তের শুক্রবারভীতি

রানা নাগ

মঙ্গলবার , ৩০ এপ্রিল, ২০১৯ at ৭:০৪ পূর্বাহ্ণ
33

‘প্যারাস্কেভিডেকাট্রায়াফোবিয়া’ শব্দটি শুনতে যেমনই লাগুক নামের মধ্যেই আছে এর অর্থ। গ্রিক ভাষায় প্যারাস্কেভি মানে শুক্রবার, ডেকাট্রিস মানে তের, আর ফোবিয়া মানে ভীতি। পুরোটা মিলে ‘১৩ শুক্রবারভীতি।’ অর্থাৎ কোনো মাসের ১৩ তারিখ যদি শুক্রবার হয়, তাহলে সেদিন অনেক মানুষই আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। শুনতে যেমনই লাগুক এই অদ্ভুত আতঙ্কে ভোগা মানুষ কম নয়। খোদ আমেরিকার প্রায় ১০% লোক এই আতঙ্কে ভোগে। কেন এই ভীতি ? জ্যোতিষশাস্ত্রে ১৩ সংখ্যাকে বলা হয় অশুভ। অনেকের ধারণা, বারোতে সবকিছু পূর্ণ হয়। যেমন: ১২ মাস, ১২ যোডিয়াক সাইন, ১২ অলিম্পিয়ান, যীশুর ১২ ভাবশিষ্য, বনী ইস্রাঈলের ১২ গোত্র ইত্যাদি। আর তাই বারোর পরে যা আসে, তা অযাচিত ও অশুভ! প্রাচীন রোমানরা বিশ্বাস করতো, ১২ জন মহান যাদুকর সর্বদা দল বেঁধে ঘুরে বেড়ায়, এদের সাথে ১৩ তম সঙ্গী জুটলে সে স্বয়ং শয়তান! তাই অনেকের মতে ১৩ শয়তানের সংখ্যা! একারণে অনেকেই ১৩ সংখ্যাটি এড়িয়ে চলেন। জেনে অবাক হবেন, ইউরোপ ও আমেরিকার অনেক হোটেলে ১২ ফ্লোরের পরে ১৪ ফ্লোর লেখা থাকে, মাঝখানে ১৩ ফ্লোর নেই! শুধু তাই নয়, ১৩ নম্বর গলি, ১৩ নম্বর বাড়ি ইত্যাদিরও অস্তিত্ব নেই অনেক জায়গায়! ইংল্যান্ডের মাত্র ২৮% রাস্তায় ১৩ নম্বর বাড়ি আছে!
এ তো গেলো তেরোর ভয়! কিন্তু শুক্রবারের সাথে তেরোর সম্পর্ক কোথায়? গবেষকরা ধর্মগ্রন্থ ঘেঁটে এই প্রশ্নেরও উত্তর বের করেছেন। যীশু খ্রিস্টকে যেদিন ক্রুশবিদ্ধ করা হয়, সেদিন নাকি ছিল শুক্রবার! এর আগের রাতে যীশুর বিখ্যাত নৈশভোজে (দ্য লাস্ট সাপার) তাঁর ১৩ জন শিষ্য উপস্থিত ছিলেন। ১৩ নম্বর শিষ্যটির নাম ছিলো জুডাস, যে কিনা যীশুর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল! তাছাড়া নূহের মহাপ্লাবনের দিনটিও নাকি ছিলো শুক্রবার! আদম নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল ভক্ষণ করেছিলেন শুক্রবারে! কাবিল হাবিলকে হত্যা করেছিল এই শুক্রবারে! নর্স পুরান অনুযায়ী, ১২ জন নর্স দেবতা ভালহাল্লায় বসে একসাথে নৈশভোজ সারছিলেন। তখন ১৩ নম্বর সভাসদ লোকই সেখানে হাজির হয় এবং আনন্দের দেবতা বাল্ডারের হত্যাকান্ড ঘটায়।
এ তো গেলো ধর্ম আর পুরাণের গল্প! এবার ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যাক! ঐতিহাসিকদের মতে, ১৩০৭ সালের ১৩ অক্টোবর ফ্রান্সের রাজা ৪র্থ ফিলিপ শতশত নাইট টেম্পলারকে বন্দী করে নির্মম অত্যাচার করেন। সে-দিনটি ছিলো শুক্রবার! ১৯৪০ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর বাকিংহাম প্যালেসে ৫ টি জার্মান বোমা আঘাত হানে এবং প্রাসাদের চ্যাপেলটি পুরোপুরি ধ্বসে যায়। সেদিনও ছিলো শুক্রবার! ১৯৭২ সালের ১৩ অক্টোবর শুক্রবার চিলির একটি যুদ্ধবিমান আন্দিজ পর্বতমালা থেকে চালকসহ উধাও হয়ে যায়। ২০১২ সালের ১৩ জানুয়ারি শুক্রবার কস্তা কনকর্ডিয়া ক্রুজ নামের একটি জাহাজ ইতালির পশ্চিম উপকূলে নিমজ্জিত হয়ে ৩০ জন যাত্রীর মৃত্যু হয়। ২০১৫ সালের ১৩ নভেম্বর শুক্রবার সন্ধ্যায় সন্ত্রাসীরা প্যারিসের বিভিন্ন স্থানে হামলা চালিয়ে ১৩০ জনকে হত্যা করে। এরকম অনেক কাকতালীয় ঘটনার কারণে বহু ইউরোপিয়ান ও আমেরিকানদের কাছে ‘ফ্রাইডে দ্য থার্টিন্থ’ একটি অশুভ দিন। তাই এই দিনে তারা ব্যবসাবাণিজ্য বন্ধ রাখে, বিমানভ্রমণ করে না, জাহাজে চড়ে না, কাজে যায় না, অনেকেই সারাদিন ঘর থেকেও বের হয় না! স্বয়ং আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট এই ফোবিকদের তালিকায় ছিলেন। তিনি ১৩ জনের ভোজসভায় কখনোই বসতেন না, ফ্রাইডে দ্য থার্টিন্থে বিমানেও চড়তেন না। অবশ্য এত কিছু করেও যে নিয়তি এড়ানো যায় না, তার প্রমাণ নিউ ইয়র্কের ডাজ বাক্সটার নামের এক নাগরিক। ফ্রাইডে দ্যা থার্টিন্থের ভয়ে তিনি ১৯৭৬ সালের ১৩ আগস্ট সারাদিন ঘরের বিছানায় শুয়ে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু কাকতালীয়ভাবে সেদিনই তাঁর বেডরুমের মেঝে ধসে পড়ায় তিনি মারা যান। প্রতিদিনের মতো বাইরে বের হলে হয়তো তিনি বেঁচেও যেতে পারতেন।

x