তিন চাকার যানবাহনের অসম প্রতিযোগিতা

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক

ছোটন কান্তি নাথ

শুক্রবার , ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ at ৩:২৪ পূর্বাহ্ণ
127

চট্টগ্রামকক্সবাজার মহাসড়কে নৈরাজ্য বন্ধ হচ্ছে একেবারেই। বিশেষ করে কক্সবাজারের চকরিয়ায় নিষিদ্ধ তিন চাকার যানবাহনের অসম প্রতিযোগিতা দেখা যাচ্ছে মহাসড়কে। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা মোতাবেক সরকার মহাসড়কগুলোতে তিন চাকার (ত্রিহুইলার) যানবাহন চলাচল একেবারেই নিষিদ্ধ করলেও ব্যস্ততম চট্টগ্রামকক্সবাজার মহাসড়কে আধিপত্য বিস্তার করছে এসব যানবাহন। এতে প্রতিনিয়ত ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হয়ে অসংখ্য মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে। এই মহাসড়কে দূরপাল্লার এবং ভারী যানবাহনগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এখনো চলছে তিন চাকার এসব যান। একের পর এক দুর্ঘটনা সংঘটিত হলেও এসব যানবাহনের অদক্ষ চালক ও মালিকদের কোন ভ্রুক্ষেপও নেই। আবার স্থানীয় যাত্রীরাও গন্তব্যে যাওয়ার জন্য এই বাহনকে ব্যবহার করে চলেছেন। এতে সড়ক দুর্ঘটনা আরো বাড়ার আশঙ্কা করছেন সচেতন মহল।

সচেতন মহলের মতে, সারাদেশের যেসব মহাসড়ক রয়েছে, তন্মধ্যে চট্টগ্রামকক্সবাজার মহাসড়কটিই ছিল বেশ নিরাপদের। কিন্তু গত কয়েকবছর ধরে নিরাপদের এই মহাসড়কটিই হয়ে উঠে মৃত্যুফাঁদে। মূলতঃ তিন চাকার যানবাহনের পাশাপাশি দূরপাল্লার যাত্রীবাহী বাসসহ বিভিন্ন ভারী যানবাহনের বেপরোয়া গতি, ফিটনেস বিহীন যান এবং অদক্ষ চালকের কারণেই সড়কে মৃত্যুর মিছিল বাড়ছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর বারোটা থেকে বিকেল সাড়ে তিনটা পর্যন্ত চট্টগ্রামকঙবাজার মহাসড়কের চকরিয়ার ৩৯ কিলোমিটার অংশের প্রায় ২০ কিলোমিটার অংশে সরজমিন প্রত্যক্ষ করা হয় এই নৈরাজ্য। এ সময় মহাসড়কের বানিয়ারছড়াস্থ চিরিঙ্গা হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির সামনে ছাড়া সড়কের অন্য কোথাও দেখা মেলেনি নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত এই সংস্থার সদস্যদের। মূলত হাইওয়ে পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে দেদার চলছে তিন চাকার এসব যানবাহন।

বেলা একটার দিকে মহাসড়কের বরইতলী নতুন রাস্তার মাথা এলাকায় কথা হয় সিএনজি চালিত একটি অটোরিকশার চালক আবদুল জলিলের সঙ্গে। এ সময় তার কাছ থেকে জানতে চাওয়া হয়, উচ্চ আদালতের নির্দেশে সরকার মহাসড়কে তিন চাকার যে কোন ধরণের যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ করেছে, বিষয়টি জানেন কীনা।

এমন প্রশ্নের উত্তরে অটোরিকশা চালক আবদুল জলিল স্থানীয় ভাষায় দৈনিক আজাদীকে বলেন, ‘এটা তো কয়েকবছর ধরে শুনে আসছি, মহাসড়কের তিন চাকার যানবাহন উঠতে দেওয়া হবে না। এনিয়ে মাঝেমধ্যে আইনশৃঙ্ক্ষলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিশেষ করে হাইওয়ে পুলিশ অভিযানে নামে। তার পরেও তো দেখছি ঠিকই এসব যানবাহন মহাসড়কে চলাচল করছে। তাই আমিও মহাসড়ক দিয়ে যাত্রী আনানেওয়া করছি।’

এর আগে মহাসড়কের ইসলামনগর এলাকায় কথা হয় ব্যাটারি চালিত ইজিবাইকটমটম চালক রমিজ উদ্দিনের সঙ্গে। এ সময় তাকে প্রশ্ন করা হয়, ‘বুধবার হারবাংয়ে কাভার্ড ভ্যানের মুখোমুখি সংঘর্ষে টমটমের চার যাত্রী নিহত হয়েছে। এর পরও কেন মহাসড়কে টমটম নিয়ে বের হয়েছেন।’

এর জবাবে রমিজের ভাষ্য, হাইওয়ে পুলিশ বা প্রশাসনের কেউ যদি আমাদের নিষেধ করতো তাহলে তো আমি টমটম নিয়ে মহাসড়কে আসতাম না। অন্যরা চালাচ্ছেন দেখে আমি নিজেও বের হয়েছি টমটম নিয়ে। এতে দোষের কি আছে?

সরজমিন আরো পরিলক্ষিত হয়েছে, দূরপাল্লার যাত্রীবাহী বাস ও পণ্যবোঝাই ভারী যানবাহনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সমানে চলছে তিন চাকার যান বিশেষ করে ইজিবাইকটমটম, সিএনজি চালিত অটোরিকশা, নছিমনকরিমন, মাহিন্দ্র। এছাড়াও একেবারে স্বল্প আকৃতির চার চাকার যানবাহনও যাত্রী পরিবহন করছে বেশি। তন্মধ্যে লেগুনা, ছারপোকা, ম্যাজিক গাড়ি অন্যতম। চার চাকার এসব যানবাহনে চলাচলও বেশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মূলত গত মঙ্গলবার দুপুরে বরইতলী নতুন রাস্তার মাথায় দুপুরে স্টার লাইন পরিবহনের যাত্রীবাহী বাসের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয় যাত্রীবাহী ছারপোকার। এই দুর্ঘটনায় একসঙ্গে তিন নারীসহ প্রাণ হারায় সাতজন যাত্রী। আহত হয় অন্তত ১০ জন। এর পরের দিন বুধবার সকালে হারবাং ইনানী রিসোর্টের সামনে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকে (মোড়) প্রাণআরএফএল গ্রুপের কাভার্ড ভ্যানের সঙ্গে যাত্রীবাহী ইজিবাইকটমটমের মুখোমুখি সংঘর্ষে এক নারীসহ চারজনের প্রাণ ঝরে যায়। একদিনের ব্যবধানে দু’টি ভয়াবহ দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন অসংখ্য যাত্রী।

এসব প্রসঙ্গে বানিয়ারছড়াস্থ চিরিঙ্গা হাইওয়ে পুলিশের ইনচার্জ ও সার্জেন্ট নূরএ আলম পলাশ কয়েকটি সমস্যার কথা তুলে ধরেন। বিশেষ করে তিনটি বিষয় প্রাধান্য পেয়েছে হাইওয়ে পুলিশের এই কর্মকর্তার মতে।

প্রথমত : চট্টগ্রামকঙবাজার মহাসড়কের চকরিয়া অংশে রয়েছে ৩৯ কিলোমিটার এলাকা। এই এলাকায় মহাসড়ক লাগোয়া অভ্যন্তরীণ সড়ক, উপসড়ক রয়েছে অন্তত অর্ধ শতাধিক। এসব অভ্যন্তরীণ সড়ক, উপসড়কে চলাচল করে তিন চাকার যানবাহন। বিশেষ করে সিএনজি অটোরিকশা, মাহিন্দ্র, ইজিবাইকটমটম উল্লেখযোগ্য। কিন্তু এসব যানবাহন এক সড়ক থেকে অন্য সড়কে যাতায়াতের জন্য হুট করে উঠে পড়ে মহাসড়কে। এ কারণে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা বাড়ছে।

দ্বিতীয়ত : ‘সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি রোধে উচ্চ আদালতের নির্দেশে সরকার মহাসড়কে এসব যানবাহন চলাচল একেবারে নিষিদ্ধ করেছে। এই নির্দেশনা আমরাও মানার আপ্রাণ চেষ্টার অংশ হিসেবে প্রতিনিয়ত মহাসড়কে অভিযানও জোরদার করা হচ্ছে। এ ধরণের অসংখ্য যানবাহন প্রতিদিন ধরে মামলা দিচ্ছি বা জরিমানা করছি। কিন্তু একেবারে অল্পসংখ্যক জনবল নিয়ে অর্ধ শতাধিক সড়ক, উপসড়কের কানেক্টিভিটিংয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে পাহারা দেওয়া কোনভাবেই সম্ভব নয়। এজন্য হাইওয়ে পুলিশে আগে জনবলের সংখ্যা আনুপাতিক হারে বাড়াতে হবে। তা না হলে যতই আমরা ওজরআপত্তি করি না কেন তা কোন কাজে আসবে না।’

তৃতীয়ত : ‘মহাসড়কে তিন চাকার যানবাহন চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে উচ্চ আদালতের যে একটি রায় রয়েছে তা কী সত্যিকার অর্থে এসব যানবাহনের কোন চালক জানেন বা অবগত আছেন? যদি তারা এই ধরণের নির্দেশনার বিষয়টি জানতেন তাহলে তারা কোনভাবেই মহাসড়কে এই যানবাহন নিয়ে উঠতেন না। এমনকি যেসব সাধারণ যাত্রী এই বাহন ব্যবহার করে গন্তব্যে যাচ্ছেন তারাও তো বিষয়টি ভালভাবে জানেন না। তাই সবপক্ষকে নিয়ে বিশেষ কাউন্সেলিং করার প্রয়োজন রয়েছে। এটি সম্ভব হলেই যেমন সকলের মাঝে সচেতনতা বাড়বে, তেমনি করে কমে আসবে সড়ক দুর্ঘটনা। ’

ভয়াবহ দুর্ঘটনার কবলে পড়ে অলৌকিকভাবে মা এবং চালকসহ প্রাণে বেঁচে যাওয়া কালের কণ্ঠ’র সিনিয়র প্রতিবেদক আসিফ সিদ্দিকী দৈনিক আজাদীকে বলেন, ‘স্মার্ট জাতীয় পত্র নেওয়ার জন্য বুধবার সকালে চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রাইভেট কারযোগে চকরিয়ার দিকে রওনা দিই। আমাদের বহনকারী গাড়িটি চট্টগ্রামকঙবাজার মহাসড়কের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতির কাছে মিডওয়েইন রেস্টুরেন্টের কাছে যেতেই সামনে থাকা স্টার লাইন পরিবহনের বেপরোয়া গতির একটি যাত্রীবাহী হুট করে রংসাইড দিয়ে ওই রেস্টুরেন্টে ঢুকে পড়ছিল। এই বাসটি যে রেস্টুরেন্টে যাত্রাবিরতির জন্য ঢুকবে সেই সংকেত পর্যন্ত দেয়নি চালক। এমনকি রেস্টুরেন্টের নিজস্ব কোন সংকেতধারীও বিদ্যমান ছিল না সেখানে। এই পরিস্থিতিতে আমাদের কার চালক নিয়ন্ত্রণ হারায়। মুহূর্তেই আমাদের কারটি মহাসড়ক থেকে ছিটকে গিয়ে কয়েকদফা গড়াগড়ি খেয়ে প্রায় ২০ ফুট খাদে ধানক্ষেতে পানিতে গিয়ে পড়ে।’

তিনি বলেন, ‘আল্লাহর অশেষ রহমত ছিল বিধায় সেদিন এত বড় দুর্ঘটনার শিকার হয়ে আমরা তিনজন (মা ও চালকসহ) প্রাণে বেঁচে যাই। স্মরণকালের ভয়াবহ এই পরিণতির শিকার হতে হয়েছে স্টার লাইন পরিবহনের যাত্রীবাহী বাসের বেপরোয়া গতি এবং অদক্ষ চালকের কারণে। শুধুমাত্র স্টার লাইন পরিবহন বলে কথা নয়, এসি এবং নন এসি গুটিকয়েক পরিবহন ছাড়া অন্যসব যাত্রীবাহী পরিবহনের বেপরোয়া গতির অসম প্রতিযোগিতার পাশাপাশি অদক্ষ চালকের কারণেও দুর্ঘটনার বাড়ার অন্যতম কারণ বলে আমি মনে করি।’

চকরিয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট খোন্দকার মো. ইখতিয়ার উদ্দীন আরাফাত বলেন, ‘নিয়মিত দাপ্তরিক কর্ম সম্পাদনের পাশাপাশি মহাসড়কে নৈরাজ্য ঠেকাতে চেষ্টা করি সময় দিতে। এরই অংশ হিসেবে মাঝেমধ্যে অভিযানও চালাই মহাসড়কে। এ সময় উচ্চ আদালতের নির্দেশনা মোতাবেক তিন চাকার কোন যান মহাসড়কে দেখলেই মামলা দিই এবং জরিমানা করি।’ তিনি বলেন, ‘চলতি সপ্তাহে একদিনের ব্যবধানে পর পর দুটি ভয়াবহ ও মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় একসঙ্গে ১১ জনের প্রাণহানির পর উপজেলা প্রশাসনের গঠিত ১১ সদস্যের তদন্ত কমিটির প্রধান হিসেবে অন্যান্য সদস্যদের নিয়ে ইতোমধ্যে তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেছি।’

এ ব্যাপারে চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নূরুদ্দীন মুহাম্মদ শিবলী নোমান দৈনিক আজাদীকে বলেন, ‘আজ (গতকাল) উপজেলার মাসিক আইনশৃঙ্ক্ষলা কমিটির সভায় একদিনের ব্যবধানে দুটি ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় বিপুল সংখ্যক প্রাণহানির বিষয়ে শোকপ্রকাশ এবং এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এ সময় বিভিন্ন শ্রেণিপেশার নেতৃবৃন্দের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ মতামত পাওয়া গেছে। তাছাড়া প্রশাসনের পক্ষ থেকে বেশকিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। অচিরেই এসব পদক্ষেপ দৃশ্যমান হবে। তবে ১১ সদস্যের গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিশদভাবে বিশ্লেষণ করে সেই প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বেশকিছু সুপারিশ ঊর্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে।’

x