দুই দফা উচ্ছেদের পরও দখল

বাংলাবাজার সড়কে এবার দোকানের পরিবর্তে ভ্যানগাড়ি, ট্যাক্সি স্ট্যান্ড

আজাদী প্রতিবেদন

শনিবার , ১৮ মে, ২০১৯ at ১০:৩০ পূর্বাহ্ণ
266

দুই দফা উচ্ছেদের ২৪ ঘণ্টা না পেরুতেই নগরীর শেরশাহ বাংলাবাজার সড়ক ফের অবৈধ দখলে চলে গেছে। তবে এবার বাঁশ ও টিনের দোকানের বদলে সেখানে বিভিন্ন পণ্য নিয়ে বসেছে ভ্যানগাড়ি। কিছু অংশে বাজারের বিকিকিনির বদলে বসেছে জেলায় নিবন্ধন নেওয়া সিএনজি টেক্সির অবৈধ স্ট্যান্ড।
সরেজমিন দেখা গেছে, শেরশাহ বাংলাবাজার মোড়টিতে আগের মতোই আবার জটলা। তবে তা তুলনামূলক কম। সড়কটির একপাশের অংশ দখল করে সেখানে প্রায় অর্ধশত ভ্যানগাড়ি পণ্য নিয়ে বসেছে। আর গাড়িগুলো ঘিরে ক্রেতারা ভিড় করছে। ফলমূল থেকে শুরু করে সবজি, খাবার সামগ্রীসহ নানা পণ্য নিয়ে সেখানে বাজার বসেছে।
এছাড়া সড়কটির উভয় পাশে গড়ে তোলা হয়েছে চট্টগ্রাম জেলায় চলাচলের জন্য নিবন্ধন নেওয়া সিএনজি টেক্সির অবৈধ স্ট্যান্ড। বিআরটিএ আইনে চট্টগ্রাম জেলার নিবন্ধন দেওয়া টেক্সি নগরীতে চলাচল করতে পারে না। বাংলাবাজার মোড়ে প্রায় অর্ধশত সিএনজি টেক্সি যাত্রীর জন্য অপেক্ষায় ছিল। যাত্রী পেলে টেক্সিগুলো বাংলাবাজার থেকে সীতাকুণ্ডের ছিন্নমূল এলাকা পর্যন্ত চলাচল করে। এছাড়া কোনোটি বায়েজিদ থানা রোড, পলিটেকনিক্যাল হয়ে খুলশী রেলগেটসহ নগরীর বিভিন্ন এলাকায় যাচ্ছে। বাংলাবাজার মোড়টি আবারো অবৈধ দখলে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন স্থানীয় কাউন্সিলর সাহেদ ইকবাল বাবু। নিজের ওপর প্রাণনাশের হুমকি আসার কথাও বলেন তিনি। তিনি বলেন, বাংলাবাজার মোড়ে উচ্ছেদ কার্যক্রমের ঘটনাকে কেন্দ্র করে রুবেল ও নূর আলম নামে দুজন আমাকে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেন। বিষয়টি আমি থানার ওসিকে জানিয়েছি।
তিনি বলেন, সিডিএর একটি প্রকল্পের আওতায় এখানে সড়কটি তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু সড়কটির তিন ভাগের দুই ভাগ জায়গা দখল করে অবৈধ দোকানগুলো তুলে বছরের পর বছর ব্যবসা করে আসছে একটি চক্র। দৈনিক ১শ টাকা থেকে শুরু করে ৫শ টাকা পর্যন্ত চাঁদা দিয়ে অবৈধভাবে এসব দোকানপাট বসানো হয়েছে।
তিনি জানান, সরকারি দলের নাম ভাঙিয়ে স্থানীয় জসিম এগুলো নিয়ন্ত্রণ করছে। সে আবার এলাকার প্রভাবশালী এক যুবলীগ নেতার অনুসারী। স্থানীয়দের কয়েকজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে আজাদীকে বলেন, দুই দফা উচ্ছেদের পরদিন থেকে ধীরে ধীরে আবারো অবৈধ দখলে চলে যায় বাংলাবাজার সড়কটি। এলাকার আধিপত্য ধরে রাখতে সন্ত্রাসীরা ওই এলাকায় মোটরসাইকেল নিয়ে মহড়াও দিচ্ছে। অবৈধ দখলদারিত্ব থেকে লাখ লাখ টাকা আয় হওয়ায় সেটা ছাড়তে নারাজ তারা। গতকাল রাতে ৪০/৫০ জনের একটি দল মোটরসাইকেল দিয়ে ওই এলাকায় মহড়া দেয় বলে জানান তারা।
ঘুরেফিরে একই সিন্ডিকেট : দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ দখলে থাকা বাংলাবাজার সড়ক থেকে দোকানপাট উচ্ছেদে গত ১৩ ও ১৪ মে পরপর দুই দফা অভিযান চালানো হয়। ওই দখলদারিত্বের পেছনে স্থানীয় জসিম পাটোয়ারী প্রকাশ পানি জসিমের নাম উঠে আসে। দৈনিক ও মাসিক চাঁদার বিনিময়ে ওইসব দোকান বসার অনুমতি দেন জসিম।
দুই দফা উচ্ছেদের পর নতুন করে বসা ফুটপাতের বাজারও একই ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণে বলে জানান স্থানীয়রা। গত ১৫ মে থেকে চাঁদার বিনিময়ে আবারো সেখানে অবৈধ দখলদারিত্ব শুরু হয়েছে।
স্থানীয়দের পাশাপাশি সরকারি দলের সাথে জড়িত কয়েকজন জানান, পানি জসিম স্থানীয় যুবলীগ নামধারী মহিউদ্দিন ও দিদারের অনুসারী। চাঁদার একটি অংশ মহিউদ্দিন, দিদারের পাশাপাশি থানা পুলিশ পর্যন্ত পৌঁছে।
টেক্সি চালকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, চলাচলের জন্য একটি টেক্সিকে এককালীন দিতে হয় ১৫ হাজার টাকা। আর দৈনিক দিতে হয় একশ টাকা।
বায়েজিদ থানাধীন বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজি, জায়গা দখল, মাদকসহ নানা অপরাধের ঘটনায় জড়িত এ চক্রটির লোকজন দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
পুলিশের ভূমিকা : বায়েজিদ থানা পুলিশ দাবি করছে, বাংলাবাজার মোড়টি যাতে আবারো অবৈধ দখলে না যায় সে ব্যাপারে পুলিশের শীর্ষ পর্যায় থেকে নির্দেশনা দেওয়া আছে। এ জন্য ওই জায়গার ওপর পুলিশ নজর রাখছে।
বায়েজিদ থানার ওসি (ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) আতাউর রহমান খন্দকার আজাদীকে বলেন, সেখানে যাতে কোনো দোকানপাট উঠতে না পারে সেজন্য পুলিশ বিভিন্ন সময় গিয়ে অভিযান চালাচ্ছে। এখনো কোনো দোকানপাট নতুন করে তৈরি হয়নি। তবে কিছু ভ্যানগাড়ি বসার চেষ্টা করছে। পরে পুলিশ গিয়ে সেগুলো তুলে দিচ্ছে।
তিনি বলেন, শুক্রবারও পুলিশ গিয়ে ব্যবসায়ীদের তুলে দেওয়ার পাশাপাশি জায়গাটি দখলমুক্ত করেছে। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে যাওয়ার পর হয়তো তারা আবার বসেছে। এ বিষয়ে খোঁজ নেয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। গত ১৩ মে বাংলাবাজারে উচ্ছেদ অভিযানে হামলার ঘটনায় কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না জানিয়ে তিনি বলেন, এ পর্যন্ত ১৪/১৫ জনকে আটক করা হয়েছে। গতকাল বিকালে সালাউদ্দিন নামে আরো একজনকে আটক করেছে পুলিশ। ঘটনার দিন ভিডিও ফুটেজ দেখে তাকে সনাক্ত করা হয়। ওসি বলেন, অবৈধ দখলদারিত্বে থাকা সিন্ডিকেটের প্রধানদেরও ধরার জন্য পুলিশ চেষ্টা চালাচ্ছে।
স্থানীয়রা জানান, সালাউদ্দিন নিজেকে এলাকায় যুবলীগ নেতা হিসেবে পরিচয় দেন। তিনি মহিউদ্দিন ও দিদারের অনুসারী বলে এলাকায় পরিচিত।
যে কারণে মোড়টি দখলমুক্ত করা জরুরি : চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) ১৭২ কোটি ৪৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ বায়েজিদ বাইপাস সড়ক নির্মাণ করছে। বাংলাবাজার মোড়টি হচ্ছে বাইপাস সড়কের প্রবেশমুখ। এর নির্মাণ কাজ প্রায় শেষের দিকে। বায়েজিদ বোস্তামি সড়কের বাংলাবাজার মুখ থেকে সড়কটি ফৌজদারহাটে ঢাকা ট্রাংক রোডের সাথে যুক্ত হয়েছে। বাইপাস সড়কটি সম্পূর্ণরূপে চালু হলে কাপ্তাই, রাঙামাটি, হাটহাজারী, রাউজান ও রাঙ্গুনিয়াসহ চট্টগ্রামের বড় একটি অংশের যাত্রীরা মূল শহরে প্রবেশ না করে চলাচল করতে পারবে। এতে করে শহরের যানজট অনেকাংশে কমে আসবে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
এছাড়া বাংলাবাজার মোড়টি থেকে অভ্যন্তরীণ সড়কের আরেকটি অংশ পলিটেকনিক, খুলশীসহ বিভিন্ন এলাকায় গেছে। অবৈধ দখলের কারণে ওই মোড়টি দিয়ে যানবাহন তো দূরে থাক, মানুষ চলাচল দুরূহ হয়ে পড়ে বলে জানান স্থানীয়রা।
গত ১৩ মে শেরশাহ বাংলাবাজারে সড়কে অবৈধভাবে বসা বাজার দখলমুক্ত করে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ভ্রাম্যমাণ আদালত। ওইদিন উচ্ছেদ করতে গিয়ে দুর্বৃত্তদের হামলার মুখে পড়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাকারীদের দল। ভ্রাম্যমাণ আদালতের ৪টি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। এসময় পুলিশসহ দুজন আহত হন। এ ঘটনায় পরে অতিরিক্ত পুলিশ এসে ৬ জনকে আটক করে। এছাড়া ভ্রাম্যমাণ আদালত ঘটনাস্থলে তিনজনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়। এ ঘটনায় কয়েকজনের নামে ও অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।
পরদিনও ওই এলাকায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে বিভিন্ন দোকানপাট উচ্ছেদের পাশাপাশি ২৬ জন দোকানিকে বিভিন্ন পরিমাণে জরিমানা করে ভ্রাম্যমাণ আদালত।

x