তখন আমাদের অনেক সময় ছিল

মোহছেনা ঝর্ণা

মঙ্গলবার , ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ at ৬:০৭ পূর্বাহ্ণ
128

তখন ছুটির দিনে সকাল সকাল বাজারে গিয়ে টকটকে লাল লাল টমেটো খুঁজে বেড়াতে হতো না। আলু, পেঁয়াজ, কাঁচামরিচ, ফুলকপি, বাঁধাকপি, লাউ, কুমড়া, গাজর, ক্ষীরা কিনতে হতো না। কিনতে হতো না কনফেকশনারি দোকানে গিয়ে ভিনেগার, সোডিয়াম বেনজুয়েট, কর্নফ্লাওয়ার, সয়াসস, টেস্টিং সল্ট….। বেগুন ভর্তার জন্য বেগুন পোড়াতে গেলে বেগুনের ভেতর পোকা আছে কিনা ভাবতে হতো না। মাছের পেটের মধ্যে আঙ্গুল চেপে দেখতে হতো না মাছ পঁচে গিয়েছে কিনা। লাল কানশি দেখে তাজা মাছ কিনে, মাছ কাটানোর জন্য রোদের মধ্যে লম্বা লাইন ধরে দাঁড়াতে হতো না। ঘরের সিলিং এর মাকড়সার ঝুল চোখে পড়তো না। কমোডের পাইপ দিয়ে পানি ঠিক মতো নির্গমন হচ্ছে না কেন সে চিন্তায় মেকানিক খুঁজতে হতো না। অনেকক্ষণ অন্ধকারে বসে থাকার পর প্রিপেইড মিটারে বিদ্যুতের কার্ড শেষ হয়ে গেছে কিনা, চাবি নিয়ে দৌড়ে নিচে নেমে দেখতে হতো না। বাড়ি ভাড়া, গ্যাস বিল, কারেন্ট বিল, পানির বিল, পেপার বিল, ডিশের বিল…. কিছুই ছিল না। মাসের সাংসারিক খরচ বলে কোনো হিসাব ছিল না। তখন আমাদের ‘সম+সার’এর সমন্বয়ে গড়া ‘সংসার’ই ছিল না। ফেসবুক ছিল না, হাতে হাতে স্মার্ট ফোন ছিল না, ইমো ছিল না, সামাজিক বন্ধু ছিল না, দেখানো সুখ, দেখানো আদিখ্যেতা ছিল না।

তখন আমাদের অনেক সময় ছিল!

তখন আমাদের অনেক ধৈর্য ছিল। আমরা প্রতীক্ষায় থাকতাম। আমরা শব্দ নিয়ে খেলতাম। ঘন্টার পর ঘন্টা আমরা প্রিয় কবিতার লাইন আওড়াতাম। বইয়ের পাতা খুঁজে খুঁজে রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ, অমিয় চক্রবর্তী, বুদ্ধদেব বসু, আবুল হাসান, পূর্ণেন্দু পত্রী, জয় গোস্বামী, নির্মলেন্দু গুণ, হেলাল হাফিজ, রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে কেটে যেতো আমাদের কত বেলা। ডানা মেলা পাখির মতো আমাদেরও অদৃশ্য ডানা ছিল।

ক্যাম্পাসে নাজিমের ঝুপড়িতে বসে লেকের ধারে এক শালিক দেখলেই আমরা হন্যে হয়ে আরেকটা শালিক খুঁজে বের করতাম। এক শালিক দেখলে নাকি দুঃখ পেতে হয়। আমরা হাঁটতাম। হাঁটতে হাঁটতে গান শুনতাম। ‘অমরত্বের প্রত্যাশা নেই, নেই কোনো দাবি দাওয়া, এই নশ্বর পৃথিবীর মানে শুধু তোমাকেই চাওয়া।’

ডিসি হিলের শান্ত প্রকৃতি আর গাছের ছায়ায় চা ফেরি করা কিশোরের হলুদ দাঁতের হাসি, রঙ চায়ে লেবুর ছোট্ট এক টুকরা অমৃতসমান স্বাদ, বাংলাদেশ নার্সারির নানা রঙের ফুল আর গাছ গাছালি দেখতে দেখতে দিনের আলো যে কখন ম্রিয়মাণ হয়ে যেত!

ইচ্ছে হলেই আমরা ছুটে যেতে পারতাম সিআরবির সবুজ উদ্যানে। মাঝে মাঝে পাহাড় চূড়ায় উঠে লাল রঙের দালানগুলোর সামনে বসে দেখতাম রাস্তায় পিঁপড়ার মতো কেমন কিলবিল করছে মানুষ। আবার থেমে থেমে নেমে আসতো শুনশান নীরবতা।

জুলাই মাসে ক্যাম্পাস বন্ধ থাকতো এক মাসের জন্য। সেই দিনগুলোতে দেখা হওয়া, কথা বলা ছিল দুরূহ। তখন সবার চোখ এড়িয়ে টেবিল ল্যাম্পের আলোতে বসে শব্দের মালা গাঁথতাম।

তখন আমাদের অনেক সময় ছিল!

স্টেডিয়ামে বৃক্ষ মেলায় ঘুরে ঘুরে নীল অর্কিড, ক্যাকটাস, অলকানন্দা, ডালিয়া, সাদা গোলাপ আর ইনডোর প্ল্যান্ট দেখতে দেখতে একটা ঘোরের ভেতর ডুবে যেতাম। শিল্পকলার চিত্র প্রদর্শনীগুলো কি অদ্ভুতভাবে টেনে ঠিকই ঘরের বাহির করে ফেলত। বসন্ত উৎসব, বর্ষা উৎসব, পিঠা উৎসব, বই মেলার দিনগুলোতে দুরন্ত ছুটে যাওয়া….। তখন আমরা আমাদেরকে অনেক সময় দিতাম।

আহ! তখন আমাদের অনেক সময় ছিল!

তখন আমাদের স্বপ্ন ছিল ছোট্ট একটা ঘরের। দখিনের এক চিলতে বারান্দার। সেই বারান্দায় বোগেনভিলিয়ার ঝাড়ের ছায়ায় কিংবা বৃষ্টির ছাঁটে ভিজতে ভিজিতে গরম চায়ের কাপে চুমুক। ক্যাসেট প্লেয়ারের জগজিৎ সিং কিংবা পংকজ উদাসের গজল……। বাস্তবতার ঘেরাটোপে স্বপ্নগুলি মুখ লুকিয়ে হাসে। জীবনের রিলে দৌড়ে দৌড়াই, শুধু দৌড়াই। দিবারাত্রির কাব্য মিলিয়ে যায় ১০০ মিটার গতিতে। আহ! ব্যস্ততায় ভুলে যাই কোথায় বৃক্ষমেলা চলছে, কোথায় পিঠা উৎসব, কোথায় ফুল উৎসবসব কেমন ম্লান হয়ে আসে কর্পোরেট কার্টেসির চাপে।

আর তখনই হঠাৎ হঠাৎ জীবন বাবু মনের বারান্দায় হেঁটে যায়ণ্ড

আমাকে খোঁজো না তুমি বহুদিনকতদিন আমিও তোমাকে

খুঁজি নাকো; – এক নক্ষত্রের নিচে তবু একই আলোপৃথিবীর পারে

আমরা দুজনে আছি;..”

x