দি হাঞ্চব্যাক অফ নটরডেম

শৈবাল চৌধূরী

মঙ্গলবার , ১৪ মে, ২০১৯ at ৬:২১ পূর্বাহ্ণ
64

পৃথিবীর প্রতিটি নামকরা শহরের প্রতীকী কিছু স্থাপনা আছে। ফরাসী দেশের রাজধানী পারী বা প্যারিসের তেমনি দুটি প্রতীকী স্থাপন নটরডেম গির্জা ও আইফেল টাওয়ার। এ দুটি দৃশ্যনন্দন স্থাপনা বিশ্ব ঐতিহ্যের অন্যতম নিদর্শন। মানব সভ্যতার দুটি সেরা কীর্তিও বটে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় গত ১৫ এপ্রিল ২০১৯ তারিখে নটরডেম চার্চ আগুনে ভস্মীভূত হলো। এই সাথে ধ্বংস হলো মানব সভ্যতার একটি বড় শিল্পকর্ম। নটরডেম চার্চ কেবল একটি পবিত্র উপসনালয় ছিল না। এর জটিল গথিক গঠন যা ছিল গোলক ধাঁধার মতো যুগে যুগে মানুষকে রীতিমত বিস্মিত ও আবিষ্ট করে রেখেছিল। এটি ছিল স্থাপত্যকলার অপূর্ব এক নিদর্শন। খ্রীস্টান সম্প্রদায়ের কাছে ধর্মীয় কারণে এই গির্জা স্বভাবতই শ্রদ্ধার আসনে থাকলেও স্থাপত্যকলার অভিনবত্বের গুণে বিশ্বের তাবৎ শিল্পানুরাগী মানুষের কাছে এটা ছিল আদরনীয় ও দর্শনীয়। আফগানিস্তানের বামিয়ানের যুগল বুদ্ধমূর্তি যখন তালেবানরা ধ্বংস করে কিংবা ইরাক মার্কিন একপেশে যুদ্ধের সময় যখন মার্কিনী লুটেরারা বাগদাদের সুপ্রাচীন গ্রন্থাগার ও জাদুঘর দুটি ইচ্ছেমতো লুটেপুটে নেয় তখন যে মানসিক যন্ত্রণা পেয়েছিল সচেতন প্রতিটি মানুষ, অনেকদিন পর নটরডেম চার্চ পুড়ে যাওয়ার ঘটনায় একই কষ্ট পেয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, ফ্রান্সের মতো দেশে কী করে এমন অগ্নিকাণ্ড ঘটতে পারে। এতো আর বাংলাদেশ নয় যেখানে ঢাকায় কদিন পর পর আগুন লাগে। নিমতলী, চকবাজার, বনানীর মতো ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড সংঘটিত হয়, রানা প্লাজার মতো হত্যাযজ্ঞ ঘটে যেখানে শত শত মানুষ নিমেষে অসহায় অবস্থায় পুড়ে অঙ্গার হয়ে যায়। সারাদেশ তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে। অবশ্য ১৭ কোটি জনসংখ্যার দেশে কয়েকশো মানুষ মরলে কিইবা এমন যায় আসে? যেখানে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন গড়পড়তা ডজনখানেক মানুষ মরে!
কিন্তু ফ্রান্সে? যে দেশ জাতিসংঘের প্রধান পাঁচটি দেশের একটি। উন্নতি ও প্রযুক্তির চরম শিখরে যে দেশের অবস্থান। সে দেশে সারাইকাজ চলাকালে এরকম একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন পুড়ে যেতে পারে এটা মানতে একটু কষ্ট হয় বৈকি। যতই বলা হোক আগুনের কাছে সবাই অসহায়, দৈব দুর্ঘটনার কাছে মানুষ অসহায়, তারপরও প্রশ্ন থাকে পর্যাপ্ত ও প্রয়োজনীয় সাবধানতা নিশ্চয় অবলম্বন করা হয়নি।কোথাও নিশ্চয় ঘাটতি ছিল। ফ্রান্সের রাষ্ট্রপতি যতই বলুন, ফ্রান্স আবার নটরডেম ক্যাথিড্র্যাল নির্মাণ করবে। কিন্তু মূলটাতো আর ফিরে পাওয়া যাবে না। যেটা নতুন হবে সেটা হবে এক ‘রেপ্লিকা।’
এই নটরডেম গির্জা নিয়ে কত গান, কবিতা, গল্প, অপেরা নাটক যে লেখা হয়েছে তার হিসেব নেই। তবে যে উপন্যাসটি গত দুই শতাব্দী ধরে কালজয়ী হয়ে রয়েছে, সেটি ‘দি হাঞ্চব্যাক অফ নটরডেম।’ ভিক্টর হুগোর লেখা। ফরাসী ভাষায় ১৮৩১ সালে। এই উপন্যাসকে অবলম্বন করে অনেকবার চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। মঞ্চস্থ হয়েছে অনেক নাটক, অপেরা। তবু তার সমাদর কমেনি।
পত্রিকান্তরে জানা গেল, ভিক্টর হুগোর এই কালজয়ী উপন্যাস এবং সে উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ছবিগুলোর ডিভিডির বিক্রি হঠাৎ করে বেড়ে গেছে। গির্জাটি পুড়ে যাওয়ার পর। প্রকাশকেরা আর ডিভিডি মেকারেরা দেদারসে বই আর ডিভিডি প্রকাশ করছেন। এটা কেবল ফ্রান্সে নয়, ইউরোপ জুড়ে এবং আমেরিকায়। এসব জায়গায় ছবিটিও আবার রিলিজ হয়েছে। দেখছেন দর্শক। নস্টালজিয়ার একটি বিষয়।
অনেকে বলে থাকেন ভিক্টর হুগো নটরডেম গির্জায় সংঘটিত সত্যি একটি ঘটনার অবলম্বনে তাঁর বহুল পঠিত উপন্যাসটি লিখেছিলেন। যদিও উপন্যাসিক এ বিষয়ে কিছু বলেননি। বিশ্বের সব ভাষায় এই উপন্যাস অনুদিত হয়েছে। হাঞ্চব্যাক অফ নটরডেম উপন্যাস অবলম্বনে প্রথম ছবিটি তৈরি হয় ১৯০৬ সালে ফ্রান্সে এ সমারেলডা নামে। ছবিটি স্বভাবতই ছিল নির্বাক। এরপর ‘নটরডেম দ্য পারী’ নামে ফ্রান্সে আরেকটি ছবি তৈরি হয় ১৯১১ সালে। সেটিও নির্বাক। ১৯১৭ সালে হলিউডে এই উপন্যাসটি নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু হয়। হলিউডে ১৯১৭ সালে ‘দি ডার্লিং অফ প্যারিস’ নামে প্রথম ছবিটি তৈরি হয়। এটাও নির্বাক।
সবাক যুগে হাঞ্চব্যাক অফ নটরডেম উপন্যাস অবলম্বনে প্রথম ছবি তৈরি হয় হলিউডে ১৯২৩ সালে। ওয়ালেস ওয়ারসলির পরিচালনায় ছবিটিতে অভিনয় করেছিলেন, লন চেনি, প্যাটসি রুথ মিলার, নরমান কেরি, আর্নেস্ট টরেন্স প্রমুখ। এঁরা সকলেই সে সময়ের তারকা অভিনয় শিল্পী। এই ছবিটি যথেষ্ট দর্শক প্রিয়তা অর্জন করে। আরেকটি বিষয় লক্ষ্যণীয়, এই ছবিটি পরবর্তী সময়ে যখন যেখানে চিত্রায়িত হয়েছে, তারকা অভিনয় শিল্পীরা মুখ্য তিন চরিত্রে অভিনয় করেছেন। শীর্ষস্থানীয় অভিনয় শিল্পীরা সবসময় আগ্রহী থাকতেন এই উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিতব্য ছবিতে অভিনয়ের জন্যে।
১৯৩৯ সালে হাঞ্চব্যাক অফ নটরডেম আবারও চিত্রায়িত হয় হলিউডে উইলিয়াম ডিয়েটেরির পরিচালনায়। অভিনয়ে ছিলেন চার্লস লাফটন, মৌরিন ও হারা, সেড্রিক হার্ডবিক, থমাস মিশেল প্রমুখ সে সময়ের শীর্ষস্থানীয় অভিনয় শিল্পীরা। এই ছবিটি সে সময় বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হয়। কেবল তাই নয়, সমালোচকেরাও যথেস্ট সমাদর করেছিলেন ছবিটিকে। এরপর আরো কয়েকবার এই উপন্যাস চিত্রায়িত হয়েছে কখনো হলিউডে, কখনো ইউরোপে। তবে সবচেয়ে বেশি চিত্রায়িত হয়েছে হলিউডে। এনিমেশন সিনেমাও তৈরি হয়েছে প্রচুর। এমনকি ডিজনি পিকচার্স থেকেও। বারবার উপন্যাসটি চিত্রায়নের নেপথ্যে একটি বাণিজ্যিক কারণও আছে। উপন্যাসের কাহিনী রেখা যথেষ্ট মনোগ্রাহী। সহজেই তা পাঠক কিংবা দর্শককে আবিষ্ট করার ক্ষমতা রাখে। এই কাহিনী রেখাকে ভাঙিয়ে এই উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন ভাষায় ছবি নির্মিত হয়েছে বহুবার। বাংলাদেশেও হয়েছে দু’বার। হারানো দিন, বানজারান ইত্যাদি। যদিও উপমহাদেশে নির্মিত প্রতিটি ছবিই অত্যন্ত নিম্নমানের।
বিউটি এন্ড বিস্ট নামের যে উপকথাটি বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়, তার কাহিনী রেখার সাথে অনেকটাই মিলে যায় ভিক্টর হুগোর উপন্যাস হাঞ্চব্যাক অব নটরডেম। তবে ভিক্টর হুগোর উপন্যাসটি বিয়োগান্তক যা বাস্তবসম্মত। নটরডেম গীর্জার কুঁজো কদাকার প্রহরী, অপরূপা এক যাযাবর সুন্দরী তনয়া এবং গীর্জার যাজক এই তিনজনের সম্পর্কের দ্বন্দ্ব উপন্যাসের উপজীব্য। তবে কুঁজো প্রহরী ও জিপসি সুন্দরীর প্রেমই উপন্যাসের মূল উপাখ্যান। সেই ১৮৩১ সাল থেকে এই উপাখ্যান-এই উপন্যাস সারা দুনিয়াকে মাতিয়ে রেখেছে- স্মরণীয় করে রেখেছে তার রচয়িতা ভিক্টর হুগো নামের অসামান্য এক লেখককে। হাঞ্চব্যাক এর এনিমেশন ছবিগুলিও এখনো সমান জনপ্রিয়। সর্বশেষ এনিমেশনটি তৈরি হয় ২০০২ সালে। তবে ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে ডিজনি পিকচার্স তাদের পুরানো এনিমেশনটির নেপথ্যের কণ্ঠস্বর পুনরায় ভাব এবং রং ও ইমেজ ডিজিটালাইজড করে নতুন করে রিলিজ করেছে। নতুন ভার্সানটিও ইতোমধ্যে দর্শকনন্দিত হয়েছে।
১৯৮২ সালে মাইকেল টুশনার ও এ্যালান হিউমের যুথ পরিচালনায় হাঞ্চব্যাক অফ নটরডেম আবারো চিত্রায়িত হয় হলিউডে। এবারের ছবিটিও যথেষ্ট সমাদৃত হয়। মুখ্য তিন চরিত্রে অভিনয় করেন জাঁদরেল তিন অভিনয় শিল্পী এ্যান্থনি হপকিন্স (কুঁজো প্রহরী), ল্যাসলি অ্যান ডাউন (জিপসি সুন্দরী) ও ডেরেক জ্যাকবি (যাজক)। এ ছবিতে এ্যান্থনি হপকিন্সের অভিনয় ছিল মর্মস্পর্শী।
সর্বশেষ ছবিটি তৈরি হয়েছে ১৯৯৬ সালে গ্যারি ট্রাউসডেল ও কার্ক ওয়াইজের পরিচালনায়। এটাও হলিউডে। অভিনয় করেন টম হাল্‌স, ডেমি মুর, হেইডি মলেনহয়ের ও টনি জে। কিন্তু এই ছবিটি তেমন সাড়া তৈরিতে সক্ষম হয় নি।
তবে সবকিছুকে ছাপিয়ে যে ছবিটি সেরার মুকুট পরে কিংবদন্তী হয়ে রয়েছে সেটি হলো ১৯৫৬ সালে ফ্রান্স ও ইতালির যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত ‘হাঞ্চব্যাক অফ নটরডেম’। আর এই ছবিটিই আবার ইউরোপে রিলিজ হয়েছে এবং এ ছবির ডিভিডিই দর্শকদের আগ্রহের শীর্ষে রয়েছে। হলিউডেরও পরোক্ষ সম্পৃক্ততা ছিল এ ছবিতে। বিশেষ করে বিশ্বজুড়ে পরিবেশনার ক্ষেত্রে। ইস্টম্যান কালারে নির্মিত সিনেমাস্কোপ এই চলচ্চিত্র প্রযোজনা করেন ফ্রান্সের প্যারিস ফিল্মস ও ইতালির প্যানিতালিয়া। বিশ্বের সর্বত্র এই ছবিটি প্রদর্শিত হয়। বাংলাদেশেও অনেকবার প্রদর্শিত হয়েছে।
এই সিনেমার বিশেষত্ব ছিল ঘটনা ও চরিত্রের ওপর আলোকপাতের পাশাপাশি নটরডেম গির্জার গথিক স্থাপত্যের অসাধারণ দৃশ্যায়ন। সিনেমাটোগ্রাফির দায়িত্বে ছিলেন মাইকেল কেলবার। শ্রুতিনন্দন সঙ্গীত নির্মাণ করেছিলেন জর্জ অরিক। চিত্রনাট্য রচনা করেন জ্যাক প্রেভার্ট ও জাঁ অঁরেশ। ১০৭ মিনিটের ছবিটি পরিচালনা করেন জাঁ দেলানয়।
তবে এ ছবির চিরস্মরণীয় দিকটি হলো কুঁজো প্রহরী কোয়াসিমরো চরিত্রে এ্যান্থনি কুইন, জিপসি কন্যা এ সমারেলদার চরিত্রে জিনা লোলোব্রিজিদা ও যাজক ক্লদ ফ্রোলোর চরিত্রে জাঁ দানেতের অসামান্য অভিনয়। অভিনয়ে আরো ছিলেন অ্যাঁলা কুনি ও রবার্ট হার্শ। বিশেষ করে এ্যান্থনি কুইন ও জিনা লোলোব্রিজিদার মর্মস্পর্শী অভিনয় এ ছবিকে অমর করে রেখেছে। দুর্দান্ত চিত্রনাট্য ছবিটির প্রতিটি দৃশ্যকে দর্শকদের স্মৃতিতে অমলিন করে রাখে। শেষ দৃশ্যে আহত কোয়াসিমরো যখন মৃতা এ সমারেলডোর বুকে তাজা রক্ত গোলাপটি রেখে ধীরে ধীরে নিজেও মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে তখন যেন আবারো প্রমাণিত হয়-ভালোবাসার চেয়ে মহীয়ান আর কিছু এই পৃথিবীতে নেই। উপন্যাসকে ছাড়িয়ে চলচ্চিত্রটি তখন আরো মহৎ হয়ে ওঠে . . .

x