তিল থেকে তাল

শুভার্থী সেনগুপ্ত ৩২১০৫

বুধবার , ১৯ জুন, ২০১৯ at ১০:৫৮ পূর্বাহ্ণ
23

“তোকে নিয়ে আর পারলাম না”, চেঁচিয়ে উঠেলেন সুপ্রিয়া । সুপ্রিয়ার ছোট ছেলে বান্টি, চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। সে খুব বেশি চঞ্চল। একটা জায়গায় যে স্থির হয়ে দাঁড়াবে তারও সাধ্যি নেই। কারো কথা সম্পূর্ণ না শুনে সে চলে যায় ,যার জন্য অন্যদেরকে সমস্যায় পড়তে হয়। যেমনটা ঘটেছে এই ঘটনায়, সুপ্রিয়া বান্টিকে ডেকে বললো ,“এই নে ৫০ টাকা , ১০ গ্রাম মরিচের গুড় ..এই টুকু শুনে বান্টি দৌড় দিল। মা কি আনতে বলেছে তা ঠিক মতো না শুনেই বান্টি দোকানে চলে গেল।১০ মিনিট পর আগমন ঘটল তার, হাতে শুকনা মরিচ। সে মাকে বললো,“এই নাও মা
তোমার শুকনা মরিচ।” সে মাকে জিজ্ঞেস করলো ,“ওমা মা মরিচ দিয়ে কী রাঁধবে গো, না মানে শুকনা মরিচের তো আর কোরমা কালিয়া হয় না তাই বলছিলাম আরকি … বলো না মা কী রাঁধবে?” একে তো মরিচের বদলে শুকনা মরিচ তার উপর ছেলের এমন কথা, সুপ্রিয়ার পাগল হওয়ার অবস্থা। তবুও সে নিজেকে শান্ত করে বললো, বাবা বান্টি, শুকনা মরিচ দিয়ে অনেক ভালো একটা খাবার হয়। চিন্তা করছি আজ রাতে ওইটাই দেবো তোকে।
“কী মা? বলো না, প্লিজ ”পান্তা ভাত আর শুকনা মরিচ”, চেঁচিয়ে বললো সুপ্রিয়া।
সুপ্রিয়ার ধমকে থতমত হয়ে গেল বান্টি।
এতো গেল আজকের কথা, কেবল মায়ের সাথে নয়,তার এরকম ঘটনা ঘটে সবার সাথে। সবাই তাকে বারণ করলেও তার এ স্বভাব বদলাবার নয়। যেখানে পরিবারের সাথে এরকম আচরণ করে, সেখানে বন্ধুরাও রক্ষা পায় না। তাই বান্টির সাথে যখন তার বন্ধুরা কোন বিষয় নিয়ে কথা বললে বান্টিকে ধরে রাখে যতে সে সম্পূর্ন কথা শুনে। একদিন বান্টির বন্ধুরা কোন একটা বিষয় নিয়ে আলোচনা করছিল। ঠিক আলোচনা নয়, কোন একটা বিষয় নিয়ে তর্ক। তাদের তর্কে এসে যোগ দিল বান্টির বন্ধূ অর্ক র দাদা অলোক, ক্লাস সিক্সে পড়ে বলে একটু দাদা দাদা ভাব দেখায়। তাদের কথা শুনে অলোক বললো, “কোন কথাকে তিল থেকে তাল করা তো তোরাই জানিস”। ঠিক সেই সময় বান্টি পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল। অলোকের কথা শুনে ফেলল সে। তারপর অন্যান্য কাজ কর্ম বাদ দিয়ে সে বেঞ্চে বসে পড়ল। ভাবতে লাগল, “তিল থেকে তাল হয় আগে জানতাম না।” আর কেউ কি জানে অলোক দাদা ছাড়া এই কথাটা! কেউ জানুক না জানুক আমার কী। এখনো তো কেউ এটা আবিস্কার করেনি, তাই আমি অবশ্যই করবো। কী মজা, এখন আর দিদা ঠাকুম্মাকে তালের পিঠা বানানোর জন্য ভাদ্র মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে না। ইতিমধ্যে স্কুল ছুটির ঘন্টা পড়ল। যে বান্টি স্কুল ছুটির ৩০ মিনিট পর বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে দিতে
বাড়িতে পৌঁছে, সেই বান্টি আজ কোন দেরি না করে বাড়িতে পৌঁছে গেল। বাড়ি যাওয়ার আগে টিফিনের টাকা থেকে ১০ টাকার তিল কিনে নিল। সুপ্রিয়া বান্টিকে এত তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে দেখে অবাক হলো। তাকে জিজ্ঞেস করলো, এতো তাড়াতাড়ি ফিরলি যে আজ? ” বান্টি তার কথায় কান না দিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে পড়ল। ড্রেস পাল্টিয়ে, খাবার খেয়ে সে তার এঙপিরিমেন্ট শুরু করার জিনিস পত্র জোগাড় করা শুরু করলো, টব, পানি, মাটি একটা বীজ পোঁতার জন্য যা যা লাগে সব আনল, তবুও তার মনে খটকা রয়ে গেল, আর কী কিছু লাগে তিল থেকে তাল করতে। সে ভাবলো সে একবার অলককে জিজ্ঞেস করবে। নিজে নিজে বলতে লাগল, ” না, না, যদি অলক দা অর্ককে বলে দেয়, অর্ক যদি সবাইকে আগে ভাগে ফাঁস করে দেয়। দরকার নেই, আমি নিজে নিজেই করব।
মনে মনে ভাবল, ”দিদি এ বিষয়ে কিছুই জানে না, আরো নাকি ক্লাস টেন এ পড়ে, কিছুই জানে না বোকা একটা।”
আবারও সে নিজের কাজে মন দিল। কাজ শেষ করে বের হলো তার রুম থেকে।
সুপ্রিয়া তাকে দেখে বলল, ”আমার বাবুসোনা এতক্ষন পড়ছিল বুঝি”?
বান্টি ”বাবুসোনা” ডাক শুনে ভাবতে লাগল, সে মাকে বলল, ”মা আজকে কি নতুন টিচার আসবে? না মানে তুমি যখনই আমাকে বাবুসোনা, চাঁদ, মানিক ডাকো তখনই আমার নতুন নতুন টিচার আসে। আচ্ছা ওসব বাদ দাও। আমি একটা পরীক্ষা করছি, তো ডোন্ট ডিসট্রাব মি”। এ পরীক্ষায় সফল না হতে পারলে তো বলবে, দেখ, তোর মতোন একটা ছেলে পরীক্ষাটা করে ফেলেছে, আর তুই? গাধা কোথাকার, কিছুই পারিস না।” এ নিয়ে সুপ্রিয়া কোন আগ্রহ
দেখাল না। কারন তাঁর জানা আছে বান্টির এক্সপিরিমেন্ট আজব কিছু হবে। এদিকে বান্টি দিন রাত কেবল টবে পানি দিতে থাকে। আগের মতো দুষ্টুমি করে না। স্কুলে যায় আর ছুটি শেষে বাড়ি চলে আসে। তার এরকম আচরণ দেখে মা চিন্তিত হয়ে পড়ল। কী এমন পরীক্ষা করছে বান্টি, যার জন্য সে নাওয়া খাওয়া ছেড়ে দিয়েছে। মা তাকে জিজ্ঞেস করল, “তুই টবে কেবল পানি দিয়ে যাচ্ছিস, আর সারাদিন সারাবেলা কেবল টবের পিছনেই পড়ে আছিস, করছিস টা কী তুই?” বান্টি মাকে বলল, “এক্সপিরিমেন্ট, যা এখনো পর্যন্ত কেউ করেনি।” এর কয়েকদিন পর বান্টির মায়ের কাছে স্কুল থেকে ফোন এলো যে বান্টি অনেক অসুস্থ হয়ে গেছে। বান্টির মা তাড়াতাড়ি স্কুলে গেল।
তাকে ডাক্তার দেখানো হলো। ডাক্তার দেখে শুনে বললেন, দুর্বলতার কারনে তার এ অবস্থা হয়েছে। বান্টিকে দেখতে তার বন্ধুরা এলো, অলোকও এলো। সবাই তার জন্য চকলেট, ফল, আনল। তার প্রিয় বন্ধু অর্ক সুপ্রিয়াকে বলল,“জানেন আন্টি, ও তো এখন আমাদের সাথে খেলে না, ও কে আমি জিজ্ঞেসও করেছিলাম। ও বলল, এক্সপিরিমেন্ট নিয়ে ভাবছি”, আচ্ছা আন্টি ও কী এক্সপিরিমেন্ট করছে?
“কী জানি বাবা, টবে পানি দিতে থাকে। আর কিছুই না।
বান্টি তখন বলে উঠল “মা, তিল থেকে তাল করছিলাম”?
মানে?
“আমি শুনেছি, তিল থেকে তাল করা যায়” বান্টি বলল।
“কী উল্টাপাল্টা কথা বলছিস, তিল থেকে তাল কখনোই হয়না। কে বলেছে তোকে এসব উল্টা পাল্টা কথা, তিল আর তাল দুইটা আলাদা গাছ।”
বান্টি বলল “অলোক দাদা”
অলোক ভ্যাবাচাকা খেয়ে বলে উঠলো, ”আমি কখন তোকে বললাম”?
“কেন, ্‌ওই দিন তোমরা কী নিয়ে যেন আলোচনা করছিলে, তখনই তো বললে”।
“আরে, তুই ঠিক ভাবে সম্পূর্ণ কথা না শুনে চলে যাস কেন? তিল থেকে তাল মানে হলো কোন ছোট কথাকে বড় করে ফেলা, যার জন্য মাঝে মাঝে ঝগড়া তর্কাতর্কি সৃষ্টি হয়।”
“দেখলি বান্টি, আমি তোকে কতবার বলেছি ধীর স্থির ভাবে কথা শুনিস। আজ দেখ অসর্ম্পূণ কথা শুনে তুই দুর্বলতায় ভুগছিস”।
বান্টি তার ভুল বুঝতে পারল এবং ভবিষ্যতে এমন কোন ভুল করবে না বলে মাকে জানাল। বান্টি তার সব এক্সপিরিমেন্ট ভুলে গিয়ে আবার নিজের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এলো।

x