তালপাতার হাতপাখা তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছে দক্ষিণ জোয়ারার সহস্রাধিক পরিবার

মুহাম্মদ এরশাদ : চন্দনাইশ

সোমবার , ৮ এপ্রিল, ২০১৯ at ১০:৫৫ পূর্বাহ্ণ
122

“হাতপাখা”, প্রচন্ড গরমে শীতল পরশ পেতে যার কোনো বিকল্প নেই। চৈত্র-বৈশাখ মাসের প্রচন্ড তাপদাহের সময় যে কেউ হাতপাখা ঘুরিয়ে শীতল পরশ পেতে উদগ্রীব থাকে। হাতপাখার শীতল বাতাস মানুষের শরীরে স্বস্তি এনে দেয়। এখন চলছে হাতপাখা তৈরি ও বিক্রির ভরা মৌসুম। বর্তমানে শহর কিংবা গ্রামে হাতপাখার প্রচুর চাহিদা রয়েছে। এই হাতপাখা তৈরি হয় মূলত তালপাতা দিয়ে। আর যুগ যুগ ধরে এই তালপাতার হাতপাখা তৈরি করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে হাতপাখার চাহিদা পূরণ করছে চন্দনাইশ উপজেলার দক্ষিণ জোয়ারার ২ গ্রামের সহস্রাধিক পরিবার। পাশাপাশি এ হাতপাখায় স্বাবলম্বী হয়েছে এ দুটি গ্রামের অসংখ্য পরিবার। বছরের ৬ মাস হাতপাখা তৈরি করেন এ দু’গ্রামের বাসিন্দারা। পুরুষ, মহিলা, শিশু কিশোর সবাই মিলে দলবেঁধে হাতপাখা তৈরি করেন। বাংলা বর্ষের কার্তিক মাসের শুরু থেকে হাতপাখা তৈরির কাজ শুরু হয়ে তা চলে চৈত্র-বৈশাখ মাস পর্যন্ত।
এখন চলছে হাতপাখা তৈরির ভরা মৌসুম। এলাকার প্রতিটি পরিবারের নারী, পুরুষ, যুবক, যুবতী এমনকি শিশু কিশোররা পর্যন্ত হাতপাখা তৈরীর কাজে পুরোদমে নেমে পড়েছেন। চট্টগ্রামসহ সারাদেশে হাতপাখার যে চাহিদা তার সিংহভাগই যোগান দেয়া হয় এ দু’গ্রামের তৈরিকৃত তালপাতার হাতপাখা দিয়ে।
দক্ষিণ জোয়ারার বাদশার পাড়ার প্রবীণ পাখা শিল্পী আনোয়ারা বেগম (৫৫) বলেন, আসন্ন বৈশাখী মেলায় বিক্রির জন্য ১২শ হাতপাখা তৈরির টার্গেট নিয়ে তিনি ৫ মাস আগে থেকে পাখা তৈরি শুরু করেন। ইতিমধ্যে তিনি সহস্রাধিক পাখা তৈরি করেছেন। তার তৈরিকৃত প্রতিশত হাতপাখা ৮হাজার টাকা থেকে ১২ হাজার টাকা দরে বিক্রি করবেন বলে জানালেন তিনি।
পার্শ্ববর্তী আরেক পাখা শিল্পী আহমদ নবীর স্ত্রী হাসিনা বেগম (৬৫) জানান ৪০ বছর পূর্বে তিনি গৃহবধূ হয়ে আসার পর স্বামীর কাছ থেকে হাতপাখা তৈরির কলা কৌশল শিখে নেন। সেই থেকে শুরু হয়ে এখনো চলছে হাতপাখা তৈরির কাজ। তিনি ছাড়াও পরিবারের ছেলে মেয়েরাও তৈরি করেন হাতপাখা। চলতি মৌসুমে তার পরিবারের টার্গেট ৩ হাজার হাতপাখা তৈরি করবেন। ৬ মাস আগে থেকে হাতপাখা তৈরি শুরু করে গত সপ্তাহে ৮শতাধিক হাতপাখা (প্রতিশত ৮ হাজার) টাকা দরে বিক্রি করেছেন। এখন তিনি আসন্ন বৈশাখী মেলায় বিক্রির জন্য হাতপাখা তৈরি করছেন আর ঘরের চালায় সারি সারি করে সাজিয়ে রাখছেন।
জিহস ফকিরপাড়া এলাকার পাখাশিল্পী সিরাজুল ইসলাম জানান, শীত মৌসুম ছাড়া সারা বছর হাতপাখার চাহিদা থাকে। বিশেষ করে চৈত্র-বৈশাখ মাসে এর চাহিদা ৩/৪ গুণ বেড়ে যায়। এ গ্রামের প্রতিটি পরিবার চৈত্র-বৈশাখ মাসে কম করে হলেও গড়ে লক্ষাধিক টাকার হাতপাখা বিক্রি করেন। একজন পাখা শিল্পী দিনে ৫/৬টি পাখা তৈরি করতে পারেন বলেও জানান তিনি।
একই এলাকার পাখাশিল্পী মৃত আবুল কালামের ঘরে সারিবদ্ধভাবে বসে পাখা তৈরি করছিলেন আরফা খাতুন (৫০), জয়নাব বেগম (৪৯), লাকী আকতার (২৫), জেরিন আকতার (১৫), মোহাম্মদ শাজাহান (৩০)। তারা সবাই পূর্ব পুরুষের হাত ধরে এ পেশায় এসেছেন। পাখা তৈরিতে তারা এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন।
একই এলাকার মৃত আবুল বশরের ছেলে মোহাম্মদ আবদুস সবুর জানালেন ব্যবসা ও কৃষি কাজের পাশাপাশি তিনি হাতপাখা তৈরি করেন এবং এলাকার পাখাশিল্পীদের দিয়েও হাতপাখা তৈরি করান। আসন্ন বৈশাখী মেলায় বিক্রির জন্য তিনি ইতিমধ্যে সহস্রাধিক হাতপাখা প্রস্তুত রেখেছেন বলে জানান।
হাতপাখা তৈরীর ইতিকথা ঃ পাখাশিল্পীরা জানান, ১৯৪২ সালের দিকে গ্রামের বেশ কয়েকজন যুবক বেকারত্ব থেকে বাঁচতে জীবিকার সন্ধানে বের হন। পরবর্তীতে তারা কুমিল্লা জেলার কোন এলাকা থেকে তালপাতার হাতপাখা তৈরির কলা-কৌশল শিখে আসেন। আর তখনকার দিনে বিদ্যুৎ সুবিধার অপ্রতুলতার করণে দ্রুত প্রসার ঘটে তাদের তৈরিকৃত হাতপাখার। এখানকার তৈরিকৃত নানা প্রকারের হাতপাখা দেখতে সুন্দর ও অত্যন্ত মজবুত হওয়ায় ধীরে ধীরে সারাদেশে এর চাহিদা ও সুনাম গড়ে উঠে। পুরো পাখাগ্রাম ঘুরে জানা যায়, এলাকার সহস্রাধিক পরিবারের ৫ হাজারেরও অধিক সদস্য তালপাতার হাতপাখা তৈরির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
হাতপাখা তৈরির প্রধান উপকরণগুলো হলো তালপাতা, বাঁশ, বেত ও রং। পরিবারের প্রধান কর্তা এসব উপকরণ সংগ্রহ করে দেয়ার পরই বাড়ির নারী, পুরুষ ও শিশু কিশোর একযোগে নেমে পড়ে পাখা তৈরিতে। হাতপাখা শিল্পী সেলিম উদ্দীন জানান, ধোপাছড়ি ও বান্দরবানের বনাঞ্চল থেকে বাঁশ ও বেত সংগ্রহ করতে হয়। আর হাতপাখা তৈরির প্রধান উপকরণ তালপাতা সংগ্রহ করতে হয় পার্শ্ববর্তী উপজেলা পটিয়ার ভাইয়েরদিঘী, কেলিশহর থেকে। এছাড়াও নোয়াখালী এবং কুমিল্লা জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকেও এ উপকরণগুলো সংগ্রহ করেন তারা।
পাখাশিল্পীরা জানায় তারা মূলত ৭ তারী, ৯ তারী, ১১ তারী, ১৩ তারী ও ১৫ তারীর হাতপাখা তৈরি করেন। এরমধ্যে ৯ এবং ১১ তারী পাখার চাহিদা বেশি থাকে। চাহিদা সম্পন্ন হাতপাখাগুলো তালগাছের ডিগ পাতা দিয়ে তৈরি করা হয়। ফলে এটি মজবুত ও টেকসই হওয়ায় দীর্ঘদিন ব্যবহার করা যায়। তাদের তৈরিকৃত হাতপাখা নিয়ে বেকায়দায়ও পড়তে হয়না তাদের। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পাইকারী ব্যবসায়ীরা এসে সিংহভাগ হাতপাখা কিনে নিয়ে যায়। এমনকি অগ্রিম টাকা দিয়ে পরিমাণ মতো অর্ডার দিয়ে যায় পাখাশিল্পীদের।
পাখাশিল্পী বদিউল আলম জানায়, চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী জব্বার মিয়ার বলী খেলা উপলক্ষে ৩দিনব্যাপী আয়োজিত লালদিঘীর মেলায় হাতপাখার বিশাল চাহিদা থাকে। তাদের তৈরিকৃত হাতপাখার সিংহভাগই বিক্রি হয় জব্বার মিয়ার বলী খেলা উপলক্ষে আয়োজিত মেলায়। এ মেলায় কমপক্ষে ৬ লাখ হাতপাখা বিক্রি হয় বলে জানান তিনি।
আরেক পাখাশিল্পী মোহাম্মদ নাছির উদ্দীন জানান চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে মাইজভাণ্ডার ওরশ শরীফ, আনোয়ারার মোহছেন আউলিয়ার বার্ষিক ওরশ শরীফের সময়ও প্রচুর হাতপাখা বিক্রি হয়। এছাড়া দেশের বিভিন্নস্থানে অনুষ্ঠিত মেলা, বলী খেলা, গরুর লড়াই, হাটবাজারেও প্রচুর হাতপাখা বিক্রি হয়। তিনি আরো জানান, ইতিমধ্যে কেউ কেউ ব্যক্তিগত উদ্যোগে মধ্য প্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশে হাতপাখা রপ্তানি করছে।
পাখা শিল্পী হাসিনা বেগম বলেন, ভবিষ্যতে এ শিল্পটি টিকিয়ে রাখতে সরকারি সহযোগিতা প্রয়োজন। সরকারিভাবে আর্থিক ঋণ পেলে তাদের তৈরিকৃত হাতপাখা বাণিজ্যিকভাবে বিদেশে রপ্তানি সম্ভব বলেও জানালেন তিনি।

x