তোতা

দীপক বড়ুয়া

শুক্রবার , ২৫ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৪:১৮ পূর্বাহ্ণ
38

আমি নুরুজ্জমা মাঝি।
নৌকা চালাই। আমার বাপ- দাদারা নৌকো চালিয়ে সংসার চালাতো। আমিও চালাই। জীবনের সবসময়টা নদীতে কেটে দিলাম।আমার একমাত্র সন্তান তোতা। মেয়ে।
খোদা একটি সন্তানই দিলো। ভীষণ গরীব আমি। ঐ নৌকাটাই শুধু সম্বল। ঐ নৌকা চললে পেট চলে। নয়তো উপুস।
গ্রামের সবার শহরে যাবার পথ এই তেরপারি নদী। রাস্তা নেই। গাড়ি চলে না। এসব অনেক আগের কথা। তখন বাংলাদেশের জন্ম হয়নি।
গাঁয়ের সবাই সম্মান করে খবর পাঠাতো। কাল শহরে যাবো। আমাদের নিয়ে যাবে। তখন রোববার বন্ধ ছিলো। শহরে যারা ব্যবসা, চাকরি করতো শনিবারে বাড়ি আসতো। ফিরতো সোমবার ভোরে। শনিবার,সোমবার ভালো আয় হতো।
জাঁহাপুর থেকে সত্তারঘাটে যাওয়া মাত্র পাঁচটাকা একজনের ভাড়া। পনের বিশ জন হলে অনেক টাকা। ফিরতে কোন সময় পেসেন্‌জার পেতাম না।
কি সুন্দর দিন ছিলো।
মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা, আন্তরিকতার কমতি ছিলো না। বিপদে, সুখেদুখে সবাই ছুটে আসতো। বিয়েশাদিতে বড়ুয়া মুসলিমেরা এক সঙ্গে আনন্দের ঢেউ বইতো।
হঠাৎ শুরু হলো যুদ্ধ। ছাব্বিশে মার্চ রাতে।
বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ডাক দিলেন। তিনি জোর গলায় বললেন, তোমাদের যার যা কিছু আছে, তাই নিয়ে শত্রুদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ো। দেশকে মুক্ত না করা পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাবে।
সাড়ে সাত কোটি মানুষের উপর রাতের অন্ধকারে গুলি মারতে শুরু করলো পাকবাহিনী। আমাদের অপরাধ আমরা স্বাধীনতা চাই। আমরা অত্যাচার থেকে বাঁচতে চাই। নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই। নিজেরা সুন্দরভাবে জীবনযাপন করতে চাই।
শহরে যাওয়া আসা হয়না মানুষের। ভয়,আতংক। পথে পথে মানুষের মৃতদেহ। ঘরবাড়ি পোড়া। চারিদিকে লাশের গন্ধ। দেশে চরম দুর্ভিক্ষ, খাওয়া নেই,ব্যবসা নেই,চাকরি নেই।হাহাকার সবদিকে।
সাথে আমার নৌকা চলে না। টাকা নেই,খাওয়া নেই। আমার তোতা কাঁদছে। দশবারো বছরের সন্তান আমার। ওর মা বলে,
– কিছু চাল ডাল নিয়ে এসো। মেয়েটাতো খিদেই কাঁদছে। দু্থদিন পানি খেয়ে আছে।
আমি কার কাছে যাবো? সবার অবস্থাতো এক। হাটে বাজারে যার যা ছিলো শেষ হয়ে যাচ্ছে। শহর থেকে কিছু না এলে সবাই উপুষে মরবে। যাদের জমি আছে,গোলাভরা ধান আছে, তরকারি আছে। এভাবে ক্থদিন যাবে।
যুদ্ধ চলছে। বাঙালি মুক্তিবাহিনীর সাথে পাকিস্তানিদের। ওরা ভারি অস্ত্রে সুসজ্জিত। আর আমরা হালকা অস্ত্রে। মুক্তিযোদ্ধারা কিছুতেই পারছিলো না পাকবাহিনীর সাথে।
শহর,বন্দর অত্যাচার করে ওরা ফিরছে গাঁয়ে। শহরে মুক্তিযোদ্ধা নেই। গাঁয়ে আসছে মুক্তিযোদ্ধা খুঁজতে।
গাঁয়ের খ্যাতিমান মুসলিম লীগেরা তৈরি করে রাজাকার, আলবদর বাহিনী। পাকবাহিনীর সাথে হাত মিলিয়ে মানুষের উপর অত্যাচার,নিপীড়ন, মানুষ মারা শুরু করে।
বিশেষত যারা আওয়ামী লীগ, হিন্দু বৌদ্ধদের উপর। ওরা ভয়ে জীবন বাঁচাতে ভারতে ছুটতে থাকে। পথেও রেহাই নেই। সেই রাজাকারের অত্যাচার। এ কেমন কাজ? মানুষতো মানুষের জন্যই। মানুষের বিপদে মানুষ মানুষকে সাহায্য করবে। এটাইতো মানবতাবোধ। শেষ পর্যন্ত ঐ জ্ঞানটুকু হারিয়ে ফেলে মানুষ? কি হবে এখন?
শুধু হিন্দুবৌদ্ধ,মুসলিমেরা নয়, সকল শিক্ষিত মানুষেরা ভারত ছুটছে। পাকবাহিনী খুঁজছে বুদ্ধিজীবী। পথে রাজাকাররা পালিয়ে যাওয়া মানুষের সর্বশ্য কেড়ে নিচ্ছে। কি অমানবিক, নির্মম দূর্ধস্য কাজ। এইও মানুষে পারে?
আমাদের নৌকা চলে না। খাওয়া জুটে না। চারিদিকে তুমুল যুদ্ধ চলছে। কয়মাস যাবার পরে মুক্তিযোদ্ধাদের শক্তি বাড়ে। ভারতে মুক্তিযোদ্ধারা উন্নত ট্রেনিং ভারি অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধে নতুন উদ্দমে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এদিকে বাংলাদেশকে ভারত স্বীকৃতি দেয়। মিত্রবাহিনীও মুক্তিবাহিনী যৌথ আক্রমণ শুরু করে পাকবাহিনীর উপর।
শহর কিছুটা শান্ত হয়। শহরে মানুষের যাওয়া শুরু হয়। চাকরিতে যাচ্ছে, ব্যবসা করছে। আমার নৌকাও চলে। আয় হয়। যেন সুদিন আসছে।গাঁয়ের অনেক ছেলেরা মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং নিয়ে যুদ্ধ করছে।
গাঁয়ের কানু,নুরনবী,অমলেন্দু আরো অনেকে যুদ্ধ করছে। ওরা রাজাকার খুঁজছে। রাতের অন্ধকারে অনেকেই মুক্তিযোদ্ধাদের খাওয়াচ্ছে। অনাহারে,অনিদ্রায়,শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে সবাই। ওরা দেশের জন্য যুদ্ধ করছে। ওদের দেখভালো করা আমাদের কর্তব্য। যারা দেশকে,মাতৃভূমিকে ভালোবাসি এটা আমাদের করা একান্ত দায়িত্ব।
আমার তোতা জীবনচলার সাথী।
আমার সাথে নৌকার দাড় টানে। আবার ভালো নৌকাও চালায়। ওর মাথায় গামছা বেঁধে দিই। লুঙ্গি পরাই। ঢিলেঢালা শার্ট পরাই। যাতে কেউ বুঝতে না পারে তোতা যে একটা মেয়ে।
তোতা বুদ্ধিমান, চালাক, সাহসী।
সেদিন শহরে যাচ্ছি ভাড়া নিয়ে।
সত্তারঘাটে পৌঁছুতেই দেখি পাকসেনাদের গাড়ি। সত্তারঘাট ব্রিজ ডিনামেইটে উড়িয়ে দিয়েছে মুক্তিবাহিনী। বিশত্রিশ জনের একটা গ্রুপ। সঙ্গে বাঙালিও আছে। মুখে দাড়ি। রাজাকার,আলবদর হবে হয়তো। ওরা বলাবলি করছে জাঁহাপুর যাবে। মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষমতা বাড়ছে ওখানে।
আমার তোতা বলে,
– আব্বা, নৌকাতো শুধু আমাদেরটাই আছে। আমাদেরটা ভাড়া চাইলে নেবে ওদের। ওরাতো সাঁতার জানে না। নৌকাকে নদীর মাঝপথে নেবার সাথে সাথে দু’জনকে কাত করে দেবো। সঙ্গে সঙ্গে পাকসেনারা পানিতে হাবুডাবু খাবে।
তোতার কথা শেষ না হতেই নৌকার কাছে আসে আলবদরটা।বলে,
-যাবি জাঁহাপুরে?
আমি চুপ থাকি।
সে রেগে যায় আমার উপর। আরো রেগে বলে,
– এই শালা, গলায় কলা দিছস? শুনছিসনা কি বলছি।
ততক্ষণে পানজাবিরা নৌকার কাছাকাছি এসে দাঁড়ায়। হাতে অনেক ভারি অস্ত্র। পানজাবিরা ঐ রাজাকার বেটার সাথে উর্দুতে কিছু বলছে। সেও ভালো উর্দু জানে না। ভাঙাভাঙা যা বুঝাতে পারে,সেভাবে বুঝিয়ে বলছে।
রাজাকার আবারও বলে,
– জাঁহাপুর যাবিতো!
– ক’জন? আমি প্রশ্ন করি।
– এইতো, আমরা সবাই।
-মানুষতো বেশি,ভাড়া বেশি দিতে হবে।
– পাবি পাবি।ভাবিসনা।
– ঠিক আছে উঠেন।
পানজাবিরা উঠেতে থাকে। বিশজন। রাজাকার দুইজন।
নৌকা ডুবোডুবি।
কান্ড দেখে তোতা হাসে। আমিও হাসি।
রাজাকার বলে,
– এই ব্যাটা নৌকা ছাড়। একটু সাবধানে চালাস।
– ঠিক আছে সাবধানে চালাব।
অন্য রাজাকারে বলে,
– ও তোর কে? ছেলে?
– হ্যাঁ, আমার ছেলে। আমি উত্তর দিতেদিতে নৌকা ছাড়ি।
– তোর বাড়ি কোথায়?
– জাঁহাপুরে।
– আমার বাড়ি ধর্মপুরে।আমাকে চিনসনা? আমি জামায়াত চেয়ারম্যান সপিউদ্দীনের ছেলে কেরামত আলী।
– কিভাবে চিনবো,সারাদিনতো নদীতেই থাকি নৌকা নিয়ে। যাত্রী আনা নেওয়া করি। গরীব মানুষ! নৌকার সামান্য আয়ে সংসার চলে।
– আচ্ছা, জাঁহাপুরে অনেক মুক্তিযোদ্ধা আছে,জানিস খবরটা? ওরা নাকি রাজাকার খুঁজছে।
– আমি মুখ্যো মানুষ, ঐসবের কিছুই বুঝিনা।জানিনা।
নৌকা ততক্ষণে নদীর মাঝামাঝি।
জোয়ারে যাচ্ছি। নৌকা ছুটছে নিজের গতিতে। তোতা দাঁড় টানছে। আমার চোখে চোখ রেখে হাসছে। পানজাবিরা চতুর্দিকে অস্ত্র তাক করে আছে। নৌকা ভাসছে।দুলছে। কি সৌভাগ্য! আচমকা বাতাস আসে। নৌকো দুলে। ঢেউ এসে নৌকায় পরে। পানজাবিরা ভয়ে আউমাউ করে। সঙ্গে এলোমেলো বাতাস। ঠিক তখনই তোতা নৌকা কাত করার ইঙ্গিত দেয়। দেরি নয়। দুইজনে একসাথেই কাত করতে শুরু করি। কী আশ্চর্য! অল্পেতেই ঘূর্ণি হাওয়ায় নৌকা কাত হয়। পানজাবিরা নৌকা থেকে পড়ে যায়। আমি, তোতাও পড়ে যাই।
জোয়ারের জলে পানজাবিরা হাবুডাবু খায়। ঘোলা নোনা জল খায়। ডুবে, ভাসে! অতলে ডুবে যায়। মজার ব্যাপার, রাজাকারেরাও সাঁতার জানেনা। ওরা জল খায়। হাত তুলে বাঁচাও চীৎকার করে।
ওদের চীৎকারে আমি,তোতা হাসি।
আমি, তোতা সাঁতার কেটে নদীর কুলে কোমড় জলে দাঁড়াই। দেখছি,
সব পানজাবিরা ডুবছে।জল খাচ্ছে। মরছে।কেউ সাঁতার জানেনা। আহাঃ কী আনন্দ! একসঙ্গে অনেক পানজাবিদের অস্ত্রছাড়া মারতে পারছি।
তোতা বলে,
– আব্বা, এবার দেখো, মুক্তিযোদ্ধারা এবার বিজয় হবেই। সত্যিসত্যি দেশ স্বাধীন হবে।
– হ্যাঁরে তোতা,তুই ঠিকই বলেছিস, মুক্তিযোদ্ধারা চারিদিকে যেভাবে যুদ্ধ করছে মিত্রবাহিনীর সাথে, দেশ স্বাধীন হবেই। আর তোর বুদ্ধির প্রশংসা করতেই হয়। মাঝ নদীতে নৌকা কাত করাটার বুদ্ধিতো তোরই।
– আব্বু, শুধু আমার বুদ্ধির কথা বলছো! শুধু তাই নয়, আচমকা বাতাস আসাকেও ধন্যবাদ জানাতে হয়। ঐ বাতাস না আসলে নৌকা কাত করাটা কষ্টকর হতো।
– ঠিক বলেছিস তোতা।
নদীর জোয়ারে সব পানজাবিরা, রাজাকারেরা ভেসে যায়। তলিয়ে যায় গভীরে।
তোতা বলে,
– আব্বু, ঐ দেখো,আমাদের নৌকাটা তীরে আটকে আছে। ওটাকে রক্ষা করতে হবে। চলো যাই।
পানজাবিদের মৃত্যু আনন্দে আমার একমাত্র সম্বল আয়ের নৌকার কথাটা ভুলে যাই।
তোতা ভুলেনি।
সে আমার মেয়ে নয়, উপযুক্ত সন্তান।
আমরা দুজন কোমর জলে হেঁটেহেঁটে নৌকার দিকে পা বাড়াই।

x