দহন-দানে পুণ্য যে-জীবন

ফেরদৌস আরা আলীম

শনিবার , ৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ at ৪:২৮ পূর্বাহ্ণ
138

 

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের নিভৃত শুশ্রূষায় সমর্পিত রমা চৌধুরীর আর ফেরা হলো না। তেসরা সেপ্টেম্বর সোমবার ভোরের শান্তিমগ্ন চরাচরের পঞ্চভূতে মিলিয়ে গেছে তাঁর অন্তিম নিঃশ্বাস। তাঁর জীবনাবসানের সঙ্গে সঙ্গে অভিমানক্ষুব্ধ এক লড়াকু আবেগের নামটি অতঃপর কিংবদন্তী হয়ে গেল।

বন্দর নগরীর পিচঢালা পথের চেয়ে বেশি আর কে জানবে যে রমা চৌধুরী আর নেই! সৈয়দ শামসুল হকের একটি উপন্যাসের এক প্রবাসী চরিত্রকে প্রচণ্ড এক শীতের রাতে দুফোঁটা চোখের জল বুঝিয়ে দিয়েছিল উষ্ণতার শেষ উৎসটি কোথায় । গনগনে রোদের দুপুরে চট্টগ্রামের পিচঢালা পথেরা জানে রমা চৌধুরীর পদপাতে কী ছিল। বছর দুয়েক আগে এক বিশ্ব জরিপে দিনরাত্তিরের চব্বিশ ঘণ্টার হিসেব ধরে বলা হয়েছিল আমাদের মেয়েরা জীবনের বারোটা বছর শুধু রান্না ঘরে কাটায়। পথ তাঁর জীবনের কতটা সময় কেড়ে নিয়েছে তার যথার্থ হিসাব হলে আমাদের রান্নাঘরের সময়টা বোধ করি লজ্জা পাবে। দৈনিক আজাদীর সম্পাদকীয় পাতা ফেসবুক থেকে প্রতিদিন নিয়ম করে কিছু স্ট্যাটাস ছাপে। পত্রিকার পাঠক বিষয়টা কোন দৃষ্টিতে দেখেন জানি না। কিন্তু তাঁর চলে যাবার পরের দিন যখন কাগজ আতিপাঁতি করে তাঁর খবর খুঁজছি তখন ওই অংশটুকুতে এসে মন জুড়িয়ে গেল। আনোয়ারা আলম ও কাজী রুনু বিলকিসের লেখার প্রতিটি পংক্তি চোখ ভিজিয়ে দিয়েছে। আমেরিকা থেকে বাদল সৈয়দ অঝোর ধারায় কেঁদেছেন তাঁর জন্য। কিছু ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়াও ব্যক্ত করেছেন তিনি। ৩৫০০ টাকার বই ১৫০০ টাকায় কিনে রমা চৌধুরীর সঙ্গে ছবি তুলে যাঁরা নিজেদের বিজ্ঞাপিত করেছেন তাঁদের হয়ে রমা চৌধুরীর কাছে ক্ষমা চেয়েছেন তিনি। তাঁকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলি, রমা চৌধুরী তার খেরো খাতায় যত্নে ক্রেতার নামধাম সহ টাকার অঙ্ক লিখে রাখতেন। নিজের কাছে তাঁর নিজের প্রতিটি কাজের জবাবদিহি ছিল। বেহিসেবী কাজ তিনি করেননি কখনও। তাঁর চারিত্রিক দৃঢ়তার তুলনা হয় না। নিজের হাতকে কখনও দান গ্রহীতার হাত করে তোলেন নি তিনি। তাঁর গ্রন্থ প্রকাশক আলাউদ্দিন খোকনের (শুধু প্রকাশক তো নয়, এই শহরে সার্বক্ষণিক সহায় হয়ে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাঁকে আগলে রেখেছেন খোকন) সঙ্গে অর্থসংক্রান্ত বিষয় নিয়ে তাঁকে রীতিমতো তর্কযুদ্ধ করতে দেখেছি। অপার সহিষ্ণুতায় খোকনকে তাঁর সবকথা মেনে নিতেও দেখেছি।

রমা চৌধুরী জাতলেখক। লিখে গেছেন আমৃত্যু। ওইটুকু একটা ঘরে (২০ বাই ১২ ফুট লিখেছে খবরের কাগজ) বইয়ের স্তূপের মাঝখানে বসে, হাঁটুর উপর খাতা রেখে, একগাদা বেড়ালের আদরের উৎপাত সয়ে তিনি কিভাবে লিখতেন জানি না। অসাধারণ স্মরণশক্তি এবং যৌক্তিক বিশ্লেষণের ক্ষমতা ছিল তাঁর। প্রকাশভঙ্গিটা ছিল ঋজু, অকৃত্রিম। আজকের কাগজের (আজকের কথা নয়) সাহিত্য সাময়িকী ‘সুবর্ণরেখা’য় তাঁর ধারাবাহিক লেখা পড়ে তাঁকে প্রথম চিনেছিলাম রবীন্দ্রকাব্যে নারীর মানসী ও কল্যাণী রূপ নিয়ে (সম্ভবত) লিখে যাচ্ছিলেন তিনি। তাঁর কোনো গ্রন্থে এ লেখাটি দেখেছি বলে মনে পড়ে না। অবশ্য গ্রন্থজীবনটি তিনি ‘রবীন্দ্র সাহিত্যে ভৃত্য’ নামক গ্রন্থ দিয়ে শুরু করেছেন। ভাব বৈচিত্র্যে রবীন্দ্রনাথ, এক হাজার এক দিন যাপনের গদ্যসহ তাঁর ১৮টি গ্রন্থ রয়েছে। ‘একাত্তরের জননী’ গ্রন্থটি নানা কারণে উল্লেখযোগ্য। এ গ্রন্থের মুখবন্ধে তিনি লিখেছেন, ‘সবদিক ভেবে দেখলে একাত্তরের জননী আমি নিজেই। পাক হানাদার বাহিনী আমাকে প্রাণে না মারলেও আমার আত্মার অপমৃত্যু ঘটিয়েছে।’ রমা চৌধুরী জীবনবাদী লেখক ছিলেন। বলিষ্ঠ জীবনবাদ তাঁর ক্ষেত্রে সহজাত ও স্বতঃস্ফূর্ত ছিল। অন্তত কোনো নারী লেখকের মধ্যে এটি সহজগোচর নয়। তাঁর স্মৃতিকথা জাতীয় লেখায় এর সাক্ষাৎ পাবেন পাঠক। মূলত ঔপন্যাসিক রমা চৌধুরী এক অর্থে একটি উপন্যাসজীবন যাপন করে গেছেন। একাত্তরের জননীতে তার কতটুকু পাওয়া গেল অপঠিত বলে জানানো গেল না। (কেউ কি জানাবেন?) তাঁর প্রবন্ধগ্রন্থ ‘যে ছিলো মাটির কাছাকাছি’ কবি জসীম উদ্‌্‌দীনকে নিয়ে ‘বেদনার কবি’সহ তাঁর ৪টি কাব্যগ্রন্থের মূল্যায়ন। কবিমূল্যায়ন, বিষয় নির্বাচন এবং গ্রন্থের নামকরণে রমা চৌধুরীর সংবেদনশীল মন ও গভীর মননশীলতার পরিচয় মেলে। প্রচুর উদ্ধৃতিসহ এ গ্রন্থের পাঠ হৃদয়গ্রাহী।

বছর দশেক শিক্ষকতা করেছেন রমা চৌধুরী। তাঁর কোনো সহকর্মী বা ছাত্রীদের মধ্যে এমন কেউ কি নেই যিনি বা যাঁরা তাঁকে জানতেন, চিনতেন। আমাদের মিনতিদি (মিনতি বিশ্বাস) এই শহরে সেন্ট মেরিস স্কুলের মতো একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষয়িত্রী ছিলেন।

লেখালেখি করেছেন। সাংস্কৃতিক কর্মযজ্ঞে নিবেদিত থেকেছেন। অথচ এমন একজনকেও আমরা পাইনি যিনি তাঁর সম্পর্কে দুচারটে কথা লিখে আমাদের কৃতজ্ঞতাভাজন হয়েছেন। রমা চৌধুরীকে নিয়ে তাঁর জীবদ্দশায় আমরা কেবল বিব্রত থেকেছি। কেন তিনি তার অকালপ্রয়াত অবোধ সন্তানদের শহীদ স্বীকৃতি চান? এতকাল পরে, একাত্তরের ছাইচাপা স্মৃতিটাকে এতকাল পরে, যখন বিস্মৃতি নিজের নিয়মে দীর্ঘ দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করে গেছে, তখন নিজেই আবার দিন তারিখসহ তাকে টেনে নিয়ে এলেন? ১৯৭১ এ বোয়ালখালী বিদুগ্রাম উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রমা চৌধুরীকে সেখানেও কেউ মনে রাখেনি? কোলের সন্তানেরা যে মাটিতে ঘুমিয়ে রয়েছে সে মাটির বুকে তিনি জুতো পরা পায়ে হাঁটবেন, এও হয়? তাঁর যেঘরে শত্রুরা আগুন দিয়েছে তিনি সে ঘরের দগ্ধীভূত একটি অংশের সংস্কার কাজ করেননি। একইভাবে রেখে দিয়েছেন। স্মৃতি সংরক্ষণের এমন চিন্তা কি খুব সহজলভ্য? তাই তাঁকে নিয়ে কেবল প্রশ্ন জাগে। উচিতঅনুচিত কথা হয়। কিন্তু আর নয়। আজাদী প্রতিবেদন জানিয়েছে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ‘স্থানীয় প্রশাসন, বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং সর্বস্তরের মানুষ’ তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছে। কুসুমকুমারী সিটি কর্পোরেশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, অপর্ণাচরণ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কাজেম আলী হাইস্কুলের শিক্ষার্থীরা সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে তাদের শিক্ষকদের নেতৃত্বে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন তাঁকে। চট্টগ্রামের ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে পুলিশের একটি চৌকষ দল তাঁকে গার্ড অব অনার প্রদান করেছে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের পক্ষ থেকে চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। শ্রদ্ধা জানিয়েছেন নগর বিএনপির সভাপতি ও সহসভাপতি। ছিলেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, বাম গণতান্ত্রিক মোর্চা, আইন ও সালিশ কেন্দ্রসহ আরও নানা সংগঠনের শ্রদ্ধা পেয়েছেন রমা চৌধুরী। শ্রদ্ধা জানিয়েছেন বিভাগীয় কমিশনার এবং অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার। তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

শহীদ মিনার থেকে তাঁর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় চেরাগী চত্বরে। সেখান থেকে তাঁর প্রায় দেড়যুগের আবাসস্থল লুসাই ভবন চত্বরে নিয়ে যাওয়া হয় তাঁকে। সেখানে মঞ্চে শায়িত রমা চৌধুরীর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান স্বয়ং। তিনি রমা চৌধুরীর স্মৃতি সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন। লুসাই ভবন থেকে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় বোয়ালখালী উপজেলায়। উপজেলা শহীদ মিনার ও পোপাদিয়া গ্রামের বাড়িতে শেষবারের মতো শ্রদ্ধা জানানোর পর রাষ্ট্রীয়ভাবে গার্ড অব অনার দেওয়া হয় তাঁকে। তাঁর শেষ ইচ্ছানুযায়ী পুত্র দীপঙ্কর টুনুর সমাধির পাশে তাঁকে ধর্মীয় নিয়মে সমাহিত করা হয়।

রমা চৌধুরী বলতেন, ‘৭১ আমাকে দিয়েছে পোড়া ভিটে, কাঁধের ঝোলা, ছেলের শোক আর খালি পা।’ তিনি কি জানতেন মৃত্যুর পরে এত এত রাজকীয় আয়োজন অপেক্ষমান থাকবে তাঁর জন্য? অনেক স্বপ্ন ছিল তাঁর। বিশেষ করে একটি অনাথ আশ্রম এবং একটি বৃদ্ধাশ্রমের কথা তিনি প্রায়ই বলতেন। অনাথ আশ্রমটি পোপাদিয়ার আপন ভিটেয় গড়ে তোলার কাজে তিনি নিজেই উদ্যোগী হয়েছেন বহুবার। সম্ভব হয়নি। আমরা চাই তাঁর সকল স্বপ্ন সফল হোক। তিনি চিরজীবী থাকুন আমাদের সকলের মধ্যে। তাঁর স্মৃতি চিরজাগরুক থাকুক আমাদের স্মৃতিতে।

x