তথ্য গোপন করে শত শত রোহিঙ্গা ভোটার!

মাত্র ১০ হাজার টাকায় ভোটার হয়েছেন রোহিঙ্গা ফয়াজউল্লাহ ও তার স্ত্রী!

আহমদ গিয়াস, কক্সবাজার

সোমবার , ৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ৯:১৬ অপরাহ্ণ
418

তথ্য গোপন করে ও টাকার বিনিময়ে শত শত রোহিঙ্গা ভোটার হয়েছেন বাংলাদেশে।

দীর্ঘদিন ধরে চলা এমন অভিযোগের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন অবশেষে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়া রোহিঙ্গা শনাক্তের কাজ শুরু করেছে। ইতোমধ্যে কক্সবাজারে ভোটার হওয়া ৫ রোহিঙ্গাকে শনাক্ত ও একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতার রোহিঙ্গা ফয়াজউল্লাহ মাত্র ১০ হাজার টাকায় ভোটার হয়েছেন বলে স্বীকার করেছেন।

অবৈধভাবে ভোটার হওয়া রোহিঙ্গা ফয়াজউল্লাহকে রবিবার রাতে আটক করে কক্সবাজার সদর থানা পুলিশ।

এরআগে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়া ফয়াজউল্লাহসহ ৫ জন রোহিঙ্গাকে শনাক্ত করে নির্বাচন কমিশন। তারা হলেন কক্সবাজার পৌরসভার ৭নং ওয়ার্ডের দক্ষিণ পাহাড়তলীর ইসলামপুরে বসবাসকারী ফয়াজ উল্লাহ (৩৯), ফয়াজ উল্লাহর স্ত্রী মাহমুদা খাতুন (৩৭), ১নম্বর ওয়ার্ডের কুতুবদিয়াপাড়ায় (নাজিরারটেক) বসবাসকারী মো. আইয়ুবের স্ত্রী নুরতাজ (৪১), সদরের পিএমখালী ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডের জুমছড়ির এলাকায় বসবাসকারী মৃত আব্দুল হাকিমের ছেলে মোহাম্মদ নোমান (৪১) ও সদরের ঝিলংজা ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডের পশ্চিম কোনারপাড়ায় বসবাসকারী নুরুল ইসলামের ছেলে এহসান উল্লাহ (১৯)।

কক্সবাজার সদর উপজেলা নির্বাচন অফিসার শিমুল শর্মা জানিয়েছেন, রোহিঙ্গা নাগরিক ভোটার হওয়ার বিষয়ে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের নির্দেশনার আলোকে সরেজমিন তদন্তকালে ৫ জন রোহিঙ্গার বাংলাদেশি জাতীয় পরিচয়পত্র পাওয়া যায়। এগুলোর নম্বর যথাক্রমে -১৯৮০২২২২৪০৭০০০০২২, ১৯৯৮২২২২৪০৭০০০০২৩, ২০০১২২১২৪৪৭০০০০০১, ১৯৭৮২২২২৪০১০০০০১০ ও ১৯৭৮২২১২৪৭১০০০০২৩।

অনলাইনে যাচাই করে দেখা যায়, তারা ২০১৯ সালে ভোটার তালিকা হালনাগাদের সময় তালিকাভুক্ত হয়।

জালিয়াতি করে এসব রোহিঙ্গা ভোটার হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ভোটার হওয়া এসব রোহিঙ্গার নিবন্ধন ল্যাপটপ আইডি নং যথাক্রমে -০৩৫১-০০০০ ও ৯৩১৮-০০০০ হলেও সদর উপজেলার ল্যাপটপ আইডির সাথে এর মিল নেই। তাছাড়া তাদের ভোটার আবেদন ফরমের সাথে উপজেলা থেকে সরবরাহকৃত ফরমেরও রয়েছে অমিল। এসব বিষয় যাচাই-বাছাই করে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সদর থানা পুলিশের সহযোগিতায় ৫ জন রোহিঙ্গার মধ্য থেকে রবিবার ফয়াজ উল্লাহকে আটক করা হয়।’

আটকের পর রোহিঙ্গা ফয়াজ উল্লাহকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ ও নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা। জিজ্ঞাসাবাদে মাত্র ১০ হাজার টাকা খরচ করে কীভাবে ভোটার হয়েছেন তা অকপটে স্বীকার করেন রোহিঙ্গা ফয়াজউল্লাহ।

নির্বাচন অফিসার শিমুল শর্মা বলেন, ‘রোহিঙ্গা ফয়াজ উল্লাহ আমাদের জিজ্ঞাসাবাদকালে চট্টগ্রামে গিয়ে মাত্র ১০ হাজার টাকায় ভোটার হওয়ার জন্য ছবি তুলেছেন বলে জানান।’

ফয়াজ উল্লাহ’র ভাষ্যমতে খোকন নামের একজনের মাধ্যমে চট্টগ্রামে গিয়ে ১০ হাজার টাকার বিনিময়ে ভোটার হওয়ার জন্য ছবি তুলেন তিনি। যথারীতি নির্বাচন কমিশনের সার্ভারে চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় তার নাম অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।

সম্প্রতি চট্টগ্রামে লাকি আক্তার নামের এক রোহিঙ্গা নারীর ভোটার হওয়ার ঘটনা শনাক্ত হয় যার হাতে কি না স্মার্টকার্ড পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। আর ওই লাকি আক্তারের বিস্তারিত তথ্য অনুসন্ধান করতে গিয়ে ধরা পড়ে ফয়াজ উল্লাহসহ আরো বেশ কয়েকজনের ঘটনা। তাছাড়া টেকনাফে পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত রোহিঙ্গা ডাকাত নূর মোহাম্মদেরও ছিল বাংলাদেশী স্মার্ট কার্ড।

রোহিঙ্গা ফয়াজ উল্লাহ প্রায় ২৫ বছর ধরে কক্সবাজার পৌরসভার ৭নং ওয়ার্ডের দক্ষিণ পাহাড়তলীর ইসলামপুরে সপরিবারে বসবাস করে আসছেন। সেখানে তিনি একটি চায়ের দোকানও খুলেছেন। ফয়াজ উল্লাহ’র স্ত্রী মাহমুদা খাতুন (৩৭)ও রোহিঙ্গা।

প্রায় ২৫ বছর ধরে তারা সপরিবারে কক্সবাজার পৌর এলাকায় বসবাস করে আসছেন। ভোটার আইডি কার্ড অনুযায়ী তার পিতার নাম মৃত লাল মিয়া, মায়ের নাম চেমন বাহার। তবে ভোটার হওয়ার ঘটনাটি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও কক্সবাজার পৌরসভার ৭নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আশরাফুল হুদা ছিদ্দিকী জামশেদ জানতেন না বলে দাবি করেন।

তিনি বলেন, ‘ফয়াজ উল্লাহ অনেক বছর ধরে ছত্তারঘোনা এলাকায় বসবাস করে আসছেন। তবে সম্প্রতি চট্টগ্রামের ঠিকানা দিয়ে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন বলে শোনা গেছে। এরপরই খবর পেয়ে তাকে আটক করা হয়েছে।’ তবে, ফয়াজ কোন পন্থায় ভোটার হয়েছেন তা তিনি অবগত নন বলে জানান।

কক্সবাজার জেলা নির্বাচন অফিসার শাহাদাত হোসাইন জানান, তথ্য জালিয়াতি করে বাংলাদেশের ভোটার হয়েছে এমন পাঁচ রোহিঙ্গাকে শনাক্ত করে তাদের বিস্তারিত তথ্য নিতে কক্সবাজার নির্বাচন অফিসে পাঠায় নির্বাচন কমিশন সচিবালয়। এরই প্রেক্ষিতে রবিবার তাদের শনাক্ত করা হয়। তাদের মধ্যে একজনকে আটক করা হয়। পরে তার বিরুদ্ধে কক্সবাজার সদর থানায় মামলা করা হয়। জালিয়াতি করে ভোটার হওয়া অপরাপর রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কক্সবাজারে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়া মাত্র ৫ জন রোহিঙ্গার ঘটনা ধরা পড়লেও আরো শত শত রোহিঙ্গার ঘটনা ধরা পড়েনি। নির্বাচন কমিশনের তথ্য সংগ্রহকারী ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ঘুষ দিয়ে এসব রোহিঙ্গা ভোটার হয়েছেন।

x