দিদি, ক্ষমো হে মম দীনতা

জয়দীপ দে শাপলু

মঙ্গলবার , ১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ at ৯:১৮ পূর্বাহ্ণ
196

জীবদ্দশায় এতো বড় রাষ্ট্র এতো জ্ঞানী গুণী মানুষ এতো রূপবান ধনবান লোকজন সবাই আমরা এড়িয়ে গেছি এই জননীকে। কারো কাছে বই বিক্রি করতে গেলে কেউ চরম বিরক্তিতে ফিরিয়ে দিয়েছি, কেউ হয়তো করুণায় কিনেছি। কিন্তু দৈত্যকুলেও যে প্রহ্লাদের জন্ম হয়। ব্যতিক্রম ছিলেন আলাউদ্দিন খোকন ভাই। শেষ দিন পর্যন্ত পুত্রের ভালোবাসায় দিদির পাশে ছিলেন। বিদায় দিয়েছেন শোকাশ্রুতে। এক খোকন লক্ষ অপদার্থের লজ্জা ঘুচিয়ে দিয়েছেন। দিদিকে আজ প্রণাম জানাই। কমরেড খোকনকে জানাই হ্যাটস অফ।

চেরাগী মোড়ের লুসাই ভবন ছিল হাজার কাজের কারখানা। বইয়ের প্রকাশনী থেকে মডেলিং ফার্ম; সাহিত্য সংসদ থেকে গাঁজার আসর; গার্মেন্টস এঙেসোরিজের কারখানা থেকে পত্রিকা অফিসসব ছিল এক ছাদের নিচে। তখন আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলায় পড়ি। বাড়তি পয়সার খোঁজে একটা এ্যাড ফার্মের সাথে যুক্ত হই। আর ফার্মের যারা পার্টনার, তারা সবাই আমার সমবয়সী। বন্ধুস্থানীয়। ফার্মের সম্পদ বলতে ছিল একটা টেবিল আর কয়েকটা চেয়ার। আরেকটা অফিসের একটু খালি জায়গায় এসব পেতে আমরা বসতাম। হুট করে কেউ এলে মনে করত পুরো অফিসটাই আমাদের। আদতে কিছুই না। অফিসের পিয়নকে পঞ্চাশ টাকা ঘুষ দিলে চা এনে দিত। মাসান্তে এ খালি জায়গার জন্য হাজার খানেক টাকা গুণতে হতো।

লুসাই ভবনের চার তলায় ছিল আমাদের অফিস। অনেকসময় আগে আগে অফিসে গিয়ে দেখতাম কেউ আসেনি। তখন ভরসা ছিল খোকন ভাই। আলাউদ্দিন খোকন। আমাদের অফিস থেকে একটু ভিতরে দশ ফুট বাই দশ ফুট একটা রুমে খোকন ভাই থাকতেন। তার বাংকারে উঁকি দিতাম। তার সাথে থাকতেন একজন বৃদ্ধা। ধর্মে হিন্দু। খোকন ভাই তাকে দিদি ডাকতেন। করতেন মাতৃজ্ঞান। কীভাবে এঁদের যোগসূত্র গড়ে উঠল আমার জানা ছিল না। তখন মাত্র লেখালেখি শুরু করেছি। লিটল ম্যাগগুলো লেখা ছাপায়। খোকন ভাই সস্নেহে আমাকে তাদের ছোট্ট কামরায় বসতে বললেন। বৃদ্ধার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। বললেন ওই যে ওই ম্যাগের সেই গল্পটার লেখক। বৃদ্ধা হেসে বললেন, ‘আপনার তো লেখার হাত ভালো’। আমি বুঝলাম সৌজন্যের দায়ে প্রশংসা। গায়ে মাখলাম না। কি যেন ছিল বাসায়, তিনি আমাকে খেতে দিয়েছিলেন। তারপর পরম মমতায় একথা সেকথা জিজ্ঞেস করতে লাগলেন। বাড়ি বাবা মা ভাইবোনের তথ্য। আমি একজন সাধারণ বয়োঃবৃদ্ধার সাথে যেভাবে কথা বলতে হয়, সেভাবেই কথা বলেছিলাম। কিন্তু কেন যেন মনে হলো মহিলার ভেতরে একটা প্রখরতা আছে। বেরুবার পর খোকন ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ইনি কে গো?’ খোকন ভাই অবাক হয়ে বললেন, ‘রমা চৌধুরীকে চিনেন না!’ বুঝতে পারলাম বিরাট একটা অপরাধ করে ফেলেছি।

পরে বন্ধুদের সাথে আলাপ করে শুনলাম রমা দি’র জীবনের উত্থান পতনের গল্প। একাধারে শহীদজননী, বীরাঙ্গনা, লেখিকা, সংগ্রামী; সর্বোপরি সাংঘাতিক আত্মবিশ্বাসী একটা মানুষ। জীবনের মৌলিক চাহিদাগুলোই তখন পরিপূরণের ক্ষমতা তার ছিল না, কিন্তু তিনি স্বপ্ন দেখতেন একটা এতিমখানা প্রতিষ্ঠার।

মানুষ মানুষের বিশালত্ব জানলে আকৃষ্ট হয়। কাছে যায়। কিন্তু যতই রমা চৌধুরী সম্পর্কে জানলাম, আমি উনাকে এড়িয়ে যেতে লাগলাম। প্রায় লুসাই ভবনের সামনের রাস্তায় তার সাথে দেখা হত। হেসে হেসে শুধাতেন, ‘দিদিকে কি দেখতে ইচ্ছে হয় না’। আমিও হেসে উড়িয়ে দিতাম। কিন্তু তার কথাই সত্য। তাকে দেখার সৎ সাহস আমার হতো না। তাই তাকে আমি এড়িয়ে যেতাম। কাকতালীয়ভাবে আমার মায়ের ডাক নাম রমা। রমাদিকে দেখলে মনে হতো মামাতৃকার এক রুগ্ন রিক্ত প্রতারিত রূপ দেখতে পাচ্ছি। যে পুরোটা জীবন উৎসর্গ করে দিলেন জাতির জন্য, শেষ বয়েসে এসে খালি পায়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন বেঁচে থাকার যুদ্ধে, জাতি তার খবরই রাখে না।

দিদির খুব শখ ছিল লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার। এ বাসনা থেকে তিনি লুসাই ভবনের একটা কামরা নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতেন। আমি প্রায় ভাবতাম, এই টাকায় তো তিনি খুব সুন্দরভাবে শহরতলীর কোথাও থাকতে পারেন। এখন বুঝি তিনি আসলে ঋদ্ধ মানুষের সান্নিধ্য খুঁজতেন। তাই পড়ে থাকতেন অন্ধকার বায়ুরুদ্ধ কামরাটায়। বই বিক্রি করতে গিয়ে দিদিকে কতজনের কত কথাই না শুনতে হয়েছে, আহারে। একবার আমার মায়ের মাথা ফেটে গিয়েছিল। মায়ের মাথার রক্ত দেখে আমিই কাঁদতে কাঁদতে মূর্ছা যাই। মা তখন নিজের বেদনা ভুলে আমাকে নিয়েই ব্যস্ত হয়ে উঠেন। এই দুর্বল হৃদয় নিয়ে রমাদি’র পাশে দাঁড়ানোর ক্ষমতা আমার ছিল না। আর দাঁড়ানোরই বা কি আছে, উনি তো কারো করুণার্থী ছিলেন না।

দিদি হয়ত এই জীবনটা স্বেচ্ছায় বেছে নিয়েছিলেন। এই যে বিপ্লবী বিনোদবিহারী, আমাদের বিনোদ দাদু, তিনি জীবনভর টিউশনি করে গেছেন। সেই টাকায় ভালোই চলতেন। একসময়ের শিক্ষিকা রমা চৌধুরী তো তা করতে পারতেন অনায়াসে। কিন্তু করেন নি। কারণ আছে নিশ্চয়ই। আসলে তাকে বোঝার মতো মানসিক উচ্চতাই আমাদের হয়নি। আমরা প্রতিটি জীবনকে মূল্যায়ন করি জাগতিক প্রাপ্তির নিরিখে। কিন্তু কেউ কেউ তো কত বেশি বিলিয়ে দিতে পরলাম, সেই আনন্দের মধ্যে জীবনের সার্থকতা খুঁজতে পারে। নইলে ৩ লক্ষ কোটি টাকার বাজেটের একটা দেশের সরকার প্রধানের সামনে গিয়ে এক সহায় সম্বলহীন বৃদ্ধা কীভাবে বলেন, ‘আমি তো বঙ্গবন্ধুর কন্যাকে দেখতে এসেছি, কিছু চাইতে আসিনি।’ এমন বিত্তবান মানুষ এদেশে কয় জন আছে বলুন?

দিদিকে দেখতাম সকাল ১১ টার দিকে খালি পায়ে কাপড়ের একটা ব্যাগে করে কিছু বই নিয়ে বেরিয়ে পড়তে। সারা শহর ঘুরে ঘুরে সুধীজনের কাছে সেই বই বিক্রি করে বেড়াতেন। অনেকে অনিচ্ছার সত্ত্বেও এক বয়স্ক মহিলার অনুরোধ ফেলতে পারতেন না। তার বই কিনতেন। আমার কাছে বিষয়টা খুব একটা সুখপ্রদ মনে হতো না। আমি প্রায় দিদিকে বিষয়টা নিয়ে আপত্তি জানাতাম। উনি হেসে বলতেন, ‘আমার বই বেচবে কে?’ কথাটার মর্মার্থ তখন বুঝি নি। এখন বুঝতে পারছি। কথাটা প্রায় আমার কানে বাজে। এখন নিজে বই লিখি। দুটো বই আমার প্রকাশিত হয়েছে। একটা বাজারে নেই। আরেকটা গেলো বইমেলায় মাত্র এসেছে। কিন্তু এক প্রকার সেটাও বাজার আউট। চট্টগ্রাম থেকে লোকে ফোন করে, ‘তোমার বই কই পাই’। সিলেট থেকে ফোন করে। খুলনা রাজশাহী মাগুড়া আমি আর তালিকা দীর্ঘ করতে চাই না। দেশের যে ক’টি প্রতিষ্ঠিত পুস্তক বিপনী আছে, তারা ব্যস্ত গুটিকয়েক লেখক নিয়ে। অনেক ক্ষেত্রে নবীন লেখকদের সেখানে প্রবেশাধিকারই নেই। বাজারে বইই পাওয়া যায় না, তারপরও প্রকাশকদের অভিযোগ, বিক্রি হচ্ছে না। আমার শেষ বইটি মেলাতেই সাড়ে ৪ শ কপি বিক্রি হয়েছে। পাঠকের ভালো সাড়াও পেয়েছিলাম। শুধু দুর্বল বিপণন ব্যবস্থার কারণে মিডিয়ার আশীর্বাদ থেকে দূরে থাকা লেখকরা মাথা তুলে দাঁড়াতে পারছে না। তাও বাঁচোয়া, অনলাইন বুকশপ এসে গেছে। রমাদি তো সেই সুযোগও কাজে লাগাতে পারেনি। তার অসহায়ত্ব এখন মর্মে মর্মে উপলব্ধি করছি।

গত সপ্তাহজুড়ে ফেসবুকে দেখছিলাম দিদির স্বাস্থ্যের সংকটময় অবস্থার খবর। নিজের অপারগতায় জ্বলে পুড়ে মরছিলাম। পরশুর আগের দিন দেখলাম খোকন ভাই লিখেছেন, ‘ ভালো নেই দিদি (রমা চৌধুরী), আজ রাতটা কঠিন হবে মনে হচ্ছে।’ বিবেকের দংশনে পুরো রাতটা আমি ছটফট করেছি। মনে মনে ভেবেছি, দিদি আপনি মরে যান। আমাদেরকে লজ্জার হাত থেকে বাঁচান। দিদি বোধহয় আমার কথা শুনে ফেলেছেন।

জীবদ্দশায় এতো বড় রাষ্ট্র এতো জ্ঞানী গুণী মানুষ এতো রূপবান ধনবান লোকজন সবাই আমরা এড়িয়ে গেছি এই জননীকে। কারো কাছে বই বিক্রি করতে গেলে কেউ চরম বিরক্তিতে ফিরিয়ে দিয়েছি, কেউ হয়তো করুণায় কিনেছি। কিন্তু দৈত্যকুলেও যে প্রহ্লাদের জন্ম হয়। ব্যতিক্রম ছিলেন আলাউদ্দিন খোকন ভাই। শেষ দিন পর্যন্ত পুত্রের ভালোবাসায় দিদির পাশে ছিলেন। বিদায় দিয়েছেন শোকাশ্রুতে। এক খোকন লক্ষ অপদার্থের লজ্জা ঘুচিয়ে দিয়েছেন। দিদিকে আজ প্রণাম জানাই। কমরেড খোকনকে জানাই হ্যাটস অফ।

x