাম কাস্টমস এককভাবে যোগান দিয়েছে ৪২ হাজার ৩৪৪ কোটি টাকা। যা দেশের অভ্যন্তরীণ সম্পদ হিসেবে জাতীয় বাজেটে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। একই সাথে দেশের সার্বিক উন্নয়নেও এই টাকা বড় ধরনের ভূমিকা রাখে। কাস্টমসের বিভিন্ন পর্যায়ে পরিচালিত দুর্নীতি দেশের রাজস্ব আয়ের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট নানা পন্থায় শুল্ক ফাঁকি দেয়। আবার অনেক সময় কাস্টমসের পদে পদে হয়রানির ঘটনাও ঘটে। চট্টগ্রাম কাস্টমস সম্পর্কে এ ধরনের শত শত অভিযোগ দুর্নীতি দমন কমিশনে জমা হয়েছে। এসব অভিযোগের বেশ কিছু খতিয়ে দেখতে শুরু করেছে দুদক। দুদকের পক্ষ থেকে গোপনে অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে। শিপিং এজেন্ট, সিএন্ডএফ এজেন্টসহ বন্দর ও কাস্টমস ব্যবহারকারীদের হয়রানি করেন এমন কর্মকর্তাদের একটি তালিকাও তৈরি হচ্ছে। জাহাজের ছাড়পত্র, পণ্যের চালান খালাসকরণ, বিভিন্ন ধরনের কেমিক্যাল পরীক্ষা করা, কাঁচামাল পরীক্ষাসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে আমদানিকারকদের হয়রানি করা হয়। আদায় করা হয় লাখ লাখ টাকা। অপরদিকে বিভিন্ন অসাধু সিন্ডিকেট তৈরি করে টাকা হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে। গোপনে অনুসন্ধান করে এ ধরনের কর্মকর্তা-কর্মচারিদের চিহ্নিত করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে চাকরি থেকে সাসপেন্ড করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পরবর্তীতে এসব কর্মকর্তার সম্পদের খোঁজও করবে দুদক। দুদকের ঢাকাস্থ সদর দফতরের এনফোর্সমেন্ট ইউনিট পুরো বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে।
জাহাজের ছাড়পত্র দেয়ার ক্ষেত্রে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে গতকাল এনফোর্সমেন্ট ইউনিটের প্রধান সমন্বয়ক ও দুদকের মহাপরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ মুনীর চৌধুরী বিশেষ একটি টিম চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজে প্রেরণ করেন। কাস্টমস হাউজে অবস্থান করে টিমের সদস্যরা চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের কর্মকর্তা নাজিম উদ্দিন আহমেদের বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য প্রমাণ পান। বিষয়টি তাৎক্ষণিক দুদকের মহাপরিচালককে জানানো হলে তিনি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে কথা বলেন এবং নাজিম উদ্দীনকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করতে বলেন। দুদকের নির্দেশনায় নাজিম উদ্দীনকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। অভিযানের এক পর্যায়ে দুদক টিমের সদস্যরা নাজিম উদ্দীনের কক্ষের স্টিলের আলমারি তল্লাশি করে নগদ ছয় লাখ টাকা পান। টাকার ব্যাপারে কোন সদুত্তর দিতে না পারায় দুদক টাকাসহ নাজিম উদ্দীনকে গ্রেপ্তার করে।
গতকাল দুদকের মহাপরিচালক মোহাম্মদ মুনীর চৌধুরী দৈনিক আজাদীকে বলেন, আমরা নাজিম উদ্দীনের সম্পদের খোঁজ করবো। শুধু একজন নাজিম উদ্দীনই নন, আরো যারা আছে তাদেরও খুঁজে বের করা হবে। তিনি বলেন, দেশের আমদানি রপ্তানি বাণিজ্যের প্রবেশদ্বার এবং রাজস্ব আয়ের প্রধান উৎস হচ্ছে চট্টগ্রাম কাস্টমস। এই কাস্টমসকে দুর্নীতিমুক্ত করতে পারলে জাতীয় অর্থনীতি অনেক বেশি গতিশীল এবং সমৃদ্ধ হবে। তাই আমরা কাস্টমসের বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে অগ্রসর হচ্ছি। আমাদের কাছে বহু অভিযোগ জমা আছে। আমরা খোঁজ খবর নিচ্ছি। মুনীর চৌধুরী যে কোন ধরনের দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের কথা উল্লেখ করে বলেন, রাজস্ব আয় নির্বিঘ্ন হলেই দেশের প্রকৃত উন্নয়ন নিশ্চিত হবে।
ভবিষ্যতে কেউ যাতে দুর্নীতি ও হয়রানির শিকার না হয়, কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে বলেও দুদকের মহাপরিচালক উল্লেখ করেন।

x