তিন বাংলাদেশি নিহত

পক্ষাঘাতগ্রস্ত স্বামীকে বাঁচাতে গিয়ে মারা গেলেন পারভীন

শনিবার , ১৬ মার্চ, ২০১৯ at ১০:০৯ পূর্বাহ্ণ
321

নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে দুই মসজিদে গুলির ঘটনায় নিহতদের মধ্যে তিনজন বাংলাদেশি রয়েছেন বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশের অনারারি কনসাল ইঞ্জিনিয়ার শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, গুলিবিদ্ধ অবস্থায় আরো চার বাংলাদেশিকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আরো একজন নিখোঁজ রয়েছেন বলে স্থানীয় বাংলাদেশি কমিউনিটির কাছ থেকে খবর পেয়েছেন তিনি। নিহত বাংলাদেশিরা হলেন লিংকন ইউনিভার্সিটির শিক্ষক ড. আবদুস সামাদ ও তার স্ত্রী এবং হোসনে আরা পারভীন নামের এক গৃহবধূ। ষাটোর্ধ্ব আবদুস সামাদের বাড়ি কুড়িগ্রামে। একসময় তিনি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। পারভীনের বাড়ি সিলেটে। খবর বিডিনিউজের।
নিউজিল্যান্ডে বাংলাদেশের স্থায়ী দূতাবাস নেই। অনারারি কনসাল ইঞ্জিনিয়ার শফিকুর রহমান থাকেন অকল্যান্ডে। সেখান থেকে তিনি ক্রাইস্টচার্চের বাংলাদেশি কমিউনিটির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। তিনি বলেন, শুক্রবার অনেকেই জুমার নামাজ পড়তে আল নূর মসজিদে গিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে কয়েকজন না ফেরায় পরিবারের সদস্যরা ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেন। কিন্তু না পেয়ে খোঁজ শুরু করেন। পরে হাসপাতালে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় কয়েকজনের ভর্তি হওয়ার খবর পাওয়া যায়। তাদের মধ্যে তিনজন মারা যান। নিউজিল্যান্ড সফররত বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের কয়েকজন খেলোয়াড় হামলার সময় আল নূর মসজিদে গিয়েছিলেন জুমার নামাজ পড়তে। ভেতরে গোলাগুলির বিষয়টি জানতে পেরে তারা বাইরে থেকেই দ্রুত নিরাপদে সরে যান। গোলাগুলির ওই ঘটনার পর বাংলাদেশ-নিউজিল্যান্ড তৃতীয় টেস্টটি বাতিল করা হয়। আজ শনিবার ক্রাইস্টচার্চের হ্যাগলি ওভালে ওই ম্যাচ শুরু হওয়ার কথা ছিল।
সামাদ ছিলেন ভার্সিটি শিক্ষক ও মোয়াজ্জিন : ক্রাইস্টচার্চে বন্দুকধারীদের হামলায় নিহত কুড়িগ্রামের আব্দুস সামাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার পাশাপাপশি একটি মসজিদে মোয়াজ্জিনের দায়িত্ব পালন করতেন বলে পরিবার জানিয়েছে। সামাদের বাড়ি কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী পৌরসভার মধুর হাইল্যা গ্রামে। তার দুই ভাই এ গ্রামে থাকেন। ছোট ভাই হাফেজ হাবিবুর রহমান বলেন, ভাই নিউজিল্যান্ডের লিংকন ইউনিভার্সিটির শিক্ষক ছিলেন। এছাড়া তিনি ডিন্স এভিনিউয়ের আল নূর মসজিদের মোয়াজ্জিনের দায়িত্ব পালন করতেন। সামাদ ২০১৩ সাল থেকে সপরিবার নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ শহরের অ্যাগলি পার্কে বসবাস করছিলেন বলে তিনি জানান।
হাবিবুর রহমান বলেন, বড় ভাই আসাদ মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। আরো এক ভাই সন্ত্রাসীদের হাতে মারা পড়লেন। সামাদের স্ত্রী কিশোয়ারা বেগম মারা গেছেন বলে গণমাধ্যমে খবর এলেও এ বিষয়ে হাবিবুর নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেননি।
হাবিবুর বলেন, সামাদের দুই ছেলে নিউজিল্যান্ডে থাকেন। বড় ছেলে ঢাকায় একটি বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত। তিনি সামাদের মরদেহ অবিলম্বে দেশে এনে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করার দাবি জানিয়েছেন। হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করেছেন তিনি।
এদিকে হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে বিকালে নাগেশ্বরী বাজারে ইসলামী আন্দোলনের উদ্যোগে মিছিল ও সমাবেশ হয়েছে।
পক্ষাঘাতগ্রস্ত স্বামীকে বাঁচাতে গিয়ে নিহত পারভীন : নিউজিল্যান্ডে মসজিদে বন্দুকধারীদের গুলির শব্দ শুনে পক্ষাঘাতগ্রস্ত ‘স্বামীকে বাঁচাতে গিয়ে’ নিহত হন সিলেটের হুসনে আরা পারভীন। ৪২ বছর বয়সী পারভীন সিলেটের গোলাপগঞ্জের জাঙ্গালহাটা গ্রামের নুরুদ্দিনের মেয়ে। তার স্বামী ফরিদ উদ্দিনের বাড়ি জেলার বিশ্বনাথ উপজেলার চকগ্রামে। পারভীনের ভাগ্নে মাহফুজ চৌধুরী নিউজিল্যান্ডের আত্মীয়-স্বজনদের বরাতে বলেন, ক্রাইস্টচার্চ এলাকায় দুটি মসজিদ রয়েছে। একটি মসজিদে নারীরা ও অন্যটিতে পুরুষরা নামাজ পড়েন। খালা পারভীন তার পক্ষাঘাতগ্রস্ত স্বামীকে নিয়ে জুমার নামাজ পড়তে মসজিদে গিয়েছিলেন। স্বামীকে হুইল চেয়ারে পুরুষদের মসজিদের রেখে নিজে নারীদের মসজিদে যান। এর প্রায় ১৫ মিনিট পরে পুরুষদের মসজিদে গুলির শব্দ শুনে বের হন। এ সময় অস্ত্রধারীরা গুলি করলে তিনি ঘটনাস্থলে নিহত হন। তবে তার স্বামী ফরিদ উদ্দিন অক্ষত আছেন। তিনি তার আত্মীয়-স্বজনদের কাছে রয়েছেন।
মাহফুজ চৌধুরী বলেন, মসজিদের বাইরে গুলির শব্দ শোনার সঙ্গে সঙ্গে কয়েকজন লোক ফরিদ উদ্দিনকে মসজিদ থেকে বের করে নেওয়ায় তিনি বেঁচে যান। নিউজিল্যান্ডে বসবাসকারী নিহত পারভীনের ভাবী হিমা বেগম ঘটনার পর টেলিফোনে সিলেটে থাকা পরিবারের সদস্যদের খবর দেন। পুলিশের পক্ষ থেকে পারভীনের নিহত হওয়ার বিষয়টি নিউজিল্যান্ডে অবস্থানকারী তার স্বজনদের জানানো হয়েছে। তবে মরদেহ এখনো পরিবারে হস্তান্তর করেনি।
পারভীন-ফরিদ দম্পতির একটি মেয়ে রয়েছে। ১৯৯৪ সালে পারিবারিকভাবে তাদের বিয়ে হয়। এর কয়েক বছর পর তারা নিউজিল্যান্ডে যান। ২০০৯ সালে তারা বাংলাদেশে এসেছিলেন বলে জানান মাহফুজ।

x