দার্শনিক জ্যাঁ পল সাত্রে

ফেরদৌস আহমেদ

বুধবার , ১২ জুন, ২০১৯ at ৬:৩৮ পূর্বাহ্ণ
24

নানা নামে তাঁকে আমরা ডাকতে পারি। কেউ বলে থাকেন, তিনি এক স্মরণযোগ্য লেখক। কারও চোখে তিনি এক মহান নাট্যকার। অনেকে ভাবে এবং ভাষ্যে, তিনি হলেন সামাজিক সমালোচক, জীবনকে যিনি প্রতিটি ক্ষেত্রে উপভোগ করতে চেয়েছিলেন। অনেকে বলেন, আধুনিক মননসম্পন্ন এক মহান দার্শনিক।
সমগ্র বিংশ শতাব্দী ধরে যে মানুষটি আপন ব্যক্তিত্বের বর্ণচ্ছটায় ফরাসি সাহিত্য আকাশকে আলোকিত করেছিলেন, তিনি হলেন জ্যাঁ পল সাত্রে। জন্মেছিলেন ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দের ২১ জুন। নেহাতই এক মধ্যবিত্ত পরিবারের হয়ে পৃথিবীর আলো দেখেছিলেন জ্যাঁ পল সাত্রে। বাবা ছিলেন স্থানীয় স্কুলের শিক্ষক। শিক্ষক হলে কী হবে, জীবন সম্পর্কে অত্যন্ত উচ্চাশা পোষণ করতেন ওই ভদ্রলোক। তিনি মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন, মানুষ শুধুমাত্র জীবন কাটানোর জন্য পৃথিবীতে আসে না, তাকে একটা নির্দিষ্ট কাজ করতে হয়। এ কাজের কারাগার থেকে তার মুক্তি নেই। বাবার কাছ থেকে ছোটো বয়সেই এ শিক্ষা লাভ করেছিলেন জ্যাঁ পল সাত্রে। বাবার হাত ধরেই সাহিত্যের জগতে তাঁর অনুপ্রবেশ। ছোটো থেকেই পড়াশোনা করতে ভালোবাসতেন। বিভিন্ন বিষয়ে ছিল তাঁর অপরিমাপ্য ঔৎসুক্য। মন দিয়ে পড়তেন সমকালীন দর্শনের বিষয়গুলো। প্রাচীন গ্রিক ঋষিদের লেখা তাঁকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করত। অ্যারিস্টটলের পাশাপাশি প্লেটোকে সম্মান শ্রদ্ধা করতেন। ভলতেয়ার কিংবা রুশোর সাথে তাঁর দেখা হত বইয়ের মাধ্যমে। প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার পর থেকে সাত্রের মনোদর্শন ক্রমশ কেন্দ্রীভুত হতে থাকে। জীবন সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট একটি ভাবধারার প্রতিষ্ঠাতা হয়ে ওঠেন তিনি। তাঁর মধ্যে এক দার্শনিকবোধেরও জন্ম হয়। একে আমরা অস্ত্তিত্ববাদ বলে থাকি। সবকিছুর মধ্যেই আত্মার অস্তিত্ব আছে-প্রতিটি মুহূর্তে জীবনকে উপভোগ করতে হবে। এ ভোগের অর্থ অবশ্য পার্থিব ভোগ নয়, এর অন্তরালে আছে আধ্যাত্মিক অনুচেতনা। এমনই সব কথা বলতেন সাত্রে, তাঁর ফেলে আসা যৌবন দিনে।
সাহিত্য জগতে প্রবেশ করার পর সাত্রে নানাভাবে তাঁর মতকে প্রকাশ করতে থাকেন। নিজের সম্বন্ধে অত্যন্ত উন্নাসিক ছিলেন তিনি। কোনো বিতর্ক সভায় যোগ দিতেন না। সাহিত্য সম্মেলনে যাবার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতেন না। নিজের ঘরে বসে বইয়ের সাম্রাজ্যের সম্রাট হয়ে জীবন কাটিয়ে গেছেন। অসংখ্য গুণগ্রাহী ছিল তাঁর। কারও সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে চাইতেন না। সাত্রে মনে করতেন, বেশি কথা বললে আত্মার ক্ষয় হয়। আত্মাকে সুসংবদ্ধ রাখতে গেলে বেশ কিছুটা সময় মৌন অবস্থায় কাটাতে হয়।
সারত্রে নোবেল পুরস্কার প্রত্যাখান করেছিলেন। তাঁর মতে, এ জাতীয় পুরস্কার গ্রহণ করার কোনো অর্থ হয় না। এটি হল এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি। এ স্বীকৃতির কোনো প্রয়োজন ছিল না তাঁর। তবুও তাঁকে লেখা সনদে বলা হয়েছিল-আপনার লেখনীর মধ্যে মুক্তির স্বাধীনতা আছে, আছে চিরন্তন অন্বেষণার চিহ্ন। আপনি এভাবেই আমাদের কালকে প্রভাবিত করেছেন।
এ হলেন জ্যাঁ পল সাত্রে। ছোটো থেকেই এক আপোসবিহীন মানুষ। বাবার কাছে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলোকে আরও উন্নত করে তুলেছিলেন। জীবনের শেষ প্রহর পর্যন্ত তিনি এক বিদ্রোহী সত্তা হিসেবেই বেঁচে ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর একটি শোকসভা ডাকা হয়েছিল। সমগ্র পৃথিবীর বিখ্যাত মানুষেরা সেখানে স্বইচ্ছায় সমবেত হয়েছিলেন। তাঁদের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছিল ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার শব্দাবলি। তাঁরা সকলে একবাক্যে জ্যাঁ পল সাত্রেকে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মানব মনীষা হিসেবে বিভূষিত করেছিলেন। এটিই বোধহয় সাত্রের সব থেকে বড়ো পুরস্কার।

x