দীপেশ চক্রবর্তীর প্রোভিনশিয়ালাইজিং ইউরোপ

ইলিয়াছ কামাল রিসাত

মঙ্গলবার , ৩১ জুলাই, ২০১৮ at ৭:৩০ পূর্বাহ্ণ
18

দীপেশ চক্রবর্তীর Provincializing Europe বইটার ব্যাপারে প্রথম শুনেছিলাম আমার প্রিয় কথাসাহিত্যিক শাহাদুজ্জামানএর কাছ থেকে।

শাহবাগইস্যুতে প্রিয় বাংলাদেশের ‘জাতীয়তাবাদ’ নিয়ে রীতিমত ট্রায়ালচুলচেরা ইতিহাস কাটাছেঁড়া শুরু হয়েছিল। বঙ্গীয় মুসলমান বলতে যে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজ দুই ধরণের ‘জাতীয়তা’র জন্য একবার ১৯৪৭এ এবং আরেকবার ১৯৭১এ সংগ্রাম করল, যেই মুসলমান সমাজ ২০১৩ সালে শাহবাগএর পর মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতা সংগ্রামকে ইসলামের ‘অপোজিশন’ হিসেবে দাঁড় করিয়েছিল।

মোটা দাগে একে আমি ‘মুসলমান সমাজ’ বলছি তার কারণ প্রথম দিকে এই শাহবাগ আন্দোলনে ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সকলের অংশগ্রহণ থাকলেও নাস্তিকতার ‘ধোঁয়া’ উঠার পরে সকল অংশগ্রহণকারী মুসলমান (ফিসিক্যালভার্চুয়াল) আস্তে আস্তে কেটে পড়ল এবং তওবা তওবা শুরু করল। আমার কাছের এক ছোট ভাই তো রীতিমত আরও বেশি ধার্মিক হয়ে পড়ল, পাপের প্রায়শ্চিত্ত করবে বলে!

সমস্যা গভীর হতে থাকে যখন গ্রামীন কওমি মাদ্রাসার বিশাল নিম্নবিত্ত শ্রেণীর বাসিন্দাদের এই শাহবাগ আন্দোলনের বিরুদ্ধে হেফাজতএর ১৩ দফা দাবি আদায়ের জন্য ঢাকাআন্দোলন শুরু হল। এরই মাঝে ঘটল মহাবিপত্তি যেদিন চাঁদে দেখা গেল সাঈদীকে!!! এরপর অনেক ধরণের রিঅ্যাকশন আসা শুরু হয়। অনেকে বলছিল, নিম্নবর্গীয় জীবনে এমন সাবকনশাস লেভেলে সাঈদীকে দেখার ঘটনা ছোট করে দেখার কিছু নেই।

ছোট করে দেখতে মানা করা মানে এই নয় যে, একে ডিফেন্ড করা। আবার এই ঘটনাকে ‘অশিক্ষিত/মূর্খ/কূপমন্ডূক’ বলে উড়িয়ে দেয়া মানে হচ্ছে যে, বিশাল জনগোষ্ঠী যারা এই ধারণা লালন ক’রে তাদের ‘পলিটিক্যাল’ প্রজেক্ট হাজির করতে চাইছে বা স্বপ্ন দেখছে তাকে আনক্রিটিকালি দেখা।

দীপেশ এই জায়গায় বেশ ভাল ক’রে হাজির হন। বাংলাদেশের এই ভূখন্ডে নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্তের ইসলামমানস বা কলকাতার মধ্যবিত্ত হিন্দুমানসএর একটু গভীরে প্রবেশ করলে এধরণের চৈতন্যের খোঁজ পাওয়া যায়।

ইউরোপিয়ান এনলাইটেনমেন্টএর লেবাস ধরে এই ধরণের মানসকে হুট করে মনে হতে পারে ‘অপ্রয়োজনীয়’ বা ‘মূর্খতা’। কিন্তু এই যে একে অসংগতি বলছি, এর গ্লোবাল ক্যাপিটালিস্ট রাজনীতিটা তখন ভুলে যাই। জন লকের ‘মডার্ন সাবজেক্ট’ যখন বলে যে যৌবনে পৌঁছার পরে যারযার পিতার নির্দেশ/আদেশ থেকে সন্তান মুক্ত। সে নিজেই সার্বভৌম। সে নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেবে। তার সাথে অন্য ভাইয়ের ভ্রাতৃত্ববোধ তার ফ্যামিলি লিনিয়েজ দিয়ে হবে না বরং সামাজিক স্বার্থ চুক্তির ভিত্তিতে।

এই জন লককে ভারতীয় মোটা কন্টেঙটএ হাজির করলে দেখা যায়, এখানকার পরিবার তিন ধরণের কর্তব্য পালনে পৃথিবীতে এসেছে: দৈবকর্ম (ঈশ্বরএর জন্য), পিতৃকর্ম (পারিবারিক বংশক্রমএর লিগ্যাসি বহন) এবং সবশেষে বিশ্বকর্ম (পার্থিব কাজকর্ম)

দীপেশ নানা ধরণের টেঙট ঘেঁটে দেখান এই ভারতীয় মানসের জনগণেরা যদিও পুঁজিবাদের দড়ির হাতে বাঁধা পড়ে পার্থিব কর্ম সম্পন্ন করছে কিন্তু দিনশেষে বাড়ি ফিরে পবিত্র গোসল দিয়ে নিজেকে সঁপে দিচ্ছে ঈশ্বর আর বংশের সেবায়।

এত বহুধা বর্তমানে বসবাসকারী এই ভারতীয় জনগণ, জন লকের মত অতীতএর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে পাওে না। কে নোভাবেই পারছে না। দক্ষিণ এশিয়া বলি, লাতিন আমেরিকা বলি, মোদ্দা কথায় এককালের সকল ঔপনিবেশিক অঞ্চলএর সংস্কৃতিআঞ্চলিক দর্শননির্দিষ্ট টাইম ফ্রেমওয়ার্ক কোনোভাবেই সম্পূর্ণভাবে তথাকথিত ইউরোপিয় অ্যানালাইটিক্যাল রিজনএ নিজেকে সঁপে দিতে পাওে না।

এই সঁপে দিতে নাপারার ফল হিসেবে অনেক ধরণের রাজনীতি হাজির আছে সারা বিশ্বে। বেশিরভাগ যে রাজনীতি, তা হচ্ছে ‘আফসোসের রাজনীতি’। যেমন: আমাদের বুর্জোয়া শে্রিণ পশ্চিমের মত বিকশিত/শৃঙ্খলিত/ফ্যাসিলিটেটিভ নয় তাই আমাদের দেশে আনইভেন ডেভেলপমেন্ট হচ্ছে।

এইসব আরও অনেক ধরণের রাজনীতি শেষমেষ সংগ্রামএর রাজনীতির দোহাই দিয়ে (একে দীপেশ নিন্দা করছেন না, বলছেন অসম্পূর্ণ) নির্মোহ অতীতগুলি এড়িয়ে যেতে চায়, মুছে দিতে চায়।

তাই দীপেশএর প্রতি আমার প্রথম কুর্নিশ: তিনি এই ‘লিভিং’এর সত্যকে কোন আবরণ ছাড়া মুখোমুখি হতে বলছেন।

দীপেশএর পুরো বইটা নিয়ে নানা দৃষ্টিকোণ থেকে লিখব। নালিখলে আমার দীপেশ বোঝাপড়াটা অতলে হারিয়ে যাবে। এবং দীপেশকে নিয়ে সকলের বোঝাপড়া অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

x