তিন যোদ্ধা

সাদিকুল নিয়োগী পন্নী

শুক্রবার , ১ মার্চ, ২০১৯ at ৭:০৭ পূর্বাহ্ণ
87

এক.
একটি বিশেষ ঘোষণা, একটি বিশেষ ঘোষণা। ভারতের দুই দালাল আনোয়ারা বেগম ওরফে আনু এবং মনোয়ারা বেগম ওরফে মনু শান্তি প্রিয় পাকিস্তানকে অশান্ত করার চেষ্টা করছে। এই দুই দেশদ্রোহী মালাউনদের সাথে হাত মিলিয়ে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিয়েছে। ভারতের এই দুই গুপ্তচরকে জীবিত বা মৃত ধরিয়ে দিতে পারলে পুরস্কার হিসেবে পাবেন নগদ পঞ্চাশ হাজার টাকা ও ত্রিশ ভরি স্বর্ণ। প্রিয় এলাকাবাসী, একটি বিশেষ ঘোষণা…।
শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান আফতাবের নির্দেশে ফোরকান রাজাকার রিকশায় পাকিস্তানের পতাকা টানিয়ে পটুয়াখালীর বিভিন্ন এলাকায় সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মাইকিং করছে।
সরকারি পটুয়াখালি কলেজের ছাত্রী আনু-মনু দুই বোন কালীপুর গ্রামের একটি নির্জন জঙ্গলের ঝোপে বসে সন্ধ্যায় মাইকের এই ঘোষণা শুনছিল। গতরাত তাদের বড় ভাই সরদার আবদুর রশিদ এখানে তাদের লুকিয়ে রেখে গেছে। সকালে তাদের অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু তার আগেই রাজাকার ফোরকান বিষয়টি টের পেয়ে তাদের ধরার জন্য মরিয়া হয়ে পড়ে।
মনু আপা ভাইজান তো এখনো আসলেন না। আমরা আর কতক্ষণ এখানে থাকবো? সারাদিন তো পানিও খাইনি।
ধৈর্য ধর আনু। ভাইজান নিশ্চয় আসবেন। হয়তো কোন কারণে আসতে একটু দেরি হচ্ছে।
আমার ভয় হচ্ছে মনু আপা। ভাইজান ধরা পরেননি তো! আফতাব চেয়ারম্যান ও ফোরকান রাজাকার খুব খারাপ লোক। তারা ভাইজানকে পেলেও মেরে ফেলবো।
দুই.
রাত তখন প্রায় ১০ টা। চারদিকে ঝিঝি পোকা ডাকছে। মশার উৎপাতও বেড়েছে। মারতে গেলে শব্দ হবে এই ভয়ে দুই বোন নীরবে মশার কামড় সহ্য করছেন। হঠাৎ পায়ের আওয়াজ শোনা গেল। আনু-মনু ভয়ে কাচুমুচু হয়ে মাথা নিচু করে ঝোপের মধ্যেই বসে রইল। ভয়ে তাদের বুক ধুকধুক করছে। দূর থেকে দেখে মনে হচ্ছে একটা ছায়া ঝোপের দিকেই আসছে। আনু ভয় আর আতঙ্কে ফুফিয়ে কাঁদতে শুরু করল।
আনু, এই আনু। ভয় পাসনে বোন, মনে সাহস রাখ। আমি দেখে আসি বিষয়টা কী। তুই চুপচাপ লুকিয়ে থাক। আর শোন, যদি আমি ধরা পড়ি তুই একদম বের হবি না কিন্তু। এই বলে মনু পা টিপে টিপে ঝোপ থেকে বের হল। মনু অন্ধকারের আগন্তুককে চিনতে পারছে না। ভয়ে তারও বুক কাঁপছে। ছায়াটা কাছে আসতেই মনু কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, কে?
আমি রশিদ।
ভাইজান। আমি তো রাজাকার ভেবে ভয় পেয়েছিলাম। তোমার আসতে এতো দেরি হলো কেন?
সকালে আসার চেষ্টা করেছিলাম। পথে পথে পাকিস্তানীদের চেকপোস্ট। আর রাজকাররা তোদেরকে পাগলা কুকুরের মতো খুঁজছে। চারদিকে মাইকিং করছে। রশিদের কণ্ঠ শুনে আনুও ঝোপ থেকে বেরিয়ে আসল।
ভাইজান আমরা ভয়ে অস্থির হয়ে আছি। তোমার কোন অসুবিধা হয়নি তো?
আমার কথা বাদ দে। অন্ধকার থাকতে থাকতে এলাকা ছাড়তে হবে। তোরা কিছু তো খাসনি। জলদি এই পাউরুটি আর কলা খেয়ে নেয়। এক বোতল পানিও এনেছি। রশিদ খাবার আর পানি বোনদের দিকে এগিয়ে দিল।
আনু-মনু মাটিতে বসেই ঝটফট খেয়ে নিল। তারপর তিনজন মিলে জঙ্গলের পথ ধরে হাঁটতে শুরু করলো। বড় ধান খেতের মাঠ, পঁচা ডুবা, খাল, বিল পারি দিয়ে শেষ রাতের দিকে তারা অন্য একটি গ্রামে পৌঁছালো। এই গ্রামটি একেবারে প্রত্যন্ত এলাকায় হওয়ায় এখনও কিছুটা নিরাপদ।
তিন.
ভোরের আলো ফোটার পর রশিদ তার বোনদের নিয়ে বেশ কয়েকটা বাড়িতে গেল। মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিলে তাদের ওপর হামলা হবে এমন ভয়ে কেউ আশ্রয় দিতে চাইছেন না। অবশেষে গ্রামের নিশানবাড়ির সফিউদ্দিন বিশ্বাস নামে এক পীর তিন ভাইবোনকে তাদের বাড়িতে থাকার অনুমতি দিলেন। সফিউদ্দিন মিজান নামে তার এক মুরিদকে ডেকে ওদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করতে বললেন। মিজান দুই বোনের জন্য একটা ছোট রুম দেখিয়ে দিলেন। আর রশিদকে থাকতে হবে মিজানের সাথেই। দুপুরে তিন ভাইবোনের জন্য আলু ভর্তা ও ডাল ভাতের আয়োজন করা হয়েছে। মিজান তাদের খাবার পরিবেশন করছেন। সফিউদ্দিন দাঁড়িয়ে তদারকি করছেন যাতে কোন ত্রুটি না হয়। সফিউদ্দিন তিন ভাইবোনকে উদ্দেশ্য করে বললেন, আপনাদের এই খাবার খেতে কষ্ট হচ্ছে নিশ্চয়। কিন্তু কী করবো? বাজারে যাওয়ারও কেউ সাহস পায় না। তাই কয়েকমাস ধরেই এই আয়োজনই চলছে।
আমাদের কোন রকম কষ্ট হচ্ছে না চাচা। আপনি আমাদের আশ্রয় দিয়েছেন এটাই সবচেয়ে বড় উপকার। দোয়া করবেন যাতে দেশটা তাড়াতাড়ি স্বাধীন হয়।
রশিদের এই কথা শুনে সফিউদ্দিন বললেন, ইনশাল্লাহ।
এমন সময় দুলাল নামে আরেক মুরিদ হুজুর হুজর বলতে বলতে হাফিয়ে বাড়িতে প্রবেশ করলেন।
সফিউদ্দিন রুম থেকে বের হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন- কী হয়েছে দুলাল?
হুজুর সর্বনাশ হয়ে গেছে। গ্রামে পাকবাহিনী ও রাজাকার এসেছে। কারা যেন বলেছে আপনার বাড়িতে মুক্তিবাহিনীর লোকজন আশ্রয় নিয়েছেন।
বল কী? আল্লাহ্‌ রক্ষা কর।
আনু, মনু আর রশিদের খাবার তখন অর্ধেকও হয়নি। এই খবর শুনে তিনজনেই থালা রেখে হাত ধুয়ে উঠে পড়ল।
সফিউদ্দিন বললেন, আপনারা ভয় পাবে না। ওরা আসার আগেই আপনাদেরকে নিরাপদ কোথাও পাঠানোর ব্যবস্থা করবো।
তিনি মিজানকে ডেকে বললেন, তুমি এখনই ওদের নিয়ে রওনা হও। আগুনমুখা নদীর ধারে একটা জঙ্গল আছে। ওটার ভেতরে ওদের রেখে আসবে। বাকিটা আমি সামলাবো।
জি, হুজুর।
চার.
মিজান পাগলের মতো ছুটছেন। তিন ভাইবোন তার পিছু পিছু। প্রায় ঘন্টা খানেক হাঁটার পর মিজান তাদেরকে নিয়ে আগুনমুখা নদীর কাছে পৌঁছালেন। তারপর নদীর পাশের সরু পথ ধরে মিনিট দশেক পর জঙ্গলের মাঝামাঝি গিয়ে তারা থামলেন।
আপনারা আপাতত এখানেই থাকেন। এই জঙ্গলে কেউ আসে না। হুজুর নির্দেশ দিলে আমি আপনাদের নিতে আসবো। এই বলে মিজান দ্রুত চলে গেলন।
খাওয়া নেই, ঘুম নেই। উৎকণ্ঠ আর আতংকে তাদের দুই দিন পার হল। আনু মনু একটা গাছের সাথে গোড়ায় হেলান দিয়ে বসে আছে। বোনদের এই অবস্থা দেখে রশিদ কান্না জড়িত কণ্ঠে বলল, হে আল্লাহ্‌ নিজ চোখে বোনদের কষ্ট আর সহ্য করতে পারছি না। তুমি সহায় হও।
মনু ক্লান্ত কণ্ঠে বলল, ভাইজান আমরা দেশের তরে জীবন দিতে প্রস্তুত। তবু পাকবাহিনী ও রাজাকারদের কাছে নতি স্বীকার করবো না।
আনু ক্ষীণ স্বরে বলল, ভাইজান তুমি কান্না করো না। একটা উপায় হবেই।
তৃতীয় দিন শেষে রশিদও ক্লান্ত হয়ে পড়লো। সে বোনদের পাশে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে রইল। চিন্তা, ক্ষুধা আর ক্লান্তিতে তিন ভাইবোন আধ মরার মতো পড়ে রইল গাছের নিচে।
চার.
রাত তখন প্রায় ২টা। একটা টর্চের আলো পড়ল রশিদের চোখে। রশিদ কে কে বলে চিৎকার দিয়ে উঠে দাঁড়াল। আনু মনু ভয়ে একে অপরকে জড়িয়ে ধরল। উঠে দাঁড়ানোর মতো শক্তি তাদের নেই।
আপনারা ভয় পাবেন না। আমাদের নয় নম্বর সেক্টরের অধীন সাব সেক্টরের প্রধান মেজর জিয়া উদ্দিন স্যার পাঠিয়েছেন। মুক্তিযোদ্ধা জাহানের কথায় তিন ভাইবোনের মধ্যে আশার আলো সঞ্চার হল। জাহান ও তার সহযোদ্ধারা তিনজনকেই উদ্ধার করে ক্যাম্পে নিয়ে গেলেন।
সবাই সুস্থ হলে মেজর জিয়াউদ্দিন আনু ও মনুকে ডেকে বললেন, রশিদকে এখানে আপাতত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে দিয়েছি। এটা শেষ হলে উচ্চতর প্রশিক্ষনের জন্য তাকে ভারতে পাঠাবো। তোমাদের বয়স কম। অস্ত্র চালাতে পারবে না। তোমরা বরং বাড়ি কিংবা আত্মীয় স্বজনদের বাড়িতে চলে যাও।
মনু বলল, স্যার আমরা সব পারবো। আপনি প্রশিক্ষণের সুযোগ করে দেন কেবল।
আনু বলল, যুদ্ধ করতে এসে ফিরে যাবো না। দেশ স্বাধীন হলে ফিরবো। প্রয়োজনে দেশের জন্য প্রাণ দিব।
দুই বোনের দেশপ্রেম ও দৃঢ় মনোবলের কারণে মেজর জিয়া উদ্দিন তাদের দলে নিতে বাধ্য হলেন।
তিন ভাইবোন প্রথমে সৈনিক ইসমাইল মিয়া ও পরে মেজর জিয়াউদ্দিনের কাছে প্রশিক্ষণ নেন। এখানে তারা গ্রেনেড নিক্ষেপ, স্টেনগান, মেশিনগান, কারবেইন, এসএলআর, থ্রি নট থ্রি রাইফেল, এলএমজি ইত্যাদি চালানো শিখেন। বড় ভাই রাশেদ আরও প্রশিক্ষণের জন্য ভারত চলে যান।
আনু ও মনু সুন্দরবনে সেন্ট্রি ও অপারেশনের রেকির কাজ করেন সাহসিকতার সাথে। সুন্দরবন, শরণখোলা, রায়েন্দা, নামাজপুর, তুষখালী, কাকচিড়া, ডোবাতলা, পটুয়াখালীসহ বিভিন্ন স্থানে মেজর জিয়াউদ্দিনের নেতৃত্বে সরাসরি যুদ্ধ করেন তারা। অন্যদিকে রশীদও ভারত থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করেন। তবে যুদ্ধকালীন সময়টুকুতে দু্‌ই বোনের সাথে রশিদের কোন যোগাযোগ ছিল না।
পাঁচ.
পাকিস্তানীরা আত্মসমর্পণের করছে। মুক্তিযোদ্ধারা স্বাধীন বাংলার পতাকা হাতে নিয়ে উল্লাস করতে করতে বাড়ি ফিরছেন। খবর নিচ্ছেন পরিবার পরিজনের।
আনু ও মনু অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধারের সাথে পটুয়াখালি সদরে আসেন। তারপর স্বাধীন বাংলার পতাকা নিয়ে পায়ে হেঁটে রওনা দেন নিজ গ্রামের দিকে। গ্রামের মাটিতে পা রাখতেই শুনতে পান মাইকের শব্দ।
প্রিয় এলাকাবাসী, প্রিয় এলাকবাসী। অত্র এলাকার কুখ্যাত রাজাকার ফোরকান ধরা পড়েছে। আজ বিকালে রায়পুরা স্কুলের মাঠে জনসম্মুখে এই বেঈমানের বিচার করা হবে। ভাইসব ভাইসব…
মনু আপা কণ্ঠটা কেমন চেনা চেনা মনে হচ্ছে। বলল আনু।
মনু মনযোগ দিয়ে আবার তা শুনল। তারপর রশিদ ভাইজান বলেই চিৎকার দিয়েই দৌঁড়। আনুও ছুটল তার পিছনে পিছনে।

x