তৃতীয় বিশ্বের ম্যাজিক

১৪ লাইনের অনুগল্প থেকে ছবি

সনেট দেব

বৃহস্পতিবার , ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ at ১১:১২ পূর্বাহ্ণ
52

ওপার বাংলার ঔপন্যাসিক স্বপ্নময় চক্রবর্তীর ১৪ লাইনের অণুগল্প “উন্নতিশীল দেশগুলির সমস্যা” অবলম্বনে ২০ মিনিটের স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘তৃতীয় বিশ্বের ম্যাজিক’ নির্মিত হয়েছে। চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য, সংলাপ, পোস্টার, পোশাক পরিকল্পনা ও পরিচালনা করেছেন সত্যজিৎ চর্চা কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হেসেন পিন্টু। গত ৭ সেপ্টেম্বর শুক্রবার সন্ধ্যা ছয়টায় নগরীর জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় এর প্রদর্শনী। প্রদর্শনী পাশাপাশি ছিলো আলোচনা সভা ও মতবিনিময়ের আয়োজন।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কলামিস্ট আবুল মোমেন। আয়োজনের উদ্বোধক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চিত্রশিল্পী, নাট্যজন, কবি ও গল্পকার সাফায়াত খান। আলোচনা আয়োজনে বিশেষ অতিথি হিসেবে আরো উপস্থিত ছিলেন দৈনিক পূর্বকোণ পত্রিকার সম্পাদক ডা. . রমিজউদ্দিন চৌধুরী, কবি ওমর কায়সার, নাট্যজন শিশির দত্ত, কবি এজাজ ইউসুফী, গীতিকার ও দৈনিক আজাদী পত্রিকার বার্তা সম্পাদক এ. কে.এম জহুরুল ইসলাম, প্রাবন্ধিক আলম খোরশেদ এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সমালোচক শৈবাল চৌধুরী।

শেখ মিরাজুর ইসলামের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন কবি, সত্যজিৎ চর্চা কেন্দ্রের সভাপতি স্বপন দত্ত। কথামালায় আবুল মোমেন বলেন, ‘পিন্টু একটা প্রত্যাশার জায়গা তৈরী করেছে অনেক আগে থেকে। অনেক দূর থেকে দৌঁড়ে এসেছে পিন্টু। এই কুঁড়ি মিনিটের ছবিটি চট্টগ্রামের চলচ্চিত্র অঙ্গণে আশার সঞ্চার ঘটাবে বলে আমার বিশ্বাস।’

তৃতীয় বিশ্বের ম্যাজিক’আসলে গল্পের ভেতরের গল্প, মানুষের ভেতরে মানুষ, বিষয়ের ভেতরে বিষয়। এই স্বল্পদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্রে আপাতবর্ণিত ঘটনাগুলোর কেন্দ্রীয় চরিত্র আলী নামের লোকটির যে জীবনসংগ্রাম দেখা যায়, তা আসলে দরিদ্রবিশ্বএকটি সত্তা, একটি বোধ। চলার পথের আবর্জনা থেকে, ডাস্টবিনের স্তূপীকৃত বর্জ্য থেকে তার যাত্রা। এভাবে রূপকাশ্রিত দুর্গন্ধময় ভাগাড়ের পিরামিড বেয়ে উঠতে উঠতে সে বেঁচে থাকার চেষ্টায়রত। এমন করেই বাঁচে দরিদ্রবিশ্বের মানুষেরা। বাঁচে উন্নত বিশ্বের দানে, উচ্ছিষ্টে আর ঋণজালে। ময়লাঘাঁটা পেশাজীবী আলী ক্ষুুণ্নিবৃত্তির জন্য ‘তাজমহল’ নামক রেস্টুরেন্টে প্রবেশ করতে চাইলেও বিতাড়িত হয়। রয়েছে সুপার মার্কেটের ঝাঁচকচকে পরিবেশের অবাক পৃথিবীতেও তার বিচরণে বাধা। স্থান তার ফুটপাতের দারিদ্র্যক্লিষ্ট মানবকুলের মাঝে। নিয়তিকে অতিক্রম করার উপায় বুঝি নেই আলীর মতো বঞ্চিত বিশ্বের মানবগোষ্ঠীর।

নগরায়নের বর্জ্যের পাহাড় উল্টাতে উল্টাতে আলী পায় ভাঙাচোরা একটি খেলনা পিস্তল। ট্রিগারে চাপ দিতেই দুঃস্বপ্নের আওয়াজ। অতঃপর পেয়ে যায় ছোট একটি নল। নলের একপ্রান্তে চোখ রাখলেই দেখা যায় যতসব আজব কান্ডকারখানা। মন যাদের পরিস্কার তারাই কেবল দেখতে পায় অসঙ্গতিময় জীবনচিত্র। বিশ্বজুড়ে ঘটে চলা অসঙ্গতি, ক্রুরতা ও অমানবিকতার ঘটনা। এভাবেই আসতে থাকে দৃশ্যের পর দৃশ্য। আলী দেখে, আবর্জনার এভারেস্টের চূড়ায় বিজয়ীর উচ্চতায় দাঁড়িয়ে দূরবীনের মতো নলের প্রান্তে চোখ রেখে। পুঁজিবাদী বিশ্বের কূটচালে তৃতীয় বিশ্বের দেশে দেশে চলছে যুদ্ধবিগ্রহ, হানাহানি, জাতিগত উচ্ছেদ। ফুটে উঠে স্মৃতির মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ, ১৯৭১এ গণহত্যা। বিশ্ব বিবেকের ওপর চাবুকের আঘাতের মতো ফুটে উঠে মর্মভেদী চিত্রমালা। মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিতাড়ন ও নিমূর্লের প্রক্রিয়া। প্রাণভয়ে সমুদ্রে ভাসে ডুবন্তপ্রায় মানুষ। মৃত্যুর এমন উৎসব আর সহ্য করতে পারে না আলী। ভেঙে পড়ে প্রিয় মাটিকে আশ্রয় করে। কান্নার নোনা জলে ধুয়ে দিয়ে আলী যেন চায় ন্যায়, মানবিকতা, নৈতিকতা ও সমতার বোধে আবারও মানবসত্তার জাগরণ ঘটাতে।

চিত্রপরিচালক আনোয়ার হোসেন পিন্টু ছাড়াও চলচ্চিত্রটির প্রধান সহযোগী পরিচালক হচ্ছেন জাফর সমীর। চিত্রগ্রহণে জাহাঙ্গীর চিশতি ও মোরশেদ হিমাদ্রী হিমু। সম্পাদনা, শব্দ ও রঙ বিন্যাসকারী সুজন মাহমুদ এবং প্রযোজনা করেছেন হাসিনা বেগম। ছবির প্রধান চরিত্রে নাট্যজন অলক ঘোষ সহ আরো অভিনয় করেন মৃত্তিকা ঘোষ, রেজাইল করিম, সাব্বির আহমদ, শাহরিয়ার হাসান, শামিম খান ও মোহাম্মদ ইমন।

তৃতীয় বিশ্বে ম্যাজিক নির্মাতা আনোয়ার হোসেন পিন্টু বলেন, শৈশব থেকে বিদ্ধান ব্যক্তিদের কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করতাম। ৩২ বছরের সাংবাদিকতা জীবনের ২০ বছর ধরে ছবির কাজ করতে গিয়ে বুঝেছি, ভালো ছবি নির্মাণ করতে হলে চাকরি করা যাবে না। ছবিটি করার আগে সব কাজ আমাকেই করতে হয়েছে, ভাবতে হয়েছে। অনেকে বলেছেন ছবিতে রাজনীতি এসেছে। আমি কিন্তু রাজনীতি অর্থনীতি নিয়ে কোন চিন্তা করিনি। রাজনীতি যদি এসেই থাকে তা বাস্তবতার নিরিখে। তিনি বলেন, ৪০ বছর ধরে সিনেমার পেছনে লেগে আছি। ছবিটি নির্মাণে ৪ দিন শুটিং ৭ দিন সম্পাদনা করতে হয়েছে। মূলত সিনেমা তৈরি হয় সম্পাদনার টেবিলে।

উল্লেখ্য, নির্মিত ছবিটির উদ্বোধনী প্রদর্শনী ঢাকাস্থ চলচ্চিত্র ফিল্ম সোসাইটির আয়োজনে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে গত ১০ মে অনুষ্ঠিত হয়।

প্রদর্শনীটি জাতীয় পর্যায়ে বিপুল সাড়া ফেলতে সক্ষম হয়। চলচ্চিত্র নির্মাতা মোরশেদুল ইসলামের সঞ্চালনায় বক্তব্য রাখেন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বরা। এতে উপস্থিত ছিলেন চিত্রনির্মাতা সাকের হোসেন, শহীদজায়া বেগম মুশতারি শফি, . সাজেদ দেলোয়ার, মাহমুদুল হাসান, সাজ্জাদ আলম টুটুল, শিশু সাহিত্যিক আলী ইমাম, রোজি কবির এমপি, দৈনিক ভোরের কাগজ সম্পাদক শ্যামল দত্ত, অভিনেতা জিয়া উল হাসান, আফরোজা বানু, সুশীল সূত্রধর, আ ফ ম মোদাচ্ছের আলী প্রমুখ।

x