তুরস্কে ইস্তাম্বুল বিজয়

আহমদুল ইসলাম চৌধুরী

বুধবার , ৩১ অক্টোবর, ২০১৮ at ৪:৪৬ পূর্বাহ্ণ
114

তুরস্কের সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মদ ১৪৫৩ খ্রিস্টাব্দে কনস্টান্টিনোপল জয় করেন। অতঃপর এ নগরীর নামকরণ করেন ইস্তাম্বুল। “চল্লুকর নৌকা পাহাড়দি চলে” অর্থাৎ সেলজুকের নৌকা পাহাড় দিয়ে চলে। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় এ প্রবাদ বাক্যটি এখনো হারিয়ে যায়নি। অর্থাৎ সেল যুগীয় তুর্কি সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মদ ১৪৫৩ খ্রিস্টাব্দে অতি সুরক্ষিত ইস্তাম্বুলের দুর্গ জয় করতে সক্ষম হন। কনস্টান্টিনোপল এত বেশী সুরক্ষিত অবস্থায় অপ্রতিরোধ্য ছিল বলে বারেবারে মুসলমানরা জয় করতে প্রচেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হন। বসফরাস প্রণালীর নিকটে দুর্গের অবস্থান। এর নিকটে যাতে কোন প্রতিপক্ষের নৌশক্তি আসতে না পারে সে লক্ষে কনস্টান্টিয়েনরা গোল্ডেন হর্ন মুখে বৃহদাকারের লোহার শিকলসহ একাধিক নৌ-প্রতিরক্ষা ব্যুহ তৈরি করে রাখে। কিন্তু তুর্কি সুলতান ২য় মুহাম্মদ যুদ্ধের জন্য তৈরিকৃত নৌকাগুলো সাগর থেকে ভিন্নপথে গোপনে পাহাড়ের ভিতর দিয়ে প্রণালী অতিক্রম করে ইউরোপীয় অংশে গোল্ডেন হর্নে ঢোকাতে সক্ষম হন। সেকালে তুরস্কের সাথে বন্দরের কারণে চট্টগ্রামের সাথে আলাদা যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা লাভ করে। চট্টগ্রাম বন্দরে নির্মিত জাহাজ টেকসই ও মানসম্মত ছিল বিধায় তুর্কি সুলতানরা তাদের গড়া বিখ্যাত মিশরের আলেকজান্দ্রিয়ায় (তখন মিশর তুর্কি সুলতানের অধীনে) শিপ ইয়ার্ডে নির্মিত জাহাজের চেয়ে অতি গুরুত্ব দিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের শিপ ইয়ার্ড থেকে জাহাজ খরিদ করে নিয়ে যেতেন। অতএব, তুর্কি সুলতান কর্তৃক ইস্তাম্বুল বিজয়ে চট্টগ্রামে নির্মিত জাহাজগুলোকে যে ব্যবহার করা হয়েছে তা অস্বীকার করা যাবে না। সেল যুগীয় তুর্কি সুলতান ইস্তাম্বুল বিজয়ের যুদ্ধের কৌশল হিসেবে পাহাড়ের স্থলভাগ দিয়ে যুদ্ধের নৌকা নিয়ে যাওয়ার সংবাদ চট্টগ্রামে সেকালে পৌঁছে যাওয়া স্বাভাবিক। ফলে আজো বয়স্কজনের মুখে সেল যুগীয় সুলতানের নৌকা (চল্লুকর নৌকা পাহাড়দি চলে) স্থলভাগের পাহাড় দিয়ে চলতে পারে বলে একটি প্রবাদ প্রচলন হয়।
১৪৫৩ খ্রি. সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মদ কনস্টান্টিনোপাল জয় করে তার নামকরণ করেন ইস্তাম্বুল। ইস্তাম্বুল জয় হয়েছে আজ থেকে প্রায় ৫৬৫ বছর আগে।
১৪৫৩ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিলে দ্বিতীয় মুহাম্মদ-এর ২১তম জন্মবার্ষিকীর এক মাস পর কনস্টান্টিনোপলের চারিদিকে এক শ্বাসরোধ্যকর আক্রমণ গড়ে তুলেন। কিন্তু বিভিন্ন অবস্থার প্রেক্ষাপটে কনস্টান্টিনোপলের সম্রাট ১৩৬২ খ্রিস্টাব্দে থেকে অটোম্যান সাম্রাজ্যের জয়-জয়কার অবস্থা বুঝতে পেরে শংকিত ছিল না। কনস্টান্টিনোপল সম্রাট তার দুর্গ রক্ষায় একাধিক প্রতিরক্ষা ব্যুহ তৈরি করে রাখে। তন্মধ্যে সিটি ওয়াল অন্যতম। নগরবাসীর বিশ্বাস ছিল অপ্রতিরোধযোগ্য সিটি ওয়াল তাদের রক্ষা করবে। সমুদ্রের দিক দিয়ে নগর আক্রমণের সুযোগ ছিল, ফলে বিশাল শিকল দ্বারা নৌপথ বন্ধ করে দিয়ে সুরক্ষিত করে রাখে, যাতে কোন অবস্থাতে শত্রুর জাহাজ এ পথ দিয়ে প্রবেশ করতে না পারে। কিন্তু তরুণ সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মদের নৌপথে এ প্রতিরোধের উত্তর জানা ছিল।
১৪৫৩ খ্রিস্টাব্দের মে মাসের রবিবার ভোরে দেওয়ালরক্ষীরা অবাক হয়ে দেখতে পেল বন্দরে মুসলিম জাহাজগুলোকে। মুসলিম সৈনিকরা রাত্রিকালীন সময়ে ২০০ ফুট দৈর্ঘ্যের কাষ্ঠ নির্মিত জাহাজগুলোকে পাহাড়ের ওপর দিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য কাষ্ঠ নির্মিত একটি রাস্তা নির্মাণ করেন। চাকাওয়ালা পরিবহন দিয়ে তা নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করে। এতে জাহাজগুলোতে কামান স্থাপন করা হয়। শুধু তাই নয় এতে আরও অন্তর্ভুক্ত ছিল ১৯ টন ওজনের বোমবাট কামান।
২৮ মে সূর্য উদয় সময় আক্রমণ শুরু হয়। নগরীর প্রত্যেকটি জায়গায় সতর্ক সংকেত বেজে ওঠে। শান্তা সূফিয়া (গীর্জা) লোকে পরিপূর্ণ ছিল। তারা প্রার্থনা করছিল এবং সংগীত পরিবেশন করছিল। কনস্টান্টিনোপল-এর প্রতিরক্ষা বাহিনী বা সৈন্যদল তুলনামূলকভাবে ছোট ছিল। এ প্রতিরক্ষা বাহিনীর মোট জনবল ছিল মাত্র ৭ হাজার। তাদের মধ্যে ২ হাজার জন ছিল বিদেশী। আক্রমণের সময় তথায় ৫ হাজার লোক বসবাস করত। অবশ্য কনস্টান্টিনোপলের বেতনভুক্ত সৈনিকদের মধ্যে তুর্কিদের সংখ্যা কম ছিল না। কিন্তু তুর্কি সৈনিকরা সম্রাটের ভক্ত ছিল এবং তাদের মধ্যে অনেকে কনস্টান্টিনোপলের পক্ষে যুদ্ধ করে প্রাণ হারায়। অপরপক্ষে, সেলজুকের তুর্কি সুলতান তথা দ্বিতীয় মুহাম্মদের অপেক্ষাকৃত বৃহত্তর সৈন্যদল ছিল। সামপ্রতিক তথ্য এবং অটোম্যানদের সরকারি কাগজপত্র প্রমাণ করে তুর্কি সুলতানের সৈন্য সংখ্যা ছিল ৮০ হাজার। তন্মধ্যে খ্রিস্টানের সংখ্যা কম ছিল না। তখন ইউরোপিয়রা সুলতানের সৈন্যবাহিনীর সাহসিকতা নিয়ে যেমনি মূল্যায়ন করতেন তেমনি সৈন্য সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তিতে থাকতেন। তাদের কারও কারও ধারণা, ১ লাখ ৬০ হাজার আবার কারও কারও মতে ২ লাখ অথবা ৩ লাখ।
সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মদ ইস্তাম্বুল আক্রমণের জন্য একটি নৌবহর গঠন করেন। এ নৌবহরে জাহাজের সংখ্যা ছিল ১০০ এবং সাথে সাথে বিভিন্ন আকৃতির ছোট জাহাজ ছিল যার এক এক গ্রুপের সংখ্যা ১৪৫/১৬০। তুর্কি সুলতানের রয়েছে যুদ্ধের ওপর বাস্তব অভিজ্ঞতার পাশাপাশি আধুনিক ও সুসংহত এক নৌবহর। অটোম্যানদের ইতিহাস পর্যালোচনা করে আরো জানা যায়, তখন তাদের হাতে মধ্যপাল্লার ক্ষেপণযোগ্য কামানও ছিল। অপরদিকে কনস্টান্টিনোপলের যেমনি রণকৌশল সমৃদ্ধ ছিলনা তেমনি কামান ও ক্ষেপণাস্ত্রের দিক দিয়ে দুর্বল ছিল।
তুর্কি সুলতানদের অগ্রযাত্রা অনুভব করে কনস্টান্টিনোপল সম্রাট তার সমস্ত শক্তি দিয়ে প্রতিরক্ষা ব্যুহ তৈরি করলেও কিন্তু তার মিত্র ইউরোপে নানান প্রতিকূলতা চলছিল। তুর্কি সুলতান কর্তৃক ইস্তাম্বুলের অনতিদূরে ইউরোপ ও এশিয়ার সংযোগস্থলে যখন ১৪৫২ খ্রিস্টাব্দে রোমেলি হিমার দুর্গ নির্মাণ কাজ সমাপ্ত হয় তখনি কনস্টান্টিনোপলে ভীতিকর অবস্থা সৃষ্টি হয়। কনস্টান্টিন পোপের কাছে লিখলেন ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে সাহায্যের প্রত্যাশায়। কিন্তু এ আহ্বানে কোন অনুকূল সাড়া পাওয়া যায়নি, যদিওবা তিনি সাহায্য পেয়ে উপকৃত হওয়ার জন্য উদগ্রীব ছিলেন। পোপ পঞ্চম নিকোলাস বাইজান্টাইন ভাবধারার প্রভাবিত ছিলেন না। তিনি পশ্চিমা রাজা ও রাজপুত্রের দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন।
অপরদিকে, ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের শত বছরের যুদ্ধে রাষ্ট্র দু’টি দুর্বল হয়ে পড়েছিল। স্পেন ও জার্মানিদের ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ ছিল জার্মানদের প্রাধান্য অপরদিকে হাঙ্গেরি ও পোল্যান্ড তাদের আভ্যন্তরীণ প্রতিকূলতায় জর্জরিত ছিল। তারপরও ইউরোপ থেকে একটি সৈন্যদল কনস্টান্টিনকে সহায়তা করার জন্য ইতালিতে উপস্থিত হয়েছিল। কিন্তু ইউরোপীয়দের সামরিক অবস্থা অটোম্যান শক্তিকে প্রতিহত করার জন্য পর্যাপ্ত ছিলনা। (আগামীবারে সমাপ্ত)।
লেখক : প্রাবন্ধিক, কলাম লেখক ও গবেষক

x