তাপসের ক্যামেরায় স্মৃতিময় চট্টগ্রাম

ঋত্বিক নয়ন

বুধবার , ১৫ মে, ২০১৯ at ৫:১৩ পূর্বাহ্ণ
209

মুহূর্তকে ধরে রাখে আলোকচিত্র। সাক্ষ্য দেয় ঘটনার। একান্ত আনন্দ-বেদনার, অসঙ্গতির, কখনোবা প্রাপ্তিরও। একটি আলোকচিত্র জীবন বা সমাজের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠতে পারে। মানুষের প্রতিরোধ, প্রতিবাদ কিংবা মানবিকতার ভাষাও হয়ে উঠতে পারে। একটি ছবি সমাজ ও জীবনের অনেক কিছু পাল্টে দিতে পারে। তাপস বড়ুয়াও এমন একটি নাম।
আলো-ছায়ার খেলায় উদ্ভাসিত জীবনের কথা বলেন চট্টগ্রাম তথা দেশের কৃতী আলোকচিত্রী তাপস বড়ুয়া। বিগত ১৫ বছর ধরে তিনি চট্টগ্রামে নয়, থাকেন আমেরিকায়। কিন্তু মনটা তাঁর পড়ে থাকে চট্টগ্রামে। তাই তিনি কাজের ভিড়ে সময় পেলেই ফিরে আসেন চট্টগ্রামে। ‘চাটগাঁইয়া’ মাটির সোঁদা গন্ধ বুকে নিয়ে জীবিকার তাগিদে ফিরে যান প্রবাসে। যখন আসেন, তখন তাঁর ক্যামেরার চোখে আমাদের নিয়ে যান চট্টগ্রামের স্মৃতিময় অতীতে।
গতকাল মঙ্গলবার সকাল ১১টায় চেরাগী পাহাড় আজাদী চত্বরে ‘ফিরে দেখা তাপসের সেই ছবি’ শিরোনামে তাপস বড়ুয়ার আলোকচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন লায়ন্স জেলার নবনির্বাচিত গভর্নর লায়ন কামরুন মালেক। প্রদর্শনীটি সকাল ১১টা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল। এসময় উপস্থিত ছিলেন কবি ও সাংবাদিক অরুণ দাশগুপ্ত, আলোকচিত্র সাংবাদিক বুলবুল আহমেদ, শিল্পী মইনুল আলম, ফটোব্যাংক গ্যালারির প্রতিষ্ঠাতা শোয়েব ফারুকীসহ বিশিষ্টজনরা।
লায়ন কামরুন মালেক বলেন, একটি ছবি লাখো শব্দের চেয়ে শক্তিশালী। তাপস বড়ুয়ার ছবি এর বড় সাক্ষ্য বহন করে চলেছে ২৫/৩০ বছর পরেও। তাপসের প্রতিটি ছবিতে উঠে এসেছে মানবিক সমাজ বিনির্মাণের আর্তি। ছবিগুলো যেন কথা বলছে। তাপস নিজেই এখন একটা ইন্ডাস্ট্রি। আরো বেশি ভালো লাগছে তাপসের উত্থান আজাদীর মাধ্যমে। আজাদী সবসময় তার সাথে ছিল, আছে, আগামীতেও থাকবে। তাপসের নাম সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ুক-এ কামনাই করি।
কবি ও সাংবাদিক অরুণ দাশগুপ্ত বলেন, ২৫ বছর আগে কেমন ছিল চট্টগ্রাম, তা এ প্রজন্ম কল্পনা করতে পারবে না। কিন্তু তাপসের তোলা ছবিগুলো তাদের সেই ধারণাটা দিতে পারবে। ইতিহাসবিদগণ এখান থেকে জানতে পারবেন চট্টগ্রামবাসীর প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে কতটা দূরত্ব ঘুচেছে। এটাই আলোকচিত্রের সার্থকতা। ভালো লাগছে তাপস দীর্ঘদিন আজাদীতে কাজ করেছে। এখন আন্তর্জাতিকভাবে কাজ করছে। আজাদীর অংশ পৃথিবীর অংশ হয়েছে-এটা আমাদের জন্য গর্বের।
প্রদর্শনী প্রসঙ্গে তাপস বড়ুয়া বলেন, বর্তমান প্রজন্মকে তখনকার চট্টগ্রাম সম্পর্কে জানাতেই মূলত এই আয়োজন। এ জন্য আজাদী সম্পাদক এম এ মালেক স্যার, পরিচালনা সম্পাদক ওয়াহিদ ভাইসহ পুরো আজাদী পরিবার সবসময় আমায় প্রেরণা যুগিয়ে গেছেন।
স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সংবাদপত্র দৈনিক আজাদীতে থাকাকালে তাপস বড়ুয়া ছুটে বেড়িয়েছেন চট্টগ্রামের অলিগলি। প্রদর্শনীতে ঠাঁই পাওয়া একটি ছবির শিরোনাম ‘বাবার ছবির সাথেই শুধু পরিচয়’। ১৯৯৯ সালের ২৪ জানুয়ারি আজাদীকে ছবিটি প্রকাশিত হয়েছিল। ছবিতে কল্পিতা বিশ্বাস নামে সপ্তম শ্রেণীর এক শিশুর হাতে তার পিতা স্বপন বিশ্বাসের ছবি। ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি লালদিঘি মাঠে পুলিশের নির্বিচার গুলি বর্ষণে শহীদ হয়েছিলেন স্বপন। ছবি হাতে মেয়েটির চোখে ফুটে উঠেছে অসংখ্য প্রশ্ন।
তেমন আরেকটি ছবি কোর্ট হাজতের লকআপে থাকা এক যুবকের। কোমরে রশি, হ্যান্ডকাপ পরা যুবকের চোখ খুঁজছে চেনাজানা কাউকে। ছবিটি ১৯৯৬ সালের ১৮ জুন ছাপানো হয়েছিল আজাদীতে। তাপসের অপর একটি ছবির শিরোনাম, ‘তারা নিজেরাই নিজের কবর খুঁড়েছিলেন’। ১৯৯৪ সালের ১৭ মে আজাদীতে প্রকাশিত ছবিটির গল্প হলো, চট্টগ্রাম টেক্সটাইল মিলের ১০জন শ্রমিক আত্মাহুতি দিতে পাহাড়তলীতে নিজেদের কবর খুঁড়ছিলেন নিজেরাই।
‘তবুও জীবন…’ শিরোনামে অপর একটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে, পঙ্গু এক ব্যক্তি ক্রাচ হাতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন জাহাজের লোহার পাত কেটে নিয়ে যাওয়া দশ/বারোজনের। গল্পটা বললেন তাপস বড়ুয়া নিজেই। বলেন, পঙ্গু লোকটির নাম আবছার। ১৫ বছর ধরে জাহাজ ভাঙা শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। কাজের সময় এক দুর্ঘটনায় পাঁচ বছর আগে এক পা হারান তিনি। লোহার পাত বইবার শক্তি হারিয়েছেন, কিন্তু জীবনকে থামতে দেননি। এখন তিনি সহযোগীদের মনের শক্তি যুগিয়ে চলেন। ‘আরো জোরে হেঁইয়ো’ বলে হাঁক দেন, তাল মেলান অন্যরা।
তাপস বড়ুয়ার মেধা আর মননের সম্মীলন বুঝাতে এ চারটি ছবিই যথেষ্ট। এছাড়া পতেঙ্গা গুপ্তখাল এলাকায় রেলওয়ের লেভেল ক্রসিং না থাকা, ‘স্নেহ বৈরিতা মানে না’ শিরোনামে কুকুর-বিড়ালের সখ্যতা, ১৯৯৮ সালের ভয়াল ২৯ এপ্রিল কক্সবাজারের কুতুবদিয়া ও মগনামায় প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে নিহত মানুষ আর গবাদি পশুর মরদেহ একসঙ্গে ভেসে থাকার দৃশ্য, কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবিরে শিশুকে আঁকড়ে ধরে রাখা নিথর মায়ের অসহায়ত্বসহ নানা ছবি তুলেছিলেন আজাদীতে কর্মরত থাকাকালীন। প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে ৫৫টি ছবি।
১৯৮৬ থেকে ২০০৩ পর্যন্ত আজাদীতে স্টাফ ফটো জার্নালিস্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন তিনি। দেশি-বিদেশি নানা পুরস্কার পেয়েছেন। ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল ঘূর্ণিঝড়ে বিধ্বস্ত জনপদের আলোকচিত্র নিয়ে ‘ক্রাই অব হিউম্যানিটি’ শিরোনামে ১৯৯২ সালে প্রকাশিত আলোকচিত্র অ্যালবাম এবং ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত ‘নিউজ ডে এভরি ডে’ আলোকচিত্র সংকলনের জন্য তিনি বিখ্যাত। ১৯৮৮ সালে জাতীয় আলোকচিত্র প্রতিযোগিতায় প্রথম, ১৯৮৯ ও ১৯৯৪ সালে জাপানের টোকিওতে ইউনেস্কো আন্তর্জাতিক আলোকচিত্র প্রতিযোগিতা, ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশের ‘ফটো জার্নালিস্ট অব দ্য ইয়ার’ পদক এবং ১৯৯৪ সালে ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত ফেডারেশন ইন্টারন্যাশনাল আর্টস ফটোগ্রাফি (ফ্ল্যাপ) পুরস্কারে ভূষিত হন তিনি।

x