দারিদ্র্য বিমোচনে জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারী ট্রাস্টের ব্যতিক্রমধর্মী উদ্যোগ

ড. মুহাম্মদ আবদুল মান্নান চৌধুরী

সোমবার , ৬ আগস্ট, ২০১৮ at ৬:৩৮ পূর্বাহ্ণ
74

এক.

নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকলে যাকাত প্রদান বাধ্যতামূলক। ‘সালাত’ যেরূপ মানুষের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে, যাকাতও সেরূপ যাকাত দাতার সম্পদকে পরিশুদ্ধ করে। যাকাত প্রদানের মাধ্যমে অভাবী, গরীব ও নিঃস্ব ব্যক্তিদেরকে সাহায্য করার সুযোগ সৃষ্টি হয়। যাকাত ধনীদের উপর গরীবের হক বা অধিকার। যাকাত গরীবদের প্রতি করুণা নয়। যাকাত বঞ্চনা, হতাশা, সংঘাত, কলহ দারিদ্র্য প্রভৃতি নিমূল করে মৈত্রী, সহযোগিতা, শুভেচ্ছা ও শান্তির পথ দেখায়। তবে যাকাত প্রদানের নীতিটা সঠিক হতে হবে। নতুবা ঐ যাকাত কোন কাজে আসবে না। একটি লুঙ্গি কিংবা একটি শাড়ি দিয়ে যাকাত গ্রহীতাকে বিদায় করে দিলে যাকাত প্রদানের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। যাকাত ভোগীদের যাকাতের মাধ্যমে একটি আয় সৃষ্টিকারী বা আয়ের উৎস সৃষ্টি করে দিতে হবে। যথা: একটি রিক্‌শা কিনে দেয়া, একটি সেলাই মেশিন কিনে দেয়া, একটি পানের দোকান করে দেয়া, শারীরিকভাবে পঙ্গু বা অক্ষম হলে কমপক্ষে এক বছরের জন্য আহার্যের ব্যবস্থা করে দেয়া। একটি চাকুরির ব্যবস্থা করে দেয়া, ঋণগ্রস্তদেরকে ঋণমুক্তিতে সহায়তা করা, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য দাতব্য চিকিৎসালয়ের ব্যবস্থা করা এবং তাদের সন্তানসন্ততির জন্য কারিগরি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, দরিদ্র মেধাবী ছাত্রছাত্রীর জন্য বিনা বেতনে পড়ালেখার ব্যবস্থা করা, বৃত্তি প্রদান করা, ক্ষুদ্র কৃষক, ভূমিহীন শ্রমিক ও দিনমজুরদের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রভৃতি। অর্থাৎ এমনভাবে যাকাত দিতে হবে যাতে করে যাকাতভোগী চিরকাল যাকাতভোগী না থেকে যাকাত গ্রহীতা যেন যাকাত দাতায় পরিণত হয়। তাই যাকাত উৎপত্তির দিক থেকে স্বর্গীয়, আদেশের দিক থেকে ধর্মীয়, প্রকৃতিগত দিক থেকে নৈতিক ও মানবিক এবং প্রয়োগের দিক থেকে সামাজিক বলে আখ্যায়িত করা যায়।

দুই.

আল্লাহ্‌র ওলীদরবেশদের জীবন ও সমগ্র কর্মকাণ্ড জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানবের সেবায় নিবেদিত। জীবনের সৃজন পালন এবং বিবর্তণ আল্লাহ্‌র অন্যতম প্রধান দৃশ্যমান হেকমত। মহান স্রষ্টার এই রবুয়িত বা পালনবাদী চেতনাকে সামনে রেখে মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফের প্রাণপুরুষ মাওলানা শাহসুফি সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারী (কঃ), হযরত মাওলানা শাহসুফি সৈয়দ গোলামুর রহমান মাইজভাণ্ডারী (কঃ), হযরত মাওলানা শাহসুফি সৈয়দ দেলাওর হোসাইন মাইজভাণ্ডারী (কঃ) প্রাচ্যের এই আকাশে গড়ে তুলেছেন মানব মিলনের তীর্থস্থান। এই মানব মিলন তীর্থে মানবতার সেবার চেতনা ও কর্মকে ব্যাপকতা দিয়ে গেছেন শাহানশাহ হযরত সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারী (কঃ)। তিনি বলেছেন, ‘দুস্থ মানবতার সেবা করলে হজ্জ্ব আকবর হয়।’ তাঁর পুত্র শাহজাদা সৈয়দ মোহাম্মদ হাসান মাইজভাণ্ডারীর (মঃ) নেতৃত্বে ও পৃষ্ঠপোষকতায় মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফের গাউসিয়া হক মন্‌জিলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘শাহানশাহ হযরত সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারী (কঃ) ট্রাস্ট’। এ ট্রাস্ট সম্ভাব্য সকল পন্থায় মানবতার খেদমতে আঞ্জাম দেবার নিরবচ্ছিন্ন প্রয়াসে এগিয়ে চলেছে। ট্রাস্টের অধীনে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে দারিদ্র্য বিমোচন প্রকল্প (যাকাত তহবিল)। যার মাধ্যমে সমাজ কল্যাণমূলক বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করে সমাজকে দারিদ্র্যমুক্ত করার প্রয়াস চালানো হচ্ছে।

তিন.

এই তহবিল ২০০৩ সাল থেকে হাল নাগাদ সঠিক যাকাত বণ্টন নীতি অবলম্বন করে ২০৯ জনকে ব্যবসায় পুঁজি, ১৭৭ জনকে আর্থিক সহায়তা, ২৯ জনকে ঋণ পরিশোধে সহায়তা, ৩২ জনকে অটোরিক্‌শা, ২৫ জনকে বিদেশ গমনে সহায়তা, ১৩ জনকে মৎস্য খামার, ১৩ জনকে সিএনজি চালিত ট্যাক্সি ক্রয়ে সহায়তা, ৩ জনকে কম্পিউটার, ৩ জনকে ইট ভাঙার মেশিন, ৫৩ জনকে গবাদি পশুর খামার, ৩৯ জনকে কলের লাঙ্গল, ১জনকে মাছ ধরার জাল ও নৌকা ক্রয়ে সহায়তা, ১১৮জনকে শিক্ষায়, ৩৭৯ জনকে বিবাহে সহায়তা, ৩০৫ জনকে গৃহ নির্মাণে সহায়তা, ১৮৩ জনকে চিকিৎসা সহায়তা, দক্ষ নারী উন্নয়নের জন্য ১৩ টি সেলাই প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনে সহায়তা প্রভৃতি কর্মকাণ্ডে মোট ১,৫৯৫ জনকে ৩,৯৭,৪৪,৯৩০ টাকা প্রদান করেছে এবং এ বিতরণ কার্যক্রম সারাবছরব্যাপী নিয়মিতভাবে অব্যাহত আছে। যাকাতভোগীরা যাকাতের অর্থ বা দ্রব্যসামগ্রী ঠিকমত ব্যবহার করছে কিনা তা তদারক করার জন্য উপযুক্ত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি যাকাত তহবিল পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা হয়েছে। এ কমিটি সার্বক্ষণিক অবৈতনিকভাবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে সমাজ থেকে দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে।

সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষগুলোর আর্থিক সক্ষমতা অর্জনে ‘শাহানশাহ হযরত সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারী (কঃ) ট্রাস্ট’ এর ম্যানেজিং ট্রাস্টি ও মাইজভাণ্ডার শরীফ গাউসিয়া হক মন্‌জিলের সাজ্জাদানশীন আলহাজ্ব সৈয়দ মোহাম্মদ হাসান মাইজভাণ্ডারীর (মঃ) বলিষ্ঠ ও দক্ষ নেতৃত্ব এবং যাকাত তহবিল পরিচালনা পর্ষদের ত্যাগী মনোভাবের কারণে দারিদ্র্য বিমোচন কার্যক্রম জনমনে ব্যাপক সাড়া জাগাতে সক্ষম হয়েছে।

এ ব্যপারে ট্রাস্টের ম্যানেজিং ট্রাস্টি হযরত সৈয়দ মোহাম্মদ হাসান মাইজভাণ্ডারী (মঃ) বলেন, আল্লাহ্‌তা’লার বিধানের আলোকে সম্পদের যাকাত সঠিকভাবে প্রদান করা ইসলামের মহান মানবিক দায়িত্বগুলোর অন্যতম। শোষণ, বঞ্চনাজনিত দারিদ্র্য থেকে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সম্মান ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য যাকাত মহান আল্লাহতা’লার পক্ষ থেকে একটি অনন্য নির্দেশনা। সমাজের হত দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য দারিদ্র্য বিমোচন প্রকল্প আল্লাহ্‌ প্রদত্ত একটি দিকনির্দেশনা। তাই যাকাত প্রদান করা কোন করুণা প্রদর্শন নয়। বরং তা সমাজের ধনী ব্যক্তিদের বাধ্যতামূলক একটি মানবিক ধর্মীয় দায়িত্বের অংশ। আবার যাকাত গ্রহণ কোন লজ্জার বা হীনম্মন্যতার বিষয় নয়, বরং আল্লাহ্‌ প্রদত্ত দরিদ্রের অধিকার। এ কারণে যাকাত আদায় কার্যক্রমে যেমন অনীহা থাকা অনুচিত তেমনি আল্লাহ্‌আল্লাহ্‌ রাসুলের (.) নির্দেশনার আওয়াতায় যারা যাকাত গ্রহীতা তাদেরও যাকাত গ্রহণে কুন্টিত হওয়া উচিত নয়।

শাহানশাহ হযরত সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারী (কঃ) ট্রাস্ট নিয়ন্ত্রণাধীনে পরিচালিত দারিদ্র্য বিমোচন প্রকল্প (যাকাত তহবিল) যাকাত প্রদান ও গ্রহণের একটি সুসমন্বিত দায়িত্বশীল বণ্টন ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে এবং কার্যকর দক্ষ যাকাত তহবিল পরিচালনা পর্ষদ স্বচ্ছ, সুষ্ঠু ও পরিকল্পিত যাকাত বিতরণের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে।

লেখক : ডিন, সমাজ বিজ্ঞান অনুষদ, আইআইইউসি

x