দুই বাবার গল্প

ফারুক উমর

শুক্রবার , ৫ অক্টোবর, ২০১৮ at ৫:৫৫ পূর্বাহ্ণ
119

চতুর্থবারের মতো মওলা সাহেব আফজাল সাহেবের রুমে ঢুকলেন। আফজাল সাহেব অফিসের বস। বসের সেক্রেটারিয়েট টেবিলের বাম পাশে দাঁড়িয়ে আছেন মওলা সাহেব। খুবই সতর্কভাবে। পাশে একটা কৃত্রিম ফুলের টব। একটু ঊনিশ বিশ হলেই টবটা পড়ে যেতে পারে। একবার ফাইল সাইন করিয়ে বের হওয়ার পথে টবটা পড়ে গেছিল। বস তার দিকে স্রেফ একবার তাকিয়েছিল। তেমন কিছুই বলে নাই। বসের গোঁফের ফাঁক গলে বের হওয়া বিরক্তি কিছুটা আঁচ করতে পেরেছিলেন। তাতেই পিলে চমকে উঠেছিল মওলা সাহেবের। বার কয়েক বসকে সরি বলেছিলেন সেদিন। চাকরি শুরুর দিকে মওলা সাহেবের বাবা ছেলেকে উপদেশ দিয়েছিলেন, কখনো ঘোড়ার পেছনে এবং অফিসের বসের সামনে যাবে না। গেলেই বিপদ। বাবা বেঁচে নাই কিন্তু মওলা সাহেব অক্ষরে অক্ষরে বাবার উপদেশ মেনে চলেন।
মওলা সাহেব বসের রুমে সবসময় সতর্কতার সাথে চলাফেরা করেন। এমনকি হাঁটার সময়ও যেন কোন শব্দ না হয় তাও খেয়াল করেন। একাউন্ট সেকশনের জালাল সাহেব হাসতে হাসতে একবার বলেছিল, অফিসে বস এবং ঘরে বউ এই দুই জিনিস সবসময় মুরালিধরনের বলের মত খেলতে হয়। বুঝলেন ভাইসাব। হাহাহাহা। এদের সাথে একটু ঊনিশ বিশ হলেই যম দূতের সাথে সাক্ষাৎ করিয়ে ছাড়বে। হাহাহাহা। মওলা সাহেব জালাল সাহেবকে প্রশ্ন করেন, ভাইসাব, আপনার কথার মাথামুণ্ডু তো কিচ্ছু বুঝি নাই। ‘আরে ভাই বলছি তাদের সামনে বেশি কথা বলার দরকার নাই’ আবারো হাসতে হাসতে জালাল সাহেব যোগ করেন।
মওলা সাহেব আসলে গোবেচারা ও সাদাসিধে টাইপের মানুষ। ওনি এই অফিসের হেডক্লার্ক। অন্যান্য অফিসে হেডক্লার্কের সাথে বসের একটা অলিখিত গুড টার্ম থাকে বলে প্রচলিত আছে। কিন্তু এই অফিসের হেডক্লার্ক মওলা সাহেব ব্যতিক্রম। সারাক্ষণ মাথা গুজে কাজ করে যায়। অফিস নিয়ে ব্যস্ত থাকে। হরিণের কানের মত সবসময় কান খাড়া করে রাখেন। কখন আবার কলিংবেল বেজে উঠে? কলিংবেল বাজলেই পিয়নের আগেই মওলা সাহেব পৌঁছে যায়। বাসায় থাকা অবস্থায় বসের ফোন আসলে শোয়া- বসা যেভাবেই থাকুক না কেন, মওলা সাহেব দাঁড়িয়ে ফোন রিসিভ করে। এসবে জাহানারা বিরক্ত হয়। একবার বলে,
তুমি যে বসে বসে কথা বলতেছ সেটা কি তোমার বস দেখতে পাচ্ছে?
তা পাবে না। আব্বা তো দেখতে পাচ্ছেন।
কি! কি বললে? আব্বা দেখতে পাচ্ছে! আব্বা দেখতে পাবে কিভাবে? কিসব বলো তুমি? এই তুমি মানসিক ডাক্তার দেখাও।
আমি কি করছি না করছি আব্বা সব আকাশ থেকে দেখতে পায়।
তোমার নাম হলো গোলাম মওলা। নামেই তোমার দোষ। তোমার বসের গোলাম হয়ে আছো তুমি। এই আমার সামনে থেকে সরো তুমি।
মওলা সাহেব কথা আর বাড়ায় না। বিয়ের পর থেকে জাহানারার মন মেজাজ আন্দাজ করে চলেন মওলা সাহেব। কিছু বললে দেখা যাবে কাঁদতে কাঁদতে বাপের বাড়ি চলে যাবে। ঘরকে নরক বানিয়ে মেয়েদের যাওয়ার জন্য বাপের বাড়ি আছে কিন্তু পুরুষদের সেই সুযোগ নাই। ঘরেই তাদের থাকতে হয়। অনলে পুড়তে হয়।
বসের সামনের ভিজিটর চেয়ারে কয়েকজন আগন্তুক বসে আছেন। মওলা সাহেব এদের চিনতে পারছেন না। অবশ্যই তাদের চেনা জরুরিও মনে করছেন না তিনি। কোন রকম ছুটিটা পেলেই নোয়াপাড়ার বাস ধরবে। তিন ছেলের পর মেয়েটা হয়েছে। খুব বাপ-নেওটা হয়েছে মেয়েটা। প্রতি রাতে কথা বলে ঘুমাতে যায় মেয়েটা। কথা না বললে নাকি সাদিয়ার ঘুম আসে না। কাল রাতে ফোন দিয়ে মেয়ের সাথে কথা বলতে চাইলে জাহানারা বললো, মেয়ের জ্বর এসেছে। ঘুমিয়ে পড়েছে। অনেকদিন পর মেয়েটা বাবার সাথে কথা না বলে ঘুমিয়ে গেল। সারারাত মওলা সাহেবের ঘুম হয়নি। বিছানার এপাশ ওপাশ করেছে শুধু। সন্তানের অসুখবিসুখে পিতামাতারা স্থির থাকতে পারে না। নিজেদের কোন অসুখবিসুখ হলেও এত বিচলিত হয় না যতটুকু সন্তানের বেলায় বাবা-মায়েরা হয়।
সকালে মওলা সাহেব মেয়ের সাথে কথা বলেছে। জ্বর কিছুটা কমেছে। তবে মেয়ে তাকে দেখতে চায়। ইলিশ মাছের ডিম খেতে চায়। কালো জাম খেতে চায়। মেয়ের এসব আবদার শোনার পর থেকে মওলা সাহেব মেয়ের কাছে যাওয়ার জন্য ছটফট শুরু করে দিয়েছে। মনে মনে বলে, দুইদিনের ছুটি নিয়ে মেয়েকে দেখে আসতে হবে। চাকরিবাকরি করে কি হবে? জ্বরে ভোগা মেয়েকে যদি ইলিশ মাছের ডিমই বা খাওয়াতে না পারি? তবে বসের সামনে গেলে মনে মনে বলা কথাগুলো কর্পূরের মতো উবে যায়। মওলা সাহেব সকাল থেকে বারবার ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকাচ্ছেন এবং বসের রুমের আশেপাশে ঘুরঘুর করছেন। কিভাবে বসকে ছুটির কথাটা বলা যায়? প্রথম তিনবার রুমে গেলেও হাতের তালু চুলকাতে চুলকাতে অন্য কথা বলে চলে আসলো। আসল কথাটা বলতে পারেনি। এইবার বসকে ছুটির কথাটা বলতেই হবে বলে মনে মনে পণ করে বসের রুমে ঢুকলেন। বসের মনমেজাজ সব সময় ভালো থাকে না। সরকারি অফিসগুলোতে কর্তার ইচ্ছায় কর্ম হয়। অফিসে চাকরি করতে হয় বসের ইচ্ছে অনুযায়ী। আর বসদের মন-মেজাজ হলো শ্রাবণের আকাশের মতো। কখনো মেঘ, কখনো বৃষ্টি।
আফজাল সাহেব সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানেন না মওলা সাহেব। শুনেছেন স্যারের বাড়ি হবিগঞ্জের আজমিরিগঞ্জে। তবে কথায় সিলেটি টান নাই। পুরোদমে শুদ্ধ বাংলায় কথা বলেন। এই অফিসে তিনি আছেন বছর দেড়েক হলো। রগচটা ভাবটা বেশি। কোন কথায় ছট করে রেগে যায় বুঝা বড় মুশকিল। খুব রয়ে সয়ে কথা বলতে হয়। আর তাঁর কাছে ছুটি চাইলে এমন ভাবে তাকায় যেন কেউ তাঁর একটা কিডনি ধার চাইছে। সাহিত্যের শিক্ষকরা যেমন শিক্ষার্থীদের খাতায় নাম্বার দিতে চান না, আফজাল সাহেবও ছুটি দিতে চান না। ছুটি দিলে মনে হয় ওনার গা ছিড়ে যাবে। চতুর্থবার অহেতুক হাত চুলকানোটা আফজাল সাহেব খেয়াল করেছেন।
মওলা, বলো। কি বলতে চাও বলো। তোমাকে কতবার বলেছি আমার সামনে বিশ্রীভাবে হাত চুলকাবে না।
জি স্যার। আর চুলকাবো না।
কি বলতে আসছো সেটা বলো। আমি মার্ক করেছি তুমি সকাল থেকে চারবার আমার রুমে এসেছো। কিন্তু তেমন কিছু বলোনি।
স্যার, আসলে আমার মেয়েটার গতকাল থেকে জ্বর। সে ইলিশ মাছের ডিম দিয়ে আমার হাতে ভাত খেতে চেয়েছে। বলছিলাম কি স্যার, দুইদিন ছুটি দিয়ে যদি একটু দয়া করতেন।
মামার বাড়ির আবদার পাইছো নাকি। মেয়ে একদিন ইলিশ মাছের ডিম খেতে চাইবে তার জন্য ছুটি, বোয়ালমাছের পেটি খাইতে চাইবে সেইজন্য ছুটি। তোমরা স্টাফদের আসলে চাকরির প্রতি কোন দায়িত্ববোধ নাই। মাস শেষে বেতনটা পেলেই হলো। কোন রেসপন্সিবিলিটি নাই। এভাবে তো হয় না। তোমার বিরুদ্ধে আমি লিখবো। কোন ছুটি নাই। যাও অফিস করো।
সরি স্যার সরি স্যার করতে করতে মওলা সাহেব বেরিয়ে এলেন। নিজের চেয়ারে বসলেও মওলা সাহেবের কাজে মন বসছে না। চুপচাপ কিছুক্ষণ বসে রইলো। আফজাল সাহেব বয়সে মিনিমাম দশ বছরের ছোট হবে। তারপরও মওলা সাহেবকে তুমি করে বলেন তিনি। কখনো কোন বসের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করেননি। যখন যেটা করতে বলেছেন জি স্যার জি স্যার বলে কাজটা করেছেন। আজকে অসুস্থ মেয়েটাকে দেখতে যাওয়ার জন্য মাত্র দুইটা দিন নৈমিত্তিক ছুটি চেয়েছিলেন অথচ বস এতগুলো আগন্তুকের সামনেই কিনা হেনস্তা করলো। দম আটকে বসে রইলো মওলা সাহেব।
গল্পটা এভাবেই শেষ হতে পারতো। সব অফিসের গল্প এভাবেই শেষ হয়। বস ঝাড়ি দিবে। ঝাড়ি গিলে আবার আগ বাড়িয়ে বসের কাছেই যেতে হয় স্টাফদের। এটাই অঘোষিত নিয়ম। আফজাল সাহেব গল্পটা এভাবে শেষ করতে দেন নি। চুপিচুপি তিনি মওলা সাহেবের রুমে গেলেন এবং তাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, মওলা সাহেব, আমারও একটা মেয়ে ছিলো। কতশত বায়না ধরতো। একবার কি হয়েছে জানো?
চোখ মুছতে মুছতে মওলা সাহেব বললেন, কি হয়েছে স্যার?
একদিন মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছিল। মাঝরাতে রোকসানা হঠাৎ বায়না ধরলো আইসক্রিম খাবে। এত রাতে বৃষ্টির মধ্যে আইসক্রিম কই পায়? এদিকে রোকসানাও জিদ ধরে আছে আইসক্রিম না খেয়ে ঘুমাবে না। বাধ্য হয়ে জিন্দাবাজার থেকে আইসক্রিম কিনে নিয়ে আসছিলাম। আমার মেয়েটার কি যে জিদ ছিলো? তোমার মেয়ের নাম কি জানি বলছিলেন?
স্যার, সাদিয়া।
তোমার মেয়ের বায়না ধরার কথা শুনে মনটা আইসক্রিমের মত গলে গেলো। তুমি নিশ্চয়ই মনে মনে আমাকে অনেক গালাগালি করেছিলে। দেখো, আমি মানুষ হিসেবে খারাপ হতে পারি। বস হিসেবেও। কিন্তু একজন ভালো বাবা ছিলাম।
স্যার, আপনার মেয়ের কি হয়েছে?
সেই গল্প আরেকদিন করবো। তুমি এখন এই পাঁচ হাজার টাকা নিয়ে ফিশারিঘাট থেকে ইলিশ কিনে সাদিয়া মায়ের কাছে যাও। মেয়ে সুস্থ না হওয়া অবধি তোমার ছুটি।
মাঝেমধ্যে এমন কিছু ঘটে যায় যা কল্পনাকেও হার মানায়। স্বপ্ন- বাস্তবতার মাঝামাঝি দুলতে দুলতে মওলা সাহেব নোয়াপাড়ার বাস ধরলো।

রোকসানার মা ভার্সিটিতে আমার ক্লাসমেট ছিলো। থার্ড ইয়ারে উঠার পর পরই পানাম নগর দেখতে আমরা ক্লাসমেট সবাই নারায়ণগঞ্জ যাই। সারাদিন একসাথে ঘুরতে ঘুরতে কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের মতো আবিষ্কার করি, লুৎফাকে আমি ভালোবাসি। এর আগে কখনো এমন মনে হয় নি। লুৎফাকে বন্ধু হিসেবে বেশ ভালো লাগতো। কিন্তু প্রেমিকা হিসেবে আগে কখনো ভাবা হয় নাই। পানাম নগরের প্রাচীন স্থাপত্যের বাঁকে বাঁকে লুৎফার প্রতি আমার ভালোবাসার খোসাও উন্মোচিত হয়েছিল সেদিন। যাউকগা, আমি আসলে বলতে শুরু করেছিলাম আমার রোকসানার কথা। সেখানে তার মায়ের কথা বলা শুরু করে দিলাম। ধান ভানতে গিয়ে যেন শীবের গীত শুরু করে দিলাম। কিছু মনে করিও না মওলা। আফজাল সাহেব জিব কেটে বলেন।
কিছু মনে করি নাই স্যার। আপনি বলেন স্যার। মওলা সাহেব মুখে যথেষ্ট আগ্রহের অবয়ব ফুটিয়ে তুলে বললেন।
আফজাল সাহেব টু দ্যা পয়েন্ট কথা বলতে পারেন না। বর্তমান কোন প্রেক্ষিত নিয়ে হয়তোবা কথা বলা শুরু করেছেন। কিন্তু তিনি বলা শুরু করেন প্রাচীন যুগ থেকে। প্রস্তর যুগ, আগুন যুগ, তাম্র যুগ, মধ্যযুগ, মৌর্যযুগে এসে কিছুটা থামেন। তারপর আবার বলা শুরু করেন পাল আমল, মোগল আমল, ইংরেজদের শোষণ, পাকিস্তানি নির্যাতন নিয়ে। এসব বলতে বলতে যা নিয়ে বলা শুরু করেছিলেন তা তিনি শেষ করতে পারেন না। এমনকি মাঝেমাঝে মূল আলোচনার টপিকও ভুলে যান। মওলা সাহেব এসব বুঝেন।
আমার মেয়ের কথা বলতে গেলে তো আগে তার মায়ের কথা বলতে হবে। কি বলো মওলা।
জি স্যার। আপনি এবং ভাবীর গল্প ভালোয় লাগছিল। হাত কচলাতে কচলাতে মওলা সাহেব বলেন।
ফোর্থ ইয়ারে উঠেই লুৎফাকে বিয়ে করে ফেলি। বাধ্য হয়েই। দুজনই ছাত্র ছিলাম। আমাদের দৌড় ছিলো হুড ফেলে রিঙায় চড়া, লুৎফাকে তার টিউশনির বাসায় দিয়ে আসা, পাবলিক লাইব্রেরির সিঁড়িতে বসে গল্প করা , তার হল গেইটে বসে একসাথে বাদাম চিবুনো। মওলা দাঁড়িয়ে আছো কেনো? আরে বসো।
না স্যার। অসুবিধা নাই।
আরে কি বলো? বসো তো। গল্প শুনতে হয় বসে, আয়েশ করে। দাঁড়িয়ে গল্প শুনলে মনোযোগ আসে না। কখন শেষ হয় সেদিকে খেয়াল রাখা হয়। তুমি বসো তো।
স্যার আমার হাতে কিছু কাজ আছে। সেগুলো শেষ করে আসি তাহলে।
মওলার পলায়নপরতা আছে। কখনো সে বসের সামনে বসে না। বস সামনে বসতে বলায় কাজের অজুহাত দেখিয়ে পালাতে চায়। বসের সামনে বসাকে মওলা বেয়াদবি হিসেবে দেখে।
কিরে মওলা দাঁড়িয়ে আছো কেনো? গল্প ভালো লাগছে না?
না স্যার। অনেক ভালো লাগছে। হাতের কাজটা একটু শেষ করে এসে যদি..। তথ্য গুলো ডিজিতে যাবে। জরুরি ছিলো।
আরে আমি বলছি আজকে কোনো তথ্যই জরুরি না। আমার রোকসানা মামনির গল্প বলবো তোমাকে। ও, সাদিয়া মামনির বয়স কতো হলো? এই তুমি বসো না কেন?
সে সাথে পড়লো এবার। চেয়ারে ইতস্ততভাবে বসতে বসতে বললো মওলা সাহেব।
একবার গ্রীষ্মের ছুটিতে গ্রামে যায় লুৎফা। গ্রীষ্মের ছুটি হলেও আমার গ্রামে যাওয়ার সুযোগ ছিলো না। গ্রামে গিয়ে গ্রীষ্মের রসালো ফল খাওয়ার সুযোগ ঢাকায় আসার পর থেকে চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে। আমার চারটা টিউশন। নিজের পড়ালেখার খরচ চালানোর পাশাপাশি ছোট দুই ভাইবোনের খরচ চালানো লাগতো। মাসে মাসে টাকা পাঠানো লাগতো। বড় ভায়েরা বিয়ে করে যার যার মতো আলাদা হয়ে গেছে। চাইলেও গ্রীষ্মে টিউশন থেকে ছুটি মিলতো না। তাই গ্রামেও যাওয়া হতো না। তো সেবার লুৎফাকে কমলাপুর গিয়ে ট্রেনে তুলে দেই বলে আফজাল সাহেব থামেন। চোখ বন্ধ করে থাকেন।
স্যার, তারপর কি হলো?
একদিন সকালবেলা হলের এক মামা রুমে গিয়ে বললো, লুৎফা আন্টি আপনাকে ডাকছে। মাথায় বাজ পড়ার মতো অবস্থা হলো। লুৎফা তো হবিগঞ্জে। সে হলে কিভাবে আসবে? এসব আকাশপাতাল ভাবতে ভাবতে নিচে নামলাম। দেখি ঘটনা সত্য। চোখ তার তরমুজের মতো লাল। চুলগুলো নারিকেলের ছোবড়ার মতো এলোমেলো। মুখ বিবর্ণ। জিজ্ঞেস করলাম, চলে আসলে যে। আমার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে সে বললো, বিয়ে করতে পারবে এখনি। পারলে চলো। আমি আমতা আমতা করে বললাম, আমাদের কারো চাকরি নাই, চলবো কিভাবে? তাইলে বিয়ে করার দরকার নাই বলে ধড়াম করে উঠে দাড়ালো লুৎফা। সেদিনই আমরা নীলক্ষেতের কাজি হাবিবুর রহমানের কাছে গিয়ে বিয়ে করে ফেলি।
এতটুকু বলে আফজাল সাহেব এক গ্লাস পানি খান এবং মওলা সাহেব ফ্যালফ্যাল করে তার দিকে তাকিয়ে থাকেন। এর পরে কি হয়, আদৌ আফজাল সাহেব আজকে তাঁর মেয়ের গল্প বলতে পারবেন কিনা তা নিয়ে মওলা সাহেব কিছুটা চিন্তিত হয়ে পড়েন।
গ্রীষ্মের ছুটিতে গেলে আপনার ভাবী জানতে পারে তার পরিবার তার বিয়ে ঠিক করে ফেলে এক লন্ডন প্রবাসীর সাথে। তাই সেদিন সে পালিয়ে আসছিলো। পরে আজিমপুরে একটা চিলেকোঠায় আমাদের সংসার পাতি। টোনাটুনির সংসার যাকে বলে। টিউশনি করি, চাকরি খুঁজি।এভাবে জীবন চলেই যাচ্ছিল।
তারপর স্যার বলে মওলা সাহেব জুগানি দেয়।
বুঝলে মওলা, যে বছর আমার চাকরি হয় সেবছরই আমার রোকসানা পৃথিবীতে আসে।
রোকসানা মামনি তো অনেক ভাগ্যবতী। মওলা সাহেব বলেন।
হুম। আমার মেয়েটা অনেক ভাগ্যবতী। সে বছর তার মায়ের চাকরিও হয়।
তাহলে তো স্যার ডাবল ভাগ্যবতী।
আজিমপুর মেটারনিটিতে রোকসানা হয়। সারারাত তার মা প্রসব বেদনা সহ্য করে সকালে তাকে জন্ম দেয়। তখন কিন্তু এত সিজার পিজার ছিলো না। শিক্ষিত মেয়েরাও সিজারে আগ্রহী ছিলো না, আবার ডাক্তারও প্রয়োজন না হলে সিজার করাতে এতো বলতো না। সেদিন সারারাত হাসপাতালে নিচে দাঁড়িয়ে সিগারেট ফুঁকছিলাম আর মানত করেছিলাম আমার ছেলে হোক মেয়ে হোক তাঁর আবদার আমি পূরণ করবো।
রোকসানাকে কোলে নিয়েই কি এ মানত করেছিলেন?
সিস্টার যখন রোকসানাকে আমার হাতে তুলে দিলো তখন মনে হয়েছিল পৃথিবীর সবচেয়ে দামী রত্ন আমার কোলে। যারা বাবা হয়নি তারা কখনো বুঝবে না এই অনুভূতি কেমন সুখের হতে পারে? স্বর্গীয় অনুভূতির আরেক নাম বাবা হওয়া! আমার পরলোকগত মায়ের নামে মেয়ের নাম রাখি রোকসানা।
এতটুকু বলে আবারো দম নেন আফজাল সাহেব। মওলা সাহেব তাগাদা দেয়, স্যার এরপর কি হলো?
এদিকে রোকসানার মা সিলেটের এক সরকারি কলেজে পড়ানো শুরু করেন। ছোট্ট রোকসানাও তার মায়ের সাথে থাকে। আমার পোস্টিং এবং তার মায়ের পোস্টিং এর ব্যবধান দুইশো কিলোমিটার। শুধু রোকসানা কোলে নেওয়ার লোভে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে প্রতি সপ্তাহে সিলেট যেতাম। এভাবেই চলছিল। লাউয়ের ডগার মতো মেয়েটি আমার তরতর করে বেড়ে উঠতে লাগলো। রোকসানার বয়স যখন তিনবছর তখন আমি বদলি হয়ে নরসিংদী চলে আসি। আগের চেয়ে দুরত্ব কমেছে, তারপরও আমাদের অনেক দূরত্ব ছিলো।
তারপর স্যার।
প্রতিবারই বাসায় যাওয়ার সময় রোকসানার জন্য আমি এই সেই নিয়ে যেতাম। ওয়ার্ড পাজল, বর্ণমালার বইও নিয়ে যেতাম। একবার টিনটিনের একটা কার্টন বই নিয়ে গেলে তার মা চেচিয়ে বললো, এসব কি জন্য আনো? তোমার মেয়ে তো কথাও বলতে পারে না। সারাক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে। তার বয়স কত হয়েছে খেয়াল আছে? সে এখন চারে পড়লো।
স্যার। এরপর কি হলো?
এরপর আর কি হবে? আরো পরে আবিষ্কার করি মেয়ে আমার অটিস্টিক রোগী। মেয়ের প্রচণ্ড জিদ। যা চায় তা দিতে হয়। অন্যান্য শিশুদের সাথেও মিশে না। একদিন রাগ করে লুৎফাকে বললাম, তুমি নিশ্চয়ই কোন পাপ করেছিলে নইলে তোমার মেয়ে এমন হলো কেন? সাপের মতো ফণা তুলে সে বললো, কি বললে তুমি? আমি পাপ করেছি? সেদিন আমাদের ঝগড়া হলো।
স্যার আপনি এভাবে না বললেও পারতেন। আপনি শিক্ষিত মানুষ হয়ে কিভাবে অটিজমের জন্য ভাবীকে দোষারোপ করেন। মওলা কিছুটা বসের সুরে আফজাল সাহেবকে বলেন।
সেদিনই লুৎফা রোকসানাকে নিয়ে আলাদা থাকা শুরু করে। সে বলে, আমার পাপের ফসল নিয়ে আমি থাকবো। তুমি পুণ্য নিয়ে থাক। অনেক অনেক চেষ্টা করেছি তার রাগ ভাঙার। কিছুতেই তার রাগ কমে না। আর দিনকে দিন একা হয়ে যাচ্ছি সূর্যের মতো একা।
স্যার, রোকসানার সাথে কথা হয় আপনার?
রোকসানার তো এত বোধশক্তি নাই। কথা হয় না।
মওলা একটা আনন্দের ব্যাপার আছে।
কি স্যার?
গত ঈদুল ফিতরে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর যে ঈদ কার্ডটা আমার নামে আসে সেটাতে যে একটা ছবি আছে অটিস্টিক মেয়ের আঁকা আছে জানো? জানো মেয়েটা কার?
নাতো, কার স্যার?
রোকসানা আফজাল, আমার মেয়ে।
মওলা সাহেব হকচকিয়ে যায়। এতদিন কি ভাবলো আর বাস্তবে কি হলো? মানুষ আসলে নারিকেলের মতো। কথা না বললে বুঝা যায় না তার ভিতরে আসলে কত হাহাকার!

x