দিব্য’র গল্প

রাজন বড়ুয়া

বুধবার , ৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ৬:২৩ পূর্বাহ্ণ
49

রাত্রির ষষ্ঠ জন্মদিন।
ঘরোয়া আয়োজনে চলছে জন্মদিন পালনের প্রস্তুতি। ড্রয়িং রুম-রান্নাঘরে সবার ব্যস্ততা। কেউ কারো দিকে তাকানোর সময় নেই।
অন্যদিকে আমন্ত্রিত অতিথিরা ছাড়াও ছোটো ছোটো ছেলে-মেয়েরাও কিন্তু বসে নেই।
তারাও রাত্রিকে নিয়ে হৈ চৈ করছে। কখনো ছুটোছুটি কিংবা নিজেরা গল্পগুজব করছে। মোট কথা, যে যার কাজে ব্যস্ত।
কিন্তু দিব্য! সে এতসবের মধ্যে নেই। তাহলে সে কি করছে?
হ্যাঁ, সেও কিন্তু একটা কাজ নিয়ে ব্যস্ত। তবে তার বয়সী কারো সাথে নয়। সে খেলছে মোবাইল নিয়ে। তার দিদার মোবাইল।
ড্রেসিং টেবিলের উপর থেকে নিয়ে মোবাইলের স্ক্রিন নাড়ছে আর মজা করছে। কিছুক্ষণ পর পর পাখির ডানার মতো দু’হাত জাপটাচ্ছে আর খাটে লাফাচ্ছে। আবার কখনো লুটোপুটি খেলছে।
দিব্য রাত্রির পিসতুতো ভাই। দু’জনেই প্রায় একই বয়সের। ২০১৩ সালে জন্ম। সেই হিসেবে একসাথে বেড়ে ওঠা।
জন্মদিনের উৎসব মানেইতো কেক কাটা। ছেলে-বুড়ো সবার নজর থাকে এইদিকে। কারণ জন্মদিনের কেক ছাড়া জন্মদিন পালন কেমন যেন অসম্পূর্ণ মনে হয়। সময় হলো রাত্রির জন্মদিনের কেক কাটার। কেকের চারদিকে সুন্দর করে মোমবাতি জ্বালানো হয়েছে। উপস্থিত সবার চোখে-মুখে খুশি যেনো উপচে পড়ছে। সবাই কেক সামনে রেখে রাত্রিকে নিয়ে জায়গায় দাঁড়িয়ে যায়। তখনি ডাক পড়ে দিব্য’র। কিন্তু কে শোনে কার ডাক। দিব্য আপন মনেই মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত। ব্যস্ত থাকবে নাই বা কেন? সে যে তাদের বাসায় মোবাইল ব্যবহার করতে পারে না। মামার বাড়িতে আসলে দিদার আদর পায়। সাথে সাথে মোবাইল নিয়ে খেলার সুযোগও।
দিব্য যখন আসছে না, তখন তার বাবা গিয়ে তাকে সবার সাথে কেক কাটার জন্য নিয়ে আসে। কিন্তু সে কোনোমতেই সেখানে দাঁড়াতে চাইছে না। ঝুপ করে ফ্লোরে বসে পড়ছে। মামার বাড়ির লোকেরা ব্যাপারটা বুঝলেও আমন্ত্রিত অতিথিরা তা সম্ভবত বোঝেনি। হয়তো মনে করছে দিব্য মিশুক নয় বলে এ ধরনের সামাজিক অনুষ্ঠান এড়িয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ওদিকে দিব্যর ধারণা, হয়েতো কেউ তাকে বোঝতে চাচ্ছে না। তাই সে বিমর্ষ হয়ে আছে। দিব্য’র বাবা অতসব ভেবে অনেক চেষ্টা করেও তাকে কেককাটার অনুষ্ঠানে রাখতে পারলো না। অনন্যোপায় হয়ে তার বাবা দিব্যকে নিয়ে নীরবে ভেতরে চলে যায়।
বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান-আয়োজনে দিব্য’র এমন আচরণ তার বাবা-মার গা সওয়া হয়ে গেছে। আর না সয়ে উপায় কী। দিব্য কারো সঙ্গে খুব বেশি মিশতে চায় না। অংশগ্রহণমূলক খেলাধুলায় যোগ দিতে চায় না। পাশাপাশি আবার অন্যদের খেলায়ও সমস্যা করে। কারণ সে স্বাভাবিক শিশু নয়। সে যে এক ‘বিশেষ শিশু’। স্বাভাবিকতার সাথে তাল মেলাতে তার একটু সমস্যা হয়-সময় লাগে। দিব্য’র এই সমস্যা নিয়ে তার বাবা-মা নানা জন থেকে নানা পরামর্শ নিয়েছেন। কেউ ভালো বললে সেটাও গ্রহণ করেছেন, কেউ মন্দ বললে সেটাও গ্রহণ করেছেন। এমন কি শুধু দেশে নয়, দেশের বাইরে নিয়ে গিয়ে দিব্যকে চেকআপ করাসহ নানা মেডিকেল সহায়তাও নিয়েছেন।
এতকিছুর পরও দিব্য’র মা-বাবা কিন্তু হাল ছাড়েনি। বাবা-মা সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তারা দিব্যকে নিয়ে নতুন নতুন স্বপ্ন দেখছেন। আর দিব্যকে স্বাভাবিকতায় ফিরিয়ে আনতে পদক্ষেপ নিতেও কার্পণ্য করছেন না। যে যেভাবে বলছেন সময়-সুযোগ পেলেই যেখানে সম্ভব সেখানে যাচ্ছেন, এ ব্যাপারে পরামর্শ গ্রহণ করছেন। কখনো আবার নিজেরা নতুন নতুন কর্মপন্থা বের করছেন। একটাই লক্ষ্য, দিব্য অন্য সবার মতো স্বাভাবিকতায় যেন ফিরে আসে।
স্পিচ থেরাপি, অক্যুপেশনাল থেরাপিসহ আরো বেশ ক’ধরনের মেডিক্যাল চিকিৎসা চলছে দিব্যর। খুশির কথা হলো ইতোমধ্যে দিব্য’র মাঝে একটু উন্নতিও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তবে বয়সের সাথে পাল্লা দিয়ে এই উন্নতি যথাযথ নয় বলা যায়।
দিব্য প্রথম শ্রেণিতে পড়ছে। তবে অন্যান্য দশ-পাঁচটা ছেলের মতো নয়। সে স্বাভাবিক স্কুলে (সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়) লেখাপড়া করছে, কিন্তু সঙ্গে তার মাকেও ক্লাসে উপস্থিত থাকতে হচ্ছে। কারণ এখনো সে একা একা ক্লাসে বসে না। মা সাথে থাকলে ক্লাস করতে পারে। স্কুলের শিক্ষকরাও তার ব্যাপারে যথেষ্ট আন্তরিক। তারাও দিব্য’র মার পাশে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু তাঁরাতো এ ব্যাপারে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নন। এর পরও তাঁরা সাধ্যমতো সহযোগিতা করে যাচ্ছেন।
স্কুল থেকে বাসায় ফিরে দিব্য বেশ ফুরফুরে মেজাজে থাকে। রাতে মায়ের সাথে স্কুলের হোমওয়ার্ক করতে বসে। যদিও তাকে হোমওয়ার্ক করাতে মাকেও বেশ বেগ পেতে হয়। যা হোক, বেশসময় নিয়ে করা হোমওয়ার্কগুলো দেখলে তার বাবা-মায়ের চোখে-মুখে আনন্দের ঝিলিক দেখা যায়। দু’জনে আরো আশাবাদী হয়ে উঠেন। ছেলেকে স্বাভাবিক চালচলনে অভ্যস্ত হওয়ার দিকে এগিয়ে নেয়ার আশায় বুক বাঁধেন। আশা-নিরাশার দোলাচলে স্বপ্নের বীজ বুনেই চলেন। সকাল থেকে রাত অবধি দিব্যকে নিয়ে তাদের সংগ্রাম যেন রোজ দিনকার রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। মা-বাবার প্রথম সন্তান দিব্য। সেই হিসেবে জন্মের পর থেকে দিব্যকে নিয়ে তাদের আকাশছোঁয়া স্বপ্ন ছিলো। কিন্তু যখন স্কুলে যাবার বয়স হচ্ছে তখন আস্তে আস্তে সেই স্বপ্নগুলো যেন ডানাভাঙা পাখির মতো ঘরের কোণে জায়গা করে নিচ্ছে। কিন্তু দিব্যর বাবা-মা এটা ঠিক বোঝেন, হাল ছেড়ে দিলে চলবে না। শক্ত হাতে সমস্যার মোকাবেলা করতে হবে দু’জনকে।
বিশেষ শিশুদের স্বাভাবিক করে তোলার ক্ষেত্রে বর্তমান সময়ে-দেশে এমনকি সারা বিশ্ববলয়ে উদ্যোগ-আয়োজনের কথা বেশ জানা যাচ্ছে। তাই তার বাবা দিব্যকে নিয়ে কোনো ধরনের হতাশ হতে রাজি নয়। সারাদিনের অফিসের খাটা খাটুনীর পর বাবা দিব্যকে কাছে নিয়ে বসে। শিশুদের মতো দুষটুমি করে-কখনো হামাগুড়ি দিয়ে কখনোবা ঘোড়া সেজে দিব্যকে ঘোড়ার সওয়ার করে তার সাথে অসম খেলায় মেতে উঠে। ফাঁক পেলেই বাসার কাছের ডিসি হিলে সাইকেল নিয়ে বের হয়। কখনো দিদার বাসা, পিসির বাসা কিংবা জেঠুমনির বাসায় বেড়িয়ে আনে। চারদিকের খোলামেলা পরিবেশ-প্রকৃতি দিব্যর চোখের সামনে মেলে ধরার চেষ্টা করে। তারপর একসময় এক বুক স্বপ্ন নিয়ে দিব্যর মুখোমুখি হয়। ভুলে থাকে নিজের চাপা বেদনা।

x