দীপংকরেই আস্থা আওয়ামী লীগের বিজয় ধরে রাখতে চায় জেএসএস

নির্বাচনী ট্রেনে ।। রাঙামাটি

বিজয় ধর, রাঙামাটি

শুক্রবার , ৯ নভেম্বর, ২০১৮ at ৬:৩৫ পূর্বাহ্ণ
166

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি ও হ্রদ-পাহাড়ের জেলা রাঙামাটিতে এখন পুরোদমে বইছে নির্বাচনী হাওয়া। আগামী ২৩ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের ২৯৯ নম্বর সংসদীয় এই আসনে সম্ভাব্য প্রার্থীরা যে যার মতো করে প্রচার-প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জেলার সকল উপজেলায় আওয়ামী লীগ প্রকাশ্যে প্রচারণা চালালেও তেমন প্রচারণায় নেই পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংতি সমিতি (জেএসএস)। তবে যেকোনো কৌশলেই গতবারের বিজয় ধরে রাখতে চায় দলটি। এছাড়া এবার জাতীয় পার্টির দু’জন মনোনয়ন প্রত্যাশীও রয়েছেন। সবমিলিয়ে আগামী নির্বাচনে যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হতে যাচ্ছে, সেটা অনেকটা পরিষ্কার। তবে দল হিসেবে আওয়ামী লীগ ঐক্যবদ্ধ থাকলেও এখনও অনেকটা নিশ্চুপ আঞ্চলিক দল জেএসএস।
উল্লেখ্য, ৬১১৬ দশমিক ১৩ বর্গকিলোমিটারের বৃহত্তর এ জেলাতে একটি মাত্র সংসদীয় আসন। দশ উপজেলা ও দুই পৌরসভা নিয়ে গঠিত এ জেলার জনসংখ্যা ৬ লাখ ২০ হাজার ২১৪ জন। এর মধ্যে ভোটার ৪ লাখ ২০ হাজারের মত। ৯০-তে এরশাদ সরকারের পতনের পর বিএনপি সরকার গঠন করলেও আসনটি জিতে নিয়েছিল আওয়ামী লীগ। ৯৬ নির্বাচনেও অক্ষুণ্ন থাকে সেই ধারাবাহিকতা। এরপর ২০০১ সালে বিএনপির হাতে চলে গেলেও পরের নির্বাচনে অর্থাৎ ২০০৮ সালে আসনটি পুনরুদ্ধার করে আওয়ামী লীগ। কিন্তু ২০১৪ সালে নির্বাচনে অনেকটা কাকতালীয়ভাবে আসনটি জেএসএস এর হাতে চলে যায় এবং উত্থান হয় নতুন শক্তির। এর পর থেকে পাল্টে যায় বড় দুই দলের হিসাব-নিকাশ।
৯০ থেকে ২০০৮ সালের নির্বাচন পর্যন্ত পাহাড়িদের ভোট ব্যাংকের আশীর্বাদ নিয়ে বড় দু’দল এতে জয়ী হলেও ২০১৪ সালের নির্বাচনে জেএসএস এর জয় বড় দলেরই মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যদিও আঞ্চলিক এ দলটির বিরুদ্ধে পেশিশক্তি ও অস্ত্রের মুখে ভোটারদের ভীতসন্ত্রস্ত করে রাখার অভিযোগ হরহামেশাই তুলছে আওয়ামী লীগ । এখানে পাহাড়ি ভোটাররা প্রার্থী নির্বাচনে বড় ভূমিকা পালন করে থাকেন। আগামী নির্বাচনেও তারা যে প্রার্থীকে বেছে নিবেন, তার জয়ই শতভাগ নিশ্চিত বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
ঐক্যবদ্ধ আওয়ামী লীগ : স্থানীয় আওয়ামী লীগের কাছে তাদের ‘সফল নেতা’ ও সাবেক পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদারের নাম শোনা যাচ্ছে সবখানে। স্থানীয়দের কাছে তিনি ‘দাদা’ নামেই পরিচিত। ‘দাদা’ দীপংকর তালুকদারেই আস্থা রাখছেন রাঙামাটি আওয়ামী লীগের সকল নেতাকর্মী। দলটির সবাই একবাক্যে স্বীকার করেছেন, দীপংকর তালুকদারের বিকল্প আপাতত নেই। সেদিক দিয়ে আসন্ন একাদশ জাতীয় নির্বাচনে দলের পক্ষে তিনিই যে একমাত্র প্রার্থী তা অনেকটাই নিশ্চিত করে বলা যায়। আওয়ামী লীগের এই নেতা ১৯৯১, ৯৬, ২০০৮ সালে এ আসনে জয় লাভ করেন। এই সময়ের মাঝে দলকে সুসংগঠিত করা ছাড়াও এলাকার যথেষ্ট উন্নয়ন করেছেন। তবে পার্বত্যাঞ্চলে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার পাশাপাশি শান্তিচুক্তির বিষয়ে ধীরগতির কারণে বিরাগভাজন হয়েছেন জেএসএস এর কাছে। তারই ফলস্বরূপ ২০০১ সালের নির্বাচনে জেএসএস বিএনপিকে সমর্থন দিলে দীপংকর তালুকদার বিএনপি প্রার্থী মনি স্বপন দেওয়ানের কাছে হেরে যান এবং ২০১৪ সালে বিএনপি বিহীন নির্বাচনে জেএসএস এর প্রার্থী উষাতন তালুকদারের কাছেও হারতে হয় পার্বত্য রাঙামাটির পরীক্ষিত এই রাজনীতিবিদকে। এরপরও সবকিছু গুছিয়ে বর্তমানে ঐক্যবদ্ধ আওয়ামী লীগ দীপংকর তালুকদারকে সাথে নিয়ে আসন পুনরুদ্ধারে কাজ করে যাচ্ছে।
রাঙামাটি জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হাজী মো. মুছা মাতব্বর বলেন, বরাবরের মত আগামী নির্বাচনে দীপংকর তালুকদারই দলটির একক প্রার্থী। বিকল্প কাউকে আপাতত ভাবছি না। তিনি যতদিন স্বেচ্ছায় অবসরে যাবেন না, ততদিন অন্য কাউকে নিয়ে চিন্তাও করছি না। তিনি বলেন, আসনটিতে দলের একক প্রার্থী হিসেবে এবারও দীপংকর তালুকদারকে চূড়ান্ত করে কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। মনোনয়ন তিনিই পাবেন। আসনটিতে একাদশ নির্বাচন নিয়ে আমরা প্রস্তুত। এ লক্ষ্যে জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড কমিটির যাবতীয় কর্মী সমাবেশ সম্পন্ন করা হয়েছে। এবার জয় নিয়ে আমরা নিশ্চিত। তবে নির্বাচনের আগে পাহাড় থেকে সব অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করতে হবে। আমরা আশা করছি, সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে সরকার তাই করবে। দলীয় প্রার্থী নিয়ে এরই মধ্যে মাঠে নেমে পড়েছি আমরা।
রাঙামাটি জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও একাদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের একক প্রার্থী দীপংকর তালুকদার বলেন, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অস্ত্রের মুখে জনগণের ভোট কেড়ে নিয়েছে জেএসএস। ফলে বিগত পাঁচটি বছর জনগণ তাদের কাছ থেকে কিছুই পাইনি। এলাকায় যা উন্নয়ন হয়েছে সব আওয়ামী লীগই করেছে। তাই আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণ আওয়ামী লীগকেই জয়ী করবেন বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
নিশ্চুপ জেএসএস : ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে বড় দুই দল আওয়ামী লীগ বা বিএনপিকে জেতাতে ভূমিকা রাখা আঞ্চলিক দল পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংতি সমিতি (জেএসএস) এখন দুটি দলের জন্যই মাথা ব্যাথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিজেদের রয়েছে বিশাল ভোট ব্যাংক, যারা দলটির প্রতি আনুগত্য প্রকাশে দ্বিমত করে না এবং দলের প্রধান সন্তু লারমার আদেশ নির্দেশ যেকোনো মূল্যে মেনে চলতে বদ্ধপরিকর। তারই জলন্ত প্রমাণ ২০১৪ সালের ১০ম সংসদ নির্বাচন। সেবার নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী জেএসএসের উষাতন তালুকদার ৯৬ হাজার ২৩৭ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের দীপংকর তালুকদার ৭৭ হাজার ৩৮৫ পান। তবে আগামী সংসদ নির্বাচনে দলটির প্রার্থী কে হবেন, তা এখনও পরিষ্কার নন। মুখ খুলছেন না শীর্ষ নেতাদের কেউই। দলের ভেতর-বাইরে বর্তমান সাংসদ উষাতন তালুকদারকে নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে। বিকল্প হিসেবে নাম শোনা যাচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক কমিটির সভাপতি গৌতম দেওয়ানের। তবে সবকিছু নির্ভর করছে দলের চেয়ারম্যান সন্তু লারমার ওপর। তার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। আগামী নির্বাচনে কাকে প্রার্থী করবেন বা করবেন না সেটা ঝুলে থাকলেও জয়ের ব্যাপারে একেবারে নিরব ভূমিকায় আছে দলটি। নিজেদের ভোট ব্যাংককে কাজে লাগিয়ে আগামী নির্বাচনের বৈতরণী পার হওয়ার আশায় আছেন দলটির নেতা-কর্মীরা।
এ প্রসঙ্গে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেএসএস এর এক সিনিয়র নেতা বলেন, দল থেকে কাকে মনোয়ন দিবে সেটা এখনো নিশ্চিত হয়নি। কয়েকদিনের মধ্যে হয়তো একটি সিদ্ধান্ত আসতে পারে। এদিকে বর্তমান সাংসদ উষাতন তালুকদার বলেন, গত নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়ায় আমি নির্বাচিত হয়েছি। এখানকার জনগণ শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়নে বিশ্বাসী। আগামী নির্বাচনেও জয়ের ব্যাপারে আমি নিশ্চিত।
জাতীয় পার্টিতে দু’জন : এদিকে আসনটিতে জাতীয় পার্টিরও দুজন প্রার্থী রয়েছেন। তারা হলেন, কেন্দ্রীয় সদস্য মো. আরফান আলী এবং জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক প্রজেশ চাকমা। জাতীয় পার্টির মনোনয়ন প্রত্যাশী প্রজেশ চাকমা বলেন, এবারও একক প্রার্থী দিয়ে রাঙামাটি আসনে নির্বাচন করবে জাতীয় পার্টি। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে দলীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন। রাঙামাটি আসনে আমি এবং কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মো. আরফান আলী মনোনয়নের জন্য আবেদন করেছি। দল যাকে মনোনয়ন দেয়া হবে তিনিই নির্বাচন করবেন। আমরা জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী। কারণ জনগণ এখন সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদকে ক্ষমতায় আনতে চায়।
জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও জেলা কমিটির সিনিয়র সহ-সভাপতি মো. আরফান আলী বলেন, ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৯৯নং রাঙামাটি আসন থেকে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে আমি নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করেছি। তিনি বলেন, বিগত এরশাদ সরকারের আমলে পার্বত্য রাঙামাটিতে যে উন্নয়ন করেছে তা এখানকার সাধারণ মানুষ এখনও মনে রেখেছে। বর্তমানে জনগণ সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদকে আবারো ক্ষমতায় দেখতে চান। আগামী সংসদ নির্বাচনে আমি মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী এবং জয়ের ব্যাপারেও।
কী ভাবছেন ভোটাররা : পাহাড়ি এ জনপদের মূল সমস্যা জাতিগত বিভেদ, চাঁদাবাজি, অবৈধ অস্ত্র, আঞ্চলিক দলগুলোর মধ্যে খুনোখুনি ও রক্তপাত। নির্বাচন এলেই এসব সমস্যা আরো দ্বিগুণ রূপ নেয়। শংকায় দিন কাটে এখানকার বাসিন্দাদের। তবে পাহাড়ি-বাঙালি সবাই শান্তির পক্ষে, সকলেই শান্তি চায়।
স্থানীয়দের মতে, যে প্রার্থী জনগণের পাশে থেকে এই পার্বত্যাঞ্চলের উন্নয়ন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারবেন, তাকেই বেছে নিবেন ভোটাররা।

x