দাম বৃদ্ধি করে ওয়াসার আর্থিক ক্ষতি কমানোর সিদ্ধান্ত যুক্তিসঙ্গত নয়

শনিবার , ১২ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৪:৩৬ পূর্বাহ্ণ
39

চট্টগ্রাম ওয়াসা আবাসিক ও অনাবাসিক খাতে (শিল্প ও বাণিজ্য) পানির দাম ৫ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। ফেব্রুয়ারি থেকে পানির বাড়তি দাম কার্যকর হবে বলে গত ৯ জানুয়ারি দৈনিক আজাদীতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা গেছে। ‘পানির দাম ৫ শতাংশ বাড়ল’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতি বছর ওয়াসার বোর্ড সভায় অনুমোদনের মাধ্যমে পানির দাম ৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ায় চট্টগ্রাম ওয়াসা। বোর্ডের সর্বোচ্চ দাম বাড়ানোর ক্ষমতা এতটুকুই। এর বেশি বাড়াতে চাইলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের বিশেষ কমিটির অনুমোদন লাগে। এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী একেএম ফজলুল্লাহ বলেন, আগে ছিল প্রতি ইউনিট পানির বিল ৯ টাকা ৪৫ পয়সা। এখন প্রতি ইউনিট পানির বিল পড়বে ৯ টাকা ৯২ পয়সা। আর্থিক ক্ষতি কমানো ও বিভিন্ন প্রকল্পের বৈদেশিক ঋণ শোধের জন্য পানির দাম বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই বলে দাবি করেছেন ওয়াসার কর্মকর্তারা।
এদিকে, পানির মূল্য গ্রাহক প্রতি ইউনিট ৯.৪৫ থেকে ৯.৯২ পয়সায় ৫ শতাংশ বাড়ানোর প্রতিবাদ জানিয়ে অবিলম্বে এ সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন দেশের ক্রেতা-ভোক্তাদের স্বার্থ সংরক্ষণকারী জাতীয় প্রতিষ্ঠান কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) নেতৃবৃন্দ। তাঁরা বলেন, ওয়াসার পানির মূল্য বৃদ্ধির আগে পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত না করে, সিস্টেম লসের নামে পানি চুরি, অপচয় বন্ধ না করে, ভৌতিক বিল ও অতিরিক্ত বিলের নামে গ্রাহক হয়রানির কারণে সাধারণ ভোক্তাদের জন্য অসহনীয় ও অসন্তুষের কারণ হতে পারে। অন্যদিকে দাম বাড়ানোর আগে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পূর্বে গ্রাহকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের মতামত নেবার জন্য গণশুনানির আয়োজন করা হলেও ওয়াসা গ্রাহকদের কোন প্রকার মতামত না নিয়ে একতরফাভাবে দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়া অন্যায্য ও ভোক্তা স্বার্থ বিরোধী এবং অগ্রহণযোগ্য। দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও সহজতর হওয়া উচিত। বোর্ড সভা ও মন্ত্রণালয়ের আদেশে দাম না বাড়িয়ে গ্রাহকও এ খাতে সকল স্টেকহোল্ডারদের মতামত নিয়ে এবং যাবতীয় বিষয়গুলি বিবেচনায় এনে দাম নির্ধারণ করা উচিত। একই সাথে গ্রাহকদের বিলগুলি মাঠ পর্যায়ে সুষ্ঠু তদারকির আওতায় এনে মিটার ও বিলের সাথে সমন্বয় করার জন্য নিয়মিত মনিটরিং করা দরকার।
ওয়াসার যুক্তি অনুযায়ী আর্থিক ক্ষতি কমানো ও বিভিন্ন প্রকল্পের বৈদেশিক ঋণ শোধের জন্যই পানির দাম বাড়ানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, লোকসান কমানোর নানাবিধ উপায় আছে। সেগুলো অবলম্বন না করে দাম বৃদ্ধির শর্টকাট রাস্তায় হাঁটাটা মোটেও যুক্তিযুক্ত নয়। পানির অপচয় রোধ, দুর্নীতিবন্ধ করাসহ নানা উপায়ে লোকসান কমানো যায়। পানি সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করছে দিন দিন।
দখল দূষণে নদ-নদীর অবস্থাও সঙ্গীন। এ অবস্থায় পানির অপচয় বন্ধ করতে হবে। এ জন্য সাশ্রয়ী পানির কল তৈরি ও ব্যবহার করা যেতে পারে। বিদ্যুতের ক্ষেত্রে যেমন এনার্জি সেভিং বাল্ব ব্যবহার করা হয়। এক্ষেত্রে ওয়াসা দায়িত্ব নিতে পারে। যাতে চাইলেই কেউ পানির অপচয় করতে না পারে, সেরকম প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং ব্যবহার করা যায় কিনা- সেটি নিয়েও ভাবতে হবে। সচেতন নাগরিকদের ধারণা, পানির দাম বৃদ্ধির ফলে বাড়িওয়ালাদের কোনো সমস্যা হবে না। শেষ পর্যন্ত ভাড়াটিয়াদের ওপরই গিয়ে চাপবে এর দায়। এমনিতেই মূল্যবৃদ্ধির যাঁতাকলে আছে জনগণ। এর ওপর পানির অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধি তাদের ওপর বাড়তি চাপ। এই চাপ তারা কতটা সহ্য করতে পারবে সেটি অবশ্যই ভাবতে হবে। চট্টগ্রাম মহানগরীতে প্রায় ৬০ লাখ মানুষের বসবাস। জনসংখ্যার সাথে বৃদ্ধি পাচ্ছে নগরীর পরিধি, বাড়ছে আবাসিক ভবন দালান কোঠাও। বৃদ্ধি পাচ্ছে কলকারখানার সংখ্যাও। অথচ এই নগরীতে নেই কোনো সুয়ারেজ ব্যবস্থা। ফলে নগরবাসীর সৃষ্ট পয়ঃবর্জ্য খাল নালা হয়ে সরাসরি গিয়ে পড়ছে কর্ণফুলী নদীতে। এতে করে বিষিয়ে উঠছে নগরীর খাল-নালা ও কর্ণফুলীর পরিবেশ। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরে জানা যায়, প্রতিদিন টনে টনে টয়লেট বর্জ্য খাল-নালা হয়ে নদীতে পড়ছে। কোনো প্রকার পরিশোধন ছাড়াই এসব তরল বর্জ্য খোলা নালা-নর্দমা হয়ে যাচ্ছে নদীতে। এতে করে নগরীর পরিবেশ মারাত্মক দূষণের শিকার হচ্ছে। আবাসিক ভবনগুলোতে টয়লেট বর্জ্য সাময়িক সংরক্ষণের জন্য রিজার্ভার থাকলেও এসব বর্জ্য নির্দিষ্ট সময় পর ওই রিজার্ভার থেকে তুলে সরাসরি নালা নর্দমায় ফেলা হচ্ছে।
খোলা নালা-নর্দমা হয়ে এসব বর্জ্য যাচ্ছে নদীতে। বর্ষাকালে বৃষ্টির কারণে নগরীর নালা-নর্দমাগুলো সচল থাকে। পানির সাথে এসব বর্জ্য ভেসে যায় নদীতে। তাই সুয়ারেজ ব্যবস্থার জন্যও ওয়াসাকে উদ্যোগ নিতে হবে।

x