দীলতাজ রহমানের ‘নিঃসঙ্গ সৈকতে সোনার ময়ূরপঙ্খি নাও’ : গল্পে গল্পে জীবনদর্শন

আহমেদ শরীফ শুভ

শুক্রবার , ৩ মে, ২০১৯ at ৬:৩৯ পূর্বাহ্ণ
64


কবি ও কথাসাহিত্যিক দীলতাজ রহমানের সাম্প্রতিক গল্পগ্রন্থ ‘নিঃসঙ্গ সৈকতে সোনার ময়ূরপঙ্খি নাও’ বেরিয়েছে এবারে বইমেলায়। গ্রন্থটিকে নিছক একটি গল্পগ্রন্থ বলে আখ্যায়িত করলে তার যথার্থ মূল্যায়ন করা হবে না। ভূমিকায় তিনি নিজেই বলেছেন ‘এই বইয়ে যা লেখা, তার কিছু গল্প, কিছু গল্পের মতো, যাকে অগল্পও বলা চলে’। তবে গল্পগুলোর চরিত্র যা-ই হোক না কেন সেগুলোকে জীবনের রোজনামচা বলা চলে অবলীলায়। সেই রোজনামচাকে আশ্রয় করে গল্পকার চিত্রায়ণ করেছেন তাঁর জীবন দর্শন। দীলতাজ রহমান তাঁর গল্পগুলোতে খুব সহজেই অনেক সত্য কাহিনী খুঁড়ে আমাদের চেতনার তন্ত্রীতে আঘাত করেছেন এমন ভাবে যাতে জীবন দর্শনের কিছু উপেক্ষিত কিংবা অস্বীকৃত সুর পাঠকের মানসকর্ণে বেজে উঠেছে অবলীলায়। আমাদের পারিপার্শ্বিকতার সে সব উপেক্ষিত এবং অস্বীকৃত অনুষঙ্গ পাঠকের কাছে হয়ে উঠে নতুন জিজ্ঞাসার উপাদান। মনে হয়, তাই তো! এভাবে তো ভেবে দেখিনি!
নিজের চারপাশকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ, পরিপ্রেক্ষিত ও ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ এবং সুখপাঠ্য গল্প হিসেবে তা পাঠকের কাছে উপস্থাপন এই তিনটি সামর্থের সমন্বয় ঘটাতে পারলেই একজন লেখক সার্থক গল্পকার হয়ে উঠতে পারেন। সে বিবেচনায় দীলতাজ রহমান একজন সময়োত্তীর্ণ গল্পকার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন এই গ্রন্থে। কারণ, গল্পগুলো তিনি কেবল ঘটনার ধারাবিবরণীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেননি, দর্শনভিত্তিক বিশ্লেষণ করেছেন এবং তা পাঠকের কাছে উপস্থাপন করেছেন প্রাঞ্জল ভাষায়। এই তিনের সমন্বয় ঘটাতে গিয়ে আবশ্যিকভাবেই ঘটনার সাথে খাঁদ মিশিয়েছেন। তিনি নিজেই বলেছেন ‘সাহিত্যে খাঁদটা সোনার চেয়ে দামি’। ঘটনা প্রবাহের সাথে এই খাঁদটুকু অত্যন্ত সফলতার সাথে মেশাতে পেরেছেন বলেই এই গ্রন্থটি একটি পরিপূর্ণ গল্পগ্রন্থ হয়ে উঠেছে।
‘নিঃসঙ্গ সৈকতে সোনার ময়ূরপঙ্খি নাও’ গ্রন্থের ২৫৫ পৃষ্ঠায় মোট ৮টি গল্প স্থান পেয়েছে। কিন্তু গ্রন্থের পাঠ এই ৮টি গল্পেই সীমাবদ্ধ থাকে না। পাঠ শুরু হয় ফ্ল্যাপ কভার থেকে। আর বইটির পড়া শেষ করতে হলে পৌঁছাতে হয় শেষ কভার অবধি। সেখানে লেখিকা মাত্র ৪টি লাইনে পুরো গ্রন্থের সবটুকু ঘনীভূত নির্যাস তুলে ধরেছেন এভাবে –
‘তুমি একটানা অনর্থক কষ্ট দিয়ে যাবে/আর সেই দুঃখ টবে ফুটলে ফুল /হুলুস্থূল তাকেও বলবে, পরকীয়া? ঘর আর চিতার সংজ্ঞা তবে আগে ঠিক করো!’
তাই বলে এটা মনে করা ঠিক হবে না যে সংসারের সংঘাত এবং তার পরিনতিতে পরকীয়াই ‘নিঃসঙ্গ সৈকতে সোনার ময়ূরপঙ্খি নাও’ এর প্রধান উপজীব্য। হ্যাঁ, পরকীয়া, পরকীয়ার হাতছানি কিংবা আকাংখা এসেছে বটে কিন্তু ‘অনর্থক কষ্ট’, সেই দুঃখে ‘টবে ফুল ফোটা’ এসেছে বেশি, আর তারও চেয়ে বেশি বিধৃত হয়েছে ‘ঘর ও চিতার’ ব্যবধান। তাই বলে নিটোল প্রেম, আটপৌরে জীবন যাপন, সংসারের প্রাত্যহিক অনুষঙ্গ, স্বামী-স্ত্রীর চিরায়ত রসায়ন, একগামীতা আর বহুগামীতার মনস্তাত্ত্বিক ব্যবচ্ছেদ, মাতৃত্ব, প্রাপ্তি অপ্রাপ্তির টানাপোড়েন কোন কিছুই বাদ পড়েনি। দীলতাজ রহমান নিজের চারপাশে যা কিছুই দেখেছেন বা উপলব্ধি করেছেন তার সবটুকু নির্যাসই পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন বিস্তৃত ক্যানভাসে।
দীলতাজ রহমানের নিজেরই স্বীকারোক্তি, এই বইয়ের অন্য গল্পগুলোর মতো প্রধান গল্প ‘বিষন্ন সৈকতে সোনার ময়ূরপঙ্খি নাও’ আত্মজৈবনিক। এর চরিত্রকে একটি আদর্শ ছোটগল্পের সংজ্ঞার মধ্যে ধারণ করা নিয়ে যথেষ্ট দ্বিধার অবকাশ থেকে যাবে। ১৮৩ পৃষ্ঠা দৈর্ঘ্যের এই গল্পটিকে পাঠক বড়গল্প বলতে পারেন আবার উপন্যাসও ভাবতে পারেন। আবার কেউ কেউ একগুচ্ছ গল্পের সংকলন ভাবলেও তা অকারণ মনে হবে না। তবে গ্রন্থে অন্য কোন গল্প না থাকলে অনায়াসেই তাকে উপন্যাস বলে অভিহিত করা যেত। গল্পকার মুখ্য চরিত্রের আড়ালে নিজের পরিবার ও পরিচিত মহল ও পারিপার্শ্বিকতার কথাচিত্র এঁকেছেন কোন রকম জড়তা ছাড়াই। এ তাঁর অন্যন্য সাহসিকতা। যিনি নিজেকে খোলামেলা উপস্থাপন করতে পারেন তিনি তার পারিপার্শ্বিকতাকে উপস্থাপন করতে পারবেন ব্যক্তিগত ভাবাবেগ বিযুক্ত করে, সেটাই স্বাভাবিক। তিনি করেছেনও তাই। আর সে জন্যই এই গল্পটি এমন জীবন্ত হয়ে উঠেছে, আমাদের সমাজের স্ফটিক-স্বচ্ছ দর্পণ হয়ে উঠেছে। এই দর্পণে নিজের অভিজ্ঞতালব্ধ জীবন দর্শনের মিশ্রণ ঘটাতে গিয়ে তিনি মানব জীবনের অজস্র অনুষঙ্গ তুলে এনেছেন বিভিন্ন গল্পাংশে। একাকীত্ব, বিষণ্নতা, প্রেম, পরকীয়া, আটপৌরে জীবন যাপন, মনের দ্বৈত সত্ত্‌বার টানাপোড়েন এসব তো আছেই, সেই সাথে আছে বিভিন্ন চরিত্রে জটিল মনস্তত্ত্বের আঙ্গিনায় ঘোরাফেরা। পাঠকের মনে হবে লেখিকা হয়তো কখনো মনোবিজ্ঞানের প্রাতিষ্ঠানিক পাঠ নিয়েছেন। স্থানে স্থানে এ সব মনোবিশ্লেষণ এবং মনস্তাত্ত্বিক মোচড়গুলো এই গল্পটিকে বিশেষত্ব দিয়েছে। তেমন একটি গল্পাংশে দেখা যাবে পিতৃত্বের বিভ্রান্তি নিয়ে একটি চরিত্রের মনোদৈহিক দংশন। আবার সে গল্পেই অপ্রাতিষ্ঠানিক কাউন্সেলিংয়ের কৌশল উঠে এসেছে অন্য চরিত্রের নিছক কর্মপরিধি হিসেবে, যেমনটি লেখিকা বর্ণনা করেছেন ু ‘আমি বুঝতে পারি, ওই যে একটু সেধে খেতে দেয়ার চেয়ে, নির্দ্বিধায় মন খুলে কথা বলতে দেওয়ার প্রশ্রয়টুকুই তাকে হয়তো কখনোসখনো আমার কাছে টেনে আনে!’। এই যে নিজেকে ব্যক্ত করার আকুলতাকে আর আনন্দ বেদনার কথা কারো কাছে উগরে দেয়ার বাসনাকে প্রশ্রয় দেয়ার প্রক্রিয়া তা-ই তো কাউন্সেলিংয়ের মূল কৌশল। দীলতাজ রহমান গল্পের মুখ্য চরিত্রের আড়ালে তা করে গেছেন অহরহ। শুধু গল্পকার হিসেবেই নন, একজন মা হিসেবে তিনি শিশু মনোবিজ্ঞানের একটি জটিল সূত্র তুলে ধরেছেন সহজ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে। ‘অনেক বাড়িতে মাস্টারি করে দিনগুজরান করা সে তরুণ লেখাপড়া নিয়ে খেলা করতে শেখেনি বলে এই ক্ষুদে ছাত্রের সাথেও মাস্টারি ফলাতে গিয়েছিল’- এই বাক্যটি শিশু মনস্তত্ত্বব নিয়ে লেখিকার এক জোরালো পর্যবেক্ষণের স্বাক্ষর। ‘লেখাপড়া নিয়ে খেলা’ করতে না পারা এবং ‘মাস্টারি ফলানো’ এই শব্দগুচ্ছের মাধ্যমে তিনি আমাদের সমাজে শিশুদের পাঠদান পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন।
এক জায়গায় দেখা গেল একজন তার স্বামীকে পরিত্যাগ করে পুরোনো প্রেমিককে বিয়ে করেছেন। কিন্তু প্রথম স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি উপলব্ধি করলেন সেই স্বামীর প্রতিও তার অনেকটুকু ভালোবাসাই রয়ে গেছে। আবার অন্য এক জায়গায় দেখা গেল একজন পরিবার-নির্যাতিতা নারী যে কিনা পিতামহের দ্বিতীয় স্ত্রী, তার প্রতি সেই পরিবারের একজনের খানিক মমত্ববোধের কারণে নায়িকার সেই ছেলেটির প্রতি এক ধরনের ভালো লাগা তৈরি হয়েছে। আপাত দৃষ্টিতে বিষয়গুলো ঠুনকো মনে হলেও এর গভীরে রয়েছে মানবিকতার বীজ।
আরেকটি শক্তিশালী ও বক্তব্যধর্মী গল্প ‘মানবতা ও পাখবতার রজ্জু’। মানব চরিত্রের মনোদৈহিক বৈশিষ্ট্যের সাথে পাখি চরিত্রের তুলনামূলক চিত্র আঁকতে লেখিকা ‘পাখবতা’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। সেই বিশ্লেষণে তিনি একটি পোষা পাখি নিয়ে লেখা গল্পকে আশ্রয় করেছেন। দীলতাজ রহমান প্রাণীমনস্তত্ত্ববিদ নন, এমনকি প্রাণীবিদ্যায় তাঁর কোন প্রশিক্ষণও নেই। অথচ মানুষ ও পাখির আবেগ ও যৌনতার যে তুলনামূলক চালচিত্র তিনি উপস্থাপন করেছেন তাতে চমৎকৃত না হয়ে উপায় নেই। তা তাঁর গভীর পর্যবেক্ষণ শক্তি, বিশ্লেষণের সামর্থ আর সহজবোধ্য ভাবে পাঠকের কাছে উপস্থাপনের সাফল্যেরই পরিচায়ক। জোড়ার একটি পাখি মারা যাবার পর যখন আরেকটি অনবরত চেঁচিয়ে যাচ্ছিল তখন তিনি পাঠককে মনে করিয়ে দিলেন – ‘এমন অবস্থায় মানুষ চেঁচালে যারা দোষ দেয়, তাদের সব বাড়ি একবার করে এই পাখিকে পাঠানো উচিত। কারণ প্রকৃতির শিক্ষাই হলো আসল শিক্ষা। এর বাইরের শিক্ষা আরোপিত এবং অসম্পূর্ণ শিক্ষা’। সঙ্গী বা সঙ্গিনীর মৃত্যুর শোকে শুধু যে তার জন্য অনুভূতির তীব্রতা থাকে তা ই নয়, নিজের সম্ভাব্য অপূর্ণতা ও কষ্টের জন্য ও হৃদয়ের ক্ষরণ থাকে। আমরা অনেক সময় বিষয়টি সেভাবে ভেবে দেখি না। অনেক সময় অস্বীকারের ভান করি। লেখিকা আমাদের সে সত্যটি মনে করিয়ে দিয়েছেন অবলীলায়। মোরগ-মুরগি এবং মানব-মানবীর আবেগ ও যৌন অধিকারবোধকে তুলনামূলক ক্যানভাসে চিত্রিত করে তিনি পাঠকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন এক কঠিন প্রশ্নের সামনে। নারীর তার স্বামী বা প্রেমিকের মন, শরীর আর সম্পদের উপর একচ্ছত্র আধিপত্যের আকাঙ্ক্ষা, ঈর্ষা এবং সেই সাথে পুরুষের বহুগামী স্বভাবের নানা মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করেছেন। কিন্তু কোন উপসংহারে পৌঁছাননি। সেটি গল্পকারের দায়িত্বও নয়। তিনি শুধু পাঠকের চিন্তাকে উসকে দিতে প্রশ্ন রেখে গেছেন – ‘এই মোরগের প্রবণতা দিয়েই তো বিধাতা পুরুষমানুষ গড়েছেন। তাহলে আইনকানুন সেই ধাতে ফেলে, শর্তগুলো সে রকমারো খোলাসা হতে পারতো। আর নারীগুলোকে বিধাতা কেন শুধু মুরগির মেজাজেই বানাতে পারলেন না! যাদের শেয়াল-বেজি, কাক-চিলের মতো ভয়ঙ্কর প্রতিপক্ষের সাথে লড়াইয়ের তাগদ থাকলেও ঘরের পুরুষকে আটকানোর কোন প্রবণতা, কোন আগ্রহ ভালবাসা থাকবে না!’ এই প্রশ্নের মীমাংসার জন্য লেখিকা একটি সম্ভাব্যতার আলোচনা উন্মুক্ত করেছেন এই ভাবে – ‘তাই শুরু থেকে নারীকে মানবতাবোধের চেয়ে পাখবতাবোধটা বেশি শেখাতে পারলে, পুরুষের সাথে গড়পরতা নারীর সম্পর্কের আঁটোসাঁটোভাবটা কমে আসবে। তাতে রক্ষা পাবে অনেক সংসার। কোন শিশুকে আর চোখের সামনে পোহাতে হবে না, মা-বাবার সম্পর্ক ভাঙার মর্মান্তিক যাতনা! আর তখন যাতনা শব্দের গায়ে অতো ভারও থাকবে না!’ বিষয়টি কিন্তু তুমুল বিতর্কের অপেক্ষা রাখে। আমাদের সমাজে অধিকাংশ মানুষই এই ধারণা সমর্থন করবে না। তবে লেখকের কাজ সমর্থন সংগ্রহ নয়, ভাবনার পরিমণ্ডলকে অবমুক্ত করা। দীলতাজ রহমান তাই করেছেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায়, পাশ্চাত্যে পরিচালিত বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের কোন অপূর্ণতা বা সীমাবদ্ধতায় সেই সংসারকে টিকিয়ে রাখার জন্য স্বামী বা স্ত্রীর কিংবা দু’জনের পরকীয়া কখনো কখনো ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তাতে দু’জনই সম্পর্কের সীমাবদ্ধতা মেনে নিয়ে সংসারজীবন অব্যাহত রাখেন। এই বিবেচনাটি মানুষ পাখিদের কাছ থেকে রপ্ত করেছে কিনা তা অবশ্য বিস্তারিত গবেষণার বিষয় আর এভাবে সংসার টিকিয়ে রাখা মাহাত্ম্য বা প্রয়োজনীয়তাই বা কি তাও ভিন্ন বিতর্কের বিষয়। ‘পাখি-পশুর মতো অত উঁচু মার্গের স্বাধীনতা ভোগের কৌশল তোরা কখনোই আয়ত্ত করতে পারবি না!’- এটা লেখিকার অভিশাপ কিংবা ভবিষ্যতবাণী যা-ই হোক না কেন এর মধ্যে ক্ষীণদৃষ্টির পাঠক সামাজিক অবক্ষয়ের ইঙ্গিত দেখবেন। কিন্তু গভীর দৃষ্টির ঋদ্ধ পাঠক দেখবেন চিন্তার জগতে মুদ্রার আরেক পিঠ। পাঠককে এমন দোটানায় ফেলে লেখিকা এগিয়ে যাবেন অন্য কোন গল্পে, অন্য কোন জীবন দর্শনের সূত্র সন্ধানে।
গ্রন্থের প্রথম গল্প ‘ভালোবাসা যারে খায়’। নামের মতোই গল্পের অবয়ব নিটোল প্রেম দিয়ে সাজানো। একেবারে ‘নাহি তত্ত্‌ব নাহি উপদেশ’। তবে একে নিছক সাদামাটা প্রেম কাহিনী বলা যাবে না।
‘বন্ধ খামে খোলা চিঠি’ আরেকটি উচ্চমার্গীয় মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েনের গল্প। গল্পটি লেখা হয়েছে মনোলগের আদলে। স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক ভালোবাসা, সৌহার্দ্য, বোঝাপড়া, আস্থা ও শ্রদ্ধাবোধের কমতি না থাকলেও কখনো কখনো তাদের রসায়নে কোন একটা যোজনীর তাল কাটা দেখা যায়। তখন সম্পর্কের দৃঢ়তা নির্ভর করে বুদ্ধিমত্তা, সম্পর্ককে লালন করার কৌশল এবং দু’জনের মানসিক পরিপক্বতার উপর।
‘লেপ ছাড়া এক শীতের কাহিনী’ গল্পটি আমাদের সাহিত্য জগতের এক খণ্ডচিত্র। একজন উঠতি লেখিকা তার লেখা ছাপানোর জন্য একজন সাহিত্য সম্পাদকের আনুকূল্য প্রত্যাশা করলে সে সাহিত্য সম্পাদক কিভাবে তার কাছ থেকে বৈষয়িক সুবিধা নিয়েছেন তার গল্প। যাদের সুকুমারবৃত্তি লালন করার কথা তাদের কাছে কখনো কখনো এভাবেই সুকুমারবৃত্তি পরাস্ত হয়ে আসছে।
‘মা যে শুধুই মা’ একটি সনাতন মাতৃত্বের গল্প। পারিবারিক কৌলিন্য আর বৈষয়িক স্বার্থে একজন নববধূর ইচ্ছা অনিচ্ছার বিসর্জনের পরও তার মধ্যে যে মাতৃত্ব জেগে আছে তা হয়তো ভিন্ন কোন বিশেষত্ব বয়ে আনে না, কিন্তু গল্পের বিভিন্ন চরিত্র তাদের ‘মা’য়ের কাছে বা ‘মা’য়ের মধ্যে যা প্রত্যাশা করেছে সেই ভিন্নতাই গল্পটিকে বিশেষত্ব দিয়েছে। এই গল্পের একটি চরিত্র বাসার, যে ছোটবেলা থেকে মাতৃসান্নিধ্য বঞ্চিত। লেখিকার কথায় ‘বাসারের ইচ্ছে করে, মা কাছে এসে জানতে চাক, সে কেমন আছে? শুধু এইটুকু তৃষ্ণা মিটে গেলে বাসার এক সাধারণ মানুষ হয়ে যেতো। তার আর অন্য কষ্ট থাকতো না’। একটি ছোট্ট প্রত্যাশার মাধ্যমে কী এক বিশাল অভিব্যক্তি!
একজন মৃত্যুপথযাত্রী বিধবার প্রতি তার পরিবার পরিজনের অবহেলার কাহিনী এবং তার ফলশ্রুতিতে সে বৃদ্ধার নিজের মতো করে প্রতিশোধ নেবার অভিপ্রায় উঠে এসেছে ‘মরণের মূল্য’ গল্পে। সমাজ যে গল্প ধামাচাপা দিয়ে রাখতে চায় দীলতাজ রহমান সে গল্প প্রকাশ করে সমাজের কালিমাই অবমুক্ত করে দিয়েছেন। শেষ গল্প ‘সোনার পাথরবাটি’। পড়তে গিয়ে বারবার মনে হয়েছে জীবন যেমন জটিল তেমন চমকপ্রদও বটে। কিছু কিছু বাস্তবতা আমাদের জানা থাকলেও কিছু কিছু বাস্তবতা আমাদের নতুন জিজ্ঞাসার সামনে দাঁড় করিয়ে দেবে।
দীলতাজ রহমানের দৃষ্টির তীক্ষ্ণতা ও গভীরতা এবং তা প্রকাশের সাবলীলতা ঈর্ষণীয়। ‘তার স্বামী কিছু দিন হলো, ডিগ্রি আনতে বিদেশে গেছেন’। এই অভিব্যক্তিটি ব্যবচ্ছেদ করলে পাঠক দেখতে পাবেন তিনি ‘উচ্চ শিক্ষার্থে’ বিদেশ যাওয়ার কথা বলেন নি, বলেছেন ‘ডিগ্রি আনতে’ যাওয়ার কথা। এই দু’টো যে ভিন্ন জিনিস তা অনেক সময় আমরা ভুলে যাই। ভুলে যাই বলেই আমাদের সমাজে ডিগ্রিপ্রাপ্ত মানুষের আধিক্য থাকলেও প্রকৃত শিক্ষিত মানুষের প্রচণ্ড অভাব। এই অপ্রিয় সত্যটি লেখিকার দৃষ্টি এড়াতে পারেনি।
গল্পগুলোকে জীবন্ত করে তোলার জন্য লেখিকা তার রচনাশৈলিতে যথোপযুক্ত প্রাঞ্জলতা দিয়েছেন। কোথাও থমকে দাঁড়াতে হয় না, খেই হারাতে হয় না। কথোপকথনের ভাষা ব্যবহারেও তিনি বাস্তবানুগ। ‘ঠিকাছে’, ‘আসতেছি’, ‘নাস্তা খাইছো’ – এই অভিব্যক্তিগুলো তারই পরিচায়ক। বইটিতে উপমা ও রূপকের ব্যবহারেও চমৎকারিত্ব রয়েছে। বেশ কিছু মুদ্রণ প্রমাদ চোখে পড়েছে। কোথাও কোথাও সামান্য কিছু অসংগতি এবং যতি চিহ্নের অতি ব্যবহার দেখা গেছে। দ্বিতীয় সংস্করণের সময় তা লেখিকার দৃষ্টি এড়াবে না আশা করা যায়। উপসংহারে এটুকু বলা যায়, যেসব পাঠক একটি পূর্ণাঙ্গ গল্পগ্রন্থের তৃষ্ণা নিয়ে এই বইয়ের অভ্যন্তরে প্রবেশ করবেন তারা বিমুখ হবেন না। গল্পগুলোতে কাহিনীর অভাব নেই, আবার ঘটনার ঘনঘটাও নেই, জীবনের কথা আছে কিন্তু আত্মজীবনীর শুষ্কতা নেই, জীবন দর্শন আছে কিন্তু তা দর্শন শাস্ত্রের পাঠ হয়ে উঠেনি। দীলতাজ রহমানের মুন্সিয়ানা এখানেই। আর সে জন্যই গ্রন্থটি বহুচারিত্রিক হলেও মূলতঃ একটি পরিপূর্ণ গল্পগ্রন্থ হয়ে উঠেছে। এই অসামান্য গল্পগ্রন্থটির বহুল প্রচার ও বহুল পাঠ কামনা করি। ‘নিঃসঙ্গ সৈকতে ময়ূরপঙ্খি নাও’ এর মাধ্যমে দীলতাজ রহমান আমাদের প্রত্যাশা বাড়িয়ে দিয়েছেন বহুগুণে।

x