দারিদ্র্য বাধা হতে পারেনি শিমুলের ইচ্ছে শক্তির কাছে

রিকশা চালকের ঘরে জিপিএ-৫ এর অনন্য আলো

রতন বড়ুয়া 

মঙ্গলবার , ৮ মে, ২০১৮ at ৩:৫৩ পূর্বাহ্ণ
554

চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডে এবার জিপিএ৫ পেয়েছে মোট ৮ হাজার ৯৪ জন শিক্ষার্থী। কিন্তু এই ৮ হাজার মেধাবীর ভিড়ে শিমুলের জিপিএ৫ অর্জনের গল্পটা যেন একটু ভিন্ন, আর দশ জনের মতো নয়। কারণ, আর দশ জন শিক্ষার্থীর মতো আলাদা করে কোচিংপ্রাইভেট পড়ার কোন সুযোগই পায়নি শিমুল। স্কুলের ক্লাসের উপর ভর করেই পড়ালেখা চালিয়ে যেতে হয়েছে তাকে। এরপরও সর্বোচ্চ ফলই অর্জন করেছে শিমুল। তাও মানবিক বিভাগ থেকে। ফি বছর যে বিভাগের শিক্ষার্থীরাই সবচেয়ে পিছিয়ে থাকে ফলাফলে। আর জিপিএ৫ পাওয়া তো দুর্লভই বলা চলে।

শিক্ষাবোর্ডের পরিসংখ্যান অন্তত তাই বলে। অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্য যেএবার মোট ৮ হাজার ৯৪ জন জিপিএ৫ ধারীর মধ্যে মানবিক থেকে জিপিএ৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা মাত্র ২৬ জন। এই ২৬ জনের মধ্যে আবার ২৪ জনই ছাত্রী। আর ছাত্র সংখ্যা মাত্র ২! যদিও ১৩ হাজার ৪৭ জন ছাত্র এই বিভাগ থেকে এবার এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়। এর মধ্যে পাস করেছে ৭ হাজার ২৮১ জন।

আর ছাত্রীসহ সব মিলিয়ে এ বিভাগে অংশ নেয় ৪২ হাজার ৫৬২ জন। পাস করেছে ২৫ হাজার ৫৯২ জন। পাসের হার ৬০.১৩ শতাংশ। অথচ ব্যবসায় শিক্ষা ও বিজ্ঞান বিভাগে পাসের হার যথাক্রমে ৭৮.৮৬ ও ৯০.০০ শতাংশ। অন্যদিকে, বিজ্ঞানে জিপিএ৫ পেয়েছে ৭ হাজার ২৮৫ জন। ব্যবসায় শিক্ষায় এ সংখ্যা ৭৮৩ জন।

মানবিকে ছাত্রদের মাঝে উত্তীর্ণ ৭ হাজার ২৮১ জনের মধ্যে যে ২ জন ছাত্র এই দুর্লভ সাফল্য অর্জনে সক্ষম হয়েছে তাদেরই একজন শিমুল। দ্বীপ অঞ্চল সন্দ্বীপের কাটগড় গোলাম নবী হাই স্কুল থেকে দুর্লভ এই সাফল্য বয়ে আনা শিমুলের বাবা একজন রিকশা চালক। দ্বীপ অঞ্চলটির আমানুল্লাহ গ্রামে তাদের বাড়ি। মা সহ দুই বোনএক ভাইয়ের সংসারে বাবা মো. দিদারই একমাত্র উপার্জনক্ষম। মা রোকেয়া বেগম থাকেন ঘরকন্নার কাজেই। দুই বোনের একজন শিমুলের বড়। বড় বোন আমেনা বেগমের সদ্য বিয়ে হয়েছে। আর ছোট বোন আবিদা সুলতানা একই স্কুলের ৭ম শ্রেণি পড়ুয়া।

রিকশা চালক বাবার উপার্জনে চার সদস্যের পরিবারে এমনিতেই ‘দিনে এনে দিনে খাই’ অবস্থা। এর মাঝে শিমুলের পড়ালেখায় আলাদা মনোযোগ দেওয়ার সুযোগইবা কোথায় বাবা মো. দিদারের। সাথে রয়েছে ৭ম শ্রেণি পড়ুয়া আরো একটি মেয়ে।

দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত পরিবারে তাই স্বাভাবিক ভাবেই পড়ালেখায় বিশেষ যত্ন পায়নি শিমুল। সুযোগ হয়নি আলাদা করে কোচিংপ্রাইভেট পড়ার। কেবল স্কুলের ক্লাসই ছিল ভরসা। আর ছিল নিজের ইচ্ছে শক্তি। এই ইচ্ছে শক্তির জোরেই দারিদ্র্য বাধা হতে পারেনি শিমুলের। দুর্লভ সাফল্যকে হাতের মুঠোয় ভরেছে সে। এমনটিই জানালেন কাটগড় গোলাম নবী হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. শামীম বখতিয়ার। তিনি বলছিলেনশিমুল আমার স্কুলের মেধাবী একজন ছাত্র। পুরো স্কুল থেকে শিমুলই একমাত্র জিপিএ৫ পেয়েছে। যদিও সব মিলিয়ে (তিন বিভাগ থেকে) এবার ১১০ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়। পাস করেছে ৮৪ জন। শিমুলের ফলাফল পর্যালোচনায় দেখা যায়মোট ১২ বিষয়ের ১০টিতেই ‘এ প্লাস’ পেয়েছে সে। মোট ১৩০০ নম্বরের মধ্যে তার প্রাপ্ত নম্বর ১০৫৪।

জিপিএ৫ পাওয়া অপর ছাত্র সৈয়দ মইন হোসাইন অর্চি নগরীর নৌবাহিনী স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষার্থী। ১২টি বিষয়ের মধ্যে তার ‘এ প্লাস’ এসেছে ৯টিতে। অর্চি সৈয়দ এনায়েত হোসাইন ও মাসুদা খানম দম্পতির সন্তান।

বৃহত্তর চট্টগ্রামে মানবিক বিভাগ থেকে জিপিএ৫ পাওয়া মাত্র দুইজন ছাত্রের একজন নিজের স্কুলের জানতে পেরে উচ্ছ্বসিত প্রধান শিক্ষক মো. শামীম বখতিয়ার। মুঠোফোনে তিনি জানালেনশিমুলের পরিবার নিতান্তই গরীব। আলাদা করে কোচিংপ্রাইভেট পড়ানোর সক্ষমতা ছিল না। ছেলেটি নিজের প্রচেষ্টায় এই সাফল্য বয়ে এনেছে। অবশ্য, স্কুলের শিক্ষকরা তাকে যথাসাধ্য সহায়তা করেছে। দিকনির্দেশনা দিয়েছে। ভালোভাবে পড়ালেখা করার সুযোগ পেলে ভবিষ্যতে সে আরো ভালো করবে বলেও বিশ্বাস করেন তিনি।

নিজের ফলাফলে খুশি হলেও ভবিষ্যতের জন্য দুশ্চিন্তা ফুটে ওঠেছে শিমুলের কথায়। মুঠোফোনে কথা হলে শিমুল জানায়ভবিষ্যতে প্রশাসনিক বড় কোন পদে কাজ করতে চায় সে। যাতে করে মানুষের জন্যসমাজের জন্য কিছু করতে পারে। কিন্তু এ লক্ষ্যে পৌঁছাতে গেলে বহুদূর পথ পাড়ি দিতে হবে তাকে। এখানেই তার যত দুশ্চিন্তা। হতাশার সুরে শিমুল বলছিলসুযোগ থাকলে ভালো নামকরা কোন কলেজে গিয়ে পড়তাম। কিন্তু বাবার আয়ে যেখানে পরিবার চালানোই কষ্টের, সেখানে তার এই প্রত্যাশা যে পূরণ হওয়ার নয়, বাস্তবতার কঠিন যাঁতাকলে তা ভালোভাবেই অনুধাবন করছে শিমুল। তাই হতাশা ও আফসোসই যেন ঝরে পড়ছিল মুঠোফোনের ও প্রান্তে।

তার স্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. শামীম বখতিয়ারও মনে করেন সুযোগ পেলে শিমুল নিজেকে মেলে ধরতে পারবে। অনেক বড় হতে পারবে। কারণ আত্মবিশ্বাস ও যথেষ্ট ইচ্ছে শক্তি রয়েছে শিমুলের। যা দিয়ে অনেক দুর্গম পথও সহজে পাড়ি দেয়া যায়। তবে শিমুলদের মতো মেধাবীদের ধরে রাখতে সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসা উচিত বলেও অভিমত এই প্রধান শিক্ষকের।

x