ঢেঁকি এখন আর চোখে পড়ে না

অপু ইব্রাহিম : সন্দ্বীপ

সোমবার , ৫ আগস্ট, ২০১৯ at ১১:০৫ পূর্বাহ্ণ
52

‘বউ ধান ভানোরে ঢেঁকিতে পাড় দিয়া, ঢেঁকি নাচে বউ নাচে হেলিয়া দুলিয়া, বউ ধান ভানোরে’ গ্রাম বাংলার চিরায়িত সেই ঢেঁকি আর ঢেঁকির তালে সেই গান আজ সন্দ্বীপের গ্রামগঞ্জ থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে। এক সময় সন্দ্বীপে ঢেঁকির তালের শব্দে চাল গুঁড়া করা হতো মাঝরাত থেকে শুরু করে পরদিন ভোর পর্যন্ত। সেই ঢেঁকি আজ আধুনিকতার উৎকর্ষতার দাপটে গ্রামের নব বধূদের কাছে এখন শুধুই স্বপ্ন। যান্ত্রিকতার নির্মম আগ্রাসনে সেই ঢেঁকি এখন আর চোখে পড়ে না। আবহমান গ্রাম বাংলার প্রতিটি গ্রামের বাড়িতে এক সময় ঢেঁকির প্রচলন ছিল।
যেই নবান্নে ধান কাটার উৎসবের সাথে সাথে শীতের পিঠা বানানোর ধুম পড়তো প্রতিটি গ্রামে গ্রামে। দিনান্তের কাজের মধ্যে বাড়ির নববধূসহ নারীদের ব্যস্ত সময় কাটাত ঢেঁকির সঙ্গে। ঢেঁকিতে ধান ভেনে চাল বের করে রাতসহ পরবর্তী দিনের খাবার যোগাতেন গৃহবধূরা। তাই প্রতিদিন বিকেল হলে গ্রামে গ্রামে শোনা যেত ঢেঁকির শব্দ, সেই সঙ্গে বাহারি রকমের গান। ফলে শারীরিক দৈনন্দিন পরিশ্রমে নারীরা থাকতেন নিরোগ, স্বাস্থ্যবান। গাঁয়ের এ পাড়া পাড়ায় এক সময় ঢেঁকি দিয়ে চাল তৈরি, চিড়া ভাঙা, আটা, পায়েসের চালের গুঁড়ো, খির তৈরির চাল, কুমড়ো আর কলাই দিয়ে সুস্বাদু সেই ডালের বড়ি বানানোর সেই ঢেঁকি আজ অসহায় হয়ে পড়েছে ইঞ্জিন চালিত মেশিনের কাছে। ধান ভানা, চাউল গুঁড়ো করা সহ ঢেঁকির যাবতীয় কাজ করছে ইঞ্জিন চালিত মিশিনে। ধারণা করা হচ্ছে, ৭০ দশকের সর্বপ্রথম দেশে রাইস মিল বা মেশিন দিয়ে ধান থেকে চাউল বের করার প্রচলন শুরু হয়, তখন থেকেই ঢেঁকির প্রয়োজনীতা দিন দিন হ্রাস পেতে থাকে। বছর জুড়ে সারা দেশে তের পার্বণ পালিত হতো। এ সময় গ্রাম-গঞ্জের কৃষাণ-কৃষাণীরাও নবান্ন উৎসব, হেমন্ত উৎসব, পৌষ উৎসব, বিয়ে উৎসব থেকে শুরু করে বিভিন্ন উৎসবে পিঠা তৈরির ধুম পড়ে যেত। আধুনিকতার যান্ত্রিক কবলে গ্রাম-গঞ্জ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে এসব উৎসব আর ঢেঁকির ছন্দময় শব্দ।
আধুনিকতার ছোঁয়ায় হারিয়ে যাওয়া ঢেঁকির প্রসঙ্গে সন্দ্বীপের গৃহবধূ পারভীন আকতার বলেন, এক সময়কার ঐতিহ্যবাহী কাঠের ঢেঁকি আজ কালের বিবর্তনে হারিয়ে গেছে ও হারিয়েছে ঢেঁকির ছন্দময় শব্দ। পৌষ-মাঘে তীব্র শীতে আমাদের মা-চাচীরা বিভিন্ন গানের তালে তালে ঢেঁকিতে চালের গুঁড়ো করে নানা রকমের পিঠা বানাতো। ঢেঁকির গুণ সম্পর্কে একটি প্রবাদ বাক্য আছে ‘ঢেঁকি স্বর্গ গেলেও ধান বানে’ এ প্রবাদ বাক্যটিও এখন খুব একটা শোনা যায়না। ঢেঁকি শিল্প গ্রাম বাংলার প্রাচীন ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বৃদ্ধা শাহজাহান বেগম বলেন, আগে আমরা ১২ মাসই ঢেঁকিতে চাল ভানতাম। রাতের পরে রাত কেটে যেত ঢেঁকিতে ধান ভানতে ভানতে। সুন্দর সেই ঢেঁকির পাটের আওয়াজ শুনে কীভাবে যে রাত পার হয়ে ভোর হতো বুঝতে পারতাম না। আজ সেই ঢেঁকি ও ঢেঁকির আওয়াজ স্মৃতি হারিয়ে গেছে আমাদের মাঝ থেকে।
কৃষকনেতা সফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, আধুনিকতার যান্ত্রিকের কবলে পড়ে হারিয়ে গেছে গ্রামের অনেক ঐতিহ্য। আর এর মধ্যে অন্যতম হলো ঢেঁকি। ঢেঁকিতে ভাঙ্গা চাউল পুষ্টিকর সমৃদ্ধ।

x