দিন যায় কথা থাকে

ফেরদৌস আরা আলীম

শনিবার , ১৯ মে, ২০১৮ at ৫:৪৫ পূর্বাহ্ণ
29

দিন যায় কথা থাকে। সূর্যোদয়ে যে দিনের শুরু, সূর্যাস্তে যার শেষ তার যাওয়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু কথা নিয়ে কথা আছে। কারণ কথা থাকে। কিন্তু সব কথা কি থাকে? সবার কথা? হ্যাঁ, কারও কারও কিছু কিছু কথা থাকে। গল্প হয়ে থাকে, গান হয়ে থাকে, বাণী হয়ে থাকে। থাকার মতো কথা হলে গর্ব হয়েও থাকে বৈ কি! তিনি এমন একজন। যাঁর হাতে রাজদণ্ড, দেশটা যিনি চালাচ্ছেন এবং শক্ত হাতেই চালাচ্ছেন তাঁর কথা কখনও কখনও থাকে, থাকতেই হয়।

বলছি আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কথা। গত মাসের (এপ্রিল, ২০১৮) শেষ পক্ষে তাঁর ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া সফর নিয়ে গল্প হয়নি এমন নয়। ভাবছি আমরাই বা বাদ যাই কেন বিশেষ করে তিনি যখন নারী এবং বাংলাদেশের নারী। হোক ইতোমধ্যে বহুবার শোনা গল্প তবু শুনি আরেকবার। কমনওয়েলথ সরকার প্রধানদের সম্মেলনে যোগ দিতে গত ১৬ ই এপ্রিল রাতে তিনি পৌছুলেন বিলেতে। ১৭ এপ্রিল মঙ্গলবারে লন্ডনের ওয়েস্ট মিনিস্টারে রানী ২য় এলিজাবেথ সম্মেলন কেন্দ্রে কমনওয়েলথ নারী ফোরামের অধিবেশনে তিনি ভাষণ দেন। অধিবেশনটির শিরোনাম ছিল, ‘এডুকেট টু এম্পায়ার মেকিং ইকুইটেবল অ্যাণ্ড কোয়ালিটি প্রাইমারি এডুকেশন অ্যান্ড সেকেন্ডারি এডুকেশন এ রিয়েলিটি ফর গার্লস অ্যাক্রস দ্য কমনওয়েলথ।’ এখানে উদ্বোধনী বক্তব্য ছিল অস্ট্রেলিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী জুলিয়া গিলার্ডের। সিয়েরা লিওনের প্রেসিডেন্ট ও যুক্তরাজ্যের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন বিষয়ক মন্ত্রীও কথা বলেছেন এখানে।

২০ মিনিটের বক্তৃতায় আমাদের প্রধানমন্ত্রী নারীর ক্ষমতায়ন ও শিক্ষায় বাংলাদেশের অগ্রগতির কথা বলেন। বলেন তাঁর সরকারের সময়ে গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সংসদ হচ্ছে দুনিয়ার একমাত্র সংসদ যেখানে স্পিকার, সংসদ নেতা, উপনেতা, বিরোধী দলীয় নেতা সকলেই নারী। এখানে পুরুষ সদস্যরা উদার। সে সম্মেলনে উপস্থিত ৫৩ জাতির কমনওয়েলথভুক্ত দেশসমূহের নেতৃবৃন্দ বারংবার করতালিতে তাঁকে অভিনন্দিত করেন। বাংলাদেশের সংবিধানে নারীপুরুষের হাতে হাত, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মানব উন্নয়নে কাজ করার কথা বলা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি এও বলেন যে জাতির পিতা নারীপুরুষের সমানাধিকারের বিষয়টি এভাবেই দেখেছিলেন। তিনি বলেন, ‘জাতি হিসেবে পথচলায় নারীকে সমান অংশীদার ভাবতে হবে। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে নারীর ত্যাগ ছিল সবার উপরে। আমাদের সংবিধানে লিঙ্গ সমতা ও অবৈষম্যের স্বীকৃতি রয়েছে। সেখানে নারীর অগ্রগতির জন্য রাষ্ট্রের কার্যকর ভূমিকা রাখার বিধানও রয়েছে।’

লিঙ্গবৈষম্য দূরীকরণে বাংলাদেশের সাফল্য সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের প্রতিবেদনটির (২০১৭) উল্লেখ করে বলেন, লিঙ্গবৈষম্যের সাফল্যের ক্ষেত্রে ১৪৪টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৪৭তম এবং দক্ষিণ এশিয়ায় এটি প্রথম। নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে ১৫৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৭ম। এ স্বীকৃতি বা এমন একটি পরিসংখ্যানগত সাফল্যের পেছনে তাঁর সরকার কর্তৃক গৃহীত নারী শিক্ষার পক্ষে যাবত কার্যক্রমের বিশদ বর্ণনা দিয়েছেন তিনি। ২০১১ সালে সরকার প্রণীত নারী উন্নয়ন নীতির কথাও তিনি বলেছেন। রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ ও নারীর ক্ষমতায়নের সাফল্য নিয়ে কথা বলেছেন। প্রধানমন্ত্রী বিশেষ করে পোশাক শিল্পখাতে এদেশের নারীর বিপুল অংশগ্রহণ ও সাফল্যের কথা বলেছেন। বিভিন্ন পেশায় নারীর বিপুল পদচারণার কথা বলেছেন। ২০২১ সাল নাগাদ ১৫ বছরের কম বয়সী মেয়েদের বিয়ের অবসান ঘটানোর ব্যাপারে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী। প্রদত্ত পরিসংখ্যানে তিনি বলেন, ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়েদের বিয়ের হার ২০১৫ সালের ৬২ শতাংশ থেকে ২০১৭ সালে ৪৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ১৫ বছরের কম বয়সীদের ক্ষেত্রে একই সময়ে ২৩ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে কমে ১০ দশমিক ৭ শতাংশ হয়েছে। নারী শিক্ষার প্রসারে বাংলাদেশে গৃহীত কর্মসূচির উল্লেখ করে তিনি বলেন, দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত বিনা বেতনে লেখাপড়া শিখছে এদেশের নারী। ২৮ লক্ষ ৪০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীদের জন্য গৃহীত মিডডে মিল কর্মসূচি এবং প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় পর্যায়ে বিশ্বের সর্ববৃহৎ বিনা মূল্যে বই বিতরণ কর্মসূচির সুফলভোগীদের অধিকাংশই ছাত্রী। দেশে প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষক পদের ৬০ শতাংশ নারীর জন্য সংরক্ষিত। তাছাড়া কন্যাশিশুর অগ্রগতিতে বিভিন্ন সামাজিক বাধা অপসারণ ও গ্রামীণ এলাকায় নারীর জীবনমান বৃদ্ধিতে নারী শিক্ষা কতটা সহায়ক ভূমিকা পালন করছে তাও তাঁর ভাষণে তিনি তুলে ধরেছেন। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নারীর অবদান প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে কৃষিক্ষেত্রে নিয়োজিত ২ কোটি নারী এবং পোশাক শিল্পে কর্মরত ৪৫ লক্ষ নারীর কথা তিনি স্মরণ করেন।

১৮ ই এপ্রিল এশীয় নেতাদের অংশগ্রহণে ‘ক্যান এশিয়া কিপ গ্রোয়িং’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন প্রধানমন্ত্রী। সেদিন বিকেলে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী আয়োজিত অভ্যর্থনা অনুষ্ঠান ও নৈশভোজে যোগদান করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ১৯ শে এপ্রিল কমনওয়েলথ সরকার প্রধানদের বৈঠকের উদ্বোধনী ও অভ্যর্থনা অনুষ্ঠান শেষে দেশে ফেরেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী।

এবারে তাঁর গ্লোবাল উইমেনস লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড পাবার গল্প। বাংলাদেশ, এশিয়া ও এশীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে তাঁর নেতৃত্বে নারী শিক্ষা ও নারী উদ্যোক্তার প্রসারের বিষয় বিবেচনায় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক বেসরকারি সংগঠন গ্লোবাল সামিট অব উইমেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে এই আজীবন সম্মাননায় ভূষিত করেছেন। গ্লোবাল সামিট অব উইমেনের আমন্ত্রণে তিনি ২৬ শে এপ্রিল থেকে ২৯ শে এপ্রিল অস্ট্রেলিয়ায় কাটান। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী ম্যালকম টার্নুবলের পক্ষ থেকে তাঁর আমন্ত্রণ ছিল। অনুষ্ঠানে তাঁর হাতে পুরস্কার তুলে দেন সংস্থাটির প্রেসিডেন্ট আইরিম নাতিভিদাদ। সিডনির ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে (আইসিসি) এ অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন তিনি। সে অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিশ্বের প্রায় দেড় হাজার নেতৃস্থানীয় নারী পুরস্কার গ্রহণকালে দাঁড়িয়ে করতালির মাধ্যমে তাঁকে অভিনন্দিত করেন। এ পুরস্কার তাঁকে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব বান কি মুন, ইউনেস্কোর সাবেক মহাপরিচালক ইরিনা বোকোভা, জাতিসংঘের সাবেক শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার সাদাকো ওগাতা, চিলির সাবেক প্রেসিডেন্ট মিশেল ব্যাসেলেট এবং আয়ারল্যান্ডের সাবেক প্রেসিডেন্ট মেরি রবিনসনসহ অনেক খ্যাতকীর্তি ব্যক্তির পংক্তিভুক্ত করেছে। পুরস্কার গ্রহণ করে তিনি অত্যন্ত আনন্দিত এবং বিশেষ সম্মানিত বোধ করেছেন বলে জানান। পুরস্কারটি তিনি বিশ্বের সেই সব নারীর উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করেছেন যাঁরা নারীর ক্ষমতায়নে কাজ করে যাচ্ছেন। তাছাড়া নারীদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দান এবং তাদের অধিকারের বিষয়গুলি তুলে ধরতে তিনি একটি নতুন জোট গড়ে তোলার আহবান জানান। নারীর স্বার্থে নিজেদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও মূল্যবোধ অক্ষুন্ন রেখে সকলকে একযোগে কাজ করার কথা বলেন। নারীর অগ্রগামিতার পথে তিনি ৪ দফা প্রস্তাব পেশ করেছেন। এক. নারীর সক্ষমতা নিয়ে সমাজের প্রচলিত ধারণা ভাঙতে হবে। দুই. ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে থাকা প্রান্তিক ও দুঃস্থ নারীর পাশে দাঁড়াতে হবে। তিন. স্বাস্থ্যঝুঁকি কমিয়ে আনা সাপেক্ষে উৎপাদন বৃদ্ধির কথা ভাবতে হবে। চার. সবক্ষেত্রে নারীর জন্য পুরুষের সমান সুযোগ তৈরী করতে হবে।

আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এই কথাগুলো বলেছেন ২৭ শে এপ্রিল ২০১৮ সালে ‘গ্লোবাল সামিট অব উইমেন এর এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে, অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে। আজীবন সম্মাননার এই পুরস্কার তাঁকে বিশ্ব নারী নেতৃত্বের মর্যাদা দিয়েছে। কিছুদিন আগে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলার জন্য ব্রিটিশ গণমাধ্যম তাঁকে ‘মানবতার জননী’ খেতাবে সম্মানিত করেছে। তারিখটি মনে পড়ছে না। আসলে দিন চলে যায়। অতি স্মরণীয় দিনগুলিও মহাকালের খাতায় জমা পড়ে। কীর্তি থেকে যায়। আমরা জানি ২৭ শে এপ্রিল ২০১৮ আর নেই। হাতে ধরে যে পুরস্কারটি তিনি সেদিন নিয়েছেন সেটিও একদিন ধূলোয় মিশে ধূলি হবে। কিন্তু কথাগুলো থাকবে। যেহেতু তিনি একজন রাজনীতিবিদ। আমরা চাইবো তাঁর কথাগুলো কোনও ধরনের রাজনৈতিক কোন্দলের শিকার না হোক। রাজনীতির কাদা ছোঁড়াছুঁড়ির শিকার না হোক। কথাগুলো ইতিহাস হয়ে থাকুক।

x