তাল গাছের অভাবে বাবুই পাখি বাসা বাঁধছে নারকেল গাছে

মুহাম্মদ এরশাদ : চন্দনাইশ

সোমবার , ২৯ এপ্রিল, ২০১৯ at ১০:১৯ পূর্বাহ্ণ
197

বাবুই পাখি, যে পাখিটির বাসা তৈরীর কলা-কৌশল অন্যান্য পাখির চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। সচরাচর উঁচু তাল গাছে তারা বাসা বাঁধে, যাতে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থাকতে পারে। এই পাখিটির বাসা নির্মাণশৈলী সবার নজর কাড়ে। এক সময় গ্রাম-গঞ্জে তাল গাছে শত শত বাবুই পাখির বাসা দেখা গেলেও এখন সেই দৃশ্য আর চোখে পড়ে না। বর্তমানে গ্রাম-গঞ্জে তাল গাছ নেই বললেই চলে। তাল গাছ হারিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি বাবুই পাখিও হারিয়ে যেতে বসেছে। তবে মাঝেমধ্যে নারকেল গাছে কিছু কিছু বাবুই পাখির শৈল্পিক বাসার দেখা মেলে।
চন্দনাইশ উপজেলার দোহাজারী পৌরসভার পার্শ্ববর্তী পুরানগড় ইউনিয়নের ফকিরখীল এলাকার মরহুম আবদুল জলিল মেম্বারের বসতভিটার উঠানে একটি নারিকেল গাছে দেখা মিললো বাবুই পাখি বাসা বুনছে। এসময় বাবুই পাখির কিচির-মিচির শব্দে সেখানে এক অন্যরকম পরিবেশের সৃষ্টি হয়। যারাই এ বসতভিটার উঠানে আসছেন সবাই একনজর দেখছেন বাবুই পাখির বাসা তৈরীর কলা-কৌশল। শুনছেন তাদের কিছির-মিছির শব্দ। আর মোবাইল ফোনে ধারণ করছেন ফটো আর ভিডিও। এসময় আবদুল মান্নান নামে সত্তরোর্ধ এক ব্যক্তি জানালেন এক সময় বাবুই পাখি উঁচু তালগাছের পাতায় পাতায় বাসা বাঁধতো। বর্তমানে তাল গাছ কমে আসায় এখন নারিকেল, খেজুর ও সুপারী গাছেও বাসা বাঁধতে দেখা যায়। তিনি বলেন চৈত্র-বৈশাখ মাসে বাবুই পাখি বাসা বাঁধে। বিশেষ করে যখন বোরো মৌসুম শুরু হয় তখনই এটি বেশি দেখা যায়।
এলাকার আরেক প্রবীণ ব্যক্তি ছালেহ আহমদ জানালেন ধান, চাল, গম ও পোকা-মাকড় প্রভৃতি বাবুই পাখির প্রধান খাবার। অথচ বর্তমানে ধান ও গম উৎপাদনে প্রচুর কীটনাশক প্রয়োগ করার ফলে ধান ও গম খেয়ে বিষক্রিয়ায় প্রচুর বাবুই পাখি মারা যায়। এছাড়া বিষক্রিয়ার ফলে পোকা-মাকড়ও মরে যাওয়ায় এদের খাদ্য ঘাটতিও দেখা দিচ্ছে।
অথচ ১০/১৫ বছর আগেও গ্রাম-গঞ্জের প্রায় তাল গাছের পাতায় পাতায় ঝুলতে দেখা যেত শত শত বাবুই পাখির নিপুণ কারিগরিতে তৈরি দৃষ্টিনন্দন বাসাগুলো। বাবুই পাখির কিচির-মিচির শব্দে মোহিত হতো সবাই। এই বাবুই পাখিকে নিয়েই কবি রজনী কান্ত সেন লিখেছেন- বাবুই পাখিরে ডাকি বলিছে চড়াই, কুঁড়ে ঘরে থেকে কর শিল্পের বড়াই! আমি থাকি মহা সুখে অট্টালিকা পরে, তুমি কত কষ্ট পাও রোদ বৃষ্টি ঝড়ে। বাবুই হাসিয়া কহে; সন্দেহ কি তাই? কষ্ট পাই, তবু থাকি নিজের বাসায়। পাকা হোক, তবু ভাই পরের ও বাসা, নিচ হাতে গড়া মোর কাঁচা ঘর, খাসা”।
এক সময় বাবুই পাখির বাসা মানুষের মনে চিন্তা ও স্বাবলম্বী হওয়ার উৎসাহ দিলেও সময়ের বিবর্তনে আজ এ পাখি ও বাসা আমরা হারাতে বসেছি। পরিবেশ বিপর্যয়ই বাবুই পাখি হারিয়ে যাওয়ার মূল কারণ। বতর্মানে গ্রাম-গঞ্জে নির্বিচারে নিধন করা হচ্ছে তালগাছসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ। আর সেকারণে হারিয়ে যাচ্ছে বাবুই পাখি ও তার শৈল্পিক বাসাগুলো। পাশাপাশি প্রাকৃতিক বিপর্যয়ও ঘটছে নিয়মিত।
ঝুঁড়ির মতো চমৎকার বাসা বানিয়ে বাস করায় এ পাখির পরিচিতি ব্যাপক। খড়, তাল গাছের কচি পাতা, ঝাউ ও কাশবনের লতা-পাতা দিয়ে উঁচু তালগাছে চমৎকার বাসা তৈরি করে বাবুই পাখি। সেই বাসা যেমন আকর্ষণীয় তেমনি মজবুত। তাল, নারকেল, খেজুর ও সুপারী গাছের সাথে তাদের বাসাগুলো এমনভাবে আটকানো থাকে প্রবল ঝড়েও ছিড়ে পড়ে না।
দোহাজারী পৌরসভার বখতিয়ার আলম নামে এক ব্যক্তি জানালেন এ অঞ্চলে একসময় প্রচুর বাবুই পাখি দেখা যেত। এখন কালে-ভদ্রেও বাবুই পাখি চোখে পড়ে না। তিনি বলেন, লোকমুখে শোনা কথা, বাবুই পাখি রাতের বেলা তার বাসাটি আলোকিত রাখতে সন্ধ্যায় জোনাকি পোকা ধরে আনতো। ভোর হলে আবার জোনাকি পোকাগুলো ছেড়ে দিত।

x