তৃণভোজী পশু উৎপাদন বাড়াতে হবে

বুধবার , ২৫ জুলাই, ২০১৮ at ৭:১৬ পূর্বাহ্ণ
78

প্রাণিজ আমিষের উৎসগুলোর মধ্যে মাছ উৎপাদনে বেশ উন্নতি করেছে বাংলাদেশ। স্বয়ংসম্পূর্ণতা এসেছে মুরগী ও ডিম উৎপাদনেও। এসব খাতেও ভালো প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। কিন্তু সে তুলনায় গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া উৎপাদন বেশ পিছিয়ে রয়েছে। ২০১৬১৭ অর্থ বছরে তৃণভোজী এ চারটি প্রাণির উৎপাদনে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১ শতাংশেরও কম। পত্রিকান্তরে গত ২১ জুলাই এখবর প্রকাশিত হয়েছে।

খবরে বলা হয়, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫১৬ অর্থবছরে দেশে গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া ছিল ৫ কোটি ৪৩ লাখ ৫৭ হাজারটি। ২০১৬১৭ অর্থ বছরে সেগুলো বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ কোটি ৪৭ লাখ ৪৫ হাজারে। সে হিসাবে উৎপাদনে প্রবৃদ্ধি হয়েছে শূন্য দশমিক ৭১ শতাংশ।

২০১৫১৬ অর্থ বছরে দেশে গরু উৎপাদন হয়েছে ২ কোটি ৩৭ লাখ ৮৫ হাজার, যা পরের অর্থ বছরে বেড়ে দাঁড়ায় ২ কোটি ৩৯ লাখ ৩৫ হাজারে। এক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি হয়েছে শূন্য দশমিক ৬৩ শতাংশ। অন্যদিকে ২০১৫১৬ অর্থ বছরে ১৪ লাখ ৭১ হাজারটি মহিষ উৎপাদন হলেও পরের অর্থবছরে ১৪ লাখ ৭৮ হাজারটি। সে হিসাবে মহিষের উৎপাদনে প্রবৃদ্ধি ছিল শূন্য দশমিক ৪৭ শতাংশ। একইভাবে ভেড়ার উৎপাদন ৩৩ লাখ ৩৫ হাজার থেকে বেড়ে ৩৪ লাখ ১ হাজার এবং ছাগলের উৎপাদন ২ কোটি ৫৭ লাখ ৬৬ হাজার থেকে বেড়ে ২ কোটি ৫৯ লাখ ৩১ হাজারটিতে উন্নীত হয়েছে ২০১৬১৭ অর্থবছরে। এদুই ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি ছিল যথাক্রমে ১ দশমিক ৯৮ শতাংশ এবং শূন্য দশমিক ৬৪ শতাংশ।

কয়েক বছর ধরে দেশে মাংস, দুধ, ডিমের মতো প্রাণিজ আমিষের উৎপাদন বেড়েছে। মাছ উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে, মুরগি ও ডিম উৎপাদনে এসেছে স্বয়ংসম্পূর্ণতা। এটা ভাল খবর সন্দেহ নেই। বিশেজ্ঞরা বলছেন, এ ধারা বজায় রাখতে পারা গেলে বাংলাদেশকে বিদেশ থেকে মাংসজাতীয় খাদ্য আমদানি করতে হবে না। এদেশের অর্থনৈতিক ভিত্তিও শক্ত হবে। কিন্তু ২০১৬১৭ অর্থবছরে গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়ার উৎপাদনে ১ শতাংশেরও কম প্রবৃদ্ধি হওয়ায় উন্নতির ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়ার আশংকা সৃষ্টি হয়েছে। প্রাণিজ আমিষের উৎপাদন বৃদ্ধি একদিকে যেমন দেশে আমিষের চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখছে তেমনি অন্যদিকেও কৃষি অর্থনীতিকে চাঙ্গা করছে। বর্তমানে জিডিপিতে দেশের প্রাণিজ আমিষের অবদান ১ দশমিক ৬৫ শতাংশ। সৃষ্টি হয়েছে লাখো মানুষের কর্মসংস্থান। এতে আয় ভালই হচ্ছে দেশে অনেকে চাষের কাজ ছেড়ে পশুপালন তথা খামারের দিকে মনোযোগী হচ্ছেন। তদুপরি স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণেরও সুযোগ বেড়েছে। এতে বেকারত্ব হ্রাস পাবে বলে মনে করা যাচ্ছে। এধারা অব্যাহত রাখতে হবে। এজন্য প্রয়োজন খামারিদের সরকারের সর্বাত্মক সাহায্য ও সহযোগিতা নিশ্চিত করা।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৩১৭ অর্থ বছরে গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া উৎপাদনে প্রবৃদ্ধি ১ শতাংশেরও কম হয়েছে। কেন কম হলো তার উত্তর খোঁজাও দরকার। চিহ্নিত করা প্রয়োজন উৎপাদন বৃদ্ধির পথে প্রতিবন্ধকতার কারণগুলো। গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া উৎপাদন বাড়াতে উন্নত মানের জাত সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। উন্নত জাতের জন্য প্রয়োজন উন্নত ব্রিড। কারণ বর্তমানের ব্রিডগুলো উন্নত জাতের নয়। গরুর জাত উন্নয়নে এদেশে এখনও ৩০ বছর আগের ব্রিড নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। অথচ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জাত ও ব্রিড হালনাগাদ করা গুরুত্বপূর্ণ। উন্নত বিশ্বে এটাই করা হয়। তারা নজর রাখে সময় ও পরিস্থিতি বিবেচনায় কম ব্যয়ে কীভাবে বেশি মাত্রায় মাংস উৎপাদন করা যাবে। আমাদের দেশে উন্নত জাত না আসায় দেশী গাভী দুধ উৎপাদনে সক্ষমতায় বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় পিছিয়ে পড়েছে। জাত ভালো না হওয়ায় খামারিদেরও বেশি পরিমাণ খাবার ও শ্রম দিয়ে কম মাংস উৎপাদন করতে হচ্ছে। এ সমস্যা সমাধানে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরকে খামারিদের সহযোগিতার সঙ্গে সঙ্গে জাত উন্নয়ন, কৃত্রিম প্রজনন ও মানসম্পন্ন ব্রিড তৈরির ওপর জোর দিতে হবে। প্রয়োজনে বিদেশের অভিজ্ঞ বিজ্ঞানীদের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে। তবে এক্ষেত্রে অবশ্যই বাংলাদেশের আবহাওয়ার সঙ্গে মানানোর বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। এতে নিয়মনীতিগত কোন বাধা থাকলে তা পর্যালোচনা করা বিধেয়। প্রাণির উৎপাদন বাড়াতে সম্ভাবনাময় প্রযুক্তিগুলো সঠিকভাবে সম্প্রসারণ অত্যাবশ্যক। উৎপাদনবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাজারজাতের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। খামারিদের সঠিকভাবে বেড়ে ওঠার এ দুটি বিষয় যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের কৃষিজমি কমে আসছে। তাই অল্পজমিতে অধিক উৎপাদনের বিষয়টি মাথায় রেখে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ঘটাতে হবে। এটি করতে পারলে এখাত আরো বড় হবে এবং অর্থনীতিও সমৃদ্ধ হবে। এ খাতের প্রতিবন্ধকতাগুলো বন্ধ করতে না পারলে দুধ ও মাংস আমদানি বাড়তেই থাকবে। বহু মানুষের পুষ্টি চাহিদা পূরণ হবে না। অনেকে কর্মসংস্থান হারাবে। এটা সার্বিকভাবে দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এমত অবস্থায় আশা করি প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ এবিষয়ে পদক্ষেপ নেবে।

x