তবুও পুলিশে ক্যাশ বাণিজ্য

‘ক্যাশিয়ার’ বলতে কিছু নেই, নানা সময় ব্যবস্থা তারপরও থামছে না দৌরাত্ম্য

সোহেল মারমা

শনিবার , ২৭ এপ্রিল, ২০১৯ at ১০:০২ পূর্বাহ্ণ
81

‘ক্যাশিয়ার’ বলতে পুলিশে কোনো কিছু নেই। এই ভাষ্য নগর পুলিশ কমিশনারের। তবুও নেমে নেই ক্যাশ বাণিজ্য। কথিত ওইসব ক্যাশিয়ারের বিরুদ্ধে নানা সময়ে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তারপরও তাদের দৌরাত্ম্য থামছে না।
অভিযোগ আছে, নগরীর ১৬ থানায় নিয়মিত চাঁদা দিয়ে বছরের পর বছর ধরে অবৈধভাবে চলছে নানা ব্যবসা। আর চাঁদা উত্তোলনে নিয়োজিত আছে একদল ক্যাশিয়ার। সনাক-টিআইবি চট্টগ্রাম অঞ্চলের সভাপতি অ্যাডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী আজাদীকে বলেন, বিভিন্ন থানায় ক্যাশিয়ায়ের বাণিজ্য এখন একটি ‘ওপেন সিক্রেট’ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর মাধ্যমে বর্তমানে পুলিশ কর্তৃক জনগণের জানমালের নিরাপত্তার যে দাবি তোলা হচ্ছে তার ব্যত্যয় ঘটছে। তারা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার যে দাবি করছে সেখান থেকে বিচ্যুত হচ্ছে। এটা কোনোভাবে কাম্য নয়। তিনি বলেন, প্রকাশ্যে দুর্নীতির বিষয় নিয়ে হাসাহাসি করবেন। আপনারা বলবেন একটা, করবেন আরেকটা। আমরা সেটা কখনো চাই না। এর মাধ্যমে সাধারণ নাগরিকেরা সুশাসন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
আখতার কবির চৌধুরী বলেন, আমরা আশা করব, আগে যা হয়েছে সেখান থেকে সরে এসে পুলিশ যাতে জনগণের সত্যিকারের বন্ধু হতে পারে, জনগণের পুলিশ বলে মানুষ যাতে তাদের প্রতি আস্থা অর্জন করতে পারে, সেই ধরনের উদ্যোগ নেওয়া দরকার।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সিএমপি কমিশনার মাহাবুবর রহমান গতকাল দৈনিক আজাদীকে বলেন, ‘ক্যাশিয়ার’ বলতে পুলিশে কোনো কিছু নেই। যারা এসব করছে তারা হয়ত এগুলো গোপনে করে থাকতে পারে। এ বিষয়ে নজরদারি রাখা হচ্ছে।
তিনি বলেন, এই ধরনের অপরাধের সাথে যাদের জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাদের তথ্য আমাদের দিন। তদন্ত করে তাদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেব। ইতিমধ্যে কয়েকজনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
সিএমপি কমিশনার বলেন, পুলিশ বাহিনীতে কর্মরত কারোর যদি ক্যাশিয়ারের সাথে যুক্ত থাকার তথ্য পাওয়া যায়, তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত পূর্বক যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে তাদের চাকরিচ্যুতির মতো শাস্তি ভোগ করতে হবে। সমাজে অপরাধ নির্মূলের ক্ষেত্রে এমন বাধা আমরা রাখতে চাই না।
নগরীর একটি থানা এলাকার একজন ক্যাশিয়ার কোন কোন অবৈধ ব্যবসা থেকে চাঁদা উত্তোলন করেন? তার পরিমাণ কত? খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গুরুত্বপূর্ণ একটি এলাকায় মোট ৮৪ জন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে থানাটির ক্যাশিয়ার নিয়মিত চাঁদা আদায় করেন। ওইসব খাত থেকে মোট চাঁদা আদায় হয় ১০ লাখ টাকার ওপরে।
এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি খাত হলো, ভেজাল ঘি, চোরাই কাপড়, তামা, ব্যবসা, কালো বা পোড়া তেলের ব্যবসা, বিটাক ব্যবসা, লোহার পুল, পরিবহন, চোরাই মালামাল, মুরগির খাদ্য, গ্যাস, চালের বাজার, মাছের পোনা, চিংড়ি পোনা, বাজার, চোরাই কাঠ পাচার, অবৈধ যানবাহনের স্ট্যান্ড, ভেজাল টিন এবং ফুটপাত। তবে সেখানে জুয়া, মাদক ও পতিতাবৃত্তি ব্যবসাসহ আরো কয়েকটি অপরাধের নাম নেই। ওইসব অবৈধ খাত থেকে একটি বড় অংকের মাসোহারা ধার্য করা থাকে। থানায় নিযুক্ত থাকা ক্যাশিয়ার নিজে বা প্রতিনিধি দিয়ে টাকা আদায় করে তা থানা পুলিশের ঊর্ধ্বতনের কাছে বুঝিয়ে দেন।
নগরীর বাকি থানাগুরোর চিত্রও একই। সাধারণত ক্যাশিয়ারদের মধ্যে রয়েছেন পুলিশের অবসরপ্রাপ্ত ও চাকরিচ্যুত সদস্য, মাদক ব্যবসায়ী, সন্ত্রাসীসহ দাগী অপরাধীরা। বর্তমানে কর্মরত পুলিশ সদস্যরাও লাভজনক এ কাজে নিযুক্ত আছেন বলে অভিযোগ আছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রে জানা গেছে, ১৬ থানায় ৪০ জনের উপরে কথিত ক্যাশিয়ার রয়েছেন। নগর গোয়েন্দা পুলিশেও ক্যাশিয়ার আছে বলে অভিযোগ আছে।
জানা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে ক্যাশিয়ারদের হাতে সাধারণ বৈধ ব্যবসায়ীদেরও নাজেহাল হতে হয়। আর এসব ক্যাশিয়ার পদ পেতে লাগে লাখ লাখ টাকার ঘুষ, সাথে জোরালো তদবির। এভাবে কথিত এসব ক্যাশিয়ার বিভিন্ন স্থান থেকে পুলিশের নামে আদায় করছে কোটি কোটি টাকা।
নগরীতে ‘ক্যাশিয়ার’রা মাদক ব্যবসা, অবৈধ পলিথিন ব্যবসায়ী, জুয়ার আসর, ফুটপাতের অবৈধ হকার, আবাসিক হোটেলে পতিতা ব্যবসা, ম্যাসেজ পার্লার, জাল টাকার কারবারি, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ভেজাল সেমাই তৈরির কারখানা, ভেজাল ঘি কারখানাসহ বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য তৈরির কারখানা, সোনা চোরাচালান, কাঠ পাচারকারী, হুন্ডি ব্যবসায়ী, নানা ভেজাল পণ্য, পরিবহন ব্যবসায়ী, পাসপোর্টের দালাল, ট্রেনে মাদক বাণিজ্যসহ অবৈধ চোরাচালানিদের কাছ থেকে দৈনিক, সাপ্তাহিক ও মাসিক হারে এ টাকা আদায় করে আসছেন। চাঁদা নিয়ে ওদের অবৈধ কর্মকাণ্ডের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
গত বুধবার বায়েজিদ এলাকায় কল্পনা কমিডিটিস কোম্পানি নামে একটি ভেজাল ঘি কারখানায় অভিযান চালায় সিটি কর্পোরেশন। ওই অভিযানে ভেজাল ঘি ধ্বংস করে দেওয়ার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটিকে ৬ লাখ ২০ হাজার টাকা জরিমানা করে ভ্রাম্যমাণ আদালত। কারখানাটি দীর্ঘদিন ধরে ভেজাল ঘি উৎপাদন করে বাজারে বিক্রি করে আসছিল। তবে ওই অভিযানের আগে স্থানীয় কাউন্সিলর লোকজন ও পুলিশ নিয়ে কারাখানাটিতে প্রবেশ করে। এ সময় কারখানায় থাকা কর্মচারীরা পালিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর কাউন্সিরের কাছে এক পুলিশ কর্মকর্তার ফোন আসে। অবশ্য এর আগে ওই কাউন্সিলর অভিযান পরিচালনার জন্য মেয়রের কাছে ম্যাজিস্ট্রেটের সহায়তা চেয়েছিলেন।
দুই নম্বর জালালাবাদ ওয়ার্ড কাউন্সিলর সাহেদ ইকবাল বাবু গতকাল আজাদীকে বলেন, আমাকে ওই পুলিশ কর্মকর্তা ফোন করে বলেন, আপনারা কারখানাটিতে অবৈধভাবে প্রবেশ করেছেন। কারখানাটির বিএসটিআই অনুমোদন ও লাইসেন্সের কাগজপত্র সব ঠিক রয়েছে। তিনি আরো অনেক কিছু বলে অভিযান পরিচালনায় বাধা দিতে চেষ্টা করেছিলেন। ওই মুহূর্তে ম্যাজিস্ট্রেট ঘটনাস্থলে পৌঁছলে তাঁর উপস্থিতিতে ওই পুলিশ কর্মকর্তাকে ফোন করা হয়। তখন তিনি বলেন, উপরের নির্দেশনা ছিল।
কাউন্সিলর সাহেদ ইকবাল বলেন, ২০১৬ সালে ওই কারখানায় ম্যাজিস্ট্রেট জরিমানার পাশাপাশি কারখানাটি সিলগালা করে দিয়েছিলেন। সিলগালা করার কয়েকদিন পর আবার কারখানাটি চালু করা হয়েছিল। থানা পুলিশকে বিভিন্ন পর্যায়ে ম্যানেজ করে কারখানাটি গোপনে ভেজাল ঘি উৎপাদন করে আসছিল। তিনি জানান, মাঝেমধ্যে অবৈধ ব্যবসাগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালিত হয়। কিছুদিন পর আবার একই অবস্থা ফিরে আসে।
নগরীর এক মাদক ব্যবসায়ী জানান, তার ব্যবসা পরিচালনার জন্য প্রতি মাসে থানা পুলিশকে ২০ হাজার টাকা দিতে হয়।
পুলিশের সূত্র বলেছে, বিভিন্ন অভিযোগের প্রেক্ষিতে ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পুলিশের কথিত ২৩ ক্যাশিয়ারকে গ্রেপ্তারে ১৬ থানার ওসিকে নির্দেশ দিয়েছিলেন তৎকালীন সিএমপি কমিশনার আবদুল জলিল মন্ডল। তারপর ইকবাল বাহার সিএমপিতে যোগ দেওয়ার পর অভিযোগের ভিত্তিতে কয়েকজন ক্যাশিয়ারের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেন। এরপরও বন্ধ হচ্ছে না অবৈধ খাত থেকে টাকা সংগ্রহ।

x