থামছে না ভেজালের দৌরাত্ম্য নানা রোগে আক্রান্ত মানুষ

দরকার সচেতনতা, কঠোর আইন ও প্রয়োগ

জাহেদুল কবির

শনিবার , ১২ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৪:২১ পূর্বাহ্ণ
47

প্রশাসনের অভিযানের পরেও কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না ভেজাল খাবারের দৌরাত্ম্য। ছোট ও মাঝারি হোটেলের পাশাপাশি নগরীর অনেক নামীদামি রেস্টুরেন্টেও এখন পরিবেশিত হচ্ছে বাসি ও ভেজাল খাবার। এমনকি সম্প্রতি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ডক্টরস ও নার্সেস ক্যান্টিনেও ভেজাল ও বাসি খাবার বিক্রির সংশ্লিষ্টতা পেয়েছেন প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে সরকারকে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। খাদ্য মানেই তাই আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠে ক্যালসিয়াম কার্বাইড, ফরমালিন, হাইড্রোজ, ইথোপেনসহ নানা ক্ষতিকর রং ও রাসায়নিক বিষের সংমিশ্রণ। এসব খাবার খেয়ে মানুষের কিডনি বিকল, হার্ট অ্যাটাক, ক্যান্সারসহ নানা ধরনের রোগ হচ্ছে। এছাড়া দেশে খাদ্যে ভেজালকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়ার কোনো নজির নেই। ফলে তারা শুধু জরিমানার অংক গুণেই ফের একই কাজ করতে থাকে।
এদিকে, গত বুধ ও বৃহস্পতিবার প্রশাসনের অভিযানে নগরীর জামালখান এলাকার দাওয়াত রেস্টুরেন্ট, চেরাগীর মোড় এলাকার নিউজি রেস্টুরেন্ট, ও আম্বারখানা রেস্টুরেন্টকে জরিমানা করেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। এছাড়া অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার সংরক্ষণের দায়েও কয়েকটি হোটেলকে জরিমানা করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উৎপাদন থেকে শুরু করে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত ভোজাল পণ্যের ছড়াছড়ি। মূলত এসব পণ্যের সহজলভ্যতা ও প্রশাসনের সঠিক নজরদারির অভাব এর জন্য দায়ী। বিষাক্ত ও রং মিশ্রিত খাবার ডায়াবেটিস ছাড়াও কিডনি, লিভারসহ অন্যান্য অঙ্গে ক্যান্সারের কারণ। বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৪৫ লাখ মানুষ খাদ্যে বিষক্রিয়ার ফলে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। লিভার ও কিডনি বিকলের পাশাপাশি হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার পেছনের ক্ষতিকারক রাসায়নিকযুক্ত খাবারই দায়ী। ভেজালের সঙ্গে জড়িত লোকদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে খাদ্যদ্রব্যকে ভেজালমুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি জনগণকে এ ব্যাপারে সচেতন হতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা আরো বলেন, খাদ্যে ভেজাল মেশানোর অপরাধ হিসেবে প্রতিবেশি দেশ ভারতে যাবজ্জীবন সাজা দিয়ে থাকে। এছাড়া চীনে মৃত্যুদণ্ড, পাকিস্তানে ২৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। আমাদের দেশেও খাদ্যে ভেজালের বিরুদ্ধে আইন আছে। কিন্তু এর যথাযথ প্রয়োগ নাই।
জানা গেছে, বিশুদ্ধ খাদ্য অধ্যাদেশ-১৯৫৯ (সংশোধিত ২০০৫) এ খাদ্য ভেজাল পাওয়া গেলে সর্বোচ্চ ১ বছর সশ্রম কারাদণ্ড বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। অপরদিকে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন-২০০৯ এ সর্বোচ্চ ৩ বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ২ লক্ষ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। নতুন প্রণীত নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩-এ জরিমানা ও শাস্তির পরিমাণ বাড়িয়ে ৫ বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ১০ লক্ষ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এসবের খুব একটা প্রয়োগ হয় না বললেই চলে।
খাদ্যে ভেজাল প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মনির উদ্দিন দৈনিক আজাদীকে বলেন, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে খাবারে রং ব্যবহৃত হয়। তবে তারা খাদ্যের সাথে সহনশীল (ফুড গ্রেড) রং ব্যবহার করে। কিন্তু আমাদের দেশের চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমাদের দেশে খাদ্যদ্রব্যে টেঙটাইলের কাপড়ের রং ব্যবহার করা হয়। ফুড গ্রেড রং ব্যবহার না করার ফলে দেখা যায়, শরীরের অভ্যন্তরে অন্যরকম বিক্রিয়া হয়। এতে শরীরে বিভিন্ন স্পর্শকাতার অঙ্গ যেমন কিডনি, লিভার ও গলব্লাডারে আঘাত হানে।
তিনি আরো বলেন, মুড়িকে অত্যধিক সাদা করার জন্য ইউরিয়া সার ব্যবহার করা হয়। এটা খুবই ভয়াবহ। আরেকটা বিষয় হচ্ছে, বিভিন্ন তেল যখন দ্বিতীয়বার ব্যবহার করা তখন তা অঙিডাইজ হয়ে যায়। এসব পোড়া তেলের খাবার শরীরে গেলে ক্যান্সারসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। প্রায় সময় কলা কিংবা আনারস পাকানোর কাজে ক্যালসিয়াম কার্বাইড ব্যবহার করা হয়ে থাকে। কার্বাইড শরীরের জন্য অপেক্ষাকৃত কম ক্ষতিকর হলেও এতে দীর্ঘমেয়াদি নানা সমস্যায় ভোগার আশঙ্কা থাকে।
ড. মনির বলেন, এমনকি দীর্ঘদিন ধরে প্লাস্টিক বোতলে কিংবা পলি প্যাকে খাবার সংরক্ষণ করা হলে তাতেও খাদ্যে বিষক্রিয়া হতে পারে। কারণ প্লাস্টিক বোতল কিংবা পলি প্যাক কোনোটাই ফুড গ্রেড অনুযায়ী তৈরি হয় না। অথচ আমরা যেভাবে ফরমালিন নিয়ে কথা বলি, সেভাবে কিন্তু এসব বিষয় নিয়ে কথা বলি না। মাছে কিংবা সবজিতে হয়ত ফরমালিন ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে ফরমালিনযুক্ত সবজি ভেজা না থাকলে কিন্তু ফরমালিনের কার্যকারিতা থাকে না। ফরমালিন কিন্তু বাতাসে উড়ে চলে যায়।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক বেনু কুমার দে বলেন, ভেজাল প্রতিরোধ করার জন্য শুধুমাত্র প্রশাসনের অভিযান যথেষ্ট নয়। সবার আগে আমাদের ভেজাল খাবারের বিরুদ্ধে সচেতনতা বাড়াতে হবে। যারা ভেজাল খাবার তৈরি করছেন তারা আমাদের সমাজেরই লোকজন। তাদেরকে বোঝাতে হবে, তাদের পরিবারের সদস্যদের এই ভেজাল খাবার তিনি খাওয়াবেন কি না? যতক্ষণ পর্যন্ত সচেতনতা বৃদ্ধি করা যাবে না, ততক্ষণ পর্যন্ত এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়।
কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি এসএম নাজের হোসেন দৈনিক আজাদী বলেন, প্রশাসন অভিযান পরিচালনা করছে, এটি ঠিক। কিন্তু তা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। ভেজাল বিরোধী অভিযানে দেখা যায়, প্রশাসন প্রায় সময় জরিমানা দিয়েই দায় সারে। কিন্তু আমরা বারবার বলে আসছি, জরিমানার পরিবর্তে যদি অপরাধীদের জেল দেওয়া যায়, তাহলে অপরাধের প্রবণতা কমত। আবার দেখা যায়, প্রশাসন জরিমানা দেওয়ার পরে তিন মাস আর ওই প্রতিষ্ঠানের আশপাশেও যায় না। ফলে ওই অপরাধী একই ধরনের কাজ আবারও অব্যাহত রাখে। দেখা যায়, ভোক্তার পকেট থেকে জরিমানাকৃত টাকা পরোক্ষভাবে আদায় করে। যদি জরিমানা করার পরের মাসে একটি ফলোআপ চালানো যায়, তাহলে ওই ব্যবসায়ী কিংবা মালিক ভয়ে থাকবেন। এক প্রকার বলা যায়, ভেজাল বিরোধী অভিযান দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই।
তিনি আরো বলেন, অভিযান পরিচালনায় প্রশাসনের লোকজনের আন্তরিকতার অভাব রয়েছে বলে মনে করি আমরা। কোনো একটি এলাকার শুধুমাত্র একটি রেস্টুরেন্টকে জরিমানা করলে হবে না, এর আশপাশের সবগুলো রেস্টুরেন্টকেও জরিমানা করতে হবে।
এদিকে স্বাস্থ্য ঝুঁকি প্রসঙ্গে জেলা সিভিল সার্জন ডা. আজিজুর রহমান সিদ্দিকী দৈনিক আজাদীকে বলেন, ভেজাল খাবার গ্রহণ করলে ক্যান্সার হতে পারে। এছাড়া লিভার ও কিডনি ফেইলিউর হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

Advertisement