দুদকের তদন্তে ফেঁসে যাচ্ছেন ১০ কর্মকর্তা

কেজিডিসিএলে দুজনকে বরখাস্ত ও একজনের চাকরিচ্যুতি

ইকবাল হোসেন

বৃহস্পতিবার , ১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ৫:৩৩ পূর্বাহ্ণ
1543

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্তে ফেঁসে যাচ্ছেন কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লি. (কেজিডিসিএল) এর ১০ জন কর্মকর্তা। ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানের দুই কর্মকর্তাকে বরখাস্ত, গুরুদণ্ড প্রদান, পদাবনতি ও একজনকে চাকরিচ্যুত করার অভিযোগ উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে। পরে তদন্তে নেমে ক্ষমতার অপব্যবহারের বিষয়ে সত্যতা পেয়ে এসব ঘটনায় জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলার প্রস্তুতিও নিচ্ছে দুদক। তবে কর্ণফুলী গ্যাসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, দুষ্টু লোকদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। তারা ক্ষমতার কোনো অপব্যবহার করেননি।
সূত্রে জানা গেছে, সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে কেজিডিসিএল-এ কর্মরত ছিলেন নিয়ামুল কবীর। দুই বছর আগে ২০১৭ সালের ২৯ নভেম্বর তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। তবে তিনি নিজেও জানেন না কী কারণে তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। চাকরিচ্যুতির আগে তার বিরুদ্ধে কোনো তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়নি। টার্মিনেশন লেটারেও চাকরিচ্যুতির কারণ উল্লেখ করা হয়নি। চাকরি হারিয়ে পরিবার পরিজন নিয়ে আর্থিক অনটনে পড়েছেন তিনি। ফলে চাকুরি ফিরে পেতে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন। আরেক সহকারী প্রকৌশলী কামরুল ইসলামকে কোনো অভিযোগ ছাড়াই ২০১৬ সালের ২৩ অক্টোবর সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। সাময়িক বরখাস্তের ৪২দিন পর তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয় তিনি নাকি জাতীয় স্বার্থ ও সংস্থার স্বার্থ পরিপন্থী কাজে লিপ্ত রয়েছেন। তদন্ত কমিটিও গঠিত হয়। কমিটিতে প্রতিষ্ঠানের উপ-মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) প্রকৌশলী শফিউল আজম খানকে আহ্বায়ক ও উপ-মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী তাজুল ইসলাম চৌধুরীকে সদস্য সচিব করা হয়। তদন্ত কমিটির অভিযোগ না পাওয়ায় তাকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার সুপারিশ করে প্রতিবেদন দেয়। কিন্তু তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনকে বিবেচনায় না নিয়ে অনেকটা ইচ্ছেকৃতভাবেই ৩ মাস ২৫ দিন পর ২ বছরের গুরুদণ্ড দিয়ে তাকে স্বপদে বহাল করা হয়। ফলে তিনি ২৪ জন কর্মকর্তার জুনিয়র হয়ে পড়েন।
ওই তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী শফিউল আজম খান গত ২ সেপ্টেম্বর রাতে দৈনিক আজাদীকে বলেন, ‘আমরা সহকারী প্রকৌশলী কামরুল ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তে গঠিত কমিটিতে ছিলাম। আমরা প্রশাসন বিভাগকে প্রতিবেদন জমা দিয়েছিলাম। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি এমনটাই প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছিলাম। তবে পরে কী হয়েছে আমরা জানি না।’
বুয়েটের ছাত্র আমির হামজা পেট্রোবাংলায় চাকুরি নেন ১৯৯০ সালে। ২০১৬ সালের ১২ জুন পেট্রোবাংলার একটি চিঠির প্রেক্ষিতে ওই বছরের ২৪ আগস্ট আমির হামজাসহ ৫ জনকে মহাব্যবস্থাপক হিসেবে পদোন্নতি দেওয়ার সুপারিশ করে কেজিডিসিএল বোর্ড। ওই সময় আমির হামজার বিরুদ্ধে বিগত সময়ে কোনো বিভাগীয় অভিযোগ নেই বলে জানায় কেজিডিসিএল বোর্ড। পদোন্নতি সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে মহাব্যবস্থাপক হওয়ার আশায় থাকা উপ-মহাব্যবস্থাপক আমির হামজাকে মাত্র ২৭ দিনের মাথায় ওই বছরের ২১ সেপ্টেম্বর দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেন না এমন অযুহাতে বরখাস্ত করা হয়। এর ৫ মাস পর উপ-মহাব্যবস্থাপক থেকে পদাবনতি দিয়ে ম্যানেজার হিসেবে চাকুরিতে বহাল করা হয় তাকে। এ বিষয়ে জানতে ফোন করা হলে গণমাধ্যমেও কথা বলতে রাজি হননি চাকুরি নিয়ে ভীতসন্ত্রস্ত এ কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ‘বক্তব্য দিলে নিজের সমস্যা হবে’। এছাড়া সহকারী প্রকৌশলী কামরুল ইসলামও বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তবে চাকুরিচ্যুত কর্মকর্তা নিয়ামুল কবীর দৈনিক আজাদীকে জানান, তাকে কোনো কারণ ছাড়াই চাকুরিচ্যুত করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আজ পর্যন্ত জানতে পারলাম না কী কারণে বা কোন অপরাধে আমাকে চাকুরিচ্যুত করা হলো। পরিবার পরিজন নিয়ে খুবই সংকটের মধ্যে পড়েছি। বৃদ্ধ মায়ের চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করতে হিমশিম খাচ্ছি। সামাজিকভাবেও সম্মানহানি হয়েছে।’
দুদক প্রধান কার্যালয় সূত্রে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, কর্ণফুলী গ্যাসের নানা অনিয়ম দুর্নীতির বিষয় তদন্তে নেমে দুদক জানতে পারে ক্ষমতার অপব্যবহার করে এক কর্মকর্তাকে চাকুরিচ্যুত করা হয়েছে। অন্য দুই কর্মকর্তাকে বরখাস্ত ও বিভাগীয় শাস্তি দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে ক্ষমতার অপব্যবহারের বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে কেজিডিসিএল এর মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) মো. ফিরোজ খান, উপ-মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) লুৎফুল করিম চৌধুরীসহ প্রায় ১০ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আলাদা তিনটি মামলার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুদক প্রধান কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, চাকুরিচ্যুত ও বিভাগীয় শাস্তি পাওয়া কর্ণফুলী গ্যাসের মোট তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছিল কর্ণফুলী গ্যাস। প্রশাসন বিভাগের কর্মকর্তারারা প্রায় সবগুলো নথিতে সই করেছেন। তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও তার আজ্ঞাবহ কর্মকর্তাদের রোষাণলের শিকার হয়েছেন এ তিন কর্মকর্তা। ইতোমধ্যে তদন্ত কর্মকর্তার কাছ থেকে প্রতিবেদন প্রধান কার্যালয়ে জমা হয়েছে বলেও জানিয়েছেন এ কর্মকর্তা।
এ বিষয়ে ৩ অক্টোবর সন্ধ্যায় কথা হলে কেজিডিসিএল এর মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) মো. ফিরোজ খান দৈনিক আজাদীকে বলেন, ‘দুদকের কাজ হচ্ছে দুর্নীতি তদন্ত করা। প্রতিষ্ঠানে (কেজিডিসিএল) কিছু দুষ্টু লোক ছিল। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল। এখানে দুদক যদি বলে ক্ষমতার অপব্যবহার করা হয়েছে, সেটা দুদকই বলতে পারবে। আপনারা (প্রতিবেদক) দুদকের কথাই লেখেন।’

x